Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ১১:৪৩ অপরাহ্ণ

কিশোর অপরাধ কী? কিশোর অপরাধের কারণ ও প্রতিকারসমূহ

কিশোর অপরাধঃ কিশোর বয়সীদের দ্বারা সংঘটিত সমাজে বিদ্যমান মূল্যবোধ ও নিয়মনীতি বিরোধী কাজই কিশোর অপরাধ। কিশোর অপরাধের কারণঃ প্রধান কারণ হলো দারিদ্র্যতা। সুষ্ঠু পরিবেশ ও মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হয়ে খারাপ সঙ্গ এবং পাচারকারী ও বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ব্যক্তির সাথে জড়িত হয়ে শিশু-কিশোররা অপরাধী হয়ে ওঠে।


সমাজে বিদ্যমান, হতাশা, নৈরাজ্য আর দারিদ্র কিশোর অপরাধ সৃষ্টির প্রধান কারণ। শহরের দূষিত পরিবেশে মানবেতর জীবনযাপন ও অশিক্ষা, ক্ষুধা, দারিদ্র কিশোরদের চুরি ছিনতাই, পকেটমারের মতো অপরাধমূলক কাজ করতে বাধ্য করে। মূলত সামগ্রিকভাবে কিশোর অপরাধের প্রধান কারণগুলো হলো- ভগ্ন পরিবার ও পিতামাতার দাম্পত্য কলহ।

