সহকারী শিক্ষক
০৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ১২:১৩ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ডিজিটাল কনটেন্টঃ
কোনো কনটেন্ট যদি ডিজিটাল উপাত্ত আকারে বিরাজ করে, প্রকাশিত হয় বা প্রেরিত-গৃহিত হয় তাহলে সেইসব কনটেন্টকেই ডিজিটাল কনটেন্ট বলে। কয়েকটটি ডিজিটাল কনটেন্ট হলোঃ ছবি, অডিও, ভিডিও ও এনিমেশন।
ডিজিটাল কন্টেন্ট বা শিক্ষায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমগুলো হল--
# অডিও উপকরণ
# পিকচার/ইমেজ
# ওয়েব ভিত্তিক উপকরণ
# মাল্টিমিডিয়া এনিমেশন
ভিডিও উপকরণ ডিজিটাল কন্টেন্টের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট, টিভি, সিডি-ও ডিভিডি, মোবাইল, ট্যাব ইত্যাদি ব্যবহার করে আমরা আমাদের পাঠ সংশ্লিষ্ট ভিডিও ক্লিপ পেতে পারি বা সংগ্রহ করতে পারি। ইন্টারনেটের youtube, teachertube, e-how.com, discovery education ইত্যাদিতে আমাদের কন্টেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় ভিডিও পাওয়া যায়। ক্লাস রুমে জটিল বিষয়কে সহজ ভাবে উপস্থাপনের জন্য খুবই কার্যকরী। এছাড়া বিভিন্ন লেকচার ভিত্তিক ও টিউটোরিয়ালভিত্তিক ওয়েবসাইট থেকে ভিডিও সংগ্রহ করা যায়। অনেক সময় একটি সাধারণ ক্যামেরা বা মোবাইল ফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে কোনো বিষয়, ঘটনা, রোল প্লে, ইত্যাদি ভিডিও করে ডিজিটাল কন্টেন্টে ব্যবহার করা যায়। ক্যামব্রিয়ান টিভি ডট কম থেকে বিভিন্ন ্নবিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ভিডিও লেকচার ডাউন লোডকরে ডিজিটাল কন্টেন্টে ব্যবহার করা যাবে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম গুলোতেও পাঠ সংশ্লিষ্ট অনেক ভিডিও ক্লিপ পাওয়া যায়।
ডিজিটাল কন্টেন্টে অডিও খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ। প্রকৃতি, প্রাণী, বিশেষ ঘটনা, সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয় ইত্যাদির সাথে সংশ্লিষ্ট অডিও ক্লিপ ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে ডিজিটাল কন্টেন্টে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া রেকর্ডার দিয়ে গল্প, কবিতা, ছড়াকার ও সুমিষ্ট কণ্ঠ ও সুন্দর বাচনভঙ্গি রেকর্ড করে সাহিত্যের বিভিন্ন ক্লাসে ব্যবহার করা যায়। উচ্চারণ ও উপস্থাপন ক্লাসে অডিওএর কোনোবিকল্প নেই। আবৃত্তি-গান কিংবা কোনোকিছুর ধারা বর্ণনার ক্ষেত্রে আমাদের মুঠো ফোনের অডিও রেকর্ডারই যথেষ্ট। এছাড়া ইংরেজি বা অন্য ভাষার ভিডিও ক্লিপে বাংলা নেরেশন ডাবিংএর ক্ষেত্রে মুঠো ফোনে অডিও রেকর্ড করা যায়।
ডিজিটাল কন্টেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হল পিকচার বা ইমেজ। গুগল ইমেজ সার্চের মাধ্যমে GIF, PNG, JPEG ইত্যাদি ফরমেটের যেকোনো ইমেজ পাওয়া যায়। ছবি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভালো রেজুলেশনের দেশীয় প্রেক্ষাপট ও বয়স উপযোগী ছবি নির্বাচন করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে বা কারো ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত হানে অথবা কোনো জাতিস্বত্তার অসম্মান হয় এমন ছবি ডিজিটাল কন্টেন্টে ব্যবহার করা যাবে না।
ওয়েবভিত্তিক উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীকে সরাসরি শ্রেণিকক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট ওয়েবে লিঙ্ক করে শিক্ষা দান করা যায়। শিক্ষার্থীরাও ওয়েবে নিজেরাও স্টাডি করতে পারে।
ডিজিটাল কনটেন্ট শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা। ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে শিক্ষাদান পদ্ধতি শিক্ষার ক্ষেত্রে এক নবদিগন্তের সূচনা করেছে। অর্থাত্ পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে একাধিক স্লাইডের সাহায্যে যে কোনো মূর্ত-বিমূর্ত বিষয়ে অতি সহজেই শিক্ষার্থীদের পাঠদান সম্ভব হয়। এই পাঠদান শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন হবে আনন্দদায়ক, তেমনি সহজবোধ্য। সনাতন চক, ডাস্টার, চকবোর্ড দিয়ে শিক্ষার্থীদের অনেক তত্ত্বগত ধারণা যথাযথ ভাবে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। কিন্তু ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে একাধিক স্থির বা চলমান চিত্রের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের যে কোনো বিষয়ে পূর্ণ ধারণা দেওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগ্রহণ হবে অনেক বেশি আনন্দদায়ক। বর্তমানে শহরাঞ্চল এমনকি গ্রামের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মোবাইল, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ইন্টারনেট প্রভৃতি বিভিন্ন ডিজিটাল উপকরণের সঙ্গে পরিচিত। এ প্রজন্মের এসব শিক্ষার্থীকে শুধুমাত্র চক, ডাস্টার, চকবোর্ডের সাহায্যে শ্রেণিকক্ষে ধরে রেখে পাঠদান পরিচালনা প্রায় অসম্ভব। তাই ডিজিটাল ক্লাসরুম এখন সময়ের দাবি। আর এর জন্য ব্যাপক