Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ জুলাই, ২০২২ ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

বাসা-বাড়িতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহার

বাসা-বাড়িতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহার

হাইড্রোজেন পারক্সাইড (Hydrogen peroxide) একটি রাসায়নিক যৌগ যার রাসায়নিক সূত্র H2O2। এর স্ফুটনাঙ্ক হচ্ছে ১৫০.২C বা ৩০২.৪°F, যা পানির স্ফুটনাংক থেকে প্রায় ৫০°C বা ৯০°F বেশি। এই তাপমাত্রায় উত্তপ্ত হলে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড গলে বিস্ফোরকের সৃষ্টি করে। অর্থাৎ ঘনীভূত হাইড্রোজেন পারক্সাইড, বা "হাই-টেস্ট পারঅক্সাইড (high-test peroxide)" উত্তপ্ত হলে গলে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে। তবে এটি অক্সিডাইজার (oxidizer), ব্লিচিং এজেন্ট (bleaching agent) এবং অ্যান্টিসেপটিক (antiseptic) হিসাবে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এটিতে কম চাপে নিম্ন তাপমাত্রায় নিরাপদ পাতন বা বিশুদ্ধ তরল হিসেবে চিকিৎসাক্ষেত্রে, রোগপ্রতিরোধ বা জীবাণুনাশকসহ প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। সাধারণত পানিতে ৩% থেকে ৬% হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের পাতলা দ্রবণ স্বল্পমাত্রার অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে, ত্বকে ছোটখাটো কাটা, স্ক্র্যাপ ও পোড়া স্থানে সংক্রমণ প্রতিরোধে, নাকের শ্লেষ্মা ও শরীরের মৃত ত্বক অপসারণ করা, মুখের সামান্য জ্বালা উপশম করা, ঘরে নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে কিংবা ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে ব্যবহার বেশ কার্যকর। এই ধরনের গৃহাস্থলীর কয়েকটি কাজে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের ব্যবহার নিচে দেয়া হলো-

 

১. স্যানিটাইজ বিউটি ও ম্যানিকিউর টুলস জীবাণুমুক্ত করা:

রূপপরিচর্চার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত টুইজার বা টিমটা, ম্যানিকিউর বা পেডিকিউর টুলস অর্থাৎ হাত ও নখের যত্নে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি এবং আইল্যাশ কার্লার প্রভৃতি ব্যবহারে শরীরের বিভিন্ন অংশ ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত জিনিসপত্র হাইড্রোজেন পারক্সাইডের মধ্যে চুবিয়ে জীবাণুমুক্ত করা যায়।

 

 

 

২. টুথব্রাশ ও মাউথ গার্ড জীবাণুমুক্ত করা:

টুথব্রাশ, রিটেইনার এবং স্পোর্টস মাউথ গার্ড প্রভৃতি মাঝে মধ্যে হাইড্রোজেন পারক্সাইডে দ্রুত ভিজিয়ে জীবাণুমুক্ত করা যেতে পারে। তবে এগুলো ব্যবহার করার আগে খালি পানি দিয়ে ভালভাবে ধুয়ে নিতে হবে, যেন এসব জিনিসপত্র থেকে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড কখনই মুখে না যায়। মাত্র ৩ শতাংশ ঘনত্বেও, এটি মুখের মধ্যে ফোসকা, বমি এবং পেটে পীড়ার কারণ হতে পারে।

 

 

 

৩. পা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও দূর্গন্ধমুক্ত রাখা:

দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া দ্বারা পায়ে দূর্গন্ধ তৈরি হয়। এক ভাগ হাইড্রোজেন পারক্সাইডের সাথে তিন ভাগ গরম পানিতে মিশিয়ে তাতে পা ভিজিয়ে রাখুন। একই ব্যবস্থা দীর্ঘক্ষণ কেডস বা জুতা পরে থাকার ফলে সৃষ্ট tinea pedis নামক ছত্রাকজনিত রোগ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে এবং এমনকি পায়ের পাতা ও গোড়ালীকে নরম করে।

