সহকারী শিক্ষক
১৩ জুন, ২০২২ ০৮:৫০ অপরাহ্ণ
গ্রিনিচ(Greenwich) শহর এবং গ্রিনিচ মানমন্দিরের ইতিহাস।
গ্রিনিচ (ইংরেজি: Greenwich) ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি শহর। এটি লন্ডনের চেয়ারিং ক্রস জাংকশন থেকে ৫.৫ মাইল পূর্ব-দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত। কয়েকশ বছর ধরে এটি কেন্ট প্রদেশের একটি শহর ছিল, এরপর ১৮৮৯ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত এটি লন্ডন প্রদেশের অংশ ছিল, তবে পরবর্তীতে এ প্রদেশ ভেঙ্গে দেয়া হয় এবং রাজধানী লন্ডন গঠিত হয়।
গ্রিনিচ এর সমুদ্রের সাথে জড়িত ইতিহাস, অসংখ্য 'টিউডর' রাজবংশের জন্মস্থান এবং গ্রিনিচ মানমন্দিরের জন্য এ শহরটি বিখ্যাত। ১৮ শতকে এটি ভ্রমণকারীদের জন্য একটি জনপ্রিয় স্থানে পরিণত হওয়ায় এখানে অনেকগুলো ম্যানসনের মতো বড় বড় বাড়ি, প্রাসাদ ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রিনিচের সাথে সম্পর্কিত সমুদ্র সংযোগগুলো বিংশ শতাব্দীতে উদযাপিত হয়।
থেম্স নদীর দক্ষিণে অবস্থিত উলউইচ মহানগর পৌরসভা ও গ্রিনিচ মহানগর পৌরসভাকে একত্র করে ১৯৬৫ সালে গ্রিনিচের লন্ডন পৌরসভা (London Borough of Greenwich) গঠিত হয়। এই পৌরসভা গ্রিনিচে পশ্চিম গ্রিনিচ ও পেনিনসুলা ওয়ার্ড তৈরী করেছে এবং এটিই গ্রিনিচের সরকার। এ পৌরসভা বেশ কয়েকটি এলাকা যেমন, ব্ল্যাকহেথ ওয়েস্টকম্ব, চার্লটন, গ্লিন্ডন, উলউইচ রিভারসাইড, উলউইচ কমোন ইত্যাদি এলাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে এবং একজন পার্লামেন্ট সদস্য বা এমপি নির্বাচন করে।
গ্রিনিচের নাম সর্বপ্রথম 'গ্রোনেউইক' নামে ৯১৮ সালে 'স্যাক্সন চার্টার' সনদে উল্লেখ করা হয়। ৯৬৪ সালে এর নাম 'গ্রেনেউইক' ও ১০১৩ সালে 'গ্রেনাউইক' হিসেবে 'অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকেল' সনদে তালিকাভুক্ত করা হয়। ১০৮৬ সালে এটির নাম গ্রেনভিচ হিসেবে ডুমসডে বই(Domesday Book)-এ উল্লেখ করা হয়, এরপর ১২৯১ সালে টাক্সাটিও এক্লেসিয়াসতিকা নামের একটি ডাটাবেসে এটিকে গ্রেনেউইচ নামে যুক্ত করা হয়। তৎকালীন গ্রিনিচের পশ্চিম অঞ্চলটি অর্থাৎ তৎকালীন পশ্চিম গ্রিনিচ থেম্স নদী সংলগ্ন ডেপ্তফোর্ড অঞ্চলের অংশ ছিল এবং দুই অংশের মীমাংসার মাধ্যমে পশ্চিম গ্রিনিচকে পূর্ব গ্রিনিচ থেকে বিভক্ত করে দেয়া হয়। এ কারণে গ্রিনিচের নাম ল্যাটিন ভাষার 'ভিকাস' শব্দ হতে আগত 'গ্রিন উইক' শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ মীমাংসা বা নিষ্পত্তি। অবশ্য সমগ্র গ্রিনিচ শহরকে পূর্ব গ্রিনিচ বলে অভিহিত করার চল ১৯ শতকেই শেষ হয়ে যায়। এ গ্রিনিচকে বৃটিশ গৃহযুদ্ধের সময় ১৮৩৭ সালে