Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

কালজয়ী বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের জীবনী :
বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম।
বাউল জগতের কালজয়ী এক মহাপুরুষের নাম।
তাঁর গানের বাণী ও সুরের মধ্য দিয়ে তিনি দেশ বিদেশের বাঙ্গালীদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।
ভাটি বাংলার অবহেলিত শাহ আব্দুল করিমের সৃষ্টি আজ বিশ্বময় ছড়িয়ে গেছে ।
বাউল শাহ আব্দুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই থানার উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
বাংলা বাউল গানের এই মহাপুরুষ সুর সহ প্রায় হাজারের উপর গান রচনা করেছেন।
নিগূঢ়তত্ত্ব,ভক্তিগীতি,দেহতত্ত্ব,বিচ্ছেদ,মনঃশিক্ষা,আল্লাহ স্বরণ,নবী স্বরণ,মুর্শিদ স্বরণ,প্রণয়গীতি,জারি, সারি, ভাটিয়ালী, জীবন তত্ব, প্রেম, জাগরনের গান,আঞ্চলিক, ও দেশের গান সহ বাউল জগতের প্রতিটা পর্যায়ে তাঁর গানের ছুয়া লেগেছে।
তাঁর মুর্শিদের নাম মৌলা বক্স মুন্সি।
তিনি বাজনা বাজিয়ে গান করতেন না,
তবে শাহ আব্দুল করিমকে গান গাইতে বাজনা ব্যাবহারের অনুমতি দেন।
গানের জগতে শাহ আব্দুল করিম তার রচনায় বাউল সাধক রশিদ উদ্দিনকে ও তাঁর উস্তাদ হিসাবে বর্ণনা করেন।
অত্যান্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহন করেন বাউল গানের এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ শাহ আব্দুল করিম ।
দারিদ্রতা পরিবারকে এমনভাবে আকড়ে ধরে রেখেছিল যে প্রতিবেলার খাবার যোগান দিতেও তার বাবার কষ্ট হত।
তাই সুযোগ হয় নি লিখাপড়া করার।
নাইট স্কুলে কয়েকদিন পড়েছিলেন এ বাউল সাধক। পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান হওয়ার তার উপর চাপটা বেশি ছিল। এজন্য তিনি চাকরি তে যোগ দেন। কষ্টে আকড়ে ধরা জীবনে তিনি ঈদের দিনেও ছুটি পেতেন না। দারিদ্র ও জীবন সংগ্রামের মাঝে বড় হওয়া বাউল শাহ আব্দুল করিমের সঙ্গীত সাধনার শুরু ছেলেবেলা থেকেই।
শাহ আব্দুল করিম সাহেব তাঁর কষ্টময় জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে রচনা করেন
********★********
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই মনে ভাবি তাই
দুঃখে আমার জীবন গড়া তবু দুঃখরে ডরাই । ।
গরিব কুলে জন্ম আমার আজও তা মনে পরে
ছোটবেলা বাস করিতাম ছোট্ট এক কুঁড়ে ঘরে
দিন কাটিতো অর্ধাহারে রোগে কোন ঔষধ নাই
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই ।।
এক সঙ্গে জন্ম যাদের তেরোশো বাইশ বাংলায়
আনন্দে খেলে তারা ইস্কুলে পড়িতে যায়
আমার মনের দুর্বলতায় একা থাকা ভালো পাই
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই ।।
পিতা-মাতার ছেলে সন্তান একমাত্র আমি ছিলাম
জীবন বাঁচাবার তাগিদে প্রথম চাকরিতে গেলাম
মাঠে থাকি গরু রাখি ঈদের দিনেও ছুটি নাই
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই ।।
সব-সময় গান গাইতাম মনের এই স্বভাব ছিলো
আমাকে নয় গানকে তখন অনেকে বাসত ভালো
রাগ-রাগিণী ভালো ছিলো রচনা করিয়া গাই
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই ।।
চাকুরি যখন ছেড়ে দিলাম হাতে নিলাম একতারা
দিবা-রাত্র গান গাই লোকে বলে বেশরা
উদাস মনের চিন্তা-ধারা মন যাহা চায় তাই গাই
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই ।।
