Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ মার্চ, ২০২২ ০৮:১৭ অপরাহ্ণ

কসরঃ (ভ্রমণকালীণ বা মুসাফিরের নামাজ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিধানাবলী)

কসরঃ (ভ্রমণকালীণ বা মুসাফিরের নামাজ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিধানাবলী)
=============================================
কসর কি?- কসর অর্থ হচ্ছে ৪ রাকাআত বিশিষ্ট নামাজ ২ রাকাআত পড়া । যেমনঃ জোহর, আসর এবং এশার নামাজ । ২ বা ৩ রাকাআত বিশিষ্ট নামাযে কসর নেই । যেমনঃ ফজর, মাগরিব এবং বিতর নামাজ। জেনে রাখা ভালো যে , কিলোমিটারের হিসেবে ৪৮ মাইল হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৭৭ কিলোমিটারের সমান।

কসর কার জন্য প্রযোজ্যঃ
কেউ যদি নিজ এলাকা থেকে ৪৮ মাইল দূরে যাওয়ার বা সেখানে পৌছে ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত করে তাহলে সে কসর পড়বে নিজ এলাকা থেকে বের হওয়ার পর থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত ।

আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ ” যখন তোমরা ভূমিতে সফর করো তখন নামায সংক্ষিপ্ত করতে গুনাহ নেই । যদি আশঙ্কা হয় যে , কাফিররা তোমাদেরকে কষ্ট দিবে । নিশ্চয়ই কাফিররা তোমাদের স্পষ্ট দুশমন।”[ সূরা নিসা : ১০১ ]
ইয়ালা ইবনে উমাইয়া বলেন- আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রাঃ কে জিঙ্গাসা করলাম, (কুরআনে এসেছে) যদি কাফিরদের সম্পর্কে তোমাদের আশঙ্কা হয় যে, তারা তোমাদেরকে কষ্ট দিবে, তাহলে নামায সংক্ষিপ্ত করতে পার। এখন তো এই আশঙ্কা নেই (তাহলে এখনও কি এই বিধান বিদ্যমান রয়েছে?)। উমর রাঃ বললেন , এ প্রশ্ন আমারও ছিল। আমি নিজে রসূল্লালাহ (সঃ) এ বিষয়ে জিঙ্গাসা করেছি। তিনি উত্তরে বলেছেন, ‘ এটা তোমাদের জন্য আল্লাহ তা’আলা প্রদত্ত অবকাশ। অতএব তোমরা তার দান গ্রহন করো।”[সহীহ মুসলিম : ১/২৪১ ] হাদীসের অন্যত্র এসেছে যে, অন্য এক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, আকাশ থেকে তো এ অবকাশ অবতীর্ণ হয়েছে। এখন তোমার ইচ্ছা হলে তা ফিরিয়ে দাও। (তাফসীরে ইবনে কাসীর)

ইমাম মালেক রহঃ থেকে বর্নিত , তিনি বলেন, ‘ নিজ এলাকার বসতি থেকে বের হওয়ার পর কসর আরম্ভ করবে এবং পুনরায় বসতিতে পৌঁছার পর পূর্ন নামায পড়বে। ‘ [মুয়াত্তা মালিক : পৃ-৫২ ]

ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, মুহাদ্দিসিন ও সালাফে সালেহীনদের মত এই যে, ৪৮ মাইল দূরত্বের সফরে নামায কসর করা যাবে, তার কমে নয় ।” [ ফাতওয়ায়ে সানাইয়্যা :১/৪৬২ ]

উপরের বর্ননাগুলো থেকে প্রমানিত হয় যে, নিজ এলাকার বসতি অতিক্রম করার পর থেকে কসরের অবকাশ আরম্ভ হয়। কেননা, রাসূল্লালাহ (সা.) যখন মাক্কার উদ্দেশ্যে সফরের ইরাদা করেছেন তখন মদীনার বাইরে যুলহুলায়ফা নামক স্থানে এসে কসর পড়েছেন।

পায়ে হেঁটে, জীব-জন্তুর পিঠে চড়ে, ট্রেনে, নৌযানে, প্লেনে এবং মোটর গাড়িতে সফর করার ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য নেই। সফরের মাধ্যম যাই হোক না-কেন, নামাজ কসর করে পড়ার ক্ষেত্রে এর কোন প্রভাব নেই। অর্থাৎ শরীয়তের পরিভাষায় যাকে সফর বলা হয় এমন সকল সফরেই চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজ কসর করে পড়ার বিধান রয়েছে।