পূর্ব ও পশ্চিম গ্রিনিচ উপজেলায় বিভক্ত করা হয়। সে সময়ের দুই গ্রিনিচের মধ্যবর্তী সীমানা বর্তমানের গ্রিনিচ চার্চ স্ট্রিট ও ক্রমস পাহাড়ের এলাকাটিতে অবস্থিত ছিল এবং সেই পূর্ব ও পশ্চিম গ্রিনিচ মূলত বর্তমানে পশ্চিম গ্রিনিচ ওয়ার্ডের সাথে সংলগ্ন রয়্যাল নেভাল কলেজ ও জাতীয় মেরিটাইম যাদুঘরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ।
মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে প্রচলিত এক ধরনের জমিদার প্রথার নাম ম্যানোর যা মূলত একটি আঞ্চলিক সরকার ব্যবস্থা ছিল। বৃটিশ রয়্যাল চার্টার সনদে পূর্ব গ্রিনিচে প্রচলিত এই ম্যানোরকে প্রায়শই করমুক্ত ম্যানোর হিসেবে অভিহিত করা হতো অর্থাৎ এ ম্যানোর থেকে কোন প্রকার কর মূল সরকারকে প্রদান করা হয় না। নিউ ইংল্যান্ড চার্টার সনদে এ বিষয়ে বলা হয়েছিল যে, সকল জমিদার বা ভূস্বামী তাদের প্রধান সরকারের ভূমি দখলদারীর মাধ্যমে বসবাস করছে। তৎকালীন বৃটিশ নিয়মানুযায়ী কোন জমিদারের জমি তাদের নিজেদের ছিল না যদিও এ জমির দলিল তাদের নামে তৈরী এবং তারাই এদের আসল মালিক। তবে টিউডর যুগে এ নিয়মের পরিবর্তন করে ফেলা হয় এবং পূর্ব গ্রিনিচে প্রচলিত টাকায় (ইংল্যান্ডের গ্র্যান্ট) এই জমিদারদের নাম উল্লেখ করার প্রচলন ঘটে। তবে ১৭ শতকের অনেকগুলো গ্র্যান্টে ইংল্যান্ডের বার্কশার প্রদেশে অবস্থিত উইন্ডসোর প্রাসাদের নাম উল্লেখ করা হতো।
জার্মানি হতে আগত স্যাক্সন জাতি গ্রিনিচের একদম প্রথমদিকের বসতিস্থাপনকারীদের মধ্যে অন্যতম। গ্রিনিচ পার্কে আবিষ্কৃত ফ্ল্যামস্টিড হাউসের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি সমাধিস্তূপ তাম্র যুগে (Bronze Age) নির্মাণ করা হয়েছিল যা ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে কবর হিসেবে এ স্যাক্সন জাতিগোষ্ঠী দ্বারা পুনঃব্যবহৃত হয়। গ্রিনিচের পূর্বদিকে অবস্থিত ভ্যানবার্গ ও মেজ-হিল-গেটসের এলাকাটিতে এক সময় একটি রোমান ভিলা বা রোমান মন্দির অবস্থিত ছিল। ১৯০২ সালে এটি খুঁড়ে ৩০০টি মুদ্রা পাওয়া যায় যেগুলো ৫ম শতকে ক্লোডিয়াস ও অনারিয়াস সম্রাটের আমলে তৈরী। ১৯৯৯ সালে চ্যানেল ভি নামের একটি বৃটিশ টিভি চ্যানেলে প্রচারিত টিম টাইম নামের একটি প্রোগ্রামে এই মন্দির্টি আবারো খনন করা হয় এবং একই সংস্থা ২০০৩ সালে এটি নিয়ে বেশ কিছু গবেষণাও চালিয়েছিল। বর্তমানে লোহার রেলিং দ্বারা সংরক্ষিত লাল বর্ণের মোজাইক করা একটি পাঁকা রাস্তা এই মন্দিরটিকে চিহ্নিত করা যায়।
