সহকারী অধ্যাপক
০৫ নভেম্বর, ২০২১ ০২:৫৩ অপরাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহার জন্ম ৬১৩ খ্রীষ্টাব্দের শেষের দিকে। তবে অনেক ঐতিহাসিকের মতে এ সময়কাল ৬১৪ খ্রীষ্টাব্দের শুরুর দিকে বলে বিবেচিত হয় । তার পিতার নাম হযরত আবুবকর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। হযরত আয়েশার মায়ের নাম হযরত জয়নব উম্মে রুম্মান রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুয়ত প্রাপ্তির পর চারবছর অতিবাহিত হলে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহার জন্ম হয়।
বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে আয়েশা (রাঃ) এর বিয়ে ও বৈবাহিক জীবনের শুরু
মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁর বিয়ের কথা চলছিল জাবির ইবনে মুতয়িম এর সাথে। অবশ্য শেষপর্যন্ত তিনি মা আয়েশা (রাঃ)কে বিয়ে করলেন না , এই ভয়ে যে তাঁকে বিয়ে করলে পরিবার ইসলামের ছায়াতলে চলে আসবে। প্রচলিত নির্ভরযোগ্য মতানুসারে মা আয়েশা (রাঃ) এর বয়স যখন ছয়, তখন শিশু আয়েশার সাথে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পাঁচশত দেরহাম মোহরের বিনিময়ে বিয়ে হয়েছিল।কিন্তু সে সময় ই তাদের বৈবাহিক জীবন শুরু হয়ে যায়নি। বরঞ্চ নির্ভরযোগ্য মতানুসারে মা আয়েশা (রাঃ) এর বয়স যখন নয় বছর মতভেদে দশ/১৫ বছর , সেসময় থেকে তাদের বৈবাহিক জীবন শুরু হয়। ছয় ও নয় বছরের মধ্যবর্তী সময় তিনি পিতৃগৃহে শিশুসুলভ ভাবেই কাটিয়েছিলেন। বয়সের দিক থেকে তিনি ছিলেন বিশ্বনবীর স্ত্রীদের মধ্যে কনিষ্ঠতম।
হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহার সাথে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভাই এর সম্পর্ক ছিল। সে সময়কার আরবের অন্য সকল কুসংস্কারের মতোই একটি কুসংস্কার ছিল এই যে- কাউকে ভাই বলে সম্বোধন করা হলে তার মেয়েকে বিয়ে করা বৈধ নয়। একইসাথে নিষিদ্ধমাস সমূহে তারা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতোনা ইসলামের উদ্ভাসিত আলো এসকল ধারণার মুলে আঘাত করল। হযরত আয়েশা (রাঃ) এর সাথে মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাঃ এর বিয়ে হলো শাওয়াল মাসে। পরবর্তীতে কিছুকাল পরে আরেক শাওয়াল মাসে মহানবী (সাঃ) আয়েশা (রাঃ) কে নিজের ঘরে উঠিয়ে এনেছিলেন। এ মাসে কোন এক সময় সেখানে মহামারী হয়েছিল বলে এই মাসকে অশুভ ধরা হত। এভাবেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) উভয় কুসংস্কারের মুলে আঘাত করলেন।
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহার এর জীবনী আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, একজন নারীও ক্ষমতা রাখে যেকোন পুরুষ অপেক্ষা অধিকতর জ্ঞানী হবার। এমনকি একজন নারী হতে পারে নারী পুরুষ নির্বিশেষে যেকোন জ্ঞানী বা পন্ডিত ব্যক্তির শিক্ষার পথপ্রদর্শক। তাঁর জীবন এটাও আমাদের শিখায় যে একজন নারী স্বীয় নেতৃত্বের গুণাবলীতে ভাস্বর হয়ে , নারী ও পুরুষ উভয়ের উপরি প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাদের নিজের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুনের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করতে পারে জীবনের নানান ক্ষেত্রে। অনেকে নারী জ্ঞান ও নেতৃত্বের গুনের ভারে নিজের নারীত্ববোধ ওমমত্ববোধ হারিয়ে ফেলেন যা আমাদের সমাজে সচারচর হয়ে থাকে। মা আয়েশা (রাঃ) এর জীবন থেকে আমরা এশিক্ষা পাই যে নেতৃত্বের ও জ্ঞানের মহিমায় গুণান্বিত হওয়ার পাশাপাশিই একজন নারী হয়ে উঠতে পারে তার স্বামীর জন্য মহব্বত, স্নেহ, মমতার উৎস।
আয়েশা (রাঃ) এর মেধা ও প্রজ্ঞা
