Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ ডিসেম্বর, ২০২১ ০১:৪৫ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের অন্যতম একটি প্রধান সমস্যা বাল্যবিবাহের কারণ ও কুফল
বাল্যবিবাহের কারণ ও কুফল
বাল্যবিবাহের কারণ
বাল্যবিবাহের কারণ নানাবিধ। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: দারিদ্র্য, কম বয়সে ছেলেমেয়ের বিয়ে দেওয়ার প্রচলিত সামাজিক প্রথা, যৌতুক প্রথা, মেয়েশিশুর সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, অজ্ঞতা, পারিবারিক ওয়াদা পূরণ, সচেতনতার অভাব, কুসংস্কার, সামাজিক অস্থিরতা, মেয়েশিশুদের বোঝা মনে করা, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া ইত্যাদি। উল্লেখিত কারণসমূহের মধ্যে মেয়েশিশুর নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আজকের প্রেক্ষিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ষণ, খুন, এসিড নিক্ষেপসহ নানা মাত্রায় এবং কায়দায় যে হারে নারী নির্যাতন বেড়ে চলছে তাতে মানুষ শংকিত। আর তাই ঘরে মেয়ে রেখে কেউ শান্তি ও স্বস্তি বোধ করেন না। মেয়ে একটু বড় হলেই সবার আগে বিয়ের ভাবনা আসে বাবা মায়ের মনে। দরিদ্র পরিবারে ভাবা হয় মেয়ে বিয়ে দিলে একটি খাওয়ার মুখ কমবে। অন্যদিকে মেয়েদেরকে উপার্জনক্ষম মানুষ হিসেবে গড়ে না তোলায় সংসারে তাদেরকে বোঝা মনে করা হয়। এসব কারণে মেয়েশিশুকে বাড়তি ঝামেলা মনে করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে দেয়ার নামে তাকে বিদায় করা হচ্ছে। রাস্তাঘাটে যৌন নির্যাতন বা বখাটেদের উৎপাতের কারণেও অভিভাবকেরা তড়িঘড়ি করে মেয়ের বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চান। এভাবেই বাড়ছে বাল্যবিবাহ।
বাল্যবিবাহ নিরোধের জন্য আইন আছে, কিন্তু বাস্তবে এই আইনের কার্যকর প্রয়োগ হচ্ছে না। আইনগত নানা জটিলতার কারণে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাও সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া বাল্যবিবাহ যে হয়েছে সবার আগে একথা প্রমাণ করা প্রয়োজন। আর এজন্য দরকার বর বা কনের বয়স নির্ণয় করা। অভিভাবকরা নানা কারণে ইচ্ছেমতো ছেলে কিংবা মেয়ের বয়স বাড়ায় কিংবা কমায়। ফলে কোথাও বাল্যবিবাহ হলে তা প্রমাণ করা প্রায়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বাল্যবিবাহের কুফল
বাস্তবে আমাদের দেশে কোনো কোনো শিশুর এতো অল্প বয়সে বিয়ে হয় যখন তাদের কাছে বিয়ের অর্থই পরিষ্কার থাকে না। শারীরিক ও মানসিক পূর্ণতাপ্রাপ্তির আগেই বাল্যবিবাহের শিকার হয় বিশেষ করে মেয়েরা। বাল্যবিবাহের খেসারত ছেলেমেয়ে উভয়কে দিতে হলেও মেয়েদের জীবনে এর কুফলের পরিধি ও মাত্রা ভয়াবহ এবং ব্যাপক। বাল্যবিবাহের মধ্য দিয়ে এক ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্দশাগ্রস্ত দাম্পত্য জীবনের দিকে মেয়েশিশু বা কিশোরীকে ঠেলে দেয়া হয়। অল্প বয়সী মায়েরাই বেশি মাতৃমৃত্যুর শিকার হয়। জীবন সম্পর্কে অনভিজ্ঞ নারী সংসারে নানাভাবে নির্যাতিত হয়। তার শিক্ষা ও দক্ষতা লাভের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। জীবিকার সংগ্রামে পিছিয়ে পড়ে নারী। দক্ষ শ্রমিক থেকে বঞ্চিত হয় পরিবার-সমাজ-অর্থনীতি। তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা প্রয়োজন।
দেশের কিশোরীদের প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশই অপুষ্টির শিকার। বিয়ের পরই স্বামী ও অন্যরা সন্তানের মুখ দেখতে চায়। এক বা দুই বছরের মধ্যে সন্তান না হলে স্বামী যদি বংশরক্ষার জন্য আবার বিয়ে করে ফেলে, সে জন্য মেয়ের বাড়ি থেকেও সন্তান নেওয়ার জন্য মেয়েটিকে চাপ দিতে থাকে। কিন্তু এই অপুষ্ট মা কম ওজনের সন্তানের জন্ম দেয়। নবজাতক মারা যায়। মারা না গেলেও মা ও সন্তানের অসুখ লেগেই থাকে। চিকিৎসার খরচ, পরিবারের লোকজনের কাজ কামাই দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি শুরু হয়। এতে নেতিবাচক অবস্থা চলতেই থাকে পরিবারটিতে।
ইউনিসেফ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মেয়েদের বাল্যবিবাহের কারণে বছরে ২ লাখ শিশুর জন্ম হয় স্বল্প ওজন ও মারাত্মক অপুষ্টি নিয়ে, মায়েরও স্বাস্থ্যহানি ঘটে। ইউনিসেফ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে গর্ভধারণ সংক্রান্ত জটিলতায় বাংলাদেশে বছরে প্রতি হাজারে ৫ জন মা মারা যাচ্ছে। অথচ এ হার জাপানে প্রতি লাখে ১ জন। এছাড়া আমাদের দেশে জন্মের সময় প্রতি হাজারে ৯০ জন শিশু মারা যায় ও এক মাস বয়েসী শিশু মারা যায় ৭০ জন। উন্নত দেশে এ অবস্থায় শিশু মারা যায় ১০ হাজারে ১ জন।
অল্প বয়সে বিয়ে এবং মা হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে জরায়ু ছিঁড়ে যাওয়াসহ জরায়ুতে ক্যান্সার হওয়ার আশংকা তৈরি হয়। অন্যদিকে আবার সন্তান লালন-পালন সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জনের আগেই বাল্যবিবাহ হলে সন্তানেরা মায়ের সঠিক পরিচর্যা থেকেও বঞ্চিত হয়। বাল্যবিবাহ স্কুলে যাওয়ার উপযোগী সন্তানদের শিক্ষার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করে। অথচ এই শিক্ষাই মানবসম্পদ হওয়ার প্রতি গ্রহণের জন্য একটি খুবই জরুরি চাহিদা। বাল্যবিবাহের ফলে বিশেষ করে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। মেয়েশিশুদের ব্যক্তিগত বিকাশ বা উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করে ফেলে বাল্যবিবাহ। আর এ বঞ্চনার ফলে অবশেষে সমাজ ও পরিবার মেয়েশিশুদের ভবিষ্যৎ সৃষ্টিশীল অবদান থেকে বঞ্চিত হয়। বাল্যবিবাহ মেয়েদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যেরও হানি করে। অন্যদিকে বালিকারা তাদের যৌন ও প্রজনন অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়। বাল্যবিবাহের কবলে পড়া মেয়েকে পারিবারিক নির্যাতনের দুর্ভোগও পোহাতে হয় অনেক বেশি।
মন্তব্য করুন

ব্লগ