Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ আগস্ট, ২০২২ ০৬:০৩ অপরাহ্ণ

আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্যঃ আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্যঃ

আরবি ১২ মাসের মধ্যে প্রথম মাসটির নাম হল মুহাররম মাস। ইসলামী শরীয়তে জিলকদ, জিলহজ,  মুহাররম ও রজব এ চারটি মাস হারাম মাস, সম্মানিত মাস নামে পরিচিত।  এসকল মাসে যুদ্ধ, মারামারি, খুন-খারাবি নিষিদ্ধ ছিল। আল্লাহ পাক বলেছেন - يا ايها الذين آمنوا لا تحلوا شعائر الله و لا الشهر الحرام তোমরা আল্লাহর দ্বীনের নিদর্শনসমূহের অসম্মান করোনা এবং হারাম মাসগুলোকে হালাল মনে করো না অর্থাৎ এই মাসগুলোতে যুদ্ধ করাকে বৈধ মনে করো না।

চার মাসের মধ্যে মুহাররম মাসকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে একে شهر الله বা আল্লাহর মাস বলে আখ্যায়িত করেছেন বিশ্বনবী (সাঃ)। এ মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। এ দিনটিতে রোজা রাখার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়াসাল্লাম।

 ইসলাম-পূর্ব শরীয়তে আশুরার রোজা তৎকালীন উম্মতের জন্য ফরজ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর শরীয়তের প্রথমদিকে মুসলমানদের জন্যও ফরজ ছিল আশুরার রোজা। যখন রমযানের রোযা ফরয করা হয়, তখন আশুরার রোজা মুস্তাহাবে পরিণত হয়। তা পালন না করলে কোন গুনাহ হবে না তবে রোযা রাখলে সাওয়াব আছে। রাসূলে পাক (সাঃ) বলেছেনঃ صيام يوم عاشوراء احتسب علي الله ان يكفر السنة التي قبله  আমি আশা করি আশুরার রোজা রাখার কারণে আল্লাহ পাক বান্দার বিগত এক বছরের সগিরা গুনাহ সমূহ মাফ করে দিবেন। তবে আশুরার রোজার সাথে এর আগের দিন রোযা রাখাকে মুস্তাহাব বলেছেন ওলামায়ে কেরাম। কারণ রাসূল (সাঃ) ইন্তেকালের পূর্বে ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি তবে ৯তারিখে ও রোজা রাখব। হাদিস শরীফে এসেছে - عن ابن عباس رض قال حين صام رسول الله صلعم عاشوراء وامر بصيامه قالوا يا رسول الله انه يوم يعظمه اليهود والنصاري فقال رسول الله صلعم لئن بقيت الي قابل لاصومن التاسع .  رواه مسلم

মুসলিম মিল্লাতের ইতিহাসে আশুরার গুরুত্বের অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনা। উম্মতের জন্য এই ঘটনা ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা। রাসূলে পাক (সাঃ) এর ইন্তেকালের মাত্র ৫০ বছর পর হিজরি ৬১ সনের মুহাররম মাসের ১০ তারিখে ইরাকের কারবালা প্রান্তরে নির্মমভাবে শহীদ হন হযরত ইমাম হুসাইন (রঃ)। শাহাদত বরণ করেন তাঁর পরিবারবর্গ সহ অনেক আহলে বাইত।

৪০ হিজরীর রমজান মাসে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর ইন্তেকালের পর হযরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।  গৃহযুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ৬ মাস পর তিনি হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ)এর পক্ষে খিলাফতের দায়িত্ব পরিত্যাগ করেন।  হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) সর্বসম্মতভাবে খলিফা হন। ২০ বছর রাষ্ট্রপরিচালনার পর ৬০ হিজরী সনে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী শাসক হিসেবে মনোনয়ন দেন। পিতার মৃত্যুর পর ইয়াজিদ  খিলাফতের দায়িত্ব দাবী করলে তৎকালীন মুসলিম রাষ্ট্রের অধিকাংশ এলাকার মানুষ ইয়াজিদকে  খলিফা হিসাবে মেনে নেয়। পক্ষান্তরে মদিনার ও ইরাকের মানুষ বিশেষত কুফার মানুষরা ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মানতে অস্বীকার করে। কুফার  লোকেরা হযরত ইমাম হুসাইনকে খলিফা হিসাবে গ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এসময় ইমাম হোসাইন (রাঃ) মদিনায় অবস্থান করছিলেন। কুফার  লক্ষাধিক মানুষ তাকে খলিফা হিসাবে বাইয়াত করে পত্র প্রেরণ করেন। অবশেষে ইমাম হোসাইন (রাঃ) কুফাবাসীদের ডাকে সাড়া দিয়ে কুফা গমনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার পরিবারের সদস্যদের কে নিয়ে কুফায় গমন করেছিলেন। কুফাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ ফেলে ইমাম হোসাইন (রাঃ) মদিনায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইয়াজিদের বাহিনী তাকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করে। ফলে ইমাম হোসাইন (রাঃ) নিজের ও পরিবারের সম্ভ্রম ও অধিকার রক্ষায় যুদ্ধ করে শহীদ হন। 