 

 

৪. বিবর্ণ নখ সাদা করা:

একটি বাটিতে এক ভাগ হাইড্রোজেন পারক্সাইডের সাথে দুই ভাগ বেকিং সোডা মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করা হয়। এটি কিছুটা ফেনা হবে, তবে এটি বন্ধ হয়ে গেলে, বিবর্ণ বা লালচে হয়ে যাওয়া নখের উপরে এবং নিচে পেস্টটি লাগিয়ে দিতে হবে। তিন মিনিটের মতো অপেক্ষা করার পর খালি পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে।

 

 

 

 

 

৫. রান্নাঘরের স্পঞ্জগুলোকে তাজা এবং জীবাণুমুক্ত করা:

রান্নাঘরে ধোয়ামুছার কাজে ব্যবহৃত স্পঞ্জগুলো E.coli, Salmonella প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়ার আশ্রয়স্থল। ৫০ শতাংশ পানি এবং ৫০ শতাংশ হাইড্রোজেন পারক্সাইডের দ্রবণ দিয়ে এসব নিত্যব্যবহৃত জিনিসপত্র প্রতিদিন তাদের জীবাণুমুক্ত করা যেতে পারে।

 

 

 

 

 

৬. কাটিং বোর্ড ব্যাকটেরিয়া মুক্ত রাখা:

প্রতিবার কাঠের বা প্লাস্টিকের কাটিংবোর্ড বা চপিংবোর্ড ব্যবহার করার সময়, সামান্য স্ক্র্যাচ দেখা যায়, যেখানে ব্যাকটেরিয়াকে জমতে পারে। হাইড্রোজেন পারক্সাইডের দ্রবণ বোর্ডের উপর স্প্রে করলে তাদের ব্যবহারে নিরাপদ রাখবে।

 

 

 

 

 

 

৭. রেফ্রিজারেটর স্যানিটাইজ করা:

রেফ্রিজারেটর পরিষ্কার করার পরে এবং বেকিং সোডা দেয়ার আগে, যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড দিয়ে ভিতরে স্প্রে করা যেতে পারে। সঠিক কাজ করার জন্য কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পর খালি পানি দিয়ে মুছে ফেলতে হবে।

 

 

 

 

 


 

 ৮. বিবর্ণ কুকওয়্যার উজ্জ্বল করা:

বেকিং সোডা এবং হাইড্রোজেন পারক্সাইডের একটি পেস্ট মিশ্রিত করে বিবর্ণ সিরামিক-কোটেড কুকওয়্যারের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। এটি দাগ হালকা করতে এবং পৃষ্ঠটি আলতো করে পরিষ্কার করতে সহায়তা করবে।

 

 

 

 

 

 

৯. পুনঃব্যবহারযোগ্য বাজারের ব্যাগ জীবাণুমুক্ত করা:

পুনঃব্যবহারযোগ্য চটের বা কাপড়ের মুদী বা বাজারের ব্যাগ জীবাণুমুক্ত করার জন্য ঘন ঘন ও সঠিকভাবে ধুতে হবে। যদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিষ্কার করার জন্য হাতে পর্যাপ্ত সময় না থাকে, তাহলে সম্ভাব্য ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড দিয়ে দ্রুত অভ্যন্তরীণ স্প্রে করা যেতে পারে।

 

 

 

১০. টাইলসের দাগ পরিষ্কার করা:

বাথরুম এবং রান্নাঘরের তেলচিটকে দাগ পড়ে টাইলস শুধু নোংরাই হয় না, তবে এতে চিতা পড়ে এক ধরনের আস্তরণ হতে পারে। ছত্রাক মেরে ফেলার অন্যতম সেরা উপায় হল হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড। টাইলস ছকছকে করতে করতে, বেকিং সোডা এবং হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের একটি পেস্ট মিশিয়ে টাইলের উপর ছড়িয়ে দিতে হবে। এটি সাবানের ময়লা কাটাতেও সাহায্য করবে। মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করার পর খালি পানি দিয়ে মুছে ফেললে টাইলস উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাবে।