কিশোর অপরাধের কারণসমূহঃ

এক ॥
কিশোর অপরাধ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। সকল সমাজেই রয়েছে এর অনিবার্য উপস্থিতি। তবে প্রকৃতি ও মাত্রাগত দিক থেকে তা বিচিত্র। প্রতিটি শিশুই ফিতরাত তথা স্বভাব-ধর্ম ইসলামের ওপর জন্মগ্রহণ করে। তার পিতা-মাতা ও আর্থ-সামাজিক পরিবেশ তাকে ইসলাম থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়ে অন্যত্র নিয়ে যায়। ফলে শিশু-কিশোররা মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে অপরাধ প্রবণতার দিকে ধাবিত হয়। সারাবিশ্বে ক্রমবর্ধমান হারে কিশোর অপরাধ যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তার ফলে এটি অল্প সময়ের মধ্যেই একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে পরিণত হতে পারে। যা একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ইসলাম আল্লাহ মনোনীত একমাত্র পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ইসলামে কিশোর অপরাধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্থান পেয়েছে।
শিশু-কিশোররাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে দেশ ও জাতির উন্নতি। শিশু-কিশোরদের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা অপরিসীম। তাদের একটি অংশ কোন কারণে অপরাধের সাথে যুক্ত হয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চরম হুমকি ও সুস্থ সমাজ জীবনের প্রতিবন্ধক হোক তা কারো কাম্য নয়। এজন্যই ইসলাম শিশু-কিশোরদের সুস্থ, স্বাভাবিক ও সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে এবং অপরাধমুক্ত জীবনযাপনের উপস্থাপন করেছে সর্বজনীন ও কল্যাণকর নীতিমালা। যা বাস্তবে কার্যকর করতে পারলে পরিবার পেতে পারে কাক্সিক্ষত প্রশান্তি এবং দেশ ও জাতি লাভ করতে পারে অমূল্য সম্পদ।
কিশোর অপরাধ পরিচিতি : কিশোর অপরাধ এর অর্থ হলো বাদ দেয়া, বর্জন করা, উপেক্ষা করা ইত্যাদি। রোমানরা কোন ব্যক্তির ওপর আরোপিত কর্ম অথবা কর্তব্য পালনে ব্যর্থতা বুঝাতে উবষরহয়ঁবহপু শব্দটি ব্যবহার করত। ১৪৮৪ সালে উইলিয়াম কক্সসন সর্বপ্রথম উবষরহয়ঁবহঃ পরিভাষাটিকে দোষী ব্যক্তির প্রচলিত অপরাধ বর্ণনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলেন। এছাড়াও ১৬০৫ সালে ইংরেজ কবি সেক্সপিয়ারের বিখ্যাত নাটক “গধপনবঃয” এ শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
কিশোর অপরাধ পরিভাষা আলোচনার পূর্বে শব্দ দু’টিকে পৃথকভাবে বিশেষণ করলে এর প্রতিপাদ্য বিষয় সহজেই অনুমেয় হবে। সাধারণত কিশোর বলতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক তথা বাল্য ও যৌবনের মধ্যবর্তী বয়সের ছেলেমেয়েদের বুঝায়।
তবে কৈশোর কালের সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও ইসলামী আইনে কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। প্রচলিত আইনে দেশ ও সমাজভেদে নির্দিষ্ট বয়সের ছেলেমেয়েরা কিশোর-কিশোরী হিসেবে বিবেচিত। যেমন বাংলাদেশে কিশোর অপরাধীর বয়স সীমা হলো ৭ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত। এছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচলিত কিশোর অপরাধীর বয়সসীমা নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো :
মিয়ানমার ৭ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, শ্রীলংকা ৭ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, ভারত ৭ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, পাকিস্তান ৭ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত, ফিলিপাইন ৯ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, থাইল্যান্ড ৭ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত, জাপান ১৪ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত, ইংল্যান্ড ৮ থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত, ফ্রান্স ১৩ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, পোল্যান্ড ১৩ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত, অস্ট্রিয়া ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত, জার্মানি ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত।
মহান আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন স্তরে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর অসীম রহমতে মানব সন্তান শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও প্রৌঢ়কাল পেরিয়ে বার্ধক্যে উপনীত হয়। এ প্রসঙ্গে আল কোরআনুল কারীমে আল্লাহতায়ালা বলেন, “আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর বীর্য থেকে, এরপর জমাট রক্ত থেকে, পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট ও অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট মাংসপি থেকে, তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্য। আর আমি এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মাতৃগর্ভে যা ইচ্ছা রেখে দেই, এরপর আমি তোমাদেরকে শিশু অবস্থায় বের করি; তারপর তোমরা যেন যৌবনে পদার্পণ কর। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে নিষ্কর্মা বয়স পর্যন্ত পৌঁছানো হয়, সে যেন জানার পর জ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে স্বজ্ঞান থাকে না।
