সহকারী শিক্ষক
০৭ জুন, ২০২২ ০৩:২৭ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বায়ুমন্ডলের যে সকল গ্যাস তাপীয় অবলোহিত সীমার মধ্যে বিকিরিত শক্তি শোষণ ও নির্গত করে সে সকল গ্যাসকে গ্রিনহাউস গ্যাস বলে। এটি গ্রিনহাউস প্রভাবের মৌলিক কারণ। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রাথমিক গ্রিনহাউস গ্যাস গুলোর মধ্যে আছে জলীয় বাষ্প,কার্বন ডাই অক্সাইড,মিথেন,নাইট্রাস অক্সাইড এবং ওজোন।
গ্রিন হাউস : গ্রিন হাউস হলো শীত প্রধান দেশে শীতকালে ফুল, ফল ও শাকসবজি ইত্যাদি জন্মাবার উদ্দেশ্যে উত্তাপ ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত কাচের ঘর। গ্রিন হাউস সূর্যের আলো আসতে বাধা দেয় না তবে তার তাপশক্তি কিছুটা কাচের আচ্ছাদনের মধ্যে ধরে রাখে। এছাড়া এ ঘরে প্রয়োজন মতো উত্তাপ ও আলো সরবরাহের ব্যবস্থা থাকে- ফলে প্রতিকূল পরিবেশে ইচ্ছেমতো শাকসবজি ফুলফল ও সবুজ উদ্ভিদ জন্মানো সম্ভব।
গ্রিন হাউস প্রভাব : বায়ুমন্ডল পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। এই ক্ষেত্রে বায়ুমন্ডলের নিম্ন স্তরে কিছু গ্যাস গ্রিন হাউস বা কাচের ঘরের দেওয়াল বা ছাদের মতো কাজ করে। সূর্যের আলো পৃথিবীর তাপ ও শক্তির মূলউৎস। সূর্যরশ্মি (রশ্মি নিকটবর্তী, দৃশ্যমান, নিকটবর্তী অবলোহিত বর্ণালি ইত্যাদি ক্ষতিকর রশ্মি) বায়ুমন্ডলে এসব গ্যাসীয় স্তর ভেদ করে পৃথিবীতে এসে পড়ে। পৃথিবীতে আসা সূর্যালোকের সবটুকু কাজে লাগে না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সূর্যালোক ভূপৃষ্ঠে ছেড়ে দেয়। আবার ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরণ তাপের সবটুকু মহাশূন্যে চলে যায় না। এই বিকিরিত তাপের একাংশ প্রধানত কার্বন ডাই-অক্সাইড জলীয় বাষ্প এবং অন্যান্য গ্রিন হাউস গ্যাস দ্বারা শোষিত হয়ে আবহাওয়া মন্ডলে কতটুকু থেকে যায় তা নির্ভর করে গ্রিন হাউস গ্যাসের ওপর। এসব গ্রিন হাউস গ্যাস বিকিরিত তাপকে মহাশূন্যে ফিরে যেতে বাধা প্রদান করে। সুতরাং গ্রিন হাউস গ্যাসসমূহের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে বায়ুমন্ডলের তাপ ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। ইহাকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে। উষ্ণতার বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়াকে গ্রিন হাউস প্রভাব বলে।
ভূপৃষ্ঠের চুনা পাথর নানাবিধ এসিডের সংস্পর্শে আসার ফলে বনাঞ্চলের অগ্নিকান্ডের ফলে নানারকম চুলিস্ন থেকে ক্রমবর্ধমান হারে অধিক পরিমাণ ঈঙ২ গ্যাস নির্গত হয়।
ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (CFC): রেফ্রিজারেটর, কোল্ড স্টোর, বরফ কল ইত্যাদি ঠান্ডা রাখার জন্য CFC ব্যবহার করা হয়। এছাড়া অ্যারোসল, পস্নাস্টিক ফোমের উপাদান যেমন : আরমোকোলস স্টাইরোফম, যানবাহন শীতালায়ন ও কলকারখানার ব্যবহৃত গ্যাস CFC-এর উৎস। মানুষের তৈরি CFC গ্যাস ওজোন স্তর ক্ষয় সাধন করে। বায়ু দূষণ তথা স্ট্রাটোস্ফেয়ারে ক্লোরিন দূষণের প্রেক্ষাপটে ওজোন ক্ষয় পরিলক্ষিত হয়। আবার জলভূমিতে পানির নিচের পানা, নানা জাতীয় পাতা ও বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদের পচনের এবং উইপোকার অন্তে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া থেকে নির্গত মিথেন গ্যাস (CH4)-এর বিকিরণের ফলে ওজোন স্তর ক্ষয় হয় এবং ওজোন ডযড়ষব তৈরি হয়। ফলে টঠ রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে এসে পড়ছে। এর ফলে ত্বকে ক্যান্সার, চোখের ছানি, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হৃ্রাস