 

 

 

১১. আয়না চকমক রাখা:

আয়নার উপর হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড স্প্রে করে মাইক্রোফাইবার কাপড় দ্বারা পরিষ্কার করলে আয়নার উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পারে ও দেখতে চকচকে হবে।


 

 

১২. সাদা কাপড় ঝকঝকে করা:

কেউ ক্লোরিন ব্লিচ (chlorine bleach) ব্যবহার করতে পছন্দ না করে, তবে ময়লা সাদা কাপড় পরিষ্কারকরণে কিছু হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহার করা যেতে পারে। কাপড় ও পানি দেয়ার  আগে স্বয়ক্রিয় ব্লিচ ডিসপেনসারে (automatic bleach dispenser) বা ওয়াশিং মেশিনে এক কাপ হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড দিয়ে কাপড় পরিষ্কার করলে সাদা কাপড়ের উজ্জ্বলতা ও সাদাভাব বৃদ্ধি পাবে।

 

 

 

১৩. শার্টের ঘামের দাগ দূর করা:

একটি পাত্রে এক কাপের চারভাগের একভাগ হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, এক কাপের চারভাগের একভাগ বেকিং সোডা এবং চারভাগের একভাগ পানি মিশিয়ে একটি নরম-ব্রিস্টেড (soft-bristled) ব্রাশ দ্বারা হালকা করে ঘষে কমপক্ষে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। ৩০ মিনিট পর আবার ব্রাশ দিয়ে ঘষে তারপর যথারীতি খালি পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে শার্টের কলারে ও বগলের নিচের ঘামের দাগ দূর হবে এবং কাপড় জীবাণুমুক্ত হবে।

 

 

 

 

১৪. ছারপোকাসহ ধুলো পরজীবী মারা:

আমরা আমাদের বাড়িতে, বিশেষ করে বেডরুমে কাপড় বা ছামড়াজাতীয় জিনিসপত্রে ছারপোকাসহ বিভিন্ন পরজীবী আশ্রয় নিতে পারে। পরজীবী পোকামাকড় মারার জন্য সোফা বা বিভিন্ন আসবাবপত্রে সমান অংশ হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড এবং পানি দিয়ে একটি স্প্রে করে দিতে হবে। পরিষ্কার কাপড় দিয়ে বিছানা পুনরায় তৈরি করার আগে কিছুক্ষণ সম্পূর্ণ শুকাতে দিলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

 

 

 

 

১৫. খেলনা জীবাণুমুক্ত করা:

বাচ্চাদের ও পোষা প্রাণীদের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের খেলনা জীবাণুমুক্ত করা এবং ব্যাকটেরিয়া মারার জন্য হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড দিয়ে স্প্রে করে কয়েক মিনিট রেখে দেয়ার পর খালি পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে পারেন।


 

১৬. বাগান পরিচর্চা করা:

হাইড্রোজেন পারক্সাইডে থাকা অতিরিক্ত অক্সিজেন অণু মাটি থেকে পুষ্টি শোষণ করার জন্য একটি উদ্ভিদের উৎপাদন ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ৩ শতাংশ হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডকে কক্ষ-তাপমাত্রার ৪গুণ পানির সাথে মিশ্রণ করে ঘরের ভেতরে ও বাহিরের গাছের উপর সরাসরি প্রয়োগ করলে গাছের উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি পাবে।

 

 

 

 

 

১৭. রোগ থেকে গাছপালা রক্ষা করা:

পোকামাকড়, ছত্রাক, এবং গাছের রোগ সহজেই উদ্ভিদ থেকে উদ্ভিদে স্থানান্তরিত হতে পারে। গাছ পরিচর্চার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামাদি যেমন ফিসকার (Fiskars), ছাঁটাই কাঁচি (Pruning Shears) এবং পাত্র প্রভৃতি ব্যবহারের পরে জীবাণুমুক্ত করতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহার বেশ কার্যকর।