একটি প্রাচীন রোমান রাস্তা লন্ডন থেকে বেরিয়ে ডোভার হয়ে ওয়াটলিং স্ট্রিটের মধ্য দিয়ে ব্ল্যাকহেথ পেরিয়ে দক্ষিণ গ্রিনিচে এসে শেষ হয়েছে। এ রাস্তাটি একটি প্রাচীন কেল্টিক রুটের অস্তিত্ব নিশ্চিত করে যা ক্যান্টারবিউরি থেকে সেইন্ট অ্যালবান্স পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। এই রুটটি অর্থাৎ এই রাস্তাটি থেকে গ্রিনিচে একসময়ে ইন্দো-ইউরোপীয়ান জাতিগোষ্ঠী 'কেল্ট' জাতির আগমনের নমুনা পাওয়া যায়। এরপর ইংল্যান্ডের রাজা হেনরি ভি-এর রাজত্বকালের শেষের দিকে অর্থাৎ ১৪ শতকের শুরুর দিকে গ্রিনিচ একটি জেলে শহরে পরিণত হয় এবং এখান থেকেই সমুদ্র ও নদী সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের জন্য গ্রিনিচ খ্যাতি লাভ করতে শুরু করে।
৮ম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিখ্যাত একটি জাতির নাম ভাইকিং যারা দক্ষিণ স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আগত এবং সমগ্র ইউরোপ থেকে শুরু করে পশ্চিমের আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড,ভিনল্যান্ড পর্যন্ত এরা জলদস্যুতা, লুটতরাজ ও কিছু কিছু সময় ব্যবসা-বাণিজ্য চালনা করতো। সামরিক শাসনামলে কেন্ট প্রদেশের পাহাড়ী অঞ্চলে এই ভাইকিং বাহিনীর বিশাল শিবির স্থাপিত হয় এবং এ বাহিনী এক সময় কেন্ট আক্রমণ করে। ১০১২ সালে তারা কান্টারবেরি শহর দখল করে এবং অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতের কান্টারবেরির একজন বিখ্যাত বিশপ আলফেজকে বন্দি করে নিয়ে যায় যাকে গ্রিনিচের সেনাশিবিরে প্রায় সাত মাস ধরে বন্দি করে রাখা হয় (সে সময় গ্রিনিচ কেন্ট প্রদেশের অংশ ছিল)। আলফেজের কাছ থেকে তারা মুক্তিপণ হিসেবে ৩,০০০ রূপা দাবি করে কিন্তু আলফেজ তা দিতে রাজি হন নি। ফলে ইস্টার সানডের যে আটদিন ব্যাপী ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় তাদের মধ্যে একটি শনিবারে মৃত্যুদন্ড হিসেবে আলফেজের গায়ে তারা পশুর হাঁড় ও মাথা নিক্ষেপ করতে শুরু করে, এক পর্যায়ে কুঁড়ালে গাঁথা এরকম একটি হাঁড় তার মাথার খুলি ফুটো করে ঢুকে যায় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করার পরও শেষ হাঁড়টি তার রক্তে না ভেজা পর্যন্ত তারা তাকে আঘাত করে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর আলফেজকে সেইন্ট উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং ১২ শতকে প্যারিশ চার্চ তার নামে উৎসর্গ করা হয়। হক্সমুরের নকশায় সেইন্ট আলফেজ চার্চটি গ্রিনিচের টাউন সেন্টারের পশ্চিমে ১৭১৪ সালে নির্মাণ করা শুরু হয় যা ১৭১৮ সালে সম্পন্ন হয়। এছাড়াও কয়েকটি ড্যানিশ শিবিরেরও কিছু চিহ্ন ব্ল্যাকহেথের সীমানার নিকটবর্তী ইস্টকম্ব ও ওয়েস্টকম্ব এলাকায় পাওয়া যায় (ব্ল্যাকহেথ গ্রিনিচের রয়্যাল পৌরসভার সীমান্তে অবস্থিত)।
