প্রধান শিক্ষক
২১ জুলাই, ২০২২ ০৯:০৭ পূর্বাহ্ণ
প্রধান শিক্ষক
উত্তর মেরু পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত বিন্দু (৯০o অক্ষাংশ)। এর অন্য নাম সুমেরু বা ভৌগোলিক উত্তর মেরু। সুমেরুর বিপরীতে পৃথিবীর অপর (দক্ষিণতম) প্রান্তে আছে কুমেরু (দক্ষিণ মেরু)। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের যে বিন্দুতে এর ঘূর্ণণ অক্ষ পৃষ্ঠতলের সাথে মিলিত হয় তাকে উত্তর মেরু বলে। উত্তর চৌম্বক মেরুর সাথে একে মিলিয়ে ফেলা ঠিক হবেনা। উত্তর মেরুতে সকল দিক দক্ষিণ দিকে নির্দেশিত হয়।
দক্ষিণ মেরু যেখানে একটি বিশাল মহাদেশের কেন্দ্রভাগে অবস্থিত, সেখানে উত্তর মেরুর অবস্থান আর্কটিক মহাসাগরের মধ্যভাগে। মহাসাগরের এই অংশের জল বছরের অধিকাংশ সময়েই সামুদ্রিক বরফে আবৃত থাকে। এ কারণেই উত্তর মেরুতে কোন স্থায়ী স্টেশন স্থাপন সম্ভব নয় যা দক্ষিণ মেরুতে সম্ভব হয়েছে। অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন (পরবর্তীতে রাশিয়া) এ অঞ্চলে মনুষ্যবাহী কয়েকটি স্থানান্তরযোগ্য স্টেশন স্থাপন করেছিল। এর কয়েকটি আবার উত্তর মেরু বা এর খুব নিকট দিয়ে অতিক্রম করে যেতে সমর্থ হয়েছে। উত্তর মেরুতে সামুদ্রিক গভীরতা ১৩,৪১০ ফুট (৪০৮৭ মিটার)। এই বিন্দু থেকে নিকটতম স্থানটি হচ্ছে কাফেক্লুবেন দ্বীপ। এই দ্বীপটি গ্রিনল্যান্ডের নিকটতম সমুদ্র উপকূল থেকে ৪৪০ মাইল (৭০০ কিলোমিটার) দূরে অবস্থিত। অবশ্য এই বিন্দুর বেশ নিকটে কিছু পাথুরে তীর-ভূমি রয়েছে।
উত্তর মেরুর দিন ও রাত
উত্তর মেরুতে দুইটি মৌসুম--গ্রীষ্মকাল আর শীতকাল। গ্রীষ্মকাল (১৮৭দিন) পুরোটাই দিন আর শীতকাল (১৭৮দিন) পুরোটাই রাত। একারণে উত্তর মেরুতে সুনির্দিষ্ট কোন ঘড়ির সময় নেই এবং পৃথিবীর ন্যায় কোন সময় অঞ্চল নেই। উত্তর মেরুতে কোন জনবসতি নেই। শীতকালে গড় তাপমাত্রা -৩৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্রা ০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এখানকার প্রধান প্রাণী হল মেরু ভাল্লুক আর বরফের নিচে জলে থাকা কিছু মাছ।
অভিযানসমূহ
এভারেস্ট জয়ের চেয়ে উত্তর মেরু জয়ের ইতিহাস কম রোমাঞ্চকর নয়। কিন্তু কে সর্বপ্রথম উত্তরমেরুতে পা দিয়েছেন তা নিয়ে এখনো বিভ্রান্তি আছে। আমেরিকান অভিযাত্রী ফ্রেডেরিক আলবার্ট কুক তার দুজন সহযাত্রী নিয়ে ২১ এপ্রিল ১৯০৮ সর্বপ্রথম উত্তর মেরুতে পা রাখেন বলে দাবী করেন। কিন্তু কুক এ ব্যাপারে সন্তোষজনক প্রমাণ দেখাতে পারেননি বলে তাকে স্বীকৃত দেয়া হয়নি।
তবে উত্তর মেরু জয়ের কৃতিত্ব যাকে দেয়া হয় তিনি হলেন আমেরিকান নেভী ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট পিয়েরি। পিয়েরি দাবী করেন তিনি ১৯০৯ সালের ৬ এপ্রিল সর্বপ্রথম উত্তরমেরুতে পা রাখেন। যদিও তার দাবীও বিতর্কিত। কারণ তার যাত্রাপথের প্রাথমিক পর্যায়ে ৫ জন সহযাত্রী থাকলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে তার সাথে কেউ ছিলনা এবং তিনি যে রুট, সময় ও গতিতে উত্তরমেরু পৌঁছার কথা বলেন তা তার প্রাথমিক সহযাত্রীর বক্তব্যের সাথে মেলেনা।