গ্রামের মুরব্বি আর মোল্লা সাহেবের মতে
ধর্মীয় আক্রমন এলো ঈদের দিনে জামাতে
দোষী হই মোল্লাজির মতে পরকালেও মুক্তি নাই
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই ।।
নিষেধ-বাধা না মানিয়া কুলের বাহির হইলাম
একতারা সঙ্গে নিয়া ঘর-বাড়ি ছেড়ে দিলাম
ঘর-ছাড়া বাউল সাজিলাম সকলেরই ”করিম ভাই”
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই ।।
****
বাউল শাহ আবদুল করিমের সঙ্গীত সাধনার শুরু ছেলেবেলা থেকেই।
বাউল সম্রাটের অনুপ্রেরণার শক্তি ছিলেন
তার স্ত্রী মমজান বিবি অনেকে ভুলবশত লিখে ফেলেন আফতাবুন্নেসা।কিন্তু সঠিক সত্য মমজান বিবি,আরেকটি নাম ছিলো ওনার বৈশাখী।
শাহ আব্দুল করিম তাঁকে আদর করে সরলা বলেও ডাকতেন। বেশ কয়েকটি গান তিনি সরলার নাম দিয়ে লিখেছেন ও গেয়েছেন।
শাহ আব্দুল করিম তাঁর স্বাক্ষাতকারে বলেছিলেন
*যদি সরলা আমার জীবনসঙ্গী না হতেন তাহলে আমিও শাহ আব্দুল করিম হতে পারতাম না *
তাঁর প্রিয়তমা সরলা কে স্বরন করে তিনি রচনা করেন
*********★**********
সরল তুমি শান্ত তুমি নূরের পুতুলা
সরল জানিয়া নাম রাখি সরলা ।।
যেদিন তোমারে প্রথম নয়নে হেরি
সেদিন হতে তোমার কথা ভাবনা করি
পাগল-বেশে ঘুরি ফিরি বাজাই বেহালা ।।
শুইলে তোমারে সদা স্বপনে দেখি
ঘুম ভাঙ্গিলে মনে হয় সকলি ফাঁকি
আমি তোমার ছবি আঁকি বসে নিরালা ।।
আমার হয়ে তুমি আমার কাছে আসিলে
আদর করে তোমাকে লইয়া কোলে
সুবাসিত বনফুলে পরাব মালা ।।
আমি তোমারে কী বলিব প্রিয়া
মনে রেখো গো তুমি আপন জানিয়া
করিমের খবর নিও থাকিতে বেলা।
* আরেকটি গানে কবি বর্ণনা করেন*
*********★***********
প্রাণে আর সহে না দারুন জ্বালা
মরণ ভালা
প্রাণে আর সহেনা দারুন জ্বালা ।।
প্রেম-ফুলের গন্ধে
ঠেকিয়াছি ফান্দে
গলে পরেছি প্রেম মালা
মরণ ভালা
প্রাণে আর সহেনা দারুন জ্বালা ।।
আহার না লয় গো মনে
নিদ্রা নাই দুই নয়নে
শয়নে-স্বপনে যায়না ভুলা
বুঝাইলে না বুঝে মনে
জ্বলে মরি প্রেমাগুনে
অদর্শনে মন-প্রাণ উতলা
মরণ ভালা
প্রাণে আর সহেনা দারুন জ্বালা ।।
কোকিল মত্ত মধুর গানে
ভ্রমর মত্ত মধুপানে
আমি কাঁদি বসিয়া নিরালা
দিয়া তুমি প্রেম আলিঙ্গন,
শান্ত করো পোঁড়া মন,
সরল তুমি নাম তোমার সরলা
মরণ ভালা,
প্রাণে আর সহেনা দারুন জ্বালা ।।
বাউল আব্দুল করিম বলে
গণার দিন ফুরাইয়া গেলে
যাবো চলে আমি যে একেলা
ভাই-বন্ধু, পিতা-মাতায়
কি করিবে ভবের মায়ায়
দমের কোঠায় লাগবে যেদিন তালা
মরণ ভালা,
প্রাণে আর সহেনা দারুন জ্বালা ।।
এই রকম অসংখ্যা গান সরলাকে উদ্দ্যেশ্য করে লিখেন।
ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ দুঃখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলে সকল অন্যায়,অবিচার,কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে।
বাউল শাহ আব্দুল করিম কেবল বাউল ছিলেন না।
তিনি ছিলেন এক প্রতিবাদী গনসংঙ্গীত শিল্পী।
যা অন্য বাউলদের ক্ষেত্রে তেমন দেখা যায় না।
তাঁর রচনায় সেই প্রতিবাদী সমাজ সচেতন চিন্তা ফুটে উঠে। তিনি রচনা করেন।
******★*******
শোষক তুমি হও হুঁশিয়ার চলো এবার সাবধানে
তুমি যে রক্তশোষক-বিশ্বাসঘাতক,তোমারে অনেকে চিনে।।
প্রাণে আর ধৈয্য মানে না দেখে তোর নিতি-বিধান
মুসলিম লীগ নাম ধরিয়া গড়েছিলে পাকিস্তান
ভেতরে ঢুকিল শয়তায় গরিবকে মারলে প্রাণে।।
স্বার্থসিদ্ধি করবে বলে করেছিলে শয়তানী
না বুঝিয়া ভাইয়ে ভাইয়ে করেছি হানাহানি