যদিও অনেকে মনে করেন কারবালার শোকাহত ঘটনার কারণে মুহাররম মাসের বৈশিষ্ট্য আসলে তা ঠিক নয়। পৃথিবীর শুরু থেকেই ১০ ই মুহাররম অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদার অধিকারী।  হযরত আদম (আঃ) হতে শুরু করে হযরত ঈসা (আঃ) পর্যন্ত নবী - রাসূলদের আমলে আশুরার দিনে হাজারো ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তাই মানব ইতিহাসে এই দিনের গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যময়। 

আল্লাহ তাআলা জমিনে তার খিলাফত কায়েমের লক্ষ্যে পৃথিবী সৃষ্টি করেন মুহাররমের ১০ তারিখে। পৃথিবীর প্রথম খলিফা, প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টি ও একই তারিখে। আদম সৃষ্টির রহস্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ واذ قال ربك للملائكة اني جاعل في الارض خليفة ঐ সময়ের কথা স্মরণ করুন যখন আপনার রব ফেরেশতাদের বলেছিলেন আমি জমিনে একজন খলিফা নিয়োগ করতে চাই। 

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জীন -ইনসান ও ফেরেশতাকুল সৃষ্টি করেছেন ইবাদতের জন্য। ইবাদতের পরিবেশ সৃষ্টি এবং ইকামতে দ্বীনের দায়িত্বে সৃষ্টি করেছেন হযরত আদম (আঃ) কে। আদম সৃষ্টির মূল লক্ষ্য খিলাফত। জীন ও ফেরেশতাদের মূল লক্ষ্য বনি আদমের সহযোগিতা। এজন্য আদম সৃষ্টির পর ফেরেশতারা আদম (আঃ) কে সেজদার মাধ্যমে তাদের ইবাদত পূর্ণতা লাভ করে। ইবলিশ অভিশপ্ত হয় সিজদা না করার কারণে।  তার সারা জীবনের ইবাদত বরবাদ হলো। সে ধোঁকা দিলো আদম ও হাওয়াকে। আল্লাহ বলেনঃ قلنا اهبطوا منها جميعا  ও আদম তুমি পৃথিবীতে যাও তোমার স্ত্রী হাওয়া কে নিয়ে।

আদম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ পাঠিয়ে দিলেন শ্রীলংকার একটি পাহাড়ে আর হাওয়া কে পাঠিয়ে দেয়া হলো সৌদি আরবের জিদ্দা শহরে। আদম আলাইহিস সালাম ফিরে আসলেন আসল জায়গায় খিলাফতের স্থানে। পৃথিবীতে তার প্রত্যাবর্তনের তারিখ ছিল মুহাররমের ১০ তারিখ। বছরের পর বছর আদম ও হাওয়া আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন আর তওবা করলেন এই বলে - ربنا ظلمنا انفسنا وان لم تغفرلنا وترحمنا لنكونن من الخاسرين আল্লাহ তায়ালা তাদের তওবা কবুল করলেন মুহাররমের এই১০ তারিখে।  তাহলে বুঝা গেল আদম (আঃ) এর সৃষ্টি, পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন এবং তাওবা কবুল হয়েছিল মহররমের ১০ তারিখে। 

মুহাররমের আরেকটি ঘটনা হলো হযরত নূহ আলাইহিস সাল্লাম তার উম্মতদের নিয়ে মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি লাভ করেন মুহাররমের ১০ তারিখে। হযরত নূহ (আঃ) দীর্ঘ সাড়ে নয়শত বছর তার কাউমের লোকদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউ তার প্রতি ঈমান আনেনি।  তাঁর দা'ওয়াতকে অস্বীকার করল তার সম্প্রদায়ের লোকেরা।  তাকে নানাভাবে কষ্ট দিতে লাগলো।  হাসি-ঠাট্টা, উপহাস করলো তার জাতি। অবশেষে তিনি হতাশ হয়ে হাত তুললেন মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে। দোয়া করলেন - وقال نوح رب لا تذر علي الارض من الكافرين ديارا -  انك ان تذرهم يضلوا عبادك  ولا يلدوا الا فاجرا كفارا অর্থাৎ  হজরত নুহ (আঃ) বললেন, হে আমার রব! কাফিরদের একজনকেও পৃথিবীর উপর জীবিত রেখো না। তাদের একজন কেও যদি জীবিত রাখ তারা তোমার বান্দাদের গোমরাহ করবে, পথ ভ্রষ্ট করবে। আর জন্ম দিবে কেবল গুনাহগার ও কাফির। (নুহঃ ২৬ ও ২৭) আল্লাহ তাআলা নুহ আলাইহিস সালামের দোয়া কবুল করলেন। কাফিরদের ধ্বংস করার জন্য আল্লাহপাক সারা দুনিয়া ব্যাপী এক মহাপ্লাবনের কথা জানিয়ে দিয়ে নুহ (আঃ) কে একটি জাহাজ বানাতে নির্দেশ দিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন - واصنع الفلك باعيننا ووحينا ولا تخاطبني في الذين ظلموا انهم مغرقون অর্থাৎ তুমি আমার তত্ত্বাবধানে এবং আমার ওহি অনুযায়ী জাহাজ নির্মাণ করো। আর যারা সীমা লংঘন করেছে তাদের ব্যাপারে আমাকে কিছু বল না।  তারা ডুবে মরবে। (হুদঃ ৩৭)

