সহকারী শিক্ষক
০১ মার্চ, ২০২২ ০৬:৫৫ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ক্যামব্রিয়ান এক্সপ্লোশন পৃথিবীতে প্রাণের ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রায় ৫৫ কোটি ৪১ লাখ বছর আগে, ক্যামব্রিয়ান যুগে পৃথিবীর জীবজগতে বেশ বড়সড় একটা পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। আধুনিক প্রাণীরা যেসব পর্বের অন্তর্গত, সেসব পর্বের সূচনা হয়েছিল এই সময়টায়। এর আগের যেসব প্রাণী ছিল পৃথিবীতে, সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল আণুবীক্ষণিক, এককোষী এবং অপেক্ষাকৃত সরল। ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণের প্রায় আড়াই কোটি বছরের এই সময়টায় হুট করে একের পর এক বহুকোষী প্রাণীর দেখা মিলতে শুরু করে। পৃথিবীর জীবজগতের বিবর্তনের ইতিহাসে সে জন্য ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণকে খুবই অনন্য একটা ঘটনা হিসেবে মনে করা হয়। বলে রাখা ভালো, এখানে বিস্ফোরণ শব্দটা আসলে কোনো গ্রহাণু বা উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে এসে পড়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, সে জন্য আসেনি, এসেছে প্রাণিজগতের আকারের এই উল্লম্ফন থেকে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে সায়েন্স ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র পুরো প্রাণিজগতের ইতিহাসকেই ওলটপালট করে দিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী ইলয়া বভরভস্কি, জোচেন ব্রকস ও তাঁদের দলের চালানো এক গবেষণা থেকে দেখা গেল, এই ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণেরও আগে, প্রায় ৫৫ কোটি ৫৮ লাখ বছর আগে ইডিয়াক্যারান যুগেই জটিল গঠনের প্রাণীদের অস্তিত্ব ছিল। ইডিয়াক্যারান যুগে যেসব ম্যাক্রোফসিল পাওয়া গিয়েছিল, নানা কারণেই সেগুলির সঠিক জাতিজনিত শ্রেণিবিন্যাস করা যাচ্ছিল না। বভরভস্কির গবেষণা থেকে দেখা গেল, পৃথিবীর প্রথম প্রাণীর উত্থান আসলে ক্যামব্রিয়ান যুগেরও বহু আগের এই ইডিয়াক্যারান যুগে। ডিকিনসোনিয়া নামের এই প্রাণীদের কথা মানুষ প্রায় ৭৫ বছর ধরে জানে। এদের বেশির ভাগ ফসিলের সন্ধান পাওয়া গেছে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ইডিয়াক্যারা পাহাড়শ্রেণিতে। এই পাহাড়শ্রেণির নাম থেকেই ইডিয়াক্যারান যুগের নামকরণ করা হয়েছে। ওই সময়টায় থাকা অনেক বহুকোষী জীবের ফসিলের সন্ধান এই জায়গায় পাওয়া গেছে।অনেক দিন থেকে ডিকিনসোনিয়ার কথা জানলেও এরা আসলে প্রাণী কি না, সেই ব্যাপার নিয়ে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন না। প্রাণীদের কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার, যেসব দেখে তাদের জীবজগতের অন্য সব সদস্য থেকে আলাদা করা যাবে। বভরভস্কির দল ডিকিনসোনিয়ার নমুনা সংগ্রহ করেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জায়গা থেকে। উত্তরপশ্চিম রাশিয়ার হোয়াইট সির পাড়ে, প্রায় ১০০ মিটার উঁচু একটি পাহাড়ের গা থেকে। এর কারণ হচ্ছে ইডিয়াক্যারা পাহাড়ে যেসব নমুনা পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো তেমন সুবিধার ছিল না। অন্যদিকে, রাশিয়া থেকে যে নমুনা পাওয়া গিয়েছিল, সেটা যে কত ভালোভাবে পাথরের গায়ে প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত ছিল, তা বুঝতে পারা গেছে পরীক্ষা–নিরীক্ষা চালানোর পর। ডিকিনসোনিয়ার এই ফসিলে পাওয়া গেছে কোলেস্টরেলের অণু—আর এই ফ্যাটের অণু পাওয়ার পরেই বিজ্ঞানীরা এক শ ভাগ নিশ্চিত হয়েছেন যে ডিকিনসোনিয়া অন্য কিছু নয়, প্রাণীই ছিল। সব প্রাণীর কোষঝিল্লিতে এই কোলেস্টরেল থাকে। এই আবিষ্কার এতটাই চমকপ্রদ ছিল যে বিজ্ঞানীরা একে বলছিলেন ‘হলি গ্রেইল অব প্যালিওন্টোলজি’, জীবাশ্মবিজ্ঞানের পরম আরাধ্য এক জিনিস।
