সহকারী শিক্ষক
০৯ মার্চ, ২০২২ ০৯:৫২ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ, আগামী সম্ভাবনার কর্ণধার। শিশু মাত্রই নির্মলতা আর পবিত্রতার প্রতিচ্ছবি। শিশুরা নিষ্পাপ নিরপরাধ। শিশুর প্রতি মমত্ববোধ নেই, এমন মানুষ খুব কমই আছে। পরিবারে সবার প্রিয় ও আদরের পাত্র মানেই শিশু। হোক সে ছেলে অথবা মেয়ে। শিশুর প্রতি ভালোবাসার কোনো হিসাব বা একটি দিনে সীমাবদ্ধতা নেই। শিশুর প্রতি আমাদের মমত্ববোধ সব সময়, সব অবস্থায়। শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ ও আস্থার জায়গা তার মা-বাবার কোল, তার পরিবার। শিশুর নিরাপত্তায় সমাজের দায়বদ্ধতাও অনেক। কারণ একজন শিশু শুধু তার পরিবারই নয়, সে বেড়ে উঠে তার সমাজে। সমাজের কৃষ্টি-কালচার, নিয়ম-কানুন, সমাজের প্রতি তার কর্তব্য বিভিন্নভাবে শিশুরাও সমাজ দ্বারা প্রভাবিত।
শিশুর প্রতি আদর-ভালোবাসার কমতি না থাকলেও বর্তমানে আমাদের সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব আর অপরাধ প্রবণতার ঘৃণ্য কিছু ঘটনা আমাদের বিবেকবোধকে দংশিত করছে। লজ্জায় মাথা নিচু হচ্ছে শিশুর প্রতি অমানবিক আচরণের কারণে। সম্প্রতি ময়মনসিংহের ভালুকায় এক শিশুর শিক্ষক কর্তৃক প্রথমে শারীরিক নির্যাতন ও অমানবিকতায় নির্যাতিত শিশুটির মৃত্যু সারা দেশের মানুষকে দুঃখ দিয়েছে। বিবেককে তাড়িত করেছে প্রবলভাবে। এ ঘৃণ্য কাজের প্রতি নিন্দার ঝড় বইছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। শিশুহত্যার মতো পৈশাচিকতা এ আধুনিক ও সভ্য সমাজে কোনোভাবে কাম্য নয়।
আধুনিক সভ্য সমাজে শিশুহত্যার মতো জঘন্য অপরাধপ্রবণতা কেন? শিশুর দুর্বলতা, অসহায়ত্ব ও সরলতা অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হয়। সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, অপ্রতিরোধ্য শিশুশ্রম, পরকীয়া, সম্পদের লোভ, বেকারত্ব, কালচার-সংস্কৃতিতে বিদেশি প্রভাব, অনলাইন প্রযুক্তিতে পর্নোগ্রাফির প্রসার ও সহজলভ্যতা, বেপরোয়া জীবন যাপন, পাচার, কর্তৃত্বের বিরোধ-শত্রুতা, স্বার্থপরতা প্রভৃতির নেতিবাচক প্রভাবে সমাজের বিবেকবর্জিত লোক শিশুদের প্রতি নৃশংস আচরণ করছে।
আজকের শিশু আগামী দিনের কর্ণধার, আমরা প্রায়ই বলে থাকি। শিশুরাই আগামী দিনের সমাজ গড়ার কারিগর। কোমলমতি অবুঝ শিশুরাই শিকার হচ্ছে খুন, ঘুম, অপহরণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন নির্যাতনের। নিষ্পাপ শিশুরা সংসারের বন্ধনকে অটুট করে। অথচ দুর্বলতার সুযোগে দুর্বৃত্তদের ঘৃণ্য টার্গেট শিশু। শিশুর প্রতি অমানবিকতা সমাজে সৃষ্টি করে মানবিক বিপর্যয়। শিশু অপহরণ, শিশুশ্রম, শিশুর প্রতি বৈষম্য, অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ইদানীং উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে। বর্তমান সময়ে সমাজের জন্য আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর প্রতি বর্বরতা শিশু শিক্ষার প্রতি হুমকি এমনকি অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের (ধর্মীয়) আবাসিক প্রতিষ্ঠানে দিতে আতঙ্কগ্রস্ত।
১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জš§দিনে বাংলাদেশে জাতীয় শিশু দিবস পালিত হয়। এ উপলক্ষে শিশুদের জন্য থাকবে নানা আয়োজন। শিশুর প্রতি মমত্ববোধ জাগাতে এ দিনটি গুরুত্বপূর্ণ।