সফরের  সময়সীমা:
সফরে কোনো স্থানে ১৫ দিন বা তার বেশি সময় অবস্থানের নিয়ত করলে পূর্ন নামায পড়তে হবে। আর যদি ১৫ দিনের কম সময় থাকার নিয়ত করে তাহলে কসর করতে হবে । যদি এমন হয় যে, সুনির্দিষ্টভাবে কত দিন অবস্হান করতে হবে তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয় , আর আজ যাব, কাল যাব করতে করতে ১৫ দিনের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে যায় তবুও কসরই পড়তে থাকবে ।
যদি কোন ব্যক্তি প্রথম দশদিন অবস্থান করার নিয়ত করে, পরে আবার পাঁচ দিনের নিয়ত করে, পরবর্তীতে আবার কয়েক দিনের নিয়ত করে, কিন্তুএকসাথে পনের দিন অবস্থান করার নিয়ত না করে তাহলে তার নামাজ মুসাফির ব্যক্তির নামাজের ন্যায় চলতেই থাকবে। একইভাবে যদি কেউ প্রথমে পাচদিনের নিয়তে সফর করে এবং পরে ঠিক করে যে তিনি ১৫ দিনের বেশি অবস্থান করবেন এমতাবস্থায় সফরে থাকাকালীন যে সমইয়ে তিনি ১৫ দিনের অধিক থাকার নিয়ত করবেন তখন থেকেই তিনি মুকীমের অবস্থায় চলে যাবেন মানে কসর থেকে বিরত থেকে পূর্ণ সালাত আদায় করবেন।
রাসূল্লালাহ (সা.) থেকে এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন সময়সীমা বর্নিত হয়েছে। তবে সাহাবায়ে কিরাম যেহেতু এগুলোর প্রেক্ষাপট সম্পর্কেও অবগত ছিলেন এবং রাসূল্লালাহ (সা.) এর কর্মপদ্ধতি, বিশেষত রাসূল্লালাহ (সা.) এর পবিত্র জীবনের শেষ আমল ছিল সাহাবীদের সামনে তাই তারা যখন এ সময়সীমা ১৫ দিন নির্ধারণ করেন তখন তা সুন্নাহ থেকে আহরিত হওয়ার বিষয়ে কোনই সন্দেহ থাকে না ।
আল-মুগনী গ্রন্থে এসেছে- আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন , ” যদি তুমি কোন স্থানে ১৫ দিন অবস্থানের নিয়ত কর তাহলে পূর্ন নামায আদায় করবে। [আল-মুগনী, ২য় খন্ড, ২৮৮ পৃষ্ঠা, সলাতুল্ মুসাফির]
যরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্নিত – যে ১৫ দিন অবস্থানের নিয়ত করল সে পূর্ন নামায আদায় করবে।[জামে তিরমিযী : ১/৭১]

জামায়াতের  বিধানঃ
মুসাফির ব্যক্তির ইমামতিতে মুকীম ব্যক্তির নামাজ এবং মুকীম ব্যক্তির ইমামতিতে মুসাফিরের নামাজ জায়েজ আছে। মুকীম ব্যক্তি যদি ইমাম হন তাহলে তার ইমামতিতে মুসাফির ব্যক্তি পূর্ণ নামাজ আদায় করবে। কিন্তু মুসাফির ব্যক্তি যদি ইমাম হন তাহলে নামাজের পূর্বে তিনি মুসল্লিদের জানিয়ে দিবেন যে, আমি মুসাফির। দু’রাকাআত নামাজ পড়ে সালাম ফিরাব। আপনারা সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন এবং নিজে নিজে বাকী দু’রাকাআত আদায় করে নিবেন। এরপর দু’রাকাআত পড়ে সালাম ফিরানোর পর মুসাফির ইমাম আবার ঘোষণা দিয়ে দিবেন। অতঃপর মুকীম মুসল্লিরা দাঁড়িয়ে নিজে নিজে দু’রাকাআত পড়ে নিবে। এই দু’রাকাআতে সূরা ফাতিহা বা অন্য কোন সূরা তিলাওয়াত করবে না বরং সূরা ফাতিহা পাঠ করা পরিমাণ সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে রুকু- সিজদার মাধ্যমে নামাজ শেষ করবে।