ডিকিনসোনিয়ার যে নমুনা তাঁরা পরীক্ষা করেছিলেন, সেটা প্রায় ১৪০ সেন্টিমিটার লম্বা ছিল। ফসিলাইজেশনের কারণে, চাপে পুরো চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল। আকার ছিল অনেকটা ডিম্বাকৃতির, দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম। শরীরের ঠিক মধ্যে একটা সরল রেখা আছে, আর সেখান থেকে অনেকগুলো রেখা এদের শরীরের মধ্য দিয়ে দুই পাশে চলে গেছে। এদের কিছু ভালোভাবে সংরক্ষিত ফসিল থেকে অভ্যন্তরীণ গঠনও বুঝতে পারা যায়। খাবার গ্রহণ এবং সেটা হজম করে শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা এদের শরীরে ছিল। ডিকিনসোনিয়া যে প্রাণী, এই আবিষ্কার থেকে আরেকটা ব্যাপারও বুঝতে পারা গেছে, আর সেটা হচ্ছে, ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণের আরও আগে থেকেই জটিল প্রাণীদের বিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, ক্যামব্রিয়ান যুগে এসে সেটা পূর্ণতা পায়।ডিকিনসোনিয়া যে পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রাণী—২০১৮ সালের এই আবিষ্কারের কথা ঠিকমতো হজম করে ওঠার আগেই প্রাণিজগতের ইতিহাসকে আবারও ভালোমতো ঝাঁকি দিয়েছে নতুন এক আবিষ্কারের খবর। নিউ সায়েন্টিস্ট ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি এক্সক্লুসিভ খবরে জানা গেছে, চীনে এক ধরনের জেলিফিশের ফসিলের সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা কিনা ডিকিনসোনিয়া থেকেও প্রায় ৪ কোটি বছরের পুরোনো! ডিকিনসোনিয়া বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ৬০ কোটি বছর আগের এই জেলিফিশদের সাথে যাদের মিল পাওয়া গেছে—কম্ব জেলি—এরা এখনো বহাল তবিয়তেই আছে। চায়না ইউনিভার্সিটি অব জিওসায়েন্সেসের বিজ্ঞানী জেনবিং শি গত মাসে জিওলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডনের এক সভায় এই আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। কোনো জার্নালে অবশ্য এটি এখনো গবেষণাপত্র আকারে প্রকাশিত হয়নি।
কম্ব জেলি মাছেরা টিনোফ্যারা পর্বের প্রাণী। এদের যেসব বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, নতুন ওই প্রাণীটিরও ফসিলেও প্রায় একই ধরনের শারীরিক বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে। প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে, সেটা হচ্ছে এদের আকার জেলিফিশের মতো। প্রস্থ ০.৭ মিলিমিটারের মতো। মাইক্রোস্কোপের নিচে রাখলে এদের কর্ষিকা, শরীরের টিস্যু, স্নায়ুকোষ, প্রজননতন্ত্র, মিউকাস ঝিল্লি এবং চুলের মতো গঠনের সিলিয়া চোখে পড়ে, যা কিনা কম্ব জেলিফিশেরা সাঁতার কাটার কাজে ব্যবহার করে। নামবিহীন এই নতুন প্রাণীর সঙ্গে কম্ব জেলিফিশের যে গণ বা Genus-এর সবচেয়ে বেশি মিল আছে, তার নাম প্লুরোব্রেকিয়া (Pleurobrachia)। এদের সি গুজবেরিও বলা হয়। কম্ব জেলিফিশ কিন্তু সাধারণ জেলিফিশ থেকে আলাদা পর্বের প্রাণী। জেলিফিশেরা নিডারিয়া পর্বের অন্তর্ভুক্ত, আর কম্ব জেলিরা টিনোফ্যারা। টিনোফ্যারা পর্বের প্রাণীরা সে জন্য জেলিফিশ থেকেও অনেক পুরোনো, আর এদের শারীরিক গঠন এবং জীবনচক্রও অপেক্ষাকৃত সরল। সেই হিসেবে চিন্তা করলে নতুন আবিষ্কৃত এই প্রাণীটির শারীরিক গঠনও বেশ সরলই হওয়ার কথা।
তারপরও ৬০ কোটি বছর আগের একটা প্রাণী হিসেবে প্রাণীটির গঠন কিন্তু বেশ উন্নত। কম্ব জেলিফিশের মুখ এবং পায়ুপথ অন্ত্রের মাধ্যমে যুক্ত। এই বৈশিষ্ট্য কিন্তু নিডারিয়া পর্বের প্রাণীদেরও নেই। নতুন আবিষ্কৃত এই প্রাণীরা যদি এক ধরনের কম্ব জেলিই হয়ে থাকে, তাহলে এদেরও একই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকার কথা। এরচেয়েও বড় ব্যাপার হচ্ছে, কম্ব জেলিরা কিন্তু শিকারি প্রাণী—সামুদ্রিক বিভিন্ন জীব এদের খাবার। তার মানে, নতুন এই প্রাণীরাও যদি এমন হয়ে থাকে, তাহলে তারা যে ফুড চেইনের অংশ ছিল, সেটা বেশ জটিল হওয়ার কথা। এবং আরও বেশ কিছু নতুন প্রজাতির প্রাণীর সন্ধানও ওই একই জায়গা থেকে পাওয়া সম্ভব!
দক্ষিণ চীনের দাশুন্তুও ফরমেশনের যে জায়গা থেকে এই নতুন প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে, সেখান থেকে আরও অনেক পুরোনো ফসিলেরও সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রায় ৬ কোটি ৩১ লাখ বছরের পুরোনো ফসিল পর্যন্ত সেখানে পাওয়া গেছে। কিন্তু ইডিয়াক্যারান যুগে এত পুরোনো প্রাণীর সন্ধান পাওয়া রীতিমতো অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার ছিল। সবাই যে এই আবিষ্কারকে সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছেন, তা নয়। গবেষণাপত্র আকারে প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সে জন্য ব্যাপারটি নিয়ে বিতর্ক থেকে যাবে। তবে যদি এই আবিষ্কারের সপক্ষে আরও প্রমাণ মেলে, তাহলে বলাই বাহুল্য, প্রাণিজগতের উৎপত্তি ও বিবর্তনের ইতিহাস একেবারে নতুন করে লিখতে হবে।
০
০ মন্তব্য