Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ জানুয়ারি, ২০২২ ১০:১১ অপরাহ্ণ

আমাদের চেতনার উৎস বিদ্রোহী কবিতা

আজ ৬ জানুয়ারি, কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত 'বিদ্রোহী' কবিতা প্রকাশের শতবর্ষ পূর্ণ হলো আজ। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি বিদ্রোহী প্রথম প্রকাশিত হয় সপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায়। ওই সপ্তাহে বিদ্রোহীর জনপ্রিয়তার ফলে বিজলী দুবার  ছাপতে হয়। মুজাফফর আহমদের ভাষ্য মতে, ‘প্রায় দেড় দু’লক্ষ লোক কবিতাটি তখন পড়েছিলেন, যার ফলে নজরুলের কবিপ্রতিষ্ঠা খুব বেশি-রকমে বেড়ে গেল।’ বিজলীর পরে বিদ্রোহী ছাপা হয় ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় এবং সন্নিহিত সময়ে বিদ্রোহী ‘প্রবাসী', 'সাধনা, ‘ধূমকেতু’এবং ‘দৈনিক বসুমতি-তে ছাপা হয়।

লর্ড বায়রন তাঁর কবি জীবনের মধ্যপর্বে এসে একদিন বলেছিলেন-- 'I woke up one morning and found myslef famous.’ বায়রনের এই উক্তিটি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে দারুন তাৎপর্যের সাথে ঘটেছে। যদিও ‘বিদ্রোহী’ রচনার আগে নজরুল কয়েকটি ভালো কবিতা লিখেছেন কিন্তু ‘বিদ্রোহী’ রচনার পর এক সকালে নজরুল সত্যিই কবি হয়ে উঠলেন এবং সেটা প্রপাগাণ্ডা সৃষ্টি করে নয় বরং ‘বিদ্রোহী’র বাণী সেদিন অশ্ববেগে ছুটেছিল দিকবিদিক। কোনও একটি কবিতা প্রকাশের পর দেশব্যাপী এমন আলোড়ন সৃষ্টির ইতিহাস বাংলা সাহিত্যে নেই, বিশ্বসাহিত্যেও এমন তোলপাড় সৃষ্টিকারী কোনও কবিতার কথা আমরা শুনতে পাই নি।

বিদ্রোহী সম্পর্কীত অসংখ্য পাঠ প্রতিক্রিয়ার মধ্য থেকে বুদ্ধদেব বসুর ভাষ্যটুকু তুলে ধরছি : ‘‘বিদ্রোহী পড়লুম ছাপার অক্ষরে মাসিকপত্রে, মনে হলো এমন কখনো পড়িনি। অসহযোগের অগ্নিদীক্ষার পরে সমস্ত মন-প্রাণ যা কামনা করছিলো, এ যেন তা-ই; দেশব্যাপী উদ্দীপনার এই যেন বাণী।” [কালের পুতুল : বুদ্ধদেব বসু]

বিদ্রোহী কবিতা প্রথমদিকে আত্ম-প্রকাশের বিচিত্র ক্রীড়ায়- উন্মাদনায় উত্তাল; মাঝে বস্তুগত ও রোমেন্টিক এবং শেষ পর্যায়ে নিপীড়িতের উপর জুলুম-পীড়নের বিষয়ে প্রতিবাদী, অধীনতার বিরুদ্ধে শক্তিমত্ত আর খেয়ালী বিধির খামখেয়ালীর বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে চির- বিদ্রোহী বীরের সমুন্নতি প্রকাশে পরিতৃপ্ত।

বিদ্রোহী স্বতন্ত্র ও অভিনব হয়েও অপরাপর মহৎ সাহিত্যের সাথে যেমন তুলনীয় তেমনি নন্দন ও চেতনাপ্রবাহের দিকে থেকেও সহগামী। বিদ্রোহী কবিতা নিয়ে দীর্ঘ পর্যালোচনা-পরিবীক্ষণের পর বিশিষ্ট লেখক ধ্রুবকুমার মুখোপাধ্যায় যে অভিমত প্রকাশ করেছেন তার কিছু অংশ: ‘বিদ্রোহীর কথক ব্যক্তিমানুষটিও শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি মানুষ নয় বিশ্বমানবের প্রতিভূ। বিদ্রোহী কবিতা হয়ে উঠেছে লেখক নির্দেশিত সমস্ত অসংগতি, স্ববিরোধ ও ঘোষণার একটি আশ্চার্য, দৈব, অপ্রতিরোধ্য, ব্যাখ্যাতীত আবেগজটিল কেলাসনে। বিদ্রোহী শুধু আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সম্পদ নয়, বিংশ শতাব্দীর সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতার অন্যতম।’

চাই, বিদ্রোহী যে কাব্যিক-আবহ নিয়ে বাঙালির সামনে প্রতিফলিত ঠিক সেভাবেই বিশ্ববাসীর সামনে উদ্ভাসিত হোক। বিদ্রোহী যে বিশ-শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা তা বিশ্বব্যাপী আক্ষরিকভাবেই বিঘোষিত হোক। সর্বোপরি ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল'-হীন পৃথিবীর যে স্বপ্ন কবি দেখেছেন, যে বিশ্ববীক্ষা এ কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে, এ পৃথিবী তেমনই সর্বমানবের হোক।    

শৈশবে বিদ্রোহী আমাদের দেহ-মনে যে অবোধ্য দোলা জাগিয়েছে, দিনে দিনে তা আরও প্রবল প্রাণপ্রবাহ ছড়িয়েছে সর্বময়। বিদ্রোহী নিয়ে একটি রচনা লেখার চেষ্টা করেছি, সহসা তা প্রকাশিত হবে, অপেক্ষায় আছি।

আজ বিদ্রোহী'র দিন, একবার পাঠ হোক চির-বিদ্রোহের বাণী: 

'আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!

আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!'

- সংগৃহীত 

মন্তব্য করুন