সহকারী শিক্ষক
০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ১০:৫৩ অপরাহ্ণ
আত্মহত্যা - Suicide. কোরআন এবং হাদিসের আলোকে অমার্জনীয় অপরাধ।
আত্মহত্যা - Suicide. কোরআন এবং হাদিসের আলোকে অমার্জনীয় অপরাধ।
আত্মহত্যা বা আত্মহনন হচ্ছে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ। ডাক্তার বা চিকিৎসকগণ আত্মহত্যাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করেন। এর পেছনে কাজ করে প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ বা ডিপ্রেশন। ফলে ভারসাম্য হারিয়ে তা সহ্য করতে না পেরেই আত্মহননের মধ্য দিয়ে দুর্বল চিত্তের ব্যক্তিরা মুক্তি খোঁজে থাকে।
ইতোমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশেই আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে এক ধরনের অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনে আত্মহত্যা কোন অপরাধ না হলেও আত্মহত্যার চেষ্টা করা অপরাধ। কেউ যদি আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় আইন তাকে সাজা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে পাশাপাশি আত্মহত্যায় সহায়তা, প্ররোচনা ও আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকেই আইনে নিষিদ্ধ করে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। উল্লেখ্য সকল ধর্মেই আত্মহত্যাকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যার পরিনাম খুবই ভয়াবহ।
মানুষের জীবনের মালিক আল্লাহ; তিনি মানুষকে মৃত্যু দান করেন। মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۖ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ-
'জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী; অতঃপর তোমরা আমারই কাছে ফিরে আসবে।’ (সুরা আনকাবুত- আয়াত ৫৭)
আল্লাহ মানুষকে মরণশীল করে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই মৃত্যু ঘটান। কিন্তু আত্মহত্যার ক্ষেত্রে বান্দা স্বাভাবিক মৃত্যুকে উপেক্ষা করে মৃত্যুকে নিজের হাতে নিয়ে নিজেই নিজকে হত্যা করে ফেলে। এ কারণে এটি একটি গর্হিত কাজ ও মহাপাপ। এ কাজ থেকে বিরত থাকতে মহান আল্লাহ্ তা’আলা বিশেষভাবে নির্দেশ দান করেছেন এবং এর পরিনামের কথা ভাববার জন্য কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির বর্ণনা দিয়ে মহা পবিত্র আল কুরআনে আয়াত অবতীর্ণ করেছেন।
কোরআনের বাণী-
وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا-
'আর তোমরা নিজেদের কাউকে হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের প্রতি দয়ালু।'
وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ عُدْوَانًا وَظُلْمًا فَسَوْفَ نُصْلِيهِ نَارًا ۚ وَكَانَ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا
'আর যে কেউ সীমালঙ্ঘন কিংবা জুলুমের বশবর্তী হয়ে এরূপ করবে, তাকে খুব শীঘ্রই আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজসাধ্য। (সুরা নিসা, আয়াত- ২৯-৩০)
আত্মহত্যা ও তার পরিণতি-
ইসলামী আইন ও বিধানে আত্মহত্যাকে হারাম করা হয়েছে এবং তার পরিণতিতে ছয়টি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থের বর্ণনায় আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পদ্ধতি অনুযায়ী তার শাস্তি ও যন্ত্রণাকে অব্যাহত রাখা হবে। রাসুল সা: আমাদের এ ব্যাপারে বিশেষভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত হাদিসটি উল্লেখ করতে হয়। তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামেও তার সেই যন্ত্রণাকে অব্যাহত রাখা হবে। আর যে ব্যক্তি ধারালো কোনো কিছু দিয়ে আত্মহত্যা করবে, তার সেই যন্ত্রণাকেও জাহান্নামে অব্যাহত রাখা হবে।’ (সহিহ বুখারি, খণ্ড ২, হাদিস নং ৪৪৬)
এমনকি রাসুল সা: নিজে আত্মহত্যাকারীর জানাজাও পড়েননি মর্মে সহীহ্ হাদিসে এসেছে-
'জাবির ইবনে সামুরা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী সা:এর দরবারে এক লোককে হাজির করা হয়, তীরের ফলা দ্বারা যে নিজেকে হত্যা করেছে। তখন তিনি তার জানাজা আদায় করেননি।’ (মুসলিম, হাদিস নং ৯৭৮)
যদিও শরিয়তের নির্দেশনায় আত্মহত্যাকারীর জানাযা হয় তবু রাসূল সা: নিজে কখনো আত্মহত্যাকারীর জানাযা পড়াননি। সাহাবিদের দ্বারা তা পড়ানো হয়। আত্মহত্যা ইসলামি শরিয়তে জঘন্যতম একটি পাপ, যার একমাত্র শাস্তি জাহান্নাম। নবিজি সা: আত্মহত্যাকারীর জানাজা আদায় না করা থেকেই প্রতীয়মান হয় যে আত্মহত্যাকারীর জন্য দোয়া করাও অনুচিত। আত্মঘাতকের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান হচ্ছে- আমির, আলিম ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা ওই ব্যক্তির জানাজায় শরিক হবেন না।
কুরআন হাদিসের আলোকে এটি প্রমাণিত সত্য যে, আত্মহত্যা কবিরা গুনাহ ও হারাম কাজ এবং এর পরিণতিও খুবই ভয়াবহ।
সুতরাং কুরআন সুন্নাহর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী হতাশা কিংবা যে কোনো কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে নিমিষেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া যাবে না। বরং এক আল্লাহর উপর ভরসা ও ধৈর্যের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্ত অতিক্রম করতে হবে। কেননা আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়; বরং আবেগতাড়িত হয়ে নিজের ভূলে নিজের জীবনকে চিরতরে নিঃশেষ করে দেওয়াটা শয়তানের প্ররোচনায় সংঘটিত এক অমার্জনীয় মহাঅপরাধ।
ডিপ্রেশন তথা মানসিক অশান্তি থেকে মুক্ত থাকতে মহান আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুলের বিকল্প নেই। কেননা আল্লাহতালা বলেছেন-
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ۚ
'যে মহান আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল বা ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত-৩)
সুতরাং যারা ইসলামী অনুশাসনে বিশ্বাসী এবং সে আলোকে নিজেদের জীবন পরিচালনা করেন, তারা কখনো আত্মহত্যা করে নিজেদের পরকালীন জীবনকে জাহান্নামে নিশ্চিত করবেন না কখনো। বরং সঙ্গী সাথীহারা একাকী জীবনে কঠিন মূহুর্তেও ভরসা রাখবে আল্লাহর উপর।
৫৩
৯২ মন্তব্য