Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৮ মে, ২০২২ ০৬:১০ পূর্বাহ্ণ

বন্যার কারণ ও ক্ষতিকর প্রভাব: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি পর্যােলোচনা
  • বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশের প্রায় ২৫০টি নদী জালের মতো জড়িয়ে রেখেছে প্রিয় বাংলাদেশকে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ প্রায়ই নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি দারিদ্র্য ও অভাবের মতো বন্যাও যেন এদেশের মানুষের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিবছর নিম্নাঞ্চলের মানুষকে বন্যার সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়।

                বেশ কয়েকদিন একনাগারে বিস্তীর্ণ স্থলভাগের প্লাবনকে বন্যা বলে। প্রায় প্রতি বছরই বর্ষার মৌসুমে আমাদের দেশে কম-বেশি বন্যা দেখা দেয়। বর্ষাকালে হিমালয়ের বরফ গলা পানি ও এর সাথে প্রচুর বৃষ্টির পানি বাংলাদেশের নদীগুলো দিয়ে বয়ে গিয়ে সমুদ্রে পড়ে। একসাথে এত পানি নদী দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে নদীর দুকূল ভেসে দেশে বন্যা দেখা দেয়। নদীর পানি উপচিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়, ডুবে যায় রাস্তাঘাট, ঘরবাড়িসহ বিস্তৃর্ণ ফসলের জমি, বির্পযস্ত হয়ে পড়ে জন জীবন। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেন সংঘটিত হয়, সে বিষয়ে নানা জনে নানা কথা বলে থাকে। কেউ বলে, তা মানুষের পাপাচার ও সীমালংঘনের জন্য, আবার কেউ বলে, তা নিছক প্রকৃতির কাজ।

    এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

    وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ

    তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে তাতো তোমাদের কর্মফল। আমি তোমাদের অনেক অপরাধ ক্ষমা করে থাকি।’ 

    বন্যা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

    فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُنْهَمِرٍ، وَفَجَّرْنَا الْأَرْضَ عُيُونًا فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَى أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ

    তখন আমি খুলে দিলাম আকাশের দরজা বারি বর্ষণের মাধ্যমে। এবং ভূমি থেকে প্রবাহিত করলাম প্রস্রবণ। অতঃপর সব পানি মিলিত হল এক পরিকল্পিত কাজে। আমি নূহ (আ.) কে আরোহন করলাম এক কাষ্ঠ ও পেরেক নির্মিত জলযানে।’ নূহ (আ.)এ প্লাবন কোন প্রকৃতির খেলা ছিল না। সীমালংঘনকারীদের শাস্তি দানই ছিল এর উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য সাধনের পর আল্লাহ বলেন, ‘আর নির্দেশ দেয় হল- হে পৃথিবী তোমার পানি গিলে ফেল, আর হে আকাশ, ক্ষান্ত হও। আর পানি হ্রাস করা হলো এবং কাজ শেষ হয়ে গেল এবং জুদী পর্বতে নৌকা ভিড়লো এবং ঘোষণা করা হলো। দুরাত্মা কাফেররা নিপাত যাক।’ 

    আমাদের জানা উচিত যে, এ প্রকৃতির পেছনে একজন স্রষ্টা আছেন যিনি তা নিয়ন্ত্রণ করেন। আকাশ মন্ডলে ও ভূমণ্ডলে যা আছে সবই তার আজ্ঞাবহ। যখনই তিনি কিছু করতে ইচ্ছা করেন তখন কেবল বলেন, ‘হও’ তখন সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে যায়।  অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টিতে, তার নির্দেশে বায়ুর দিক পরিবর্তনে এবং তার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান জাতির জন্য নিদর্শন রয়েছে অর্থাৎ শিক্ষা রয়েছে।’ তাই বন্যা, সিডর, সুনামি, কেটারিনাসহ প্রাকৃতিক দূর্যোগসমূহ আল্লাহর নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছে তবে তা বান্দার সীমা লংঘনজনিত কর্মের জন্য সংঘটিত হয়েছে। উল্লেখ্য, আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না।

    অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

    إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ

    আমি কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করি না যতক্ষণ না তারা নিজে নিজের অবস্থা পরিবর্তন করে।’

    বাংলাদেশে বন্যার প্রধান কারণ হচ্ছে, নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া। কারণ বর্ষাকালে বাংলাদেশের নদীগুলো দিয়ে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয় তার প্রায় ৯৪ শতাংশই আসে উজানে থাকা দেশগুলোর পার্বত্য অঞ্চল থেকে। এ পানি আটকে রাখার কোনো উপায় নেই। আবার খাল, বিল, জলাশয় ক্রমাগতভাবে ভরাট হওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ বৃষ্টির পানিও বন্যার মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে।

         এছাড়া ভারতের তৈরি ফারাক্কা বাঁধের কু-প্রভাবে দেশ প্রতিবছর আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত হয়ে থাকে। খরা মৌসুমে বন্ধুরাষ্ট্র ভারত ফারাক্কা বাঁধের প্রতিটি দরজা বন্ধ করে বাংলাদেশকে মরুভূমিতে পরিণত করার প্রয়াসে লিপ্ত থাকলেও বর্ষা মৌসুমে সম্পূর্ণ নিজেদের স্বার্থে বাঁধের সবকটা দরজা খুলে দিয়ে দেশে অপ্রত্যাশিত বন্যা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই ফারাক্কা বাঁধকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বন্যার কারণ বলা হয়ে থাকে। যা আমাদের জন্য অভিশাপ।

      অপরদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা দুনিয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমেই বাড়ছে। যেমন বাড়ছে সংখ্যায়, তেমন বাড়ছে তীব্রতা বা ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকেও। জেনেভাভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, কেবল ২০১০ সালেই বিশ্বে চার কোটি ২০ লাখ মানুষ গৃহহারা হয়েছে। আর এদের উদ্বাস্ত হওয়ার প্রধান কারণ বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়।

                ছোট হোক আর বড় হোক, বন্যা প্রতিবছরই আঘাত হানছে। গতবছরও আগাম বন্যায় হাওরাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তিস্তা-যমুনার অববাহিকা প্লাবিত হয়েছিল। বন্যায় মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দুর্ভোগ পোহায় দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। তাদের ফসলহানি হয়, বন্যাপরবর্তী রোগ-মহামারিতে স্বাস্থ্যহানি হয়। দারিদ্র্য আরো বেশি করে তাদের চেপে ধরে। বন্যার কারণে জীবনের ক্ষতি, ঘর-বাড়ী, ব্রিজ, সেতু এবং কালভার্টসহ অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। এছাড়াও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা, রাস্তা-ঘাট এবং বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনাকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়। বন্যার পানি জলবাহিত রোগ যেমন- টাইফয়েড, কলেরা, ডাইরিয়া ইত্যাদি বহন করে। কৃষি জমি প্লাবিত হয়ে ফসলের ক্ষতি মানুষ এবং পশু উভয়ের জন্য খাদ্য সংকট সৃষ্টি করে। বন্যার ক্ষতিকর প্রভাবে মৃত্যু, গুরুতর জখম এবং দীর্ঘকাল ভেজা ঘরে বসবাসের ফলে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা এবং অন্যান্য অসুস্থতা দেখা যেতে পারে। তাই আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করে পৃথিবীতে সুষ্ঠুভাবে জীবন যাপন করা আবশ্যক। 

    অতএব শয়তানের প্ররোচনায় পাপ হয়ে গেলে অনুশোচনার পরপরই কোনো নেকির কাজ করা উচিত। কারণ নেকি পাপ মিটিয়ে দেয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

    إن الحسنات يذهبن السيئات

    নিশ্চয়ই সৎ কর্মসমূহ মন্দ কর্মসমূহকে বিদূরিত করে।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ১১৪)

মন্তব্য করুন