কাযা নামাজের বিধানঃ
মুসাফির অবস্থায় যদি কোনো নামাজ কাজা হয়ে যায় আর তা বাড়ি ফিরে পড়েন, তাহলে কসরই পড়বেন এবং বাড়ি থাকা অবস্থায় কোনো কাজা নামাজ যদি সফরে আদায় করেন, তবে তা পূর্ণ নামাজই পড়তে হবে।

কখন থেকে কসর শুরু হবেঃ কোন ব্যক্তি যদি কমপক্ষে ৪৮ (শর্য়ীড়) মাইল বা প্রায় ৭৭.২৫ কি.মি. দূরত্ব গমন করার ইচ্ছাকরে, তাহলে শহরবাসী নিজ শহরের সীমা ও গ্রামবাসী নিজ ইউনিয়ন বা পৌরসভার সীমা অতিক্রম করার পর থেকে মুসাফির বলে জন্য হবে। তখন থেকেই নামাজের কসর সহ মুসাফিরের অন্যান্য হুকুম তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। (শামী-২/৫৯৯-৬০২, হিন্দিয়া-১/১৩৭, আহসানুল ফাতাওয়া-৪/৯৪-৯৫)। এখানে উল্লেখ্য যে, সফরের যে সীমানা তা নিজ শহর বা গ্রামের সীমানা অতিক্রান্ত হলেই তার উপর কসরের বিধান প্রযোজ্য হবে। উদাহরণস্বরূপঃ কেউ ঢাকার গুলিস্থান থেকে কুমিল্লার চান্দিনা যাবে। যার মোট দুরত্ব ৮৮ কি.মি.। শরয়ী সফরের দুরত্ব সোয়া সাতাত্তর কি.মি.। কিন্তুসফরকারী ব্যক্তির আবাসস্থল ঢাকা। আর চান্দিনার দিকে সফরে ঢাকার শেষ সীমা হল কাঁচপুর ব্রীজ। গুলিস্তান থেকে যার দুরত্ব ১৩ কি.মি.। কাঁচপুর থেকে চান্দিনার দুরত্ব ৭৫ কি.মি.। সুতরাং ঢাকা সফরকারী ব্যক্তির নিজ শহর বা অবস্থানকৃত শহর হওয়ায় তার সফরের দূরত্ব গণনা শুরু হবে কুমিল্লার দিকে ঢাকার শেষ সীমা তথা কাঁচপুর ব্রীজ থেকে। চান্দিনা পর্যন্ত যার দুরত্ব ৭৫ কি.মি.। তাই শরয়ী উসূল অনুযায়ী উল্লেখিত দুরত্ব শরয়ী সফরের দূরত্বের সমান না হওয়ায় তাকে পূর্ণ নামায আদায় করতে হবে। নতুবা নামাজ সহীহ হবে না।

উল্লেখ্য,ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম বা কুমিল্লার দিকে যেতে ঢাকার শেষ সীমা কাঁচপুর ব্রীজ, ময়মনসিংহ অঞ্চলের দিকে যেতে আব্দুল্লাহপুর ব্রীজ, মাওয়ার দিকে যেতে পোস্তগোলা ব্রীজ এবং গাবতলী দিয়ে অন্য অঞ্চলের দিকে যেতে গাবতলী ব্রীজ।