কিশোর অপরাধ প্রত্যয়টির সংজ্ঞায়নে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিশোর বয়সে অবাঞ্ছিত ও সমাজবিরোধী আচরণ সম্পাদন করাকেই বলা হয় কিশোর অপরাধ। মার্কিন অপরাধ বিজ্ঞানী ঈধাধহ বলেন, সমাজ কর্তৃক আকাক্সিক্ষত আচরণ প্রদর্শনে কিশোরদের ব্যর্থতাই কিশোর অপরাধ। আইনগত দিক থেকে কিশোর অপরাধ বলতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ে কর্তৃক আইন বিরুদ্ধ দ-নীয় কর্ম সম্পাদন করাকেই বুঝায়। এ প্রসঙ্গে ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক আয়োজিত দ্বিতীয় কংগ্রেস অধিবেশনে কিশোর অপরাধের নির্ধারিত সংজ্ঞাটি উল্লেখ করা যেতে পারে। কিশোর অপরাধ বলতে কমিশন সে কাজকে বুঝায়, যে কাজ একজন বয়স্ক ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হলে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে কিশোর অপরাধের পরিচয়ে বলা যায় যে, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ে কর্তৃক সংঘটিত দেশীয় আইন, সামাজিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধের পরিপন্থী কর্মকা-কেই কিশোর অপরাধ বলে।
কৈশোরকাল মানব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ স্তর শেষ হওয়ার সাথে সাথে প্রত্যেক মানব সন্তানের ওপর বিভিন্ন শর’ঈ বিধি-বিধান ও সামাজিক দায়-দায়িত্ব আরোপিত হয়। এর আগ পর্যন্ত কিশোর-কিশোরীরা গায়রু মুকালাফ বা বিধি-বিধান পালনের বাধ্যবাধকতামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। কেননা হাদিসে তিন ব্যক্তিকে শরী’আতের বিধান পালনের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দিয়ে বলা হয়েছে, “তিন ব্যক্তি যাবতীয় দায় থেকে অব্যাহতি পেয়েছে; ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, অপ্রাপ্ত বয়স্ক যতক্ষণ না বয়ঃপ্রাপ্ত হয় এবং পাগল যতক্ষণ না সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন হয়।
কিশোর অপরাধের কারণ : কিশোর অপরাধের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা অত্যন্ত জটিল ও কঠিন বিষয়। তথাপিও অপরাধবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিশোর অপরাধের কারণ অনুসন্ধানের প্রয়াস চালিয়েছেন। যা অপরাধের নানাবিধ সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে ধারণা লাভে সহায়ক। কিশোর অপরাধের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক আরনল্ড টয়েনবী অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, বর্তমানের ধর্মহীনতাই অন্যান্য অপরাধের ন্যায় কিশোর অপরাধের কারণ। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রের জনক কার্লমার্কস এর মতে, কিশোর অপরাধসহ সব ধরনের অপরাধের মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রভাব। আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের জনক সিজার লোমব্রোসো কিশোর অপরাধের কারণ হিসেবে জৈবিক প্রভাবকে দায়ী করেছেন। সমাজবিজ্ঞানী হিলি এবং ব্রোনার (ঐবধষু ধহফ ইৎড়হহবৎ) কিশোর অপরাধের কারণ হিসেবে সামাজিক পরিবেশের প্রভাবকে চিহ্নিত করেছেন। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড কিশোর অপরাধের কারণ অনুসন্ধানে বাহ্যিক পরিবেশের পরিবর্তে মানুষের মনোজগতের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
পারিবারিক কারণ : কিশোর অপরাধ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সবসময় পরিবারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। কেননা পরিবার মানুষের আদি সংগঠন এবং সমাজ জীবনের মূল ভিত্তি। পরিবারের সূচনা হয় স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক বন্ধনের মাধ্যমে। আর পারিবারিক পরিম-লে সন্তানের জন্ম হয় এবং বিকাশ লাভ করে। সন্তানের স্বাভাবিক ও সুস্থ বিকাশের জন্য পিতামাতার মধ্যে সম্প্রীতিময় দাম্পত্য জীবন একান্ত অপরিহার্য। পিতা-মাতার মধ্যে মনোমালিন্য ও কলহ বিবাদ থাকলে সন্তানের ওপর তার বিরূপ প্রভাব পড়ে, যা পরিণামে শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণ হতে বিশেষভাবে সাহায্য করে।
অর্থনৈতিক কারণ : অর্থনৈতিক অবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কিশোর অপরাধের মাত্রাকে প্রভাবিত করে। দারিদ্র্য ও সম্পদের প্রাচুর্য উভয়ই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কিশোর অপরাধ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দরিদ্রতার কারণে মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়ে কিশোররা বিভিন্ন প্রকারের অপরাধে লিপ্ত হয়ে থাকে। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ (সা.) কুফরির পাশাপাশি দারিদ্র্য থেকেও আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে বলেন, “হে আল্লাহ্! আমি আপনার নিকট কুফরি ও দরিদ্রতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”