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহার মেধা ও প্রজ্ঞার দিক থেকে ছিলেন অন্যতম। তিনি ছিল ছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয়তম স্ত্রী। তার অর্জিত জ্ঞান ছিল আল্লাহ প্রদত্ত এবং স্বীয় চেষ্টা এবং নিরন্তর অধ্যাবসায়ের ফল। মা আয়েশা (রাঃ) এর যুগে সে ধরণের কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ছিলনা । তথাপি তার জ্ঞানমূলক বাক্য, তার দেওয়া শিক্ষা মুসলিম ইতিহাসের একটি উল্লেখ্যযোগ্য অংশ। খুব অল্প বয়সেই তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার মেধার এবংঅতুলনগ স্মরণশক্তির পরিচয় রেখেছিলেন। উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) স্বয়ং মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর স্নেহ, ভালোবাসা ও শিক্ষার সংস্পর্শে ছিলেন। তার মত করে কোন নারী মহানবীর সান্নিধ্যে থেকে এতটা জ্ঞান অর্জন করতে পারেননি।
স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক আয়েশা (রাঃ) এর পবিত্রতার ঘোষণা
উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) এর উপর একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে আয়িশা ও সাফওয়ান বিষয়ে বিতর্কিত অপবাদ রটানো শুরু হলে , স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক আয়েশা (রাঃ) পবিত্রতা সম্পর্কে ওহী নাজিল হয় মহানবীর জীবদ্দশায়। আয়েশা (রাঃ) মহানবীর জীবদ্দশায় এবং এর পরেও তার ঈমানের শক্ত ভিতের উপর ছিলেন।
আয়েশা (রাঃ) এর আল্লাহর পথে দানের ঘটনা
একটা সময় যখন মুসলমানরা ধনসম্পদ প্রচুর পরিমানে পেতে আরম্ভ করলো এবং অনেক ধনী ব্যক্তি ইসলামের ছায়াতলে আসল সেসময় আয়েশা (রাঃ) একশ হাজার দিরহাম অর্থ পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন।যখন পুরস্কার পেলেন তখন তিনি রোজা ছিলেন। সেসময় তিনি সম্পূর্ণ অর্থ গরীব, দুঃখী এবং যাদের প্রয়োজন আছে তাদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন।
যদিও সেসময় তার নিজের ঘরের জন্যই পর্যাপ্ত ছিলোনা। ক্ষণিক বাদেই এক সারভেন্ট যখন জিজ্ঞেস করলো আপনি কি এক দিরহাম দিয়ে , আপনার ইফতারের জন্য একটুকরো গোস্তও পারবেন?
তখন আয়েশা (রাঃ) বললেন মনে থাকলে আমি অবশ্যই এক দিরহাম রেখে দিতাম ।
মহানবী (সাঃ) এর মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত আয়েশা (রাঃ) তার পাশে ছিলেন
মহানবী (সাঃ) এর মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) তার পাশে ছিলেন। তার ভালোবাসা ও আশীর্বাদে সিক্ত ছিলেন। দয়ালনবী শেষ বারের মত আয়েশা (রা:) এর ঘরেই ছিলেন। অন্যান্য স্ত্রীদের থেকেও তিনি এই মত পেয়েছিলেন। আয়েশা (রাঃ) কক্ষেই দয়াল নবীর কবর এর ব্যবস্থা করা হয় ।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মৃত্যুর পর উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) আরো পঞ্চাশ বছরের মোট বেঁচেছিলেন। যাদের মাধ্যমে কুরআন, হাদিস সংরক্ষিত হয়েছিল তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) অতীব নিকটে থাকায় তার পক্ষে এমন অনেক কিছুই জানা সম্ভব হয়েছিল যা অন্যথায় সম্ভব ছিলোনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্র্ণ হলো এটা যে তার অর্জিত হাদিসের শিক্ষা কমপক্ষে তিন জনের মাধ্যমে লিখিত ভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল।সে সময়ের অনেক উচ্চশিক্ষিত ও মর্যাদাবান সাহাবীও আয়েশা(রাঃ) এর থেকে প্রাপ্ত তথ্য দ্বারা উপকৃত হয়েছিলেন।
শুধু জ্ঞান অর্জনের মধ্যেই আয়েশা (রাঃ) এর কাজ সীমাবদ্ধ ছিলোনা। তিনি সক্রিয়ভাবে জ্ঞানের বিস্তার এবং সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখেন।
খাদিজা আল কুবরা, ফাতিমা আজ জোহরা, এবং উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) কে ইসলামের শ্রেষ্ঠ তিন নারী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তার ব্যক্তিত্বের জন্য, এবং দায়িত্ববোধ ও দক্ষতার জন্য তিনি সমাজ , যুদ্ধ , জ্ঞান সকল ক্ষেত্রেই ছিলেন সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রায়শই তিনি যুদ্ধে নিজের অংশগ্রহণ কে অপছন্দের চোখে দেখতেন। তিনি ছিলেন এখনের এবং তার সময়ের সম্মানীত মহিলা।
উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা ৫৮ হিজরী সনের ১৭ রমজান মৃত্যুবরণ করেন ।
৭০
১৪৪ মন্তব্য