৫ম বা ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যকালে উত্তর জার্মানিতে বিদ্যমান একটি জাতির নাম ছিল নর্স যাদের একটি অংশ ভাইকিংদের সাথে মিলিত হয়ে নরম্যান নামের আরেকটি জাতিসত্ত্বা তৈরী করে। ডুমসডে বইয়ের একটি বর্ণনায় বলা আছে ১০৮২ সালে বেয়াক্সের বিশপ ওডো-এর এলাকায় এই জাতি আক্রমণ করে নিজেদের শাসন স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় কেন্ট প্রদেশের হানড্রেড (এক ধরনের প্রশাসনিক বিভাগকে হানড্রেড বলা হয় যা অনেক দেশেই ঔপনিবেশিক বিভাগ হিসেবে প্রচলিত) বিভাগটি ব্ল্যাকহেথ হানড্রেডে পরিণত হয়ে যায় কারণ ১২ শতকে হানড্রেড আদালতটি এখানে স্থানান্তর করে দেয়া হয়। ইংল্যান্ডের রাজা এডয়ার্ড লংশ্যাংক্স (এডয়ার্ড ১ম বা Edward 1 অর্থাৎ এডওয়ার্ড পরিবারের ১ম বংশধর) -এর আমলের শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৩০০ সালের কিছু আগে থেকে ব্ল্যাকহেথে এলথাম প্রাসাদ নামের একটি রাজকীয় প্রাসাদ অবস্থিত ছিল যেখানে প্রায়শই অতিথিদের আমন্ত্রণ করা হতো এবং তাদের জন্য এলাকার ভেতর শিকারেরও ব্যবস্থা ছিল, প্রাসাদটি এখনও এখানে বিদ্যমান।
প্লান্টাজেনেট বংশের রাজাদের আধিপত্যও গ্রিনিচে বিদ্যমান। হেনরি ৪র্থ তার শপথবাক্য গ্রিনিচে পাঠ করেছিলেন, হেনরি ৫ম ইংলিশ মিলিটারি কমান্ডার থমাস বিউফোর্টকে গ্রিনিচের ম্যানোর প্রদান করেছিলেন। হেনরি ৫মের সৎভাই, বৃটিশ রাজকুমার, সৈনিক ও সাহিত্যিক হাম্প্রে ১৪৪৩ সালে গ্রিনিচ প্রাসাদ তৈরী করে, যা হাম্প্রের মৃত্যুর পর হেনরি ৬ষ্ঠ প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদ (Palace of Placentia) নামে নামকরণ করেন। এডয়ার্ড ৪র্থ এটিকে আরো বড় করে পুনঃনির্মাণ করেন এবং ১৪৬৬ সালে এ প্রাসাদটি রাণী এলিজাবেথকে প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে এই প্রাসাদটি চার্লস ২য়-এর রয়্যাল পর্যবেক্ষণাগার হিসেবে নির্বাচন করা হয় এবং এই প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদই হলো বিশ্ববিখ্যাত গ্রিনিচ মানমন্দির যার উপর দিয়ে পৃথিবীর মূল মধ্যরেখা অতিক্রম করেছে।
হেনরি ৭ম থেকে টিউডর রাজবংশের যাত্রা শুরু হয়। প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদটি মূলত হেনরি ৭মের বাসস্থান ছিল এবং এখানেই তার ছেলে হেনরি ৮ম ও এডমন্ড টিউডরের জন্ম হয় ও সেইন্ট আলফেজের চার্চে তাদের খ্রিষ্টধর্মের শিক্ষালাভ সম্পন্ন হয়। হেনরি গ্রিনিচ প্রাসাদকে এলথাম প্রাসাদ হতে বেশি পছন্দ করতেন এবং ১৫৩০ সালে হোয়াইট-হল প্রাসাদ তৈরী হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত লন্ডনে তার প্রধান সিংহাসন ছিল প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদ। হেনরি