Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৮ এপ্রিল, ২০২২ ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ

১৯ বছর ধরে আটকে থাকা শতভাগ উৎসব ভাতা চালুর দাবি চার লাখ শিক্ষকের


এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন সহকারী শিক্ষক দশম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা আর প্রভাষকরা নবম গ্রেডে ২২ হাজার বেতন স্কেলে চাকরিতে যোগ দেন। এই শিক্ষকদের মূল বেতনের পুরোটাই সরকার দিলেও দুই ঈদে মাত্র ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা দেওয়া হয়। ফলে চাকরিতে ঢোকার পর স্কুলে একজন শিক্ষক উৎসব ভাতা পান চার হাজার টাকা আর কলেজের শিক্ষক পান সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা।

শিক্ষকরা বলছেন, বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই সামান্য টাকায় কোনোভাবেই প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। ফলে চার লাখ শিক্ষকের মনে নেই ঈদের আনন্দ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে এখন এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর পদ রয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষক প্রায় চার লাখ ১০ হাজার এবং কর্মচারী এক লাখ ২০ হাজার। এসব শিক্ষক মূল বেতনের বাইরে বাড়িভাড়া বাবদ মাসে এক হাজার টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা বাবদ ৫০০ টাকা পান।

এ ছাড়া সরকারি বিধি অনুযায়ীই মূল বেতনের ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা এবং বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট পান। তবে দুই ঈদের উৎসব ভাতার ক্ষেত্রে রয়ে গেছে জটিলতা। শিক্ষকরা মূল বেতনের ২৫ শতাংশ এবং কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ ঈদ বোনাস পান।

১৯৮০ সাল থেকে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি শুরু করে। শুরুতে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ দেওয়া হলেও ২০০৮ সাল থেকে শতভাগ বেতন দেওয়া শুরু হয়। শিক্ষকদের আন্দোলন ও দাবির মুখে ২০০৩ সালে তাত্ক্ষণিকভাবে থোক বরাদ্দ থেকে শিক্ষকদের ২৫ শতাংশ এবং কর্মচারীদের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা দেওয়া হয়। তখন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তী অর্থবছরে এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রেখে শতভাগ উৎসব ভাতা দেওয়া হবে। কিন্তু গত ১৯ বছরেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে। সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করে। এর সঙ্গে দুই ঈদে শতভাগ উৎসব ভাতা দিতে হলে অতিরিক্ত আরো এক হাজার ১০০ কোটি টাকা লাগবে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেছিলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধান ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। এই বেসরকারি শিক্ষকরা শতভাগ উৎসব ভাতা চান। এ বিষয়ে এখনো সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে কাজ করছি। সব কিছু মিলিয়ে কতটুকু করা যায়, আমরা দেখছি। ’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ  বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য এই ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা অত্যন্ত কষ্ট ও অনুতাপের। বর্তমান সময়ে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা উৎসব ভাতায় কিছুই হয় না। শিক্ষকদের মনের কষ্ট লাঘবে শতভাগ উৎসব ভাতা দেওয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছে। ’

সূত্র জানায়, ৩০ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাজধানী ও জেলা-উপজেলা সদরে বড় কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি বরাদ্দের বাইরে শিক্ষকদের বাড়তি কিছু ভাতা দেয়। বাকিগুলোতে সরকারি বেতন-ভাতাই ভরসা। এমনকি ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়িয়ে আলাদা আয় করতে পারলেও অন্য শিক্ষকদের সে সুযোগ নেই। বেশির ভাগ শিক্ষকের সেই সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান বলেন, ‘যাঁরা পলিসি মেকার তাঁরা এ ব্যাপারে উদাসীন। ২০০৩ সালে যে ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা দিয়ে শুরু হয়েছিল, ১৯ বছরেও তা সেখানেই আটকে আছে। এই ১৯ বছরে মানুষের জীবন যাত্রার ব্যয় মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, শিক্ষকরা ব্যাপক বঞ্চনার শিকার। আগামী বাজেটে সরকার এই খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখবে, সেটাই আমাদের চাওয়া। ’

স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের (স্বাশিপ) সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান আলম সাজু বলেন, ‘আমরা ভবিষ্যতে মানসম্মত শিক্ষার দিকে যাচ্ছি। এ সময় শতভাগ উৎসব ভাতা পেলে শিক্ষকরা অনুপ্রাণিত হবেন। তাঁরা আগের চেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে কাজ করবেন। ’

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, ‘শতভাগ উৎসব ভাতা দিতে অতিরিক্ত এক হাজার ১০০ কোটি টাকা লাগলেও সেটি সরকারের জন্য বড় কোনো ব্যাপার নয়। এতে শিক্ষকদের মর্যাদা বাড়বে, সরকারেরও ভাবমূর্তি বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষকদের ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। বর্তমান সরকার সরকারি কর্মচারীদের মতোই শিক্ষকদের ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সংবেদনশীল দৃষ্টির কাছে আমরা এই শতভাগ উৎসব ভাতার দাবি এখনো নিয়ে যেতে পারিনি। ’

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবু বকর ছিদ্দিক  বলেন, ‘শিক্ষকদের শতভাগ উৎসব ভাতা দিতে পারলে আমরাই সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম। আমাদের আন্তরিকতাও আছে। কিন্তু সরকারের সক্ষমতার ব্যাপারটিও দেখতে হবে। তারা এখন শতভাগ বেতন পাচ্ছেন। একসময় শতভাগ উৎসব ভাতাও পাবেন।

মন্তব্য করুন

ব্লগ