Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ১২:৩৯ অপরাহ্ণ

মধ্যযুগ ভৌত বিজ্ঞানের বিকাশ এবং কেপলার, গ্যালিলিও ও নিউটন এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উদ্ভবঃ

মধ্যযুগ ভৌত বিজ্ঞানের বিকাশ
নবম থেকে দ্বাদশ শতকে পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে আরবের নিবিড় সংযোগের ফলে উভয় পক্ষই লাভবান হয়েছিল। ইউরোপীয় সভ্যতার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার পুনরুজ্জীবনের ফলে বিশ্বজগৎকে নতুন করে দেখার তাগিদ অনুভূত হল এবং এভাবেই হল পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের জন্ম। চারদিকে নতুন নতুন পরীক্ষা সম্পাদিত হতে থাকে আর এসব পরীক্ষার ব্যাখ্যার জন্য জন্ম লাভ করতে থাকে নতুন নতুন ধারণার। ত্রয়োদশ শতকের সবচেয়ে পন্ডিত মানুষ ছিলেন অ্যালবার্টাস ম্যাগনাস (Albertus Magnus, ১১৯৩-১২৮০) তাঁর মতে বিজ্ঞান যা শোনা যায় তাকেই বিশ্বাস করা নয়। বিজ্ঞান হল প্রাকৃতিক ঘটনার যথার্থ কারণের অনুসন্ধান। মধ্যযুগে যখন নিয়মের প্রতি অন্য আনুগত্যই ছিল সাধারণ নিয়ম, সে সময় তাঁর এই বৈজ্ঞানিক মানসিকতা লক্ষ করার মত। রজার বেকন (Roger Bacon, ১২১৪-১২৯) ছিলেন পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রবক্তা। তাঁর মতে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমেই বিজ্ঞানের সব সত্য যাচাই করা উচিত।


লিউনার্দো দা ভিঞ্চি (Leonardo da Vinci, ১৪৫২-১৫১৯) পনের শতকের শেষদিকে পাখির উড়া পর্যবেক্ষণ করে উড়োজাহাজের একটি মডেল তৈরি করেছিলেন। তিনি মূলত একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন, কিন্তু বলবিদ্যা সম্পর্কে তাঁর উল্লেখযোগ্য জ্ঞান ছিল। ফলে তিনি কিছু সাধারণ যন্ত্র দক্ষতার সাথে উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন।

গ্যালিলিও-নিউটনীয় যুগে সংখ্যায় কম হলেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন বিজ্ঞানী জন্মগ্রহণ করেন। ডাঃ গিলবার্ট (Gilbert, ১৫৪০-১৬০৩) চুম্বকত্ব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও তত্ত্ব প্রদানের জন্য চিরস্মরণীয়। আলোর প্রতিসরণের সূত্র আবিষ্কার করেন জার্মানীর স্নেল (Snell, ১৫৯১-১৬২৬)। হাইগেন (Huygen ১৬২৬-১৬৯৫) পেণ্ডুলামীয় গতি পর্যালোচনা করেন, ঘড়ির যান্ত্রিক কৌশলের বিকাশ ঘটান এবং আলোর তরঙ্গতত্ত্ব উদ্ভাবন করেন। রবার্ট হুক (Robert Hooke, ১৬৩৫-১৭০৩) বিক্রিতকরণ বা (Distoring force)-এর ক্রিয়ার স্থিতিস্থাপক বস্তুর ধর্ম অনুসন্ধান করেন। বিভিন্ন চাপে গ্যাসের ধর্ম বের করার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল (Robert Boyle, ১৬২৭-১৬৯১)। ডন গুয়েরিক (Von Guericke) বায়ু পাম্প আবিষ্কার করেন, বিজ্ঞানী রোমার (Romer, ১৬৪৪-১৭১০) বৃহস্পতির একটি উপগ্রহের গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করে আলোর বেগ পরিমাপ করেন, কিন্তু তাঁর সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের কেউই বিশ্বাস করেননি যে আলোর বেগ এত বেশি হতে পারে।

কেপলার, গ্যালিলিও ও নিউটন এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উদ্ভব
কোপারনিকাস যে সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বের ধারণা উপস্থিত করেন কেপলার সেই ধারণার সাধারণ গাণিতিক বর্ণনা দেন তিনটি সূত্রের সাহায্যে। কেপলারের সাফল্যের মূল ভিত্তি হল, তিনি প্রচলিত বৃত্তাকার কক্ষপথের পরিবর্তে উপবৃত্তকার কক্ষপথ কল্পনা করলেন। গ্রহদের গতিপথ সম্পর্কে তাঁর গাণিতিক সূত্রগুলোর সত্যতা তিনি যাচাই করলেন গ্রহদের গতিপথ সম্পর্কে তাঁর গুরু টাইকোব্রাহের পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যের দ্বারা। কেপলারের গাণিতিক সূত্রগুলো পরিমাণগতভাবে গ্রহদের গতিপথ নির্ধারণ করলেও তা ছিল নিছক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যকে সমীকরণের মধ্যে ধারণ করার ব্যাপার।

আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রথম সূচনা ঘটে ইটালির বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর অবদানের ভিতর দিয়ে। তিনি প্রথম দেখান যে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং সুশৃঙ্খলভাবে ভৌত রাশির সংজ্ঞার্থ ও এদের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণ বৈজ্ঞানিক কর্মের মূল ভিত্তি। তিনিই অ্যারিস্টটলের ‘কেন?' প্রশ্নের পরিবর্তে 'কেমন করে ? এই প্রশ্নের প্রবর্তন করেন। গ্যালিলিও'র মৃত্যুর বছরেই নিউটনের জন্ম। গ্যালিলিও'র উদ্ভাবিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে পূর্ণতর রূপ প্রদান করেন নিউটন। গাণিতিক তত্ত্ব নির্মাণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে সে তত্ত্বের সত্যতা যাচাইয়ের বৈজ্ঞানিক যে ধারা তা প্রতিষ্ঠিত হয় নিউটনের বিস্ময়কর প্রতিভার দ্বারা। গ্যালিলিও সরণ, গতি, ত্বরণ, সময় ইত্যাদির সংজ্ঞার্থ ও এদের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণ করেন। ফলে তিনি বস্তুর পতনের নিয়ম আবিষ্কার ও সৃতিবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করেন। নিউটন আবিষ্কার করেন কলবিদ্যা ও বলবিদ্যার বিখ্যাত তিনটি সূত্র। আলোকবিদ্যায়ও তাঁর অবদান রয়েছে। গণিতের নতুন শাখা ক্যালকুলাসও তাঁর আবিষ্কার।

গ্রহদের গতিপথ সম্পর্কে কেপলারের সূত্রগুলোর মূল উৎসরূপে মহাকর্যের তত্ত্ব তিনি আবিষ্কার করেন। নিউটনের অবদান এতই গভীর ও সুদূরপ্রসারী যে সনাতনী পদার্থবিজ্ঞানকে নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞান বলা হয়।

মন্তব্য করুন