কন্ঠাগত হলো প্রাণি তোমার নিষ্ঠুর শোষনে।।
মুসলিম লীগের নাও ডুবাইয়া যুক্তফ্রন্টে আসিলে
পরে আইয়ুবের ছত্রচ্ছায়ায় বেশ কয়েকদিন কাটাইলে
তারপর ইয়াহিয়ার কালে ছিলে অতি সন্ধানে।।
বাংলা স্বাধীন হইলে পরে, আবার দেখি তোমারে
বাঙ্গালির দরদি সেজে আসলে তুমি ছল করে
আর কী করবে তাহার পরে ভাবতেছি মনে মনে।।
বড় শয়তান সাম্রাজ্যবাদ নতুন নতুন ফন্দি আঁটে
মধ্যম শয়তান পুঁজিবাদ বসে বসে মজা লোটে
সামন্তবাদ জালিম বটে দয়া নাই তাহার মনে।।
তিন শয়তানের লীলাভূমি শ্যামল মাটি সোনার বাংলার
গরিবের বুকের রক্তে রঙ্গিন হলো বারে বার
সোনার বাংলা করলো ছারখার সাম্রাজ্যবাদ শয়তানে।।
স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে মজা মারল শোষকে
এখন সবাই বুঝতে পারে চাবি ঘুরছে কোন পাকে
মধু হয় না বল্লার চাকে বাউল আব্দুল করিম জানে।।
*****
গানের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকে শাহ আব্দুল করিম রচনা করেন অসংখ্যা গান।
গানটাই ছিলো তাঁর জীবনের সবকিছু।
অন্য আর কিছু চান নি কেবল গানকেই চেয়েছেন ।
তাঁর সেই বিখ্যাত গান
*******★*********
গান গাই আমার মনরে বুঝাই
মন থাকে পাগলপারা
আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া ।।
গানে বন্ধুরে ডাকি
গানে প্রেমের ছবি আঁকি
পাব বলে আশা রাখি
না পাইলে যাব মারা।
আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া ।।
গান আমার জপমালা
গানে খুলে প্রেমের তালা
প্রাণ বন্ধু চিকন কালা
অন্তরে দেয় ইশারা।
আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া ।।
ভাবে করিম দ্বীনহীন
আসবে কি আর শুভদিন
জল ছাড়া কি বাঁচিবে মীন
ডুবলে কি ভাসে মরা।
আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া ।।
****বাউল শাহ আব্দুল করিমের এ পর্যন্ত প্রায় দেড় সহস্রাধিক গান বর্তমান আছে যার সুরারোপ তিনি নিজে করে গিয়েছেন । বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে তাঁর ১০টি গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে।
প্রকাশিত বইঃ
বাউল শাহ আবদুল করিমের ৬টি গানের বই প্রকাশিত হয়। বইগুলো হলো- আফতাব সংগীত, গণ সংগীত, কালনীর ঢেউ, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে এবং ধলমেলা। এছাড়াও তাঁর রচনাসমগ্র ‘অমনিবাস’ পরবর্তীতে বাজারে এসেছে।
আফতাব সঙ্গীত (১৯৪৮)
গণ সঙ্গীত (১৯৫৭)
কালনীর ঢেউ (১৯৮১)
ধলমেলা (১৯৯০)
ভাটির চিঠি (১৯৯৮)
কালনীর কূলে (২০০১)
শাহ আব্দুল করিম রচনাসমগ্র (২০০৯)
শাহ আব্দুল করিমের সম্মাননা প্রাপ্তিঃ
শাহ আব্দুল করিম তাঁর স্বাক্ষাতকারে বলেছিলেন *আমার পুরুস্কারতো আমি অনেক আগেই পেয়ে গিয়েছি।
যখন কাগমারী সম্মেলনে আমার গান শুনে মাওলানা ভাসানী আমার পিটে হাত বুলিয়ে বলেছিলেন তুই একদিন গনমানুষের শিল্পী হবি।
মাওলানা ভাসানীর সেই কথা আমার কাছে এতোটাই ভালো লেগেছিলো যে তাঁর এই কথাগুলোই আমার বড় পুরুস্কার ছিলো। *
পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলায় শাহ আব্দুল করিম যে সকল পুরুস্কারে ভূষিত হন।
একুশে পদক (২০০১)
কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরি পদক (২০০০)
রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার (২০০০)
লেবাক এ্যাওয়ার্ড (২০০৩)
মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার আজীবন সম্মাননা (২০০৪)
মন্তব্য করুন