সুতরাং নির্দেশ অনুযায়ী হজরত নুহ আলাই সালাম জাহাজ নির্মাণ করে জাহাজে আরোহন করলেন। আল্লাহর হুকুমে তুফান শুরু হলো। সারাদেশ বন্যায় ভেসে গেল। কাফিররা পানিতে ডুবে মারা গেল।  বিজয়ের পতাকা উড়ালেন হজরত নুহ (আঃ) জুদী পাহাড়ের পাদদেশে (তুরস্কে) মুহাররমের ১০ তারিখে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেনঃ وقيل يا ارض ابلعي ماءك ويا سماء اقلعي وغيض الماء وقضي الامر واستوت علي الجودي وقيل بعدا للقوم الظالمين 

এই মাসের আরেকটি ঘটনা হলো হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি লাভ।  হযরত ইব্রাহিম (আঃ) প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে ইসলাম প্রচার করেন।  তার কাওম ছিল মূর্তিপূজারী।  তিনি মূর্তিপূজারীদের পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেন।  মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ واذ قال ابراهيم لابيه آزر اتتخذ اصناما آلهة - اني اراك وقومك في ضلال مبين  হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর কার্যকলাপ দেখে মূর্তিপূজারীরা রেগে গেল।  তখনকার সময়ে বাদশা ছিল নমরুদ।  নমরুদ নিজেকে খোদা বলে দাবি করতো।  মহান আল্লাহর কুদরত নিয়ে নমরুদের সাথে ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর বিতর্ক হল। বিতর্কে ইব্রাহিম (আঃ) নমরুদকে হারিয়ে দিলেন। অবশেষে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে আগুনে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নিল বাদশা নমরুদ। তাকে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হল।  জলন্ত আগুন রূপ নিল ফুল বাগানে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ  قلنا يا نار كوني بردا وسلاما علي ابراهيم  হে আগুন! তুমি শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও ইব্রাহিমের জন্য। আগুনের মধ্যে ইব্রাহিমের (আঃ) ৪০ দিন কেটে গেল । আল্লাহপাকের কুদরতে ইব্রাহিম (আঃ)এর শরীরের একটি পশমও ফুড়লো না। আগুন যখন নিভে শীতল হলো ইব্রাহিম (আঃ) সে অগ্নিকুণ্ড থেকে বের হয়ে আসলেন। ইব্রাহিম (আঃ) এর অগ্নিকুণ্ড থেকে বের হয়ে আসার এই দিনটি একটি স্মরণীয় দিন। এই ঘটনা ঘটেছিল মুহাররমের ১০ তারিখে। 

হযরত মুসা (আঃ) আশুরার দিনে আল্লাহ সাথে কথা বলেছেন এবং আল্লাহর কাছ থেকে তাওরাত কিতাব লাভ করেন। আবার এই আশুরার দিনে মুসা (আঃ) ও বনি ইসরাইল নিরাপদে লোহিত সাগর পার হলেন।  আর ফেরাউন ও তার বাহিনী পানিতে ডুবে ধ্বংস হলো। 

এছাড়া অসংখ্য ঘটনা সংঘটিত হয়েছে আশুরার দিনে।  কেয়ামত ও সংঘটিত হবে এই আশুরার দিনে। 

মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। يريدون ليطفؤا نور الله بافواههم والله متم نوره ولو كره الكافرون  সত্যকে আঁকড়ে ধরা, সত্যের পথে সকল বিপদ অকাতরে মেনে নেওয়াই মুমিনের দায়িত্ব।

আল্লাহ পাক আমাদের প্রত্যেককেই মুহাররম ও আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য বুঝার এবং তার সন্তুষ্টির পথে চলার তৌফিক দান করুন।  আমিন

মন্তব্য করুন

ব্লগ