পাবে। ওজোন (O3) ২৫% শতাংশ হ্রাস পেলে সামুদ্রিক পস্নাংটন ৩৫% হ্রাস পাবে। ফলে মৎস্যসম্পদের খাদ্যের অভাব হবে। টঠ রশ্মির ফলে তুলা, তরমুজ ও বাঁধাকপিসহ কিছু শস্য উৎপাদন কমে যাবে এবং খাদ্য শস্যেও তেজস্ক্রিয়তা দেখা দেবে। উদ্ভিদের পাতা, ফল ও বীজের বৃদ্ধি ব্যাহত হবে। কয়েক শ্রেণির উদ্ভিদের সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। প্রাণীর প্রজনন ক্ষমতা হৃ্রাস পাবে এবং উদ্ভিদের ক্ষেত্রে শস্য উৎপাদন হ্রাস পাবে।
নাইট্রাস অক্সাইড (N2O) : মটরযান শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র পস্নাস্টিক এসিড বিস্ফোরণ নির্মাণকারী কারখানাসহ বিভিন্ন কারখানা ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত নাইট্রোজেন সার ইত্যাদি হতে নাইট্রাস অক্সাইড নির্গত হয়।
মিথেন (CH4) : প্রাকৃতিক উৎস বিশেষ করে গাছপালাসমূহ বায়ুমন্ডলে বেশি পরিমাণে হাইড্রো কার্বন নিঃসরণ করে। এদের মধ্যে মিথেনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। মাটিতে ও পানির জৈব যৌগের ব্যাকটেরিয়াজনিত বিয়োজনের মাধ্যমে আশানুরূপ ঈঐ৪ পাওয়া যায়।
ব্যাকটেরিয়া:
এছাড়া ধানের অবশিষ্ট অংশ গাবাধি পশুর মল কয়লাখনি জলাভূমিতে পানির নিচে পানা নানা জাতীয় পাতা ও বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদের পচনের ফলে এবং গাছ ধ্বংসকারী উইপোকার অন্তে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া থেকে CH4 গ্যাস নির্গত হয়।
গ্রিন হাউস প্রভাবের সম্ভাব্য ফলাফল: বায়ুমন্ডলে ক্রমাগত গ্রিন হাউস গ্যাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। বায়ুমন্ডলে গ্রিন হাউস গ্যাসের বৃদ্ধিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে বিশ্ব পরিবেশের ওপর যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে তা নিম্নে উলেস্নখ করা হলো:
১। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে পৃথিবীর সমুদ্র উপকূলবর্তী নিচু স্থলভূমি জলমগ্ন হবে। উপকূলবর্তী নিচু ধান
উৎপাদনকারী জমির পরিমাণ হ্রাস পাবে। লবণাক্ত জমির প্রকোপে মৃত্তিকার উর্বরতা হ্রাস পাবে- ফলে ফসল উৎপাদন হ্রাস পাবে।
২। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কিছু অঞ্চল নতুনভাবে জলমগ্ন হবে এবং কিছু অঞ্চল শুষ্ক হবে। এতে করে বাস্তুতন্ত্রের প্রাণ প্রবাহের ওপর জলবায়ুর পরিবর্তন বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
৩। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং অসংখ্য উদ্ভিদ ও পানির অস্তিত্বও বিপন্ন হবে। অসংখ্য জীবের প্রজাতি পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হবে।
৪। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ৩ - ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে পৃথিবীর দুই মেরুতে জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করবে ফলে এই বরফ গলা পানি সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দেবে এর ফলে জনপদ নগর পানির তলায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৫। সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সামুদ্রিক ঝড় জলোচ্ছ্বাস ও টাইফুনের হার বেড়ে যাবে। বিপর্যয়ের এই সংকেত পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে।
৬। সামুদ্রিক পানির উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে সমুদ্রের পানির তাপীয় সম্প্রসারণের কারণে দ্রবীভূত কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনমাত্রা হ্রাস পাবে। ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র বিপন্ন হবে এবং অসংখ্য জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
