সহকারী শিক্ষক
৩১ জানুয়ারি, ২০২২ ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মশলা এবং ভেষজ ঔষধ গুণসম্পন্ন আদার উপকারিতা বেশ কার্যকারী। বহুল প্রচলিতভাবে আদা যদিও মশলা হিসেবেই বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আদা প্রাকৃতিক ভেষজ ঔষধের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। আদাতে রয়েছে স্বাস্থ্য উপকারিতা। এর মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক উপাদানগুলো স্বাস্থ্য রক্ষার্থে এবং ভালো রাখতে বেশ ভালো ভূমিকা রাখে। আমাদের শারীরিক কিছু সমস্যা আছে, যেগুলো দেখা দিলে ক্যামিকেল যুক্ত ঔষধ সেবন না করেই আদা খাওয়ার মাধ্যমেই সুস্থ্য হতে পারি। এছাড়াও মশলা হিসেবে সব মহাদেশেই আদার ব্যবহার লক্ষণীয়। আদা রান্নার স্বাদ বা টেস্ট দ্ধিগুণ করে ফেলে।
আদা হলো মূলত এক ধরনের মশলা। কিন্তু মশলাগুণের পাশাপাশি এতে রয়েছে অনেক রকমের স্বাস্থ্য উপকারিতা। জ্বর-সর্দি হতে শুরু করে গলা ব্যথা এবং-কি এমন অনেক রোগের থেকে রেহাই পাওয়া যায় আদা খাওয়ার মাধ্যমে। মূলত শরীর সুস্থ্য রাখতে আদা হলো প্রাকৃতিক খনিজ সমৃদ্ধ একটি মশলা বা ভেষজ ঔষধ।
আদার পুষ্টিগুণগুলো জানার পর আদার উপকারিতাগুলো বুঝতে বেশ সহজ হবে। শারীরিকভাবে আদার মধ্যে রয়েছে মানব শরীরের অসংখ্য উপকারিতা। যেগুলো আদা খাওয়ার মাধ্যমে উক্ত উপকারিতাগুলো পেতে পারি। নিয়মিত আদা খাওয়ার মাধ্যমে এবং নিয়ম অনুযায়ী সঠিকভাবে, সঠিক পরিমাপে আদা খাওয়ার মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যগত উপকারিতা। চলুন জানা যাক আদার উপকারিতাগুলো-
কাঁশি দূর করতে অনেক আগ থেকেই আদা ব্যবহার হয়ে আসছে। আদাতে থাকে এক ধরনের বিশেষ উপাদান, যা গলা চুলকানো দূর করে এবং এতে আছে প্রাকৃতিক পেইন রিলাইভার, যা গলার ব্যথা সহ কাঁশি দূর করে। প্রতিদিন দিনে কয়েকবার আদার টুকরো মুখে দিয়ে রাখলে কাশি কমে আসে।
যাদের ক্ষেত্রে পেটে অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিক রয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে পেটফাঁপা সহ আমাশয় হয়ে থাকে, তাদের জন্য আদা বেশ উপকারক একটি উপাদান। আদা পেটে যাওয়ার পর গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্ট পেটের মধ্যে থাকা পেশীগুলোকে শিথীল করে এবং ফলাফলসরূপ পেটফাঁপা কমে যায়। প্রতিদিন ১ চা চামচ আদার রসের সাথে মধু ও লেবু মিশিয়ে গরম পানিতে মিক্স করে খেয়ে ফেলুন। এভাবে দিনে কয়েকবার খেয়ে ফেলুন। এতে আমাশয় সহ পেটের সকল ধরনের পীড়া দূর হয়ে যাবে।
আমাদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা নানা রকম রোগে ভুগছি। এর মধ্যে ধরুন কেউ একজন হৃদরোগের সমস্যা নিয়েও ভুগছে। এমতোবস্থায় সে ডাক্তারের পরামর্শে ক্যামিকেল জাতীয় ঔষধ সেবন করে অস্থায়ী ভাবে সুস্থ্য আছে। কিন্তু সে যদি কিছু ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক উপায় অবলম্বণ করতো বা চেষ্টা করতো তাহলে সে অনেকাংশেই হৃদরোগের সমস্যা থেকে রেহাই পেয়ে যেতো। এক্ষেত্রে আদা কার্যকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রতিদিন মধুর ও লেবুর রসের সাথে আদার রস মিক্স করে যদি কয়েকবার খাওয়া যায়, তাহলে হৃদরোগের মাত্রা অনেক বেশি কমে যায়। পাশাপাশি যারা গ্যাস্ট্রিক এবং আমাশয় বা পেট ব্যথায় ভুগছেন, তারা এই পদ্ধতি অবলম্বণ করে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে পারে।
