Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৮ মে, ২০২২ ১০:১৯ অপরাহ্ণ

ব্যবহারিক খাতা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা

বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। কিন্তু এই প্রযুক্তির ছোঁয়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কতটুকু আলোকিত করেছে? শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতিতে কতটা প্রযুক্তি ব্যবহার করছি?

বর্তমানে চক-বোর্ডের জায়গায় এসেছে হোয়াইটবোর্ড-মার্কার। প্রশ্নপত্রে এসেছে সৃজনশীল পদ্ধতি। শ্রেণীকক্ষের নতুন সংযোজন হিসেবে এসেছে প্রজেক্টর।

এত কিছুর পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন আসেনি ব্যবহারিক খাতা লেখার প্রক্রিয়ায়। এক্ষেত্রে এখনও আমরা সেই পুরনো প্রক্রিয়াকেই আঁকড়ে ধরে আছি।

আমাদের বড়রা ব্যবহারিক খাতা লিখতেন। আমরা ব্যবহারিক খাতা লিখেছি। আমাদের ছোট ভাইবোনরাও ব্যবহারিক খাতা লিখছে।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এতকিছু পরিবর্তন হয়ে গেল কিন্তু ব্যবহারিক খাতা লেখার নিয়মটা পরিবর্তন হল না।

ছোটবেলায় আমাদের বড় ভাইয়া-আপুরা একটা মোটা খাতা আর কিছু ছবি দিয়ে যেত আর বলত, ‘ছবিগুলো এঁকে দিলে চকলেট খাওয়াব।’ চকলেটের লোভে আমরাও ছবি আর লেখাগুলো কপি করে দিতাম।

যখন ৯ম-১০ম শ্রেণীতে উঠে বিজ্ঞান বিভাগ নিলাম, তখন বুঝলাম ছোটবেলায় আমরা কী করতাম। আমরা আসলে বড় ভাইয়া-আপুদের বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়গুলোর ব্যবহারিক ক্লাসের ব্যবহারিক খাতা লিখে দিতাম।

ব্যবহারিক ক্লাসে যা করানো হয়, তা লেখা এবং যা দেখানো হয়, তা আঁকাটাই হল ব্যবহারিক খাতা লেখা। একই লেখা, একই ছবি ক্লাসের সবাইকে লিখতে হতো, আঁকতে হতো।

যে লেখা বা ছবি বইয়ে আছে, তা আবার খাতায় লিখে বা এঁকে কী লাভ হতো কেউ জানত না। সবাই অন্ধের মতো বই দেখে দেখে লিখত আর ছবি আঁকত। যাদের ছোট ভাইবোন থাকত, তারা তাদের দিয়ে সেই কাজ করিয়ে নিত। কারণ শিক্ষকরা সেটা ধরতে পারেন না।

ইন্টারমিডিয়েটেও ব্যবহারিক খাতা লেখার রীতিটা প্রায় একই। টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে দেখলাম, এখানেও সেই ব্যবহারিক খাতা লেখার নিয়মটা চালু আছে। প্রতিটা সেমিস্টারে যতটা থিওরি সাবজেক্ট থাকত, ততটারই প্র্যাকটিক্যাল সাবজেক্ট থাকত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্র্যাকটিক্যাল খাতা লেখাটা আরও ঝামেলার। শিক্ষকরা ক্লাসের প্রথমদিনেই হয়তো লেকচার শিট দিয়ে দেবেন বা প্রতিটা ক্লাস শেষে নির্দিষ্ট বিষয়ের লেকচার শিট দিয়ে দেবেন।

সেই লেকচার শিট দেখে দেখে প্র্যাকটিক্যাল খাতা লিখে নিয়ে আসতে হবে ও শিক্ষকের সাইন নিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে সাইন না নিতে পারলে পরে শিক্ষক সাইনও করতে চান না। আর ব্যবহারিক খাতায় সাইন না থাকলে খাতা লেখার ১০ নম্বরও পাবে না শিক্ষার্থীরা।

এজন্য ক্লাস শেষে সবাই ক্লাসে কী পড়ানো হয়েছে, সেটা নিয়ে চিন্তা না করে কিভাবে প্র্যাকটিক্যাল খাতা লিখতে হবে; তা চিন্তা করতে থাকে। একজনের ব্যবহারিক খাতা লেখা হয়ে গেলে সবাই শুধু সেটা দেখে কপি করে।