৭। সমুদ্র পৃষ্ঠ স্ফীত হলে আবহাওয়ায় প্রকৃতি পরিবর্তিত হবে।
বর্তমান বিশ্বে গ্রিন হাউসের প্রতিকূল প্রভাব নিয়ন্ত্রণে নিম্নলিখিত ব্যবস্থাসমূহ নেয়া যেতে পারে:
১। জ্বালানি শক্তির সংক্ষেণের মাধ্যমে বায়ুমন্ডলে ঈঙ২ গ্যাসের উত্তরোত্তর পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধি করা।
২। সৌর পানি বায়ু পারমাণবিক শক্তির মতো পুনঃপুনঃ ব্যবহার যোগ্য শক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া।
৩। প্রতি কিলোমিটারে বর্তমানের চেয়ে অনেক কম জ্বালানি তেল প্রয়োজন হয় এমন মটরযান ইঞ্জিন উদ্ভাবন করা।
৪। কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদনকারী জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার যথাসম্ভব কম করা।
৫। বনাঞ্চল সংরক্ষণ ও নিয়মিত ব্যাপক বনায়নের মাধ্যমে নতুন নতুন বনাঞ্চল সৃষ্টি করা।
৬। কৃষি কাজে রাসায়নিক সারের ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার ব্যাপক প্রচলন করা।
৭। ঈ.ঋ.ঈ-এর সস্তা বিকল্প আবিষ্কার করা এবং ঈ.ঋ.ঈ ব্যবহার এবং উৎপাদন বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৮। উপকূলে উপযুক্ত বাঁধ ও দেওয়াল নির্মাণ করা ও সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা।
৯। ত্রম্নটিপূর্ণ যানবাহনের জ্বালানির অসম্পূর্ণ দহনের ফলে ঈঙ২, ঈঐ৪-এর মতো বিভিন্ন গ্রিন হাউস গ্যাস তৈরি হয় তাই ত্রম্নটিপূর্ণ যানবাহনের ব্যবহার রোধ করতে হবে।
১০। কলকারখানার ও যানবাহনের কালো ধোঁয়া বায়ুমন্ডলে নির্গত না করে উপযুক্ত ফিল্টারের মাধ্যমে পরিশোধ করে নির্গত করতে হবে।
সাধারণতঃ উচ্চ অক্ষাংশে শীতপ্রধান উন্নত দেশসমূহে শাক-সবজি উৎপাদনের জন্য তৈরী বিশেষ একধরনের কাঁচের ঘরকে সবুজ ঘর বা গ্রীন হাউস (Green House) বলা হয়ে থাকে । কাঁচ স্বাভাবিকভাবেই সূর্যের আগত ক্ষুদ্র তরঙ্গরশ্মিকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়, কিন্তু প্রতিফলিত দীর্ঘ তরঙ্গের সৌরবিকিরণকে কাঁচ কোনোভাবেই বাইরে বেরোতে দেয় না, ফলে এই ঘরের মধ্যে তাপমাত্রা আটকা পড়ে ক্রমশ ঘরের অভ্যন্তরস্থ তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং শাক-সবজি বা গাছপালা জন্মানোর জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠে ।
বর্তমানে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলও অনেকটা গ্রীন হাউসের মত আচরণ করছে । সূর্যকিরণ থেকে পৃথিবীতে মোট যে পরিমাণ বিকিরণ আসে তার ৩৪ % (২ % ভূপৃষ্ঠ থেকে, ৭ % বায়ুমন্ডল থেকে এবং ২৫ % মেঘপুঞ্জ থেকে) বিকিরণ মেঘপুঞ্জ, ধুলিকণা প্রভৃতি দ্বারা প্রতিফলিত হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যায় । পৃথিবী থেকে সূর্যরশ্মির প্রত্যাবর্তনের এই প্রাকৃতিক ঘটনাকে অ্যালবেডো (Albedo) বলে । এই প্রতিফলিত অ্যালবেডো পৃথিবীর বায়ুমন্ডলকে কোনোভাবেই উত্তপ্ত করতে পারে না, ফলে তা পৃথিবীর তাপের ভারসাম্য বজায় রাখতে বিরাট ভূমিকা নেয় । কিন্তু গত বেশ কয়েক দশক ধরে বায়ুমন্ডলে অবস্থিত কিছু গ্যাস ও অন্যান্য উপাদান ( কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন, জলীয় বাস্প নাইট্রোজেন অক্সাইড প্রভৃতি) পৃথিবীর তাপমাত্রাকে ধরে রাখছে গ্রীন হাউসের কাঁচের দেওয়ালের মতো । কারন, এই গ্যাসগুলিও গ্রীন হাউসের কাঁচের মতো সূর্যের আগত ক্ষুদ্র তরঙ্গরশ্মিকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়, কিন্তু প্রতিফলিত দীর্ঘ তরঙ্গের অ্যালবেডোকে পুরোপুরি বাইরে বেরোতে বাঁধা দিচ্ছে । ফলে এই বায়ুমন্ডলসহ পৃথিবীর মধ্যে তাপমাত্রা আটকা পড়ে গড় তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে । এই ঘটনাকেই গ্রীন হাউস প্রভাব বা গ্রীন হাউস এফেক্ট (Green House Effect) বলা হচ্ছে ।
