প্রভাষক
২৫ জুন, ২০২২ ০৬:২১ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
মানুষের জীবন চলার পথে পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ইতিবাচক ও কল্যাণকর রূপে ব্যবহারের পরিশীলিত সুবিন্যস্ত জ্ঞানই হলো বিজ্ঞান। আল কুরআন শ্রেষ্ঠতম মহাবিজ্ঞান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারিমে বলেন- يس - وَالْقُرْآَنِ الْحَكِيمِ ‘শপথ বিজ্ঞানময় কুরআনের।’ (৩৬:২)। ইসলামী বিশ্বাসের মূল উৎস হচ্ছে, কুরআন। মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে,এটা আল্লাহ পক্ষ থেকে এসেছে এবং তা গোটা মানব জাতির জন্য হেদায়েত। কুরআন যেহেতু সকল যুগের জন্য, তাই তা সকল যুগের জন্যই সামঞ্জস্যপূর্ণ্য। আল্লাহ পাক সমগ্র বিশ্ব জগতের সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক। তিনি মানুষকে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা করার তাকীদ প্রদান করেছেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ
পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মরিস বুকাইলী, যিনি গভীর অধ্যয়নের ফলস্বরূপ ‘বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান’ নামক একটি বই লিখেছেন। এ বইয়ে তিনি প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক বিষয়ে প্রাপ্ত বাইবেল ও কুরআনের বক্তব্য তুলনা করেছেন। বিচার-বিশ্লেষণের পরে তাঁর সিদ্ধান্ত হচ্ছে:
“পূর্ববর্তী দুটি ঐশীবাণী অর্থাৎ তাওরাত ও ইঞ্জিলের পর কুরআন অবতীর্ণ হয়। কুরআনের বাণীসমূহ যে শুধুমাত্র স্ববিরোধিতা থেকেই মুক্ত তা নয়, বাইবেলের মত এতে মানুষের কোন হস্তক্ষেপের প্রমাণ নেই। কেউ যদি নিরপেক্ষভাবে এবং বৈজ্ঞানিক বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর বক্তব্যসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে চায়, তাহলে দেখতে পাবে যে, তা আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।” সূরা আল-ইমরান: ১২।
আধুনিক বিজ্ঞানের গতি মুলত সঞ্চারিত করে যান মুসলিম বিজ্ঞানীরাই। বিজ্ঞান চর্চার জন্য বাগদাদে আব্বাসী খলিফা মামুনুর রশীদ ‘বায়তুল হিকমাহ’ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিজ্ঞানের অনেক শাখারই জনক মুসলিম বিজ্ঞানীরা। জ্যোতির্বিজ্ঞানী আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ আল নিহাওয়ান্দী আজো শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি গোলকের মন্ডল, গ্রহ-নক্ষত্রের গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ে অবদান রেখেছেন। আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ আন নিহাওয়ান্দী জ্যোতিষ্ক মন্ডল নিরীক্ষণ করে আল-মুস্তামান নামে নিখুঁত ছক বানান।
বিজ্ঞানী আবুল হাসান দুরবীক্ষণ যন্ত্রের উদ্ভাবক এবং পেন্ডুলামের দোলনের সাহায্যে সময়ের পরিমাণ স্থির করে ঘড়ির উদ্ভাবন করেন মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে ইউসুফ।
এলজ্যাবরা, ত্রিকোণমিতিসহ কেমিষ্ট্রি (আল-কিমিয়া), শল্য বিদ্যা, বায়ুর গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ক যন্ত্র ইত্যাদি সবকিছুই মুসলিম বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন। এছাড়াও অন্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে জাবির ইবনে হাইয়ান-যিনি রসায়ন বিজ্ঞানের জনক হিসেবে পরিচিত, ওমর খৈয়াম, ইবনে সীনা, আবু যায়দ আল আনসারী, আল-খাওয়ারিজমী, ইবনে বাজ্জা, হুনায়ন ইবনে ইসহাক, বাত্তানী, ওমর ইবনুল ওয়ারদী, ইবনে আওয়াম, কাযবীনী, আবু মা’শার প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