রাতে দেখা যায়, সব শিক্ষার্থীই কানে হেডফোন লাগিয়ে প্র্যাকটিক্যাল খাতা লেখা শুরু করেছে। কী লিখছে, সেটাও শিক্ষার্থীদের ভাববার বিষয় না। খাতা ভরে লেখা আছে কিনা, সেটাই মুখ্য বিষয়। যদি কারও খাতায় ভুল থাকে, সেই ভুল প্রায় সব খাতাতেই পাওয়া যায়।

শিক্ষকরাও জানেন যে, শিক্ষার্থীরা দেখে দেখে লিখেছেন। তারপরও তারা সেখানে সাইন করে দেন। এই খাতা লিখে শিক্ষার্থীদের না হাতের লেখা ভালো হয়, না তারা কিছু শিখতে পারে। ফলে আবারও সেই পুরনো প্রশ্ন মাথায় এলো- যে লেখা বা ছবি লেকচার শিটে আছে, তা আবার খাতায় লিখতে বা আঁকতে হবে কেন?

কখনও কখনও মার্জিন ঠিক নেই, তারিখ লেখা নেই, এই নেই- সেই নেই বলে সাইন না করে শিক্ষার্থীদের ঘোরাতে থাকেন শিক্ষকরা। মাঝে মাঝে প্র্যাকটিক্যাল খাতা লেখার চাপের কারণে থিওরি পরীক্ষার পড়াও ঠিকমতো পড়তে পারে না শিক্ষার্থীরা।

কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপও থাকে না কিছু শিক্ষকের। আর এভাবেই ১০ নম্বর বাঁচাতে গিয়ে ৭০ নম্বরের থিওরি পরীক্ষা খারাপ করে ফেলে শিক্ষার্থীরা। আর এতকিছুর পরে সেই প্র্যাকটিক্যাল খাতাগুলোর স্থান হয় পুরনো কাগজ কেনাবেচার দোকানে। এটা কি কাগজেরও অপচয় নয়?

যদি ধরি, প্রতি সেমিস্টারে ৫টি করে প্র্যাকটিক্যাল সাবজেক্ট থাকে। তাহলে সপ্তাহে ৫টি প্র্যাকটিক্যাল খাতা দিতে হবে। প্রতিদিন একজন শিক্ষার্থীর একটা প্র্যাকটিক্যাল খাতা লিখতে কমপক্ষে ২ ঘণ্টা করে লাগলেও সপ্তাহে ১০ ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়।

বছরে কমপক্ষে ৫০০ ঘণ্টা এবং অনার্স জীবনের ৪ বছরে প্রায় ২ হাজার ঘণ্টা সময় একটা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করতে হয় শিক্ষার্থীদের। এর ফলে হাজার হজার শিক্ষার্থীর জীবন থেকে কী পরিমাণ মূল্যবান সময় হারিয়ে যাচ্ছে, তা কী আমরা বুঝতে পারছি?

সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, ব্যবহারিক খাতা লেখার প্রক্রিয়াটা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়। এ প্রজন্মের অনেক শিক্ষকই ব্যবহারিক খাতা লেখার সম্পূর্ণ বিপক্ষে। বর্তমানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকরা প্রিন্টেড ব্যবহারিক খাতা সরবরাহ করে থাকেন।

যেখানে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে বসেই ব্যবহারিক খাতার ফাঁকা অংশ পূরণ করে ফেলতে পারেন এবং শিক্ষকের সাইন নিতে পারেন। এতে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় নষ্ট হয় না।

আবার অনেক শিক্ষকই ব্যবহারিক খাতার পাশাপাশি কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে ‘পাওয়ার পয়েন্টে প্রেজেন্টেশন’ নেয়ার ব্যবস্থাও চালু করেছেন। কিন্তু সেটাকেও ঠিক ব্যবহারিক খাতার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি।

ব্যবহারিক খাতার বিকল্প হিসেবে প্রিন্টেড কপি সরবরাহ বা পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টশন হতে পারে অনন্য সমাধান। কিন্তু এই দুটি ব্যবস্থার কোনোটিকেই এখনও সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করতে পারছে না। সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে।

আমরা অনেক পরিবর্তন মেনে নিয়েছি, নিজদেরকে মানিয়েও নিয়েছি। তাহলে ব্যবহারিক খাতার পরিবর্তনটা আমরা মেনে নিতে পারছি না কেন?

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কেন পিছিয়ে থাকবে? আমরা কি পারি না আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে? আমরা কি পারি না পুরনো শিক্ষাব্যবস্থা বদলে ফেলে নতুন করে গড়ে তুলতে?

শিক্ষার্থী,বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

তথ্যসূত্রঃ যুগান্তর।

মন্তব্য করুন

ব্লগ