বিভিন্ন গ্রীনহাউস গ্যাসের নাম ও তাদের উৎসঃ গ্রীন হাউস প্রভাব বা গ্রীন হাউস এফেক্ট সৃষ্টিকারী বিভিন্ন গ্যাসগুলি ও তাদের উৎসগুলি হলো নিম্নরূপ –
১. কার্বন-ডাই অক্সাইডঃ উৎস– বনজ সম্পদ দহন, আগ্নেয়গিরি, জৈব জ্বালানি, বনভূমি বিনাশ, ভূমিব্যবহার পদ্ধতি প্রভৃতি ।
২. মিথেনঃ উৎস– জলাভূমি, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেলের নির্যাস, জৈবসার, ধান উৎপাদন, গবাদিপশু প্রভৃতি ।
৩.নাইট্রাস অক্সাইডঃ উৎস– বন, ঘাস, সমুদ্র, মাটি, সার, জৈবসার, জৈবজ্বালানী প্রভৃতি ।
৪.ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (CFC): উৎস– রেফ্রিজারেটর, এরোসল স্প্রে, ফোম, রং প্রভৃতি ।
৫.ওজোনঃ উৎস– প্রাকৃতিকভাবে সূর্যের আলো দ্বারা অক্সিজেন থেকে সৃষ্ট এবং কৃত্রিমভাবে ফটোকেমিক্যাল ধোয়া উৎপাদন থেকে সৃষ্ট ।
গ্রীন হাউস প্রভাব / গ্রীন হাউস গ্যাসের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধির কারণঃ বায়ুমন্ডলে গ্রীন হাউস প্রভাব ও গ্রীন হাউস গ্যাসের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধির কারণগুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিঃ বায়ুমন্ডলে গ্রীন হাউজ প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পৃথিবী গত ২০ লাখ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গরম হয়ে যাবে । ১৮৮০ সাল থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা ০.৬°C বেড়েছে । ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর উষ্ণতা ২.৫°C এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ৩.৮°C বেড়ে যেতে পারে । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, গত ২০০০০ বছরের তুলনায় শেষ শতকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে । বিংশ শতাব্দীর দুটি অধ্যায়ে (যথা – ১৯২০–১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ এবং ১৯৭৬–২০০০ খ্রিষ্টাব্দ) উষ্ণতা সবথেকে বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে । ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে হিসাব করলে বিশ্বের উষ্ণতম দশক হচ্ছে ১৯৯০ এর দশক । নাসার গোদার্দ ইনস্টিটিউট ফর স্পেন স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে উষ্ণতম বছর । কিন্তু ওয়ার্ল্ড মিটিয়েরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট ও ক্লাইমেট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে উষ্ণতম বছর হলো ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দ এবং দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর হলো ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ ।
খ) মেরু অঞ্চলের বরফ গলনঃ এর ফলে বিষুবীয় ও মেরু অঞ্চলের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে । মনে করা হচ্ছে, আর ১০০ বছরের মধ্যে সুমেরু কুমেরুতে গরমকালে সমস্ত বরফ জলে পরিনত হবে । শীতে অল্প বরফ থাকবে ।
গ) সমুদ্র জলতলের উচ্চতা বৃদ্ধিঃ ক্রমবর্ধমানহারে গ্রীন হাউজ প্রভাবের ফলে সমুদ্রের স্তর ৩০ – ৪০ সেন্টিমিটার বেড়ে যাবে । এর ফলে পৃথিবীর উপকূলবর্তী এলাকার (পশ্চিমবঙ্গ,বাংলাদেশসহ) একটি বিরাট অংশ সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে ।