এ সময়ে বাংলাদেশে শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হয়ে পড়ছে। শিশুর প্রতি আবেগ-অনুভূতির কারণে এসব শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সমাজ-রাষ্ট্রের অসহায়ত্ব প্রকাশ পায়। স্বার্থান্বেষী কতিপয় বিবেকহীন অপরাধীর হিংস্রতা, শিশুর ওপর নির্মম ও বর্বরোচিত আচরণ মানবতাবোধকে দংশিত করছে।
দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী আইন রয়েছে। ধর্মীয় নির্দেশনা রয়েছে শিশুর প্রতি মমত্ববোধের বিষয়। শিশুর জšে§র প্রথম দিন থেকে পরিণত বয়সে উপনীত হওয়া পর্যন্ত তার লালনপালন, শিক্ষা-দীক্ষা ও তার জীবনের উত্তম বিকাশের জন্য মা-বাবার প্রতি বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। নবী করিম (সা.) বলেছেনÑ‘যে ব্যক্তি ছোটকে স্নেহ-মমতা করে না এবং বড়কে সম্মান দেখায় না, সে আমার উম্মত নয়’। শুধু ইসলাম ধর্মেই নয়, অন্য ধর্মগুলোয়ও শিশুর প্রতি স্নেহ-মমতার নির্দেশ রয়েছে।
শিশুর প্রতি দুর্বলতা নেই, এমন ব্যক্তি খুব কমই আছে। তারপরও ইদানীং শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে গেছে। মা-বাবা কর্তৃক সন্তান হত্যার মতো অমানবিক ঘটনা সত্যিই সভ্য সমাজের বুদ্ধিমান জীব হিসেবে মানুষকে বিবেকবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শিশু হত্যা ও নির্যাতনের মতো ঘটনা থেকে বাঁচতে আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে জাগ্রত করে পারিবারিক বন্ধনে শিশুকে সুনজরে রেখে তাদের সার্বিক মঙ্গল কামনায় সদা জাগ্রত থাকতে হবে তবেই শিশু দিবসের সার্থকতা আসবে। বিকৃত মানসিকতার পরিবর্তনে এবং শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তার সঙ্গে পারিবারিক বোঝাপড়া ও শিশুর প্রতি সহমর্মিতার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে।
শিশুদের সম্মান করতে বিশ্বব্যাপী শিশু দিবস পালিত হয়। এটি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় পালিত হয়ে থাকে। শিশু দিবসটি প্রথমবার তুরস্কে পালিত হয়েছিল, ১৯২০ সালের ২৩ এপ্রিল। বিশ্ব শিশু দিবস পালিত হয় ২০ নভেম্বর এবং আন্তর্জাতিক শিশু দিবস পালিত হয় ১ জুন। তবে কোনো কোনো দেশ এসব দিনের বাইরে আলাদাভাবে শিশু দিবস পালন করে। বাংলাদেশে এটি পালিত হয় ১৭ মার্চ।
জাগ্রত হোক মানবিক মূল্যবোধ, বন্ধ হোক শিশুর প্রতি সহিংসতা। প্রাপ্য অধিকার দিয়ে শিশুর প্রতি মমত্ববোধ বাড়িয়ে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদেরই। সচেতনতাই অনেকাংশে শিশু জীবন সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ফুলের মতো জীবনের অধিকারী শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা ও তাদের অধিকার আদায়ে- শিশু নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ সময়ের দাবি। শিশুর জীবনের হুমকি মোকাবিলা এবং তাদের সুরক্ষায় পরিবারের ভূমিকার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। শিশু দিবস তখনই সার্থক হবে যখন শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। শিশু বেড়ে উঠবে সবার সহনশীল আচরণ ও ভালোবাসায়।
৭১
১৪৫ মন্তব্য