মুসলিম বিজ্ঞানীদের তালিকা যত বিশাল তাদের অবদানের তালিকা আরো বিশাল, আর এটা ইসলামে বিজ্ঞান চর্চার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপের ফলেই সম্ভব হয়েছে। পবিত্র কুরআন মাজিদে সুরা আল-মুলক এর ৩ ও ৪ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا مَّا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِن تَفَاوُتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِن فُطُورٍ(3) ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِئاً وَهُوَ حَسِيرٌ (4)
আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা সমর্থিত বক্তব্যের উদাহরণ :
ভ্রূণসৃষ্টি ও এর বিকাশ সম্পর্কিত যথাযথ বর্ণনা: নবী মুহাম্মাদের সময়ে এ সম্পর্কে বিরাজমান তত্ত্বের ভিতরে এরিস্টটলের এই ধারণা অন্তর্ভুক্ত ছিলো যে একটি শিশু রক্তের জমাট বাঁধা অবস্থা থেকে সৃষ্ট, যেভাবে পনীর তৈরী হয়।
আঠারশ শতাব্দীতে হার্টসিকার দাবী করেন যে, তিনি আদি মাইক্রোস্কোপ-এর সাহায্যে স্পার্ম এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে গঠিত মানুষ দেখতে পেয়েছেন। কুরআন এসব কিছুই বলছে না, বরং মানবের ভ্রূণাবস্থার বিকাশের বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছে: এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, (আল মু’মিনুন, ২৩, ১২-১৬)
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ سُلَالَةٍ مِنْ طِينٍ (12) ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَكِينٍ (13) ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنْشَأْنَاهُ خَلْقًا آَخَرَ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ (14) ثُمَّ إِنَّكُمْ بَعْدَ ذَلِكَ لَمَيِّتُونَ (15) ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ (16)
নবী (সঃ) আরো ব্যাখ্যা করেন যে “নুতফা” পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাণু উভয়টিকেই বোঝায়। “আলাকা” শব্দটির তিনটি অর্থ আছে আরবীতে: (১) আঁকড়ে থাকা বস্তু, (২) জমাট রক্তবিন্দু, (৩) জোঁকের মত বস্তু। তিনটি অর্থই বিকাশমান ভ্রূণের প্রথম ধাপকে সঠিকভাবে বর্ণনা করে। নিষিক্ত ডিম্বাণু এমন হয় যে তা জরায়ূর দেওয়াল আঁকড়ে ধরে রাখে। তারপর আকার ও আচরণের দিক থেকে সেটা জোঁকের সাদৃশ্য অবলম্বন করে। জোঁক এবং ভ্রূণ উভয়েই রক্ত শোষণ করে। এটা জমাট রক্তবিন্দুর মতও হয়ে থাকে। পরবর্তী স্তরে এটা চিবানো-বস্তুর মত হয় দেখতে, এটাও সঠিক। এটাও সত্যি যে পেশী ও মাংসের পূর্বে অস্থি তৈরী হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মাতৃগর্ভে মানব শিশু জন্মের স্তর সম্পর্কে এভাবে বলেছেন,
إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ، ثُمَّ يَبْعَثُ اللَّهُ مَلَكًا، فَيُؤْمَرُ بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ، وَيُقَالُ لَهُ اكْتُبْ عَمَلَهُ وَرِزْقَهُ وَأَجَلَهُ وَشَقِيٌّ أَوْ سَعِيدٌ. ثُمَّ يُنْفَخُ فِيهِ الرُّوحُ، فَإِنَّ الرَّجُلَ مِنْكُمْ لَيَعْمَلُ حَتَّى مَا يَكُونُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجَنَّةِ إِلاَّ ذِرَاعٌ، فَيَسْبِقُ عَلَيْهِ كِتَابُهُ، فَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ النَّارِ، وَيَعْمَلُ حَتَّى مَا يَكُونُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ إِلاَّ ذِرَاعٌ، فَيَسْبِقُ عَلَيْهِ الْكِتَابُ، فَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ الْجَنَّةِ ".