এখানে একটি বিষয়ের আলোচনা খুবই গুরুত্বের দাবী রাখে এই যে, আমাদের অনেকেরই গ্রামের বাড়ি আবার ঢাকা বা অন্য বিভাগীয় বা জেলা শহরে জীবিকার তাগিদে বসবাস করে থাকি। এমতাবস্থায় যদি কেউ তার বর্তমান আবাসস্থল থেকে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যায় তাহলে তার ক্ষেত্রে কসরের বিধান কি হবে তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান থাকেন। এক্ষেত্রে আগে বিবেচনায় আনতে হবে যদি চাদপুরের একজন ব্যক্তি তার পরিবার নিয়ে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বাড়ি করে বসবাস করা শুরু করেন এবং চাদপুরে কেবলমাত্র বেড়ানোর উদ্দেশ্যেই যেয়ে থাকেন তাহলে তার ক্ষেত্রে কসরের বিধান প্রযোজ্য হবে যেহেতু তিনি এখন আর সেখানে বসবাস করেননা। কিন্তু যদি কেউ ঢাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন আবার গ্রামের বাড়িতেও তার আত্মীয় স্বজন থাকে তিনি সেখানে বেড়াতে যান তাহলেও তিনি মুসাফির হিসেবে গণ্য হবেননা। এমনি করে যদি উভয় স্থানেই যদি তার আবাসস্থল থাকে এবং তিনি উভয় স্থানেই বসবাস করেন তাহলেও তিনি মুসাফির বলে পরিগণিত হবেননা। এরই আলোকে বলা যায় যদি কোন প্রবাসী ভাই দেশে বেড়াতে আসেন তিনিও মুসাফির নন বরং তিনি পূর্ণ সালাত আদায় করবেন তা তিনি যত বছরই দেশের বাইরে থাকুননা কেন। আবার যদি কারো দুই স্ত্রী বিদ্যমান থাকে এবং উভয় স্ত্রী শরয়ী দূরত্ব মানে ৪৮ মাইলের বেশি দূরত্বে অবস্থান করে তাহলে উক্ত ব্যক্তির জন্য উভয় অবস্থাতেই মুকীমের বিধান বলবত থাকবে মানে তিনি পূর্ণ সালাত আদায় করবেন। 

জুমার নামাজের বিধানঃ মুসাফির অবস্থায় জুমার নামাজ ওয়াজিব নয়। যদি সম্ভব হয় ও সুযোগ থাকে তাহলে জুমা আদায় করে নিবে অন্যথায় যোহরের নামাজ কসর পড়ে নিবে। মুসাফির অবস্থায় জুমার নামাজের ইমামতি করা যাবে। সেক্ষেত্রে মুসাফিরের পিছনে মুকিম মুক্তাদিদের নামাজও হয়ে যাবে। জুমার নামাজে মুকীম ব্যক্তি দ্বারা ইমামতি করানোই উত্তম।

আরো কিছু মাসয়ালাঃ
যদি কোন ব্যক্তি নামাজের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সময় মুকীম থাকে এবং নামাজ পড়ার পূর্বে সফর শুরু করে দেয় তাহলে সে মুসাফির ব্যক্তির ন্যায় নামাজ আদায় করবে। এমনিভাবে কেউ যদি ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সময় মুসাফির থাকে এবং নামাজ পড়ার পূর্বে মুকীম হয়ে যায় তাহলে সে মুকীম ব্যক্তির ন্যায় নামাজ আদায় করবে।

কোন মুসাফির ব্যক্তি যদি কোন কারণে ইকামতের নিয়ত করে কিন্তু বাস্তবে তার ইকামত করার ইচ্ছা না থাকে তাহলে এমতাবস্থায় সে মুসাফিরই থেকে যাবে, এই কৃত্রিম নিয়তের কারণে মুকিম হবেনা।

চার রাকাআত বিশিষ্ট নামাজে প্রথম বৈঠক (২য় রাকাআতের পর যে বৈঠক হয়)এ দরূদ শরীফের “ওয়া ‘আলী মুহাম্মাদ” পর্যন্ত পড়ে ফেললে নামাযের শেষে সেজদায়ে সাহু করতে হবে। (শামী-২/৫৪৫)

মুসাফির ভুলবশত চার রাকাত নামাজ পড়ে ফেললে যদি দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহুদের বৈঠক করে থাকে, তবে নামাজ আদায় হয়ে যাবে। অন্যথায় নয়।

পূর্ণ নামাযের স্থলে অর্ধেক নামাজ পড়ার পর কারো কারো মনে এরূপ ধারনা আনাগোনা করে যে, বোধহয় এতে নামাজ পূর্ণ হলোনা, এটা ঠিক নয়। কারন কসরও শরীয়তের নির্দেশ। এ নির্দেশ পালনে গোনাহ হয়না বরং সওয়াব পাওয়া যায়। (তাফসীরে মারেফুল কোরআন, দ্বিতীয় খন্ড)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের আমল করার তাওফীক দিন।

মন্তব্য করুন