মাইগ্রেন এবং সাইনাসের ব্যথা কমাতে আদা বেশ কার্যকারী। ব্যথা যদি বেশি হয়ে থাকে এবং তাৎক্ষণিক ব্যথা কমাতে হবে এরকম পরিস্থিতি হলে সাথে সাথেই লবণ দিয়ে আদা খেতে হবে। তবে স্থায়ীভাবে এসব রোগ সারাতে হলে প্রতিদিন কয়েকবার করে ১০-১৫দিনের উপর আদা খেতে হবে। গরম একগ্লাস পানির সাথে মধু ও লেবুর রস মিশেয়ে আদা খেতে হবে। সপ্তাহে কয়েকবার এভাবে আদা খেলে মাইগ্রেন বা সাইনাসের প্রদাহ কমে যায়।
আদা খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পূর্বের চেয়ে অনেকাংশে বেড়ে যায় এবং অনেক বিজ্ঞানী দাবী করেন যে, নিয়মিত গরম পানির মাধ্যমে আদা খেলে তার গলা ব্যথা স্বাভাবিক একটা মানুষের চেয়ে অনেকগুণ কম থাকে। সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে গলা ব্যথা কমাতে আমাদের বেশি করে আদা খেতে হবে।
আদাতে আছে প্রাকৃতিক ভেষজ সম্পন্ন গুণ। যাদের একটানা কয়েকদিন কাঁশি থাকে, তাদের ক্ষেত্রে কয়েকদিন পর গলায় এবং বুকে কফ জমা হয়। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন সকালে এক গ্লাস পানির সাথে আদার রস এবং তুলসি পাতার রস এক সাথে খেলে আশা করা যায় গলা ও বুক থেকে কফ সরে যাবে। এছাড়া সাথে কাঁশি ভাবটা চলে যাবে। বুকের ভিতর জমে থাকা কফ এবং গলাতে জমে থাকা কফ দূর করতে এই পদ্ধতিটা চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
উচ্চ রক্তচাপ কমাতে বা হ্রাস করতে আদা বেশ কার্যকারী একটি উপাদান। যাদের দেহে প্রচুর ব্লাডপ্রেসার থাকে, তারা প্রতিদিন সকালে এবং বিকালে দুবলা করে আদা, লেবুর রস এবং মধু একসাথে করে খেলে উচ্চ রক্ত চাপ সহ আরো অনেক রোগ থেকে রেহাই পাবে। এই ক্ষেত্রে যেসব রোগীরা ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত তাদের ক্ষেত্রে মধুটা বাদ দেওয়া যেতে পারে। প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থায় আদার স্থান ছিল সর্বোচ্চ। কেননা আদা একাধিক রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যবহার হতো। কাশি দূর করতেও এই পদ্ধতিটা অবলম্বন করা যেতে পারে। মূলত আদা একাধিক রোগের ঔষধ, তাই ঘুরেফিরে খাওয়া এবং ঔষধ বানানোর কৌশলে একই ভাব চলে আসে। আদা কিডনির জন্যও বেশ উপকারি।
অসটিও আর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ফলে আমাদের শরীরের সবগুলো জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা তৈরি করে। এসব ব্যথা দূর করতে আদা বেশ কার্যকারী এবং ফলফস্রু। তবে এই ক্ষেত্রে অনেকে রান্না করে আদা খেয়ে ফেলে। যা মোটেও ঠিক নয়। রান্না করা আদার চেয়ে কাঁচা আদা চিবিয়ে বা পিষিয়ে খাওয়া বেশ কার্যকারী। কাচা আদাতে পুষ্টিগুণও বেশি থাকে। মূলত শরীরে প্রবেশের পর আদা টনিকের মতো কাজ করে। যা কয়েকদিন এভাবে খাওয়ার পর সম্পূর্ণভাবে প্রত্যেকটা জয়েন্টের ব্যথা দূর হয়ে যায়।