ইংল্যান্ডের দুই রাণী 'ক্যাথারিন অফ অ্যারাগন' ও 'অ্যান অফ ক্লিভস' -কে গ্রিনিচেই বিয়ে করেন এবং তার দুই কন্যা এলিজাবেথ ১ম ও ম্যারী ১ম -এর জন্মস্থানও গ্রিনিচ। তার ছেলে এডওয়ার্ড ৪র্থ মাত্র ১৫ বছর বয়সে এই গ্রিনিচেই মৃত্যুবরণ করে। এলিজাবেথ ১ম ও ম্যারী ১ম, এই দুই বোনই তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে এই প্রাসাদটিকে ব্যবহার করেছিলেন। ১৫৮৮ সালে ১৩০ টি স্প্যানিশ জাহাজ বিপুল পরিমাণ সেনাবাহিনী নিয়ে ইংল্যান্ড আক্রমণ করতে যাত্রা করেছিল যাদের একত্রে স্প্যানিশ আর্মাডা নামে অভিহিত করা হয়। এদেরকে প্রতিহত করার জন্য এলিজাবেথ ১ম -এর পরিষদ 'স্প্যানিশ আর্মাডা' নামের একটি ক্যাম্পেইন আয়োজন করে যা প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদে সংগঠিত হয়। এলিজেবেথ ১ম ও ম্যারী ১ম -এর একটি প্রিয় বেড়ানোর জায়গা ছিল এই প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদ যেখানে তারা প্রতিবছর গ্রীষ্মের সময় কিছুদিনের জন্যে বেড়াতে আসতে ভালোবাসতেন।
টিউডরদের পরে গ্রিনিচে স্থাপিত হয় স্কটল্যান্ড ও বৃটেনের প্রসিদ্ধ রাজবংশ স্টূুয়ার্টদের আমল। গ্রিনিচ প্রাসাদের চূড়ান্ত নির্মাণকার্য সম্পন্ন করেন জেমস ১ম এবং গ্রিনিচের ম্যানোর তার স্ত্রী 'রানী অ্যান অফ ডেনমার্ক' -কে প্রদান করেন। গ্রিনিচের একটি প্রাচীন রয়্যাল রেসিডেন্সের নাম 'কুইন্স হাউস (Queen's House)' এবং অনেক রাজবংশের পরিবার বিভিন্ন সময়ে বেড়াতে এসে বা প্রাশাসনিক কাজে গ্রিনিচে এসে এই কুইন্স হাউসে থাকতেন। কুইন্স হাউসের ভেতরে একটি ভীষণ সুন্দর ও বিরাট প্যাঁচানো সিঁড়ি রয়েছে যা এর নির্মাণকার্যের জন্য অতি বিখ্যাত। রাণী অ্যান গ্রিনিচ প্রাসাদে এই কুইন্স হাউস একটি অতিরিক্ত অতিথিঘর হিসেবে স্থাপন করেছিলেন যেটি প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদের সর্বশেষ সংস্করণ ছিল এবং রেনেঁসা যুগের প্রথমদিকে স্থাপত্যশৈলীতে বৃটেনের সর্বপ্রথম বিখ্যাত ব্যক্তি ইনিগো জোন্স দ্বারা এর নকশা ও নির্মাণকার্য শুরু করা হয়। এরপর চার্লস ১ম,তার স্ত্রী রাণী হ্যানরিয়েটা মারিয়াকে গ্রিনিচের ম্যানোর প্রদান করে এবং এ রাণীর আমলেই ইনিগো জোন্স গ্রিনিচ প্রাসাদের কুইন্স হাউস নির্মাণকার্য সম্পন্ন করেন। বৃটিশ গৃহযুদ্ধের সময় এ প্রাসাদটিতে একটি বিস্কুট তৈরীর কারখানা চালু হয় ও একই সাথে প্রাসাদটিকে যুদ্ধকালীন বন্দিশিবির হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এ সময় রাজা চার্লস ১ম-কে গণসম্মুখে শিরচ্ছেদের (শরীর থেকে মাথা কেটে আলাদা করে ফেলা) মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। ১৬৬০ সালে তার ছেলে চার্লস ২য়-এর আগমন ঘটে এবং এর মাধ্যমেই স্টূুয়ার্ট রাজবংশের শাসনের পুনরুদ্ধার ঘটতে শুরু করে। এই সময়টিকে 'ইন্টেরেগনাম' বা বিরতিকাল বলা হয়। ইন্টেরেগনাম সময়কালে প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদ এবং এর পার্কটিকে একত্রে এই এলাকার বিভাগীয় প্রধানের ম্যানসনে পরিণত করা হয়।