ঘ) রোগের প্রকোপ বৃদ্ধিঃ মালেরিয়া, গোদ, কলেরা, ডেঙ্গু বাড়বে; কারণ জল বাড়লে মশা বাড়বে । আরো ভিন্ন রোগ ফিরে আসবে, নতুন রোগ আসবে ।
ঙ) বাস্তুতন্তের বিনাশঃ সমুদ্রে ক্ষারের পরিমাণ কমবে, ফলে ক্ষারে বেচে থাকা জীবের অস্তিত্ব লোপ পেয়ে বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ ঘটবে ।
চ) আবহাওয়ার প্রকৃতি পরিবর্তনঃ উষ্ণতা বৃদ্ধি পাবার ফলে অধঃক্ষেপণের পরিমান, ঝড়ঝঞ্জার প্রকোপ প্রভৃতি বৃদ্ধি পাবে । ঘূর্ণীঝড়ের সংখ্যা ও শক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে । বৃষ্টিবহুল এলাকা নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চলের দিকে ক্রমশ বাড়তে থাকবে । ফলে আবহাওয়ার প্রকৃতি পরিবর্তন হবে ।
ছ) ফসলের ক্ষতিঃ আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে ফসলের সমূহ ক্ষতি হবে এবং উৎপাদন কমে যাবে ।
এছাড়াও,
জ) বনাঞ্চল ধ্বংস হবে ।
ঝ) পানীয় জলে সংক্রমণ দেখা দেবে ।
ঞ) বন্যজন্তুর সংখ্যা হ্রাস পাবে ।
ট) মানুষের আবাসস্থলের সংকট দেখা দেবে ।
ঠ) বিশ্বজুড়ে খাদ্যভাব প্রকট হবে ।
ড) স্থানবিশেষে কোথাও খরা, আবার কোথাও বন্যার প্রকোপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে । সব মিলিয়ে পৃথিবীতে নতুন নতুন ভৌগোলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যা প্রকট থেকে প্রকটতর হবে ।
গ্রীন হাউস প্রভাব নিয়ন্ত্রনের উপায়ঃ গ্রীন হাউস প্রভাব নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলি হলো নিম্নরূপ –
ক) জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার হ্রাসঃ কলকারখানা, যানবাহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সবকিছুতেই জীবাশ্ম জ্বালানী জ্বালানোর পরিমান ক্রমশ যতটা পারা যায় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ যথাসম্ভব কমাতে সম্ভব হবে ।
খ) রাসায়নিক সারের ব্যবহার হ্রাসঃ কৃষিতে নাইট্রোজেন সার (যেমন – ইউরিয়া) ব্যবহারের ফলে বাড়ছে নাইট্রোজেন অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ । অবিলম্বে কৃষিকাজে রাসায়নিক সারের ব্যবহার যথাসম্ভব কমাতে হবে ।
গ) মিথেন নির্গমনের পরিমাণ হ্রাসঃ গাছপালার পচন, কৃষিজ বর্জ্য এবং জীব জন্তুদের বর্জ্য থেকে সৃষ্ট মিথেন গ্যাসের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে । মিথেনের এই সকল উৎসগুলিকে অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ।
ঘ) অচিরাচরিত শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিঃ অচিরাচরিত শক্তি বলতে বোঝায় যেসব শক্তির উৎস পুনর্নবীকরণ করা যাবে অর্থাৎ, ফুরিয়ে গেলেও আবার তৈরি করে নেওয়া সম্ভব । জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহারে বায়ুমন্ডলে গ্রীণ হাউস গ্যাসের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে । ফলে হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ । গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানীর পরিবর্তে বিকল্প জ্বালানী ব্যবহার করলে বায়ুমন্ডলে গ্রীণ হাউস গ্যাস (যেমন – কার্বন-ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন, ওজোন) এর পরিমাণ কমে আসবে । ফলে পরিবেশ দূষণ অনেকটাই কমে যাবে । সাম্প্রতিক কালে এই অচিরাচরিত শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপকভাবে আলাপ আলোচনা হচ্ছে । এই চিরাচরিত শক্তিগুলি হলো – সৌর শক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বায়োডিজেল, জোয়ার-ভাটা শক্তি, ভূ-তাপীয় শক্তি, আবর্জনা থেকে প্রাপ্ত শক্তি, নিউক্লিয়ার এনার্জি প্রভৃ্তি ।
