Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০২:২৫ অপরাহ্ণ

আমরা জানবো কুমিল্লা জেলার নামকরণ ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস কুমিল্লা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি-

কুমিল্লা জেলার নামকরণ ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে ২৩°০২´ থেকে ২৪°৪৭´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°৩৯´ থেকে ৯১°২২´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ জুড়ে কুমিল্লা জেলার অবস্থান। রাজধানী ঢাকা থেকে এ জেলার দূরত্ব প্রায় ১০৫ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় সদর থেকে প্রায় ১৪৯ কিলোমিটার। এ জেলার দক্ষিণে ফেনী জেলা ও নোয়াখালী জেলা; পশ্চিমে চাঁদপুর জেলা, মেঘনা নদী ও মুন্সিগঞ্জ জেলা, উত্তর-পশ্চিমে মেঘনা নদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলা, উত্তরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা এবং পূর্বে ভারতের ও ত্রিপুরা প্রদেশ অবস্থিত।

অবস্থান ও সীমানা

কুমিল্লা একসময় বর্তমান ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ ছিল। ১৭৩৩ সালে বাংলার নবাব সুজাউদ্দিন খান ত্রিপুরা রাজ্য আক্রমণ করে এর সমতল অংশ সুবাহ বাংলার অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ত্রিপুরা দখল করে ১৭৯০ সালে কোম্পানী শাসনামলে ত্রিপুরা নামের জেলার সৃষ্টি। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে বর্তমান ভারতের ত্রিপুরা থেকে আলাদা করে কুমিল্লাকে জেলা হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়।

বর্তমান কুমিল্লা জেলা চট্টগ্রাম বিভাগের অধীনস্থ একটি জেলা। শুরুর দিকে এটি সমতট জনপদের অন্তর্গত হলেও পরবর্তীকালে এটি ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ হয়েছিল। কুমিল্লা নামকরণের অনেকগুলো প্রচলিত মত রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযাগ্য চৈনিক পরিব্রাজক ওয়াং চোয়াঙ কর্তৃক সমতট রাজ্য পরিভ্রমণের বৃত্তান্ত থেকে। তার বর্ণনায় কিয়া-মল-ঙ্কিয়া নামক যে স্থানের বিবরণ রয়েছে সেটি থেকে কমলাঙ্ক বা কুমিল্লার নামকরণ হয়েছে। এ অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রাচীন নিদর্শন‍াদি থেকে জানা যায় খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দী থেকে ত্রিপুরা গুপ্ত সম্রাটদের অধিকারভুক্ত ছিল।

১৭৬৫ সালে এটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে আসার পূর্বে মধ্যবর্তী সময়ে মুঘলদের দ্বারা শাসিত হয়েছে কুমিল্লা। ১৭৬৯ সালে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে কোম্পানী একজন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করে। তখন ঢাকা প্রদেশের অন্তর্গত ছিলো কুমিল্লা। কুমিল্লাকে ১৭৭৬ সালে কালেক্টরের অধীনস্থ করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরবর্তী সময়ে ১৯৬০ সালে ত্রিপুরা জেলার নামকরণ করা হয় কুমিল্লা এবং তখন থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর পদটির নামকরণ জেলা প্রশাসক করা হয়। ১৯৮৪ সালে কুমিল্লার দু'টি মহকুমা চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে পৃথক জেলা হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়।


মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি

মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লা ২ নং সেক্টর এর অন্তর্গত ছিল। ঢাকা, ফরিদপুরের কিছু অংশ, নোয়াখালী ও কুমিল্লা নিয়ে গঠিত হয়েছিল ২নং সেক্টর। এ সেক্টরের নেতৃত্ব দেন- মেজর খালেদ মোশাররফ (১০ এপ্রিল, ১৯৭১- ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১), মেজর এ.টি.এম. হায়দার (২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১- ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২)।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল ইপিআর ক্যাম্পেই ৪ জন পাকিস্তানি ইপিআরকে সাধারণ জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। জুনের শেষ দিকে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ছকারমার পুলের নিকট পাকবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের এক সম্মুখ লড়াইয়ে ১৮ জন পাকসেনা নিহত হয়। কসবা-ব্রাহ্মণপাড়া সীমান্তের ঘুংঘুর নদীর তীরে হোলাইমুড়ি নামক স্থানে পাকবাহিনীর সঙ্গে ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অনারারী ক্যাপ্টেন ওহাবের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধে ১ জন ক্যাপ্টেনসহ ১৫ জন পাকসেনা নিহত হয়। পরবর্তীতে পাকবাহিনী পার্শ্ববর্তী চান্দলা ও ষাইটশালা গ্রামে তাদের ক্যাম্প স্থাপন করে এবং প্রায় শতাধিক গ্রামবাসিকে হত্যা করে গণকবর দেয়। ৩১ মার্চ দেবিদ্বার উপজেলায় কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে পাকবাহিনীর সঙ্গে বাঙালিদের এক সংঘর্ষে প্রায় ৩৩ জন বাঙালি শহীদ হন। ৬ এপ্রিল লাকসাম উপজেলায় আজগরা বাজারে পাকবাহিনীর বোমা হামলায় প্রায় ২০০ জন নিরীহ গ্রামবাসি নিহত হয়। ২৩ মে দাউদকান্দি উপজেলায় স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকবাহিনী রায়পুরা গ্রামের ১১ জন নিরীহ লোককে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং পার্শ্ববর্তী জিংলাতলী ও হারপুর গ্রামের অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। এছাড়া দাউদকান্দি উপজেলার গোয়ালমারী বাজারে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের একাধিক লড়াইয়ে প্রায় ২০০ জন পাকসেনা ও স্থানীয় রাজাকার নিহত হয় এবং ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। জুলাই মাসে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার মাদারীপুর গ্রামে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ে উভয় পক্ষের বেশসংখ্যক সেনা হতাহত হয়। এছাড়া পাকবাহিনী কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ৫/৭ জন নিরীহ গ্রামবাসিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। জুলাইয়ের শেষ দিকে হোমনা উপজেলায় পাকবাহিনী তিতাস নদী পথে লঞ্চযোগে জয়পুর গ্রামে প্রবেশের চেষ্টা করলে নদীর দুই তীর থেকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা সশস্ত্র আক্রমণ চালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে লঞ্চটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আক্রমণে টিকতে না পেরে পাকবাহিনী দ্রুত মাছিমপুরের দিকে চলে যায়। এই যুদ্ধে পাকবাহিনীর অনেকেই হতাহত হয়। জয়পুর ছাড়াও হোমনা উপজেলার চম্পক নগর, ঘাগুটিয়া, নিলখী বাজার, দুলাল বাজার, হোমনা সদর ও পঞ্চবটি প্রভৃতি জায়গায় সংঘটিত পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের একাধিক লড়াইয়ে প্রায় ২৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং প্রায় ২৪ জন আহত হন। তাছাড়া পাকবাহিনী বর্তমান হোমনা ডিগ্রি কলেজের পাশে বহুসংখ্যক নিরীহ মানুষকে জীবন্ত কবর দেয়। ২ সেপ্টেম্বর বরুড়া উপজেলায় পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প আক্রমণ করে এবং গ্রামে প্রবেশ করে ৬ জন নিরীহ লোককে নির্মমভাবে হত্যা করে। ১০ সেপ্টেম্বর বরুড়া উপজেলার পয়ালগাছার বটতলীতে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘটিত লড়াইয়ে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১৩ সেপ্টেম্বর মনোহরগঞ্জ উপজেলায় হাসনাবাদ বাজারের উত্তরে চৌমুহনী নামক স্থানে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ লড়াইয়ে প্রায় ৭০ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং ১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১৯৭১ সালে মুরাদনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে রাজাকার ও পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ কয়েকটি সম্মুখ লড়াই হয়। এতে কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধারা বুড়িচং থানা আক্রমণ করলে পাকবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে ১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাছাড়া বুড়িচং উপজেলায় পাকবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘটিত একাধিক লড়াইয়ে ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ২৮ নভেম্বর চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর জগন্নাথদীঘি-ক্যাম্প দখল করে। চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের খণ্ড লড়াইয়ে উপজেলার প্রায় ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। দেবিদ্বার উপজেলায় পাকবাহিনী ৭ আগস্ট চর কামতায়, ২৯ সেপ্টেম্বর জাকেরগঞ্জ এলাকায় এবং ১৪ নভেম্বর থানা সদরের নিকট গণহত্যা চালিয়ে প্রায় কয়েক হাজার নিরীহ লোককে হত্যা করে। নাঙ্গলকোট উপজেলার তেজের বাজারে পাকবাহিনী ১১ জন নিরীহ লোককে হত্যা করে কবর দেয়। তাছাড়া নাঙ্গলকোট উপজেলায় স্থানীয় রাজাকাররা ১ জন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে হত্যা করে হাসানপুর রেলস্টেশনের পাশে পুঁতে রাখে। ১১ ডিসেম্বর চান্দিনা উপজেলায় পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধে প্রায় ১৪০০ পাকসেনা আত্মসমর্পণ করে। ১২ ডিসেম্বর এ উপজেলার কটতলায় সম্মুখযুদ্ধে ৭ জন পাকসেনা মারা যায় এবং ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাছাড়া ফাউই নামক স্থানে পাকবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘটিত লড়াইয়ে ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

 

মন্তব্য করুন