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, নিশ্চই তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপকরণ নিজ নিজ মাতৃগর্ভে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, এরপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। অনুরূপভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। এরপর তা গোশতপিন্ডে পরিণত হয়ে (আগের ন্যায় চল্লিশ দিন) থাকে। এরপর আল্লাহ একজন ফিরিশতা প্রেরণ করেন। আর তাঁকে চারটি বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়। তাঁকে (ফিরিশতাকে) লিপিবদ্ধ করতে বলা হয়, তার আমল, তার রিযক, তার জীবনকাল এবং সে কি পাপী হবে না পূণ্যবান হবে। এরপর তার মধ্যে আত্মা ফুকে দেওয়া হয়। কাজেই তোমাদের কোন ব্যাক্তি আমল করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তার এবং জাহান্নামের মাঝে মাত্র একহাত ব্যবধান থাকে, এমন সময় তার আমলনামা তার উপর অগ্রগামী হয়। ফলে সে জান্নাতবাসীর মত আমল করে।
এই যথাযথ তথ্য বর্ণিত দিকগুলির বিকাশের সঠিক সময় জানাচ্ছে এবং ভ্রূণের লিঙ্গ ঠিক বিয়াল্লিশ দিনের পূর্বে সুনিশ্চিত ভাবে জানা সম্ভব নয়। মাত্র কয়েক দশক পূর্বেও শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের আগে এটা জানা সম্ভব ছিল না।
শীর্ষস্থানীয় ভ্রূণতত্ত্ববিদগণের অন্যতম কিথ মুর, কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনাটমি বিভাগের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, কুরআনের এই সমস্ত বক্তব্য ও সহীহ হাদীসের বক্তব্য সম্পর্কে বলেন, “ এটা আমার কাছে পরিষ্কার যে এসব বক্তব্য নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছ থেকে মুহাম্মাদ (সঃ) এঁর কাছে এসেছে কারণ এই জ্ঞানের প্রায় সবটুকুই অবিষ্কৃত হয়েছে এর বহু শতক পরে। এটা আমার কাছে প্রমাণ করছে যে মুহাম্মাদ নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল।”
কুরআন কোন বিজ্ঞান গ্রন্থ নয়, তবে আল কুরআনে রয়েছে জ্ঞানবিজ্ঞান সব মৌলিক বিষয়। যেমন- জ্যোতিষ শাস্ত্র, বিশ্ব সৃষ্টি ও মহাবিস্ফোরণ (বিগ ব্যাংগ) প্রসঙ্গ, ছায়াপথ সৃষ্টির আগে প্রাথমিক গ্যাস পিণ্ড, পৃথিবীর আকার গোল। আছে পদার্থবিজ্ঞান, পানিবিজ্ঞান, পানিচক্র, বাষ্পে পরিণত হওয়া। আছে ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞান, পাহাড় পর্বতের রহস্য, মহাসাগর, মিষ্টি ও লবণাক্ত পানির বিবরণ এবং রয়েছে উদ্ভিদ বিজ্ঞান। রয়েছে প্রাণিবিজ্ঞান, পাখির উড্ডয়ন, মৌমাছির দক্ষতা, মাকড়সার জাল, পিপিলিকার জীবনধারা ও যোগাযোগ। আছে চিকিৎসাবিজ্ঞান, ওষুধ ও পথ্য। রয়েছে শরীরতত্ত্ব, রক্ত চলাচল, দুগ্ধ ও ভ্রূণতত্ত্ব এবং সাধারণ বিজ্ঞান ও আঙুলের ছাপ ইত্যাদি।
কুরআন বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দিক থেকে বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানব জাতিকে সঠিক পথের দিশা দিতে সক্ষম।
৪
৪ মন্তব্য