স্টূুয়ার্ট শাসনের পুনরুদ্ধারের সময়কালকে 'রেস্টোরেশন' বলে অভিহিত করা হয়। এ সময়ে প্লাসেন্টিয়া প্রাসাদটির ব্যবহার থেমে যায় এবং পর্যায়ক্রমে এটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। চার্লস ২য়-এর জন্য নতুন নতুন প্রাসাদ নির্মাণ করা শুরু হয়। এদের মধ্যে একমাত্র 'কিং চার্লস ব্লক' সম্পন্ন করা হয়েছিল, বাকিগুলোর কোনটিই করা হয়নি। রাজা চার্লস ২য়, গ্রিনিচ পার্কের নতুন নকশা তৈরী ও পুনঃনির্মাণ সম্পাদন করেন। এছাড়াও তিনি গ্রিনিচের রয়্যাল অবসার্ভেটোরি (রাজবংশীয় ব্যক্তিত্বদের জন্য গঠিত একটি মানমন্দির) নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা করেন। ইংল্যান্ডের রাজা জেমস ২য় যিনি একইসাথে স্কটল্যান্ডেরও রাজা ছিলেন ও স্কটল্যান্ডে তাকে জেমস ৭ম বলে অভিহিত করা হতো, সর্বপ্রথম গ্রিনিচে একটি রয়্যাল নেভাল হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব দেন, নাবিকদের জন্য আলাদাভাবে তৈরী একটি বিশেষ হাসপাতাল। তার মেয়ে ম্যারী ২য় দ্বারা এটি স্থাপিত হয়। ম্যারী ২য়-এর স্বামী ও রাজা উইলিয়াম ৩য়-এর তত্ত্বাবধানে ১৬৯৬ সালে এর নির্মাণকার্য শুরু হয় এবং বৃটিশ স্থপতি নিকোলাস হক্সমুরের তত্ত্বাবধানে এই নির্মাণকার্য সম্পন্ন হয়। রয়্যাল নেভেল হসপিটাল বর্তমানে প্রাচীন রয়্যাল নেভাল কলেজ (Old Royal Naval College) নামে সুপরিচিত।
জার্মানির হ্যানোভার শহর থেকে গ্রেট বৃটেন ও আয়ারল্যান্ডের রাজা জর্জ ১ম, ১৭১৪ সালে গ্রিনিচে আগমন করেন। তার মাধ্যমেই হ্যানোভারিয়ান রাজবংশের সময়কাল শুরু হয়, শুধুমাত্র গ্রিনিচে নয়, বরং হ্যানোভারিয়ান নামক রাজবংশের স্থপতি হলেন এই রাজা জর্জ ১ম। ১৭১৫ সালে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে স্টূুয়ার্ট রাজবংশের শাসন পুনঃস্থাপিত করার জন্য জেমস ফ্রান্সিস এডয়ার্ড স্টূুয়ার্ট দ্বারা বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ শুরু হয়। এ সময়ে জর্জ ১ম-এর উত্তরসূ্রি জর্জ ২য়, যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত এলাকাগুলো জন্য রয়্যাল নেভাল হসপিটালটি উম্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। জর্জ ৩য় ১৮০৫ সালে গ্রিনিচ কুইন্স হাউসকে অনাথ-এতিমদের জন্য স্থাপিত স্কুল 'রয়্যাল নেভাল অ্যাসাইলাম'-এর কাছে প্রদান