আয়োজনেরও প্রয়োজন নেই। ডিজিটাল ক্লাসরুমের জন্য প্রয়োজন একটি কম্পিউটার, একটি প্রজেক্টর আর ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ ডাউনলোডের জন্য একটি ইন্টারনেট মডেম। এসব উপকরণ বর্তমানে ৮০/৯০ হাজার টাকায় ক্রয় করা সম্ভব। দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এসব উপকরণ ক্রয় করার সামর্থ্য আছে। তাছাড়া সরকারিভাবে এসব উপকরণ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে এসব উপকরণ সংগ্রহ করে যথাযথভাবে ব্যবহার করে ক্লাস নেওয়ার জন্য প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের আগ্রহ। তবে আশার কথা— ইতিমধ্যে ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়ার ব্যাপারে প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।
সরকার ইতিমধ্যে ২০৫০০ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ICT-i মাধ্যমে শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষকের প্রশিক্ষণ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এছাড়া www.ictinedubd.ning.com ব্লগের মাধ্যমে শিক্ষকরা তাঁদের নিজেদের তৈরি কনটেন্ট সহজেই ওয়েবসাইটে আপলোড ও ডাউনলোড করার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে একজন শিক্ষক তাঁর নিজের ধারণা দেশের অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে সহজেই শেয়ার করতে পারছেন। শিক্ষকদের অসংখ্য তৈরিকৃত স্লাইড থেকে প্রয়োজনীয় স্লাইড ডাউনলোড করে প্রয়োজনে সংযোজন ও বিয়োজন করে সহজেই শ্রেণিকক্ষে ব্যবহার করতে পারছেন। আর এ বিষয়ে শিক্ষক একবার অভ্যস্ত হলে তিনি আনন্দ লাভ করবেন এবং দিন দিন তাঁর আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া সরকারি উদ্যোগে শিক্ষকদের তৈরি ডিজিটাল কনটেন্ট প্রতিযোগিতা শিক্ষকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। এ প্রতিযোগিতা চালু থাকা প্রয়োজন। এতে শিক্ষকদের মধ্যে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হবে। শিক্ষক নিজের সফলতা দুর্বলতা সহজেই চিহ্নিত করতে পারবেন। ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে ক্লাস পরিচালনা করতে শিক্ষকদের ব্যাপক কম্পিউটার জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র কম্পিউটার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা ও মাইক্রোসফট পাওয়ার পয়েন্ট নিয়ে স্লাইড তৈরি এবং ইন্টারনেটের মহাসমুদ্র থেকে বিষয় সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় ছবি, ভিডিও, অ্যানিমেশনসহ অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ ডাউনলোড করার ধারণা থাকলেই চলবে। আর যে কোনো শিক্ষকের এসব বিষয়ে দক্ষ হতে মাত্র কয়েকটি সেশনের প্রয়োজন। যে সব শিক্ষক ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ডিজিটাল কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন তাঁদের মধ্যে থেকে অধিক দক্ষ শিক্ষকদের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে অন্যান্য শিক্ষককে সহজেই এ প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। তবে এর জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষকদের নতুন কিছু গ্রহণ করার মতো মন মানসিকতার পরিবর্তন।
একথা সত্য যে, চিরাচরিত শুধুমাত্র চক, ডাস্টার, চকবোর্ড দিয়ে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার উন্মেষ এবং শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক অংশগ্রহণমূলক পাঠদান অতি কঠিন কাজ । যা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। ফলে চিরাচরিত মুখস্ত করার প্রবণতা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনা সম্ভব হয় না। শিক্ষাদান কার্যে শিক্ষার্থীর যত বেশি ইন্দ্রিয়কে সম্পৃক্ত করা যাবে শিক্ষাদান তত বেশি চিত্তাকর্ষক ও স্থায়ী হবে। আর ইন্টারনেট এমন এক মহাসমুদ্র যেখান থেকে যে কোনো বিষয়ের তত্ত্ব, তথ্য, ছবি, ভিডিও, অ্যানিমেশন অতি সহজেই পাওয়া সম্ভব । প্রাপ্ত এসব উপকরণ দিয়ে অতি সহজেই একটি ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা যায়। আর একবার কোনো কনটেন্ট তৈরি করা হলে তা অতি সহজেই যে কোনো সহায়ক মেমরিতে সংরক্ষণ করে প্রয়োজনে বার বার ব্যবহার করা যায়। অন্য কোনো মাধ্যমে যা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। আর এসব উপকরণ যথাযথভাবে ব্যবহার করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন উপকরণের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে হবে। তাহলেই তারা বর্তমান পৃথিবীর উপযোগী হয়ে গড়ে উঠবে। তাই যেসব শিক্ষক ইতিমধ্যে ডিজিটাল কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিদ্রুত এসব ICT শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা প্রয়োজন। কারণ IT প্রশিক্ষিত শিক্ষকগণ তাঁদের অর্জিত প্রশিক্ষণ শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
৭১
১৪৫ মন্তব্য