কিশোর অপরাধ প্রতিরোধের করণীয়সমূহঃ

অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরা আইনবিরোধী যে কাজ করে, সেটাই কিশোর অপরাধ বলে গণ্য। এই সময়ের বহুল আলোচিত বিষয় এটি। শিশু-কিশোরদের অপরাধ প্রবণতা জাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। আমাদের দেশে কোন বয়স থেকে অপরাধীকে কিশোর অপরাধী বলা হবে, সেটা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী ও আইনজীবীদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সেটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।

কিশোর অপরাধীরা সঙ্গ দোষ ও দারিদ্র্যের কারণে নানাবিধ অপরাধে জড়ায়। এসব অপরাধের অন্যতম হলো চুরি, খুন, জুয়া খেলা, বাড়ি থেকে পালানো, পরীক্ষায় নকল, বিদ্যালয় ও পথে-ঘাটে খারাপ আচরণ, পকেটমার, মারপিট, বোমাবাজি, গাড়ি ভাঙচুর ও এসিড নিক্ষেপ ইত্যাদি।

অশিক্ষা, সঙ্গদোষ ও দারিদ্র্য কিশোর অপরাধের অন্যতম কারণ। দরিদ্র পরিবার শিশু-কিশোরদের অনেক চাওয়া-পাওয়া ও স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না। এর ফলে, তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ে এবং হতাশা থেকে তারা অপরাধের দিকে পা বাড়ায়। এ ছাড়া সুস্থ পারিবারিক জীবন ও সুষ্ঠু সামাজিক পরিবেশের অভাবেও শিশু-কিশোর অপরাধী হয়ে ওঠে। যেসব বাবা-মা চাকরির সুবাদে সন্তানকে সময় দিতে পারে না, এ সময় ওই সন্তান চরম হতাশায় ভুগে কিশোর অপরাধীতে পরিণত হয়। তাছাড়া মাতা-পিতার অকাল মৃত্যু, বিবাহ বিচ্ছেদ, অভিভাবকের অতিরিক্ত শাসনের ফলেও অনেক সময় কিশোর অপরাধীর জন্ম হয়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য সবাইকে পদক্ষেপ নিতে হবে যথাযথভাবে।

কিশোর অপরাধ, অপরাধের ধরন ও প্রতিকার সম্পর্কে অভিভাবকদের জানতে হবে। অভিভাবকরা যদি সঠিকভাবে সন্তানদের লালন-পালন, পরিচর্যা, খোঁজখবর রাখেন ও পরিচালনা করেন তাহলে কোনো কিশোর অপরাধীর জন্ম নেবে না। এ জন্য পরিবারকে হতে হবে সচেতন, ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে সন্তানকে গড়ে তুলতে হবে।

পরিবারের সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে শিশু-কিশোররা কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে এবং কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে। তাদের চলাফেরায় খারাপ কাউকে দেখলে সন্তানকে সতর্ক করতে হবে। এ জন্য সন্তানের সঙ্গে পিতামাতার সুসম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি।

সন্তানদের সঠিক প্রতিপালনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে ইসলাম। এ প্রসঙ্গে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘পিতার ওপর পুত্রের যে অধিকার আছে, পুত্রের ওপরও পিতার তদ্রƒপ অধিকার আছে। পিতার অধিকার হলো, পুত্র শুধু আল্লাহকে অমান্য করার আদেশ বাদে তার সব আদেশ মেনে চলবে এবং পুত্রের অধিকার হলো, পিতা তার একটি সুন্দর নাম রাখবে, তাকে উত্তম প্রশিক্ষণ দেবে এবং কোরআন শিক্ষা দেবে।’ নাহজুল বালাগা

ইসলাম অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে চায়। এ কারণে শরিয়ত মানুষের নৈতিক সুরক্ষার্থে নিম্নবর্ণিত কর্মসূচি, বিধান ও মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে।

ক. ইসলাম আশৈশব ব্যক্তির সংশোধন, তার মন পবিত্র ও পরিশুদ্ধকরণ এবং তাকে নির্মলভাবে লালন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত মহান চরিত্রে বিভূষিত করে তোলে। তার অন্তরে ইমানের বীজ বপন করে তাকে কল্যাণমুখী বানাতে চায়। তার মধ্যে অপরাধবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করতে চায়।

খ. ইসলাম নিষিদ্ধ কাজ করা থেকে দূরে রাখার জন্য খারাপ পরিণতির ভয় প্রদর্শন করে। সে খারাপ পরিণতি মানুষের সামনে ভয়াবহরূপে চিত্রিত করে পেশ করা হয়েছে। যা স্বভাবতই মানব মনে এমন তীব্র ভীতির সঞ্চার করে, সে কিছুতেই সেই খারাপ কাজের দিকে পা বাড়াতে সাহস করে না।

গ. ইসলাম বিধিবিধানের মাধ্যমে সব ভালো কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা, পারস্পরিক কল্যাণ কামনা, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ, ধৈর্য অবলম্বনের উপদেশ এবং সব পাপ, সীমালঙ্ঘনমূলক কাজ, অন্যায়, জুলুম ও বিপর্যয় প্রতিরোধের নির্দেশ দেয়।