বেশি কাশি এবং সর্দি-জ্বর ফুসফুসের জন্য বেশ ক্ষতিকর। অত্যধিক কাশি হতে ফুসফুস ছিড়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। আদা খাওয়ার মাধ্যমে কাশি দূর করা যায়। এছাড়া অন্য ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া দ্ধারা আক্রমণের হার অনেকাংশে কমে যায় আদার কারণে। কেননা আদাতে আছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন গুণ এবং রয়েছে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল গুণ। ফুসফুস রক্ষাথে কিছু ব্যায়াম ও করা যেতে পারে। এগুলো আমাদের ফুসফুসের জন্য বেশ কার্যকারী ব্যায়াম। নিয়মিত আদার রস এবং লেবুর রস একসাথে করে খেলে দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্তর তৈরি হয়। তাই আদা ও লেবুর রস গরম পানির সাথে করে খেতে হবে।
আদাতে থাকা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট শরীরে প্রবেশ করার পর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরো বৃদ্ধি করে। নিয়মিত লেবুর রস এবং মধু দিয়ে আদা খেলে পূর্বের চেয়ে আরো অনেক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। প্রতিদিন সকালে এবং দিনে ১ বা ২বার করে খেতে হবে। একগ্লাস কুম-কুম পানির সাথে লেবুর রস এবং মধু মিক্স করে আদার রস মিশাতে হবে। এরপর খেয়ে ফেলতে হবে। এভাবে কয়েকদিন খাওয়ার পর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। বর্তমান দূষিত এই পরিবেশে বসবাস করার জন্য এবং আমাদের শরীরের অর্গানগুলো সুস্থ্য রাখার জন্য দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার মতো বিকল্প আর কোনো কিছুই নেই। তাই নিয়মিত উক্ত উপায়ে আদা খেতে হবে। তাহলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
আমাদের মধ্যে অনেকে আছে যাদের বিশেষ করে গাড়িতে চড়ার সময় বমি বমি ভাব চলে আসে। এছাড়াও মাঝে মাঝে কোনো কারণ ছাড়াই কারো ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব আসে। সেক্ষেত্রে যদি এক টুকরো আদা মুখে দিয়ে রাখা যায়, তাহলে বমি বমি ভাব দূর হয়ে যায় এবং মুখে স্বাদ স্বাদ একটা ভাব চলে আসে। কাচা আদা মুখে দিয়ে রাখলে কারো ক্ষেত্রে রুচির উন্নতি ঘটে। তাই মাঝে মাঝে কাচা এক টুকরো আদা খাওয়া যেতে পারে।
শ্বাসকষ্ট দূর করতে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়ার উন্নতির জন্য আদা বেশ কার্যকর। আদা খাওয়ার মাধ্যমে হাঁপানি রোগীরা বেশ উপকার পেতে পারে। কারো যদি ফুসফুসের ধমনিতে কোনো রকম সংক্রমণ হয়ে থাকে এবং শ্বাস নিতে কষ্ট অনুভব হয় , তাহলে সে প্রতিদেন দুইবার করে আদা খেলে এর থেকে রেহাই পেতে পারে। আদাতে রয়েছে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল জাতীয় পদার্থ। যা যে কোনো ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে ফুসফুসকে রক্ষা করে থাকে।
৫
৫ মন্তব্য