এভাবে ১৯৮৯ পর্যন্ত রবার্ট পিয়েরিকেই সর্বপ্রথম উত্তরমেরু জয়ী ধরা হয়। কিন্তু ওই সালেই ব্রিটিশ অভিযাত্রী ওয়ালি হার্বার্ট চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ঘোষণা করেন যে পিয়েরি আর তার দলবল আসলে ভুল তথ্য দিয়েছেন এবং তারা প্রকৃতপক্ষে উত্তর মেরু পৌছাননি।
এরপর ২০০৫ সালে পিয়েরিকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেন এবার আরেক ব্রিটিশ অভিযাত্রী টম এভারি। তিনি পিয়েরির বর্ণনা অনুযায়ী রুটে কুকুরবাহী স্লেজে চড়ে যাত্রা শুরু করেন এবং ৩৬দিন ২২ ঘণ্টা পর তিনি উত্তর মেরু পৌছান। এই সময় পিয়েরির বর্ণনাকৃত সময় অপেক্ষা ৫ ঘণ্টা কম। কাজেই এভারি ঘোষণা করেন যে রবার্ট পিয়েরি আধুনিক দিক-নির্দেশনা যন্ত্র ছাড়াই প্রকৃত উত্তরমেরুতে না পৌছাতে পারলেও এর সবচে কাছাঁকাছি গিয়েছিলেন এবং তিনিই প্রথম উত্তর মেরু জয়ী।
১৯৭১ থেকে উত্তর মেরু অঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধির হার পৃথিবীর অনুপাতে তিনগুণ বেশি
রিপাের্ট অনুসারে ১৯৭১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত উত্তর মেরু অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে ৩.১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড় করে উষ্ণতা বেড়েছে, যেখানে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বেড়েছে গড়ে ১ ডিগ্রি করে। ১৯৭১ থেকে ২০১৯-এর মধ্যে উত্তর মেরুর বরফাবৃত অঞ্চল দ্রুত গতিতে গলেছে। বিজ্ঞানীদের পূর্ব অনুমানের থেকে অনেক বেশি গতিতে এই গলে যাওয়াকে বিপজ্জনক বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক রিপাের্টে একথা জানা গেছে।
আর্টিক মনিটরিং অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট প্রােগ্রাম -র সাম্প্রতিক রিপাের্টে এই কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যে রিপাের্ট অনুসারে – পৃথিবীর উষ্ণতা যদি আরও ২ ডিগ্রি বৃদ্ধি পায় তাহলে এই গ্রীষ্মেই ওই বরফ সম্পূর্ণ গলে যেতে পারে। ১৯৭১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বরফ গলেছে প্রায় তিনগুণ বেশি গতিতে।
ওই রিপাের্ট অনুসারে ১৯৭১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত উত্তর মেরু অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে ৩.১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড করে উষ্ণতা বেড়েছে, যেখানে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বেড়েছে গড়ে ১ ডিগ্রি করে। গবেষকদের মতে এই শতাব্দীর শেষে মেরু অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩.৩ ডিগ্রি থেকে ১০ ডিগ্রির মধ্যে থাকবে।
এর আগে গবেষকরা জানিয়েছিলেন, যে হারে মেরু অঞ্চলের উষ্ণতাবৃদ্ধি পাচ্ছে। তাতে আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে মেরু অঞ্চলের পুরাে বরফ গলে যেতে পারে। সেইসময় বলা হয়েছিলাে উত্তর মেরু অঞ্চলের প্রতি দশকে ১৩ শতাংশ করে গলে যাচ্ছে ন্যাশনাল স্নাে অ্যান্ড আইস ডাটা সেন্টারের তথ্য অনুসারে গত এপ্রিল মাসেসবথেকে বেশি বরফ গলেছে ল্যাব্রাডরসাগর এবংসী অফ অখটস্ক-এ। এছাড়াও নােভায় জেমলিয়ার বেরিং সাগর এবং পূর্ব বেরেন্টস সমূত্রেও প্রচুর পরিমাণে বরফ গলেছে।
৭১
১৪৫ মন্তব্য