ঙ) ই-ওয়েস্ট বা ইলেক্ট্রনিক বর্জ্য আমদানী বন্ধঃ উন্নত বিশ্বের দেশগুলো থেকে নানা ধরণের ই-ওয়েস্ট বা ইলেক্ট্রনিক বর্জ্য আমদানী হচ্ছে আমাদের দেশে । এভাবে প্রতি বছর প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ব্যবহৃত (সেকেন্ড হ্যান্ড) কম্পিউটার তৃতীয় বিশ্বে পাঠানো হচ্ছে । এসব কম্পিউটারের অন্যতম ক্রেতা হলো – চীন, ভারত ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলি । অর্থাৎ, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে পরোক্ষভাবে উন্নত দেশগুলোর ইলেক্ট্রনিক বর্জ্যের আস্তাকুড়ে পরিণত করা হচ্ছে । এই সব ই-বর্জ্যের মধ্যে হাজার হাজার টন সীসাসহ রয়েছে আরও বহু বিষাক্ত উপাদান যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসছে । এসব দূষিত বর্জ্য পদার্থ বিভিন্নভাবে গ্রীন হাউস প্রভাব বৃদ্ধি করার পাশাপাশি সরাসরি কৃষি সম্পদ, মৎস্যসম্পদ, বনজ সম্পদ বিনষ্টেরও অন্যতম কারণ ।
চ) পরিকল্পিত বনায়নঃ বিশ্বজুড়ে যখন গ্রীন হাউস প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষেধক হল অরণ্য । একদিকে অরণ্যচ্ছেদন রোধ ও অন্যদিকে পরিকল্পিতভাবে
বনায়নের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যপী গ্রীন হাউস প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ।
ছ) শক্তিসাশ্রয়ী আবাসনঃ আমাদের জীবনযাপনের সবক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে । বড় বড় অট্টালিকা, বাড়িঘর বা বড় দালান নির্মাণে প্রয়োজনীয় খালি জায়গা রাখতে হবে । প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের প্রবেশ যেন সহজে হয় সে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে যাতে কম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালাতে হয়, লিফট, জেনারেটর, এয়ার কন্ডিশন এসবের ব্যবহার কমাতে গ্রীণ বিল্ডিং টেকনোলজির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে । শহরের পাশাপাশি গ্রামের বাড়িঘর নির্মাণেও বিদ্যুত সাশ্রয়ী সবুজায়ন প্রয়োজন ।
জ) পরিবেশ রক্ষাসংক্রান্ত চুক্তিগুলির দ্রুত বাস্তব রূপায়ণঃ বিশ্বে ক্রমবর্দ্ধমান গ্রীন হাউস প্রভাব নিয়ে চুক্তিগুলির দ্রুত বাস্তব রূপায়ণ খুবই দরকার । কেবলমাত্র আলাপ-আলোচনা নয়, দরকার গৃহীত সিদ্ধার্ন্তগুলির দ্রুত ও বাস্তব রূপায়ণ ।
ঝ) বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব দ্রব্য ব্যবহারঃ গ্রীন হাউস প্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদানগুলির বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব দ্রব্য ব্যবহারের উপর জোর দিতে হবে ।
ঞ) নাগরিক দায়িত্বঃ পরিবেশ রক্ষা নাগরিকদের মৌলিক দায়িত্ব । তাই গ্রীন হাউস প্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদানগুলি যাতে পরিবেশে কম পরিমানে উৎপাদিত হয়, সে বিষয়ে সকলকেই দায়িত্বশীল হতে হবে ।
ট) নতুন প্রযুক্তিঃ গ্রীন হাউস প্রভাব প্রতিরোধের চুড়ান্ত উত্তর হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি । তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত উপাদান পরিবর্তন, যানবাহনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কার্বন-ডাই-অক্সাইড পৃথকীকরণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন প্রভৃতিসহ বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করতে হবে । (সংগৃহীত)
৪
৪ মন্তব্য