 

 

 

 

১৮. রক্তের দাগ মুছা:

ফ্লোর, জামাকাপড়ে কিংবা কাটাজনিত কারণে শরীরের বাহিরের ত্বকে জমে যাওয়া রক্তের দাগ পরিষ্কার করা অনেকক্ষেত্রে কঠিন। অবিকৃত হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড প্রয়োগ করে একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে রক্তের জায়গায় হালকা করে ঘষতে হবে। তবে কোনোভাবেই চোখে বা ত্বকের বড় অংশে প্রয়োগ করা যাবে না।

 

 

 

 

১৯. মার্বেল থেকে দাগ মুছা:

সীলবিহীন মার্বেল টাইলস, মার্বেল টেবিল, কাউন্টার টপ, তাক বা কাটিং বোর্ড প্রভৃতির দাগ মুছার জন্য একটি পেস্টি মিশ্রণে ময়দা ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড একত্রিত করে সরাসরি দাগের উপর প্রয়োগ করা যেতে পারে। পেস্ট এবং আশেপাশের জায়গাটিকে নিরাপদে প্লাস্টিকের মোড়ক দিয়ে কমপক্ষে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ঢেকে রাখতে হবে। তারপর পেস্টটি পরিষ্কার করলে কোনও দাগ অবশিষ্ট থাকবে না। এরপরও হালকা দাগ থাকলে এই প্রক্রিয়াটি পুনরাবৃত্তি করতে পারেন।

 


 

২০. মাউথওয়াশ তৈরি:

হাইড্রোজেন পারক্সাইড দাঁতের স্বাস্থ্যবিধি জন্য বিশেষভাবে কার্যকর। জীবাণু মারতে এটিকে মাউথওয়াশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অর্ধেক পানি ও অর্ধেক হাইড্রোজেন পারক্সাইড দিয়ে পাতলা দ্রবণ তৈরি করে এক মিনিটের জন্য মুখে ঝাঁকিয়ে বা কুলি করে ফেলে দিতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে যেমন মুখের ভেতর না যায়। মুখ পরিষ্কারের পাশাপাশি এটি দাঁতের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করবে। তাছাড়া এটি দ্বারা টুথব্রাশ ও বিভিন্ন ডেন্টাল যন্ত্রপাতি যেমন রিটেনার্স, মাউথ গার্ড প্রভৃতি পরিষ্কার করতে পারেন।

 

 

২১. ফলমূল ও সবজি পরিষ্কার করা:

যেকোনো ফলমূল বা শাকসবজিতে পরিষ্কার করা ও জীবাণুমুক্ত করতে ফলমূল ও শাকসবজির উপর সামান্য খাদ্য-গ্রেড হাইড্রোজেন পারক্সাইড ছিটিয়ে দিয়ে খাওয়ার পূর্বে খালি পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

 

 

 

 

 

 

 

 

২২. টয়লেট পরিষ্কার করা:

টয়লেট পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ভালো কাজ করে। টয়লেটের প্যানে বা কমোটে আধা-কাপ হাইড্রোজেন পারঅক্সাইকে ঢেলে ৩০ মিনিট পর ব্রাশ করে পানি দিয়ে পরিষ্কার করলে কিংবা ফ্লাশ করলে টয়লেট পরিষ্কার, দূর্গন্ধমুক্ত ও জীবাণুমুক্ত হবে।

 

 

 

 

 

 

 

 

[ †jLK: gwbi Avn‡g`, mnKvix Aa¨vcK, Z_¨ I †hvMv‡hvM cÖhyw³, weGGd kvnxb K‡jR XvKv]

 

 

উৎস:

·         https://www.thespruce.com

·         https://bestreviews.com

·         https://www.familyhandyman.com

 

 

মন্তব্য করুন