প্রভাষক
২৯ এপ্রিল, ২০২২ ১১:৩৭ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
মাহে রমজানের শেষ জুমার দিনটি আমাদের সমাজে জুমাতুল বিদা নামে পরিচিত। জুমাতুল বিদার মহত্ত্ব : দুটি কারণে জুমাতুল বিদা অত্যন্ত মহিমাময়। ১. মাহে রমজানের কারণে : রমজান মাস সীমাহীন ফজিলতের মাস এবং এটি উম্মতে মোহাম্মাদীর জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ উপহার স্বরূপ। আর জুমার দিনের মাহাত্ম্য সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সূর্যদয়ের মাধ্যমে যে দিনগুলো হয় তার মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন।
২.ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায়, রমজান মাসের শেষ শুক্রবার হজরত সুলায়মান আলাইহিসসালাম জেরুজালেম নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং মুসলমানদের প্রথম কিবলা ‘মসজিদ আল-আকসা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এ জন্য প্রতিবছর সারা বিশ্বের মুসলমানরা রমজান মাসের শেষ শুক্রবারকে ‘আল কুদস’ দিবস হিসাবে পালন করেন।
রাসূলে আরবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ শুক্রবার জুমার নামাযের পর বিশেষ ইবাদত করতেন। তার উম্মতরা এরই ধারাবাহিকতায় এই দিনে বাদ জুমা নফল নামাজ আদায় করেন এবং বিশেষ মোনাজাত করেন। ফজিলতময় জুমার দিন যদি হয় সুন্নাতে ভরপুর, তাহলে জুমার ফজিলত পরিপূর্ণভাবে পাওয়ার আশা করা যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, আগে আগে মসজিদে গমন করল, পায়ে হেঁটে মসজিদে গেল, ইমামের কাছাকাছি বসল, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনল, কোনো কথা বলল না, আল্লাহ তাআলা তাকে প্রতি কদমে এক বছরের নফল ইবাদতের সওয়াব দান করবেন। (মুসনাদে আহমাদ : ৫৮১)
মাহে রমজানের সব শুক্রবারই অত্যন্ত পবিত্র ও বরকতময় দিবস। তন্মধ্যে বিদায়ী শুক্রবার জুমাতুল বিদা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। এ দিন রমজান মাস শেষ হয়ে যাওয়ার সতর্কতামূলক দিবস। জুমাতুল বিদা রোজাদারদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মাহে রমজানের সমাপনান্তে এ বছর এর চেয়ে ভালো দিবস আর পাওয়া যাবে না।
রমজানের বিদায়লগ্নে পূর্বসূরি পুণ্যাত্মা মনীষীদের মধ্যে ভীতি ও প্রীতির মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হতো। যেমন তাঁরা আশায় বুক বাঁধতেন মহামহিম আল্লাহ হয়তো তাঁদের ক্ষমা করে দেবেন, তেমনি ভয় পেতেন রমজানে আল্লাহর মুক্ত ভাণ্ডার থেকে বঞ্চিত হওয়ার। তাঁরা আল্লাহর কাছে রমজানের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চাইতেন এবং রমজানের মূল শিক্ষা খোদাভীতি প্রাপ্তির প্রার্থনা করতেন।
১. কবুলের দোয়া করা : ইয়াহইয়া ইবনে কাসির রহমাতুল্লাহি আলাইহি রমজানের শেষরাতে দোয়া করতেন—(উচ্চারণ) আল্লাহুম্মা সাল্লিমনি ইলা রামাদান, ওয়া সাল্লিম লি-রামাদান, ওয়া তাসাল্লামহু মিন্নি মুতাকাব্বালান। (অর্থ) হে আল্লাহ! আমাকে (আগামী) রমজান পর্যন্ত সুস্থ রাখুন। রমজানকে আমার জন্য নিরাপদ করুন। রমজানকে (রমজানের ইবাদতগুলো) আমার পক্ষ থেকে কবুল করুন।
আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘আমাদের পূর্ববর্তী মনীষীরা রমজানের আগে ছয় মাস রমজানপ্রাপ্তির দোয়া করতেন এবং রমজানের পরে ছয় মাস রোজা ও ইবাদত কবুলের দোয়া করতেন।’ রমজান বিদায় নেওয়ার পর খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ঈদের খুতবায় দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখা ও ইবাদত করার জন্য মানুষকে অভিনন্দন জানাতেন এবং উপদেশ দিতেন রোজা কবুলের দোয়া করতে।
২. ভুলত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হওয়া : মনীষীরা রমজানের শেষে তাঁদের ত্রুটিবিচ্যুতির জন্য অনুতপ্ত হতেন। আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রমজানের শেষরাতে বলতেন, ‘হায়! যদি আমি জানতাম রোজা কবুল হয়েছে, তাহলে অভিনন্দন জানাতাম অথবা জানতাম বঞ্চিত হয়েছি, তাহলে অনুতপ্ত হতাম।’
৩. পাপ থেকে বিরত থাকার প্রত্যয় : রমজানে মুমিন ইবাদত-বন্দেগি ও সাধনার মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করবে এবং সারা বছর আল্লাহর অনুগত হয়ে চলবে। তাই রমজান শেষে কাউকে পাপের পথে ফিরে যেতে দেখলে মনীষী আলেমরা ব্যথিত হতেন। হযরত কাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রাখে এবং মনে মনে প্রত্যয় গ্রহণ করে রমজানের পর আল্লাহর অবাধ্য হবে না, সে বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে রোজা রাখে এবং মনে মনে বলে, ফিতরের পর আল্লাহর অবাধ্য হবে, তার রোজা প্রত্যাখ্যাত হবে।’
৪. ইবাদত অব্যাহত রাখার প্রত্যয় : বিশর হাফি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন, ‘কিছু মানুষ রমজানে আল্লাহর ইবাদত করে এবং ভালো কাজে আত্মনিয়োগ করে। রমজানের পর তা ছেড়ে দেয়। কতই না নিকৃষ্ট সেসব মানুষ, যারা শুধু রমজানেই আল্লাহকে চেনে।’
৫. আল্লাহর প্রতি আশাবাদ : মনীষীরা শুধু ব্যথিত হতেন না, বরং তাঁরা আল্লাহর প্রতি আশাবাদী হতেন। আল্লাহর দরবারে নিজের ভুলত্রুটির জন্য লজ্জিত হওয়ার পাশাপাশি রমজানের রোজা ও অন্যান্য ইবাদত কবুলের আশা রাখতেন। কেননা বান্দার প্রতি আল্লাহর করুণার ধারাই বেশি প্রবল।
৬. আনন্দের নামে উন্মাদনা নয় : রমজান শেষে নিশ্চিন্ত আনন্দ ও উন্মাদনা মনীষীরা অপছন্দ করতেন। তাঁরা পছন্দ করতেন সংযত আনন্দ, যাতে খোদাভীতির ছাপ থাকে। ওহাব ইবনুল ওয়ারদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি একদল মানুষকে ঈদের দিন খুব হাসতে দেখে বললেন, ‘এ মানুষগুলোর রোজা যদি কবুল হয়ে থাকে, তবে তাদের আনন্দ কৃতজ্ঞতার নিদর্শন। আর যদি তা কবুল না হয়, তবে কোনো মুত্তাকি মানুষ কি এভাবে হাসতে পারে?’
হাসান বসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন, ‘আল্লাহ বান্দাকে রমজান মাস দান করেছেন আমলের প্রতিযোগিতার জন্য। একদল তাতে অগ্রসর থাকে, তারাই সফল এবং একদল পিছিয়ে পড়ে, তারাই ব্যর্থ। কী আশ্চর্য! আজ সফল ও ব্যর্থ সবাই সমান আনন্দ-ক্রীড়া-কৌতুকে মেতেছে।’ (আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ,‘লাতায়িফুল মাআরিফ’)
সুতরাং এ পুণ্যময় দিনটির যথাযথ সদ্ব্যবহার করা অবশ্য কর্তব্য। মাহে রমজানের শুরু থেকে যেসব ইবাদত ব্যস্ততাবশত ফেলে রাখা হয়েছে, যে গুনাহখাতা মাফের জন্য কান্নাকাটি করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে ভুল হয়েছে, জুমাতুল বিদার দিনে দোয়া কবুল হওয়ার সময়ে তা-ই করা উচিত।
লেখক: আরবি প্রভাষক ও এম ফিল গবেষক
৫৩
৯১ মন্তব্য