Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ০৮:১২ অপরাহ্ণ

সম্রাট শাহজাহানের সত্য-মিথ্যা কিছু তথ্য

মোঘল সম্রাট শাহজাহানের বয়স তখন মাত্র কুড়ি। একদিন আগ্রার বাজার দিয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ শাহজাহানের চোখ চলে যায় পরমা সুন্দরী নারীর দিকে। আরজুমান্দ বেগম নামের মেয়েটির বয়স তখন পনেরো। প্রথম দেখাতেই আরজুমান্দ বেগমকে ভালো লেগে যায় শাহজাহানের। পরবর্তীতে, ১৬১২ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে মমতাজের বিয়ে হয় তাঁর সঙ্গে। তবে এর আগে রাজনৈতিক কারণে পারস্যের রাজকন্যাকে বিয়ে করেন সম্রাট শাহজাহান। যদিও মমতাজই ছিলেন শাহজাহানের সব চেয়ে প্রিয় বেগম। উনিশ বছরের বিবাহিত জীবনে মমতাজের মোট চোদ্দটি সন্তান হয়। মমতাজ মহল ১৬৩১ সালে ৩৯ বছর বয়সে বুরহানপরে ১৪তম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। স্ত্রী হারানোর শোকে মুহ্যমান শাহজাহান তার প্রাণ প্রিয় স্ত্রীর স্মৃতির জন্য নির্মাণ করেন ভালবাসার এই অপরূপ নিদর্শন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর সাতদিন সাতরাত শাহজাহান কিছু খাননি। ঘর থেকেও বের হননি। সাতদিন পর শাহজাহান বাইরে বের হলেন। তখন তার চুলের রং ধূসর হয়ে গেছে, মুখ ফ্যাকাসে।

কিন্তু অদ্ভূত ব্যাপারটা হলো, সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজের প্রেম কাহিনী যতটা আলোচিত, ঠিক ততোটাই সমালোচিত। মমতাজ ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী। কোথাও বলা হয়েছে, মমতাজ শাহজাহানের ৩য় স্ত্রী, কোথাও বলা আছে ৪র্থ স্ত্রী। আসলে কততম স্ত্রী তা কোথাও সঠিকভাবে বলা নেই। পিএন অক নামের এক প্রফেসর তার ‘তাজমহল: দ্য ট্রু স্টোরি’তে শাহজাহান ও মমতাজের প্রেম কাহিনীর সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার লেখায় তিনি উল্লেখ করেন, মমতাজ ও শাহজাহানের ভালোবাসার গল্প মূলত রূপকথা যা লোকমুখে সৃষ্ট। কারণ এতো গভীর ও চমৎকার প্রেমের কথা ভারতের ওই সময়কার কোন সরকারি নথিপত্রে বা গ্রন্থে উল্লেখ নেই। তিনি আরও কিছু ডকুমেন্টরি উপস্থাপন করেন যা প্রমাণ করে, তাজমহল কখনোই সম্রাট শাহজাহানের আমলের নয়। সেগুলো হল, নিউইয়র্কের আর্কিওলজিস্ট মারভিন মিলার যমুনা নদীর তীর সংলগ্ন তাজমহলের দেয়ালের নমুনা পরীক্ষা করেন। তিনি এর কার্বন টেস্ট করে যে তথ্য পান, এই কার্বন সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলেরও চেয়ে ৩০০ বছর বেশি পুরনো! এছাড়া আরেকটি ব্যাপার হল কোন এক ইউরোপীয়ান পর্যটক ১৬৩৮ সালে আগ্রা ভ্রমণ করেন। সময়টি শাহজাহান স্ত্রী মমতাজের মারা যাওয়ার মাত্র ৭ বছর পর। কিন্তু তিনি তার লিখিত ভারতবর্ষ ভ্রমণ গ্রন্থে তাজমহল নামক প্রাসাদের কথাই উল্লেখ করেননি।

সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজের প্রেম কাহিনীতে বলা হয়েছে সম্রাট শাহজাহান মমতাজকে বাজারে দেখতে পান এবং প্রথম দেখাতেই মমতাজকে পছন্দ করে ফেলেন। কিন্তু এও শোনা যায় শাহজাহানের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগেও মমতাজের বিয়ে হয়েছিল। সম্রাট শাহজাহান মমতাজের সেই স্বামীকে হত্যা করে তারপর মমতাজকে বিয়ে করেছিল। শুধু তাই নয় মমতাজের আগেও সম্রাট শাহজাহানের আরও ৩ জন স্ত্রী ছিলেন। মমতাজকে বিয়ে করার পরও সম্রাট শাহজাহান আরও তিনটি বিয়ে করেন। এমনকি মমতাজ মারা যাওয়ার পর শাহজাহান মমতাজের আপন ছোট বোনকে বিয়ে করেন। তাজমহলের ডিজাইনারের নাম ছিল- ঈশা মোহাম্মদ। তিনি তার স্ত্রীকে উপহার দেয়ার জন্য একটি ভাস্কর্য বানায়। পরে সম্রাট শাহজাহানের পছন্দ হওয়াতে সেই ডিজাইনের আদলে বানানো হয় বিশ্ববিখ্যাত তাজমহল এবং সেই ব্যক্তিটির চোখ নষ্ট করে দেয়া হয় যাতে তিনি নতুন করে আর এই ডিজাইন তৈরি করতে না পারেন। শুধু তাই নয়, যে বিশ হাজার শ্রমিক দিন রাত খেটে এই মহলটি তৈরি করেছিলেন তাদের হাতও কেটে দিয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহান। ভালোবাসার এক নিষ্ঠুর ও নৃশংসতম ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে সম্রাট শাহজাহান-মমতাজের প্রেম কাহিনী ও তাজমহলের পেছনে।

আজ যেখানে তাজমহল দাঁড়িয়ে, সেখানটা ছিল মহারাজা জয় সিংহের সম্পত্তি। শাহজাহান মধ্য-আগ্রার একটি প্রকান্ড রাজপ্রাসাদের বিনিময়ে ওই জমিটি অধিগ্রহণ করেন। তাজমহলের নির্মাণ শুরু হয় ১৬৩২ সালে। মমতাজের মৃত্যুর এক বছর পর। ২০ হাজারের বেশি শ্রমিকের প্রচেষ্টায় ১৬৪৮ সালে, মমতাজের মৃত্যুর ১৭ বছর পর গম্বুজগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। যদিও পুরো কাজ শেষ হয় ১৬৫৩ সালে। শুধু মানুষ নয়; এ মহান কীর্তির ভাগিদার এক হাজার হাতি। যারা নির্মাণের জন্য মার্বেল পাথর পরিবহনে নিয়োজিত ছিল। এই সৌধ নির্মাণে বিভিন্ন ধর্মের স্থাপত্যের অনুকরণ করা হয়; যেমন তাজের মাথার ত্রিশূলটি হিন্দুদের শিবমন্দিরের অনুকরণে, মুসলমানদের মসজিদের মতো করা হয় তাজমহলের চারটি মিনার ও মাথার গম্বুজ। পুরো তাজমহল ১৮০ ফুট উঁচু যার প্রধান গম্বুজটি ২১৩ ফুট উঁচু এবং ৬০ ফুট চওড়া এবং এর চারপাশে চারটি মিনার আছে যার প্রতিটির উচ্চতা ১৬২ দশমিক ৫ ফুট। পুরো কমপ্লেক্সটির আকার ১৯০২X১০০২ ফুট। শুধু তাজমহলটি ১৮৬X১৮৬ ফুট মার্বেল পাথরের উপর নির্মিত। এর প্রধান প্রবেশদ্বার ১৫১X১১৭ ফুট চওড়া এবং ১০০ ফুট উঁচু। তাজমহল নির্মানের জন্য পাঞ্জাব থেকে আনা হয় স্বচ্ছ মার্বেল পাথর, চীন থেকে সবুজ পাথর, তিব্বত থেকে স্বচ্ছ ও নীল পাথর এবং শ্রীলংকা থেকে নীলমনি। তাছাড়া ভারত, পাকিস্তান, পারস্য ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২৮ রকমের মূল্যবান পাথর দিয়ে তৈরি করা হয় এই অনন্য স্থাপত্য।

মন্তব্য করুন