Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বাস ও মূল্যবোধ কী? শিক্ষাক্ষেত্রে এদের গুরুত্ব এবং মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সম্পর্ক

বিশ্বাস কী? 

বিশ্বাস মানুষের মনের একটি বিমূর্ত ধারণা বা বিমূর্ত ভাবনা। অর্থাৎ বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু হলো মন। কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি, বস্তু, ঘটনা বা ধারণাকে কেন্দ্র করে মানুষের বিশ্বাস গড়ে উঠে। বিশ্বাস মানুষের জীবনাচরণে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

মূল্যবোধ কী?

মূল্যবোধ কথার অর্থ মূল্যবান, মর্যাদাবান বা শক্তিশালী হওয়া।

মূল্যবোধের কতগুলো সংজ্ঞা নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • ব্যক্তির জানা, পরিচিত বা নিজের আয়ত্তে যা কিছু আছে, তার চেয়েও অধিকতর মূল্যবান, যা কিছু সঞ্চয় করে রাখার মতো তা হলো মূল্যবোধ।
  • মানুষের আচরণ পরিচালনাকারী নীতি ও মানদণ্ডকে মূল্যবোধ বলে।
  • কতগুলো মনোভাবের সমন্বয়ে গঠিত অপেক্ষাকৃত স্থায়ী বিস্বাসকে মূল্যবোধ বলে।
  • সমাজবিজ্ঞানী ডেবিড পোপেনো (David Popenoe) বলেছেন, “ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিক, কাঙ্ক্ষিত-অনাকাঙ্ক্ষি সমাজের সদস্যদের যে ধারণা, তার নামই হলো মূল্যবোধ।
  • সমাজবিজ্ঞানী এফ. ই. স্পেন্সার বলেছেন, ” মূল্যবোধ হলো একটি মানদণ্ড, যা আচরণের ভালো-মন্দ বিচারের এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন লক্ষ্য হতে কোনো একটি পছন্দ করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
  • সমাজবিজ্ঞানী এফ. ই. মেরিল (F. E. Merril)-এর মতে, সামাজিক মূল্যবোধ হলো বিশ্বাসের এক প্রকৃতি বা ধরন যা গোষ্ঠীগত কল্যাণে সংরক্ষণ করাকে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।

আর যে শিক্ষার মাধ্যমে সমাজে প্রচলিত রীতিনীতি, প্রথা, আদর্শ ইত্যাদির বিকাশ ঘটে তাই হলো মুল্যবোধ শিক্ষা। মূল্যবোধ হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি। এটি মানুষের আচরণের সামাজিক মাপকাঠি। একটি দেশের সমাজ, রাষ্ট্র,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উৎকর্ষতার অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে এটি ভূমিকা পালন করে।

জন্মের পর থেকে শিশুর জীবনের বহুমুখী বিকাশ হয়। এই বিকাশের লক্ষণ প্রকাশ পায় ব্যক্তির আচরণের মধ্যে। আচরণবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা যায়, শিশুর বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তার জন্মগত আচরণের মধ্যে পরিবর্তন আনতে থাকে; এই পরিবর্তিত নতুন আচরণকে বলা হয় অর্জিত আচরণ। এই অর্জিত আচরণগুলো সৃষ্টি করে, শিশু বা ব্যক্তির অন্তর্নিহিত কতগুলো অর্জিত জৈব-মানসিক প্রবণতা।

যেমন: বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে শিশু কতগুলো অভ্যাস গঠন করে। পরবর্তী পর্যায়ে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে কতগুলো স্থায়ী অনুরাগ গড়ে ওঠে। আরও পরে সেন্টিমেন্ট, মনোভাব ইত্যাদি জৈবমানসিক প্রবণতাগুলো গড়ে ওঠে। পরিণত বয়সে এসব জৈব-মানসিক প্রবণতাগুলোর অভিজ্ঞতার ফলে সমন্বয় ঘটে। এ ধরনের সমন্বয়ের ফলে, যে সর্বশক্তিসম্পন্ন জৈব-মানসিক সংগঠন গড়ে ওঠে, তা ব্যক্তির সবরকম আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই জৈব-মানসিক সংগঠনই হলো মূল্যবোধ। 

মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সম্পর্কে বিশ্লেষণ

  • মূল্যবোধ

বিশ্বাসের ভিত্তির উপর গড়ে ওঠে মূল্যবোধের কাঠামো। মানুষ তার বিশ্বাসের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করে। জীবনের প্রতিটি স্তরে বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাতে হবে মূল্যবোধকে প্রয়োগ করে। যেমন, একজন ব্যক্তি মানবিকতায় বিশ্বাসী। তিনি জীবজগতের প্রতি সব সময়ই সহানুভূতিশীল। এখানে তার বিশ্বাস তাকে এই মানবিক আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে, সে কারণে তিনি মানবিক আচরণকে গুরুত্ব দেন বা মূল্য দেন। এটাই তার মূল্যবোধ।

মূল্যবোধ ব্যক্তির শক্তি বা ক্ষমতা যার গুণে সে নিজের বৈশিষ্ট্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং যা সে চায় তাই অন্যের মধ্যে বিকশিত করতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রে মূল্যবোধের বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিষয়বস্তু, শিক্ষকের গুণাবলি, শিখন পরিবেশ এসব উপাদান শিক্ষার্থীর বিশ্বাস গঠনে প্রভাব বিস্তার করে। বিদ্যালয়ে যে বিশ্বাস সে অর্জন করবে তার উপর তার মূল্যবোধ গড়ে উঠবে। যে ব্যক্তি ইতিবাচক বা কল্যানকর গুণাবলিকে মূল্য দেন তিনি শিক্ষক হওযার যোগ্য। কারণ তার মূল্যবোধ ও দর্শন দ্বারা তিনি শিক্ষার্থীদের প্রভাবান্বিত করতে পারেন। মূল্যবোধ জাতীয় দর্শন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার নীতিমালা বা সার্বিক উন্নয়নে সহায়ক শক্তি। আধুনিক ধারণা অনুযায়ী মূল্যবোধ হলো কতগুলো জৈব মানসিক সংগঠনের এমন এক সমন্বয় যা পরিবেশের বৃহৎ অংশকে সক্রিয়তার দিক থেকে সমগুণসস্পন্ন করে তোলে এবং ব্যক্তির মধ্যে উপযুক্ত আচরণ সৃষ্টি করে। এ সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পরিবেশ ও পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের জৈব মানসিক প্রবণতা যা সাধারণধর্মী ও সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ সৃষ্টি করে তাকে মূল্যবোধ বলা হয়।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থানান্তর করার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় মূল্যবোধের উদাহরণ নিচে দেয়া হল,

  • শিক্ষকদের সম্মান করা
  • সহপাঠীদের সাথে সহযোগিতা করা
  • পরীক্ষায় নকল না করা
  • সত্যকে জানা ও বাস্তব জীবনে তা অনুশীলন করা
  • সাস্থ্য ভালো রাখার নিয়মনীতি মেনে চলা
  • ঈর্ষা, রেষারেষি এবং বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ না করা ইত্যাদি।

 

  • নৈতিকতা

“নৈতিকতা” যার অর্থ হলো ভদ্রতা, চরিত্র, উত্তম আচরণ। এটি মূলত উদ্দেশ্য, সিদ্ধান্ত এবং কর্মের মধ্যকার ভালো-খারাপ,উচিত-অনুচিত এর পার্থক্যকারী।

নৈতিকতা হলো কোনো মানদন্ড বা নীতিমালা যা নির্দিষ্ট কোন আদর্শ, ধর্ম বা সংস্কৃতি থেকে আসতে পারে। আবার এটি সেসকল বিষয় হতেও আসতে পারে যেসকল বিষয়কে সমগ্র মানুষ কল্যাণকর হিসেবে আখ্যায়িত করে। নৈতিকতাকে “সঠিকতা” বা “ন্যায্যতা”-ও বলা যায়।

নৈতিকতার আদর্শে পরানীতিবিদ্যা অন্তর্ভুক্ত থাকে যেখানে নৈতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ, উক্তি, প্রবণতা এবং বিচারের প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা-বিশ্লেষণ করা হয়। নৈতিকতার একটি আদর্শ উদাহরণ হলোঃ “আমাদের উচিত অন্যের সাথে সেভাবেই আচরণ করা যেমনটা আমরা নিজেরা অন্যের থেকে আশা করব।”

অপরদিকে, অনৈতিকতা হলো নৈতিকতারই সম্পূর্ণ বিপরীত। যা অসচেতনতা, অবিশ্বাস, উদাসীনতারই বহিঃপ্রকাশ।

(সংগৃহীত)

মন্তব্য করুন

ব্লগ