ঘ. মানুষের মন পবিত্রকরণ, আত্মা বিশুদ্ধকরণ এবং তাদের পাপ ও অভিশপ্ত কাজে জড়িত হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য ইসলামে অবশ্য পালনীয় দুটি ইবাদত সর্বজন পরিচিত, মৌলিক ও ব্যাপক প্রভাবশালী ইসলামি জীবনে সর্বাধিক গুরুত্বের অধিকারী। এ দুটি ইবাদত হলো নামাজ ও রোজা। মূলত এ দুটি ইবাদতই বিশেষ প্রশিক্ষণস্বরূপ। যার চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে সব ধরনের হীনতা-নিচতা থেকে মুক্ত করে কেবল এক আল্লাহর অনুগত বান্দা বানানো।

আবু দাউদ শরিফে নামাজ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের সন্তানকে সাত বছর বয়সে নামাজ পড়ার নির্দেশ দাও।’ নামাজ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালার ঘোষণা হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে সর্বপ্রকারের নির্লজ্জ ও ঘৃণ্য কাজকর্ম থেকে বিরত রাখে।’ সুরা আনকাবুত : ৪

রোজা মানবমনের যাবতীয় কু-প্রবৃত্তির ওপর লাগাম লাগিয়ে দেয় এবং রোজাদারকে যাবতীয় অপকর্ম থেকে বিরত রাখে। এভাবে ইসলামের মূলনীতি ও বিধানাবলির আলোকে মানবজীবনকে শৈশব-কৈশোর থেকে সব ধরনের অনাচার, পাপ ও পিঙ্কলতা থেকে মুক্ত করা গেলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অপরাধজনক কাজ থেকে দূরে সরে থাকবে।

স্থূলদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ সন্তানকে কেবল এই জন্য ভালোবাসেন যে তারা তাদের ঔরসে জন্ম নিয়েছে। তাদের সঙ্গে তাদের রক্তের সম্পর্ক রয়েছে কিংবা বৃদ্ধকালে তাদের মাধ্যমে উপকৃত হওয়া যাবে। এসব অভিভাবকের কাছে সন্তান সৎ বা অসৎ হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়। অতি আদর পেয়ে সন্তানটি জঘন্য অপরাধী হয়ে গেলেও বিষয়টি তারা হালকাভাবে গ্রহণ করেন। এমন পরিস্থিতিতে তারা অপরাধী সন্তানের পক্ষ নিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কথাও তারা তখন ভুলে যান। কিন্তু ‘ইমানদারের দৃষ্টি হতে হবে সত্যের প্রতি নিবদ্ধ। ইমানদার ব্যক্তি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেন না।

প্রাকৃতিক নিয়মে সন্তান মা-বাবার অধিকারে আসে। তাই তাদের সুশিক্ষা ও উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও মা-বাবার ওপর বর্তায়। পর্যাপ্ত পরিশ্রম ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও কোনো সন্তান আদর্শ মানুষ হতে না পারলে বুঝতে হবে যে মা-বাবার পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। এ ধরনের সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার নৈতিক ও মানসিক সংযোগ থাকার কোনো কারণ নেই। এমন অপরাধী সন্তানের ওপর প্রাকৃতিক বা পার্থিব শাস্তি আরোপিত হলে পরিবারের সদস্যদের তাদের পক্ষ নেওয়ারও সুযোগ নেই।

সমাজকর্মী, মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে যে অবক্ষয় ঘটছে, তারই প্রভাবে শিশু-কিশোর অপরাধ বাড়ছে। পরিবার ও কর্মক্ষেত্রেও সনাতন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ‘দুর্বল’ শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। কিশোর অপরাধের জন্য বিশ্লেষকরা সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন আকাশ সংস্কৃতি এবং অনলাইন প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাবকে। আকাশ সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ না করলে কিশোর অপরাধ দমন করা কঠিন। বলা যায়, এটি অসম্ভবও বটে।


মন্তব্য করুন