করেন। এই স্কুলটি ১৮২১-১৮২৫ সালের মধ্যে গ্রিনিচ হসপিটাল স্কুল (একটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল)-এর সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। এই সম্পূর্ণ ভবনটিকে ১৮৯২ সালে রাণী ভিক্টোরিয়া 'রয়্যাল হসপিটাল স্কুল' নামে নামকরণ করেন এবং এটিতে নতুন রুম স্থাপনসহ আরো কিছু সংস্করণ করা হয়। বর্তমানযুগে এটি একটি যাদুঘরে পরিণত হয়েছে এবং জাতীয় ম্যারীটাইম যাদুঘর নামে এটি পরিচিত। জর্জ ৪র্থ এটিতে একটি চিত্র গ্যালারীর জন্য প্রায় ৪০টি চিত্রকর্ম দান করেছিলেন, উইলিয়াম ৪র্থ ও রাণী অ্যাডেলেইডও এই গ্যালারীতে অনেককিছু প্রদান করেছেন ও প্রায়ই এটি দেখতে আসতেন। রাণী 'ম্যারী অফ টেক' বা রাণী ম্যারীও এখানে অনেক ঐতিহাসিক সংগ্রহ প্রদান করেছিলেন। রাজা জর্জ ৬ষ্ঠ এখানে ফাউন্ডেশন স্টোন নামের একটি পাথরের তৈরী ফলক স্থাপন করেন।
রাণী ভিক্টোরিয়া কদাচিৎ অর্থাৎ খুব কমই গ্রিনিচ পরিদর্শন করতে এসেছিলেন। ১৮৩৮ সালে লন্ডনের সর্বপ্রথম যাত্রীবাহী বাষ্পচালিত ট্রেন চালু হয় এবং এর রেলওয়ে লন্ডন থেকে গ্রিনিচ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল যেটি লন্ডন অ্যান্ড গ্রিনিচ রেলওয়ে নামে পরিচিত। গ্রিনিচ স্টেশনটি অ্যাশবার্নহাম ট্রায়াঙ্গেল নামের একটি সংরক্ষিত আবাসিক এলাকার উত্তরে অবস্থিত, এই আবাসিক এলাকাটি অ্যাশবার্নহাম পদবি বিশিষ্ট একটি পরিবারের মাধ্যমে গঠিত হয় ১৮৩০ থেকে ১৮৭০ সালে। রেলওয়েটির শেষপ্রান্তের বিপরীতদিকে ১৮৬৪ সালে সেফটন পেরি একটি ১,০০০ সিটের মুভি থিয়েটার নির্মাণ করেন, নাম- নিউ গ্রিনিচ থিয়েটার। ১৯৩৭ সালে এ থিয়েটারটিকে ভেঙ্গে ফেলে সেখানে একটি টাউন হল স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে এর স্থানে কয়েকটি বড় বড় ভবন তৈরী হয় বর্তমানে যাদেরকে একত্রে 'মেরিডিয়ান হাউস' নামে অভিহিত করা হয়। গ্রিনিচ থিয়েটারটি ভিক্টোরিয়ান মিউজিক হলের ভেতর পুনঃনির্মাণ করা হয়। তবে এই মিউজিক হলটিও পুনঃনির্মিত হয় ১৮৭১ সালে চার্লস ক্রাউডারের মাধ্যমে যা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে নানা ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে।
১৯৭৭ সালে রাণী এলিজাবেথ ২য়-এর রাজত্বের ২৫তম বর্ষপূর্তিতে তিনি গ্রিনিচে আমন্ত্রিত হন এবং গ্রিনিচের একটি জাহাজে এ বর্ষপূর্তিতে আয়োজিত একটি নাট্যাভিনয় তাকে প্রদর্শন করা হয়। এছাড়াও প্রাচীন রয়্যাল নেভাল কলেজের ১৫০তম বর্ষপূর্তিতে তিনি এসেছিলেন। তার রাজত্বের ৬০তম বর্ষপূর্তিতে গ্রিনিচ পৌরসভাকে লন্ডনের প্রধান পৌরসভার একটিতে পরিণত করা হয় এবং গ্রিনিচ এই প্রধান পৌরসভাগুলোর মধ্যে ৪র্থ।
৭১
১৪৫ মন্তব্য