সহকারী প্রধান শিক্ষক
১৯ আগস্ট, ২০২২ ০৭:৪০ পূর্বাহ্ণ
সহকারী প্রধান শিক্ষক
কাজী নজরুল ইসলামের পাঁচটি প্রেমের কবিতা
-সজিব তুষার
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। কবিতায় যদিও তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবেই পরিচিত। তবে তাঁর প্রেম গুলোও বেশখানিক জায়গা দখল করে আছে কাব্যজগতে।
কোন কবিতায় নাম না জানা 'অনামিকা'র বন্দনায় মশগুল থেকেছেন, কোন কবিতায় বারবার গোপন করেছেন প্রিয়ার পরিচয়। আবার একাএকা থাকা সময় গুলোতে বিড়বিড় করে বলেছেন তোমারে পড়িছে মনে আবার খানিক পরেই অভিযোগ-অনুযোগে দিয়েছেন অভিশাপ আবার দিন শেষে প্রেমিকার মান ভাঙাতে তার রুপ-গুণের বন্দনা করে চুলের গন্ধ নিতে নিতে বলেছেন আমার কবিতা তুমি। তাঁর এমন সাড়া জাগানো পাঁচটি প্রেমের কবিতা নিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের এই ফিচারটি।
(১)
অ-নামিকা
তোমারে বন্দনা করি
স্বপ্ন-সহচরী
লো আমার অনাগত প্রিয়া,
আমার পাওয়ার বুকে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া!
তোমারে বন্দনা করি….
হে আমার মানস-রঙ্গিণী,
অনন্ত-যৌবনা বালা, চিরন্তন বাসনা-সঙ্গিনী!
তোমারে বন্দনা করি….
নাম-নাহি-জানা ওগো আজো-নাহি-আসা!
আমার বন্দনা লহ, লহ ভালবাসা….
গোপণ-চারিণী মোর, লো চির-প্রেয়সী!
সৃষ্টি-দিন হ’তে কাঁদ’ বাসনার অন্তরালে বসি’-
ধরা নাহি দিলে দেহে।
তোমার কল্যাণ-দীপ জ্বলিলে না
দীপ-নেভা বেড়া-দেওয়া গেহে।
অসীমা! এলে না তুমি সীমারেখা-পারে!
স্বপনে পাইয়া তোমা’ স্বপনে হারাই বারে বারে
অরুপা লো! রহি হ’য়ে এলে মনে,
সতী হ’য়ে এলে না ক’ ঘরে।
প্রিয় হ’য়ে এলে প্রেমে,
বধূ হয়ে এলে না অধরে!
দ্রাক্ষা-বুকে রহিলে গোপনে তুমি শিরীন্ শরাব,
পেয়ালায় নাহি এলে!-
‘উতারো নেকার’-
হাঁকে মোর দুরন্ত কামনা!
সুদুরিকা! দূরে থাক’-ভালোবাসা-নিকটে এসো না।
তুমি নহ নিভে যাওয়া আলো, নহ শিখা।
তুমি মরীচিকা,
তুমি জ্যোতি।-
জন্ম-জন্মান্তর ধরি’ লোকে-লোকান্তরে তোমা’ করেছি আরতি,
বারে বারে একই জন্মে শতবার করি!
যেখানে দেখেছি রূপ,-করেছি বন্দনা প্রিয়া তোমারেই স্মরি’।
রূপে রূপে, অপরূপা, খুঁজেছি তোমায়,
পবনের যবনিকা যত তুলি তত বেড়ে যায়!
বিরহের কান্না-ধোওয়া তৃপ্ত হিয়া ভরি’
বারে বারে উদিয়াছ ইন্দ্রধনুসমা,
হাওয়া-পরী
প্রিয় মনোরমা!
ধরিতে গিয়োছি-তুমি মিলায়েছ দূর দিগ্বলয়ে
ব্যথা-দেওয়া রাণী মোর, এলে না ক’ কথা কওয়া হ’য়ে।
চির-দূরে থাকা ওগো চির-নাহি-আসা!
তোমারে দেহের তীরে পাবার দুরাশা
গ্রহ হ’তে গ্রহান্তরে ল’য়ে যায় মোরে!
বাসনার বিপুল আগ্রহে-
জন্ম লভি লোকে-লোকান্তরে!
উদ্বেলিত বুকে মোর অতৃপ্ত যৌবন-ক্ষুধা
উদগ্র কামনা,
জন্ম তাই লভি বারে বারে,
না-পাওয়ার করি আরাধনা!….
যা-কিছু সুন্দর হেরি’ ক’রেছি চুম্বন,
যা-কিছু চুম্বন দিয়া ক’রেছি সুন্দর-
সে-সবার মাঝে যেন তব হরষণ
অনুভব করিয়াছি!-ছুঁয়েছি অধর
তিলোত্তমা, তিলে তিলে!
তোমারে যে করেছি চুম্বন
প্রতি তরুণীর ঠোঁটে
প্রকাশ গোপন।
যে কেহ প্রিয়ারে তার চুম্বিয়াছে ঘুম-ভাঙা রাতে,
রাত্রি-জাগা তন্দ্রা-লাগা ঘুম-পাওয়া প্রাতে,
সকলের সাথে আমি চুমিয়াছি তোমা’
সকলের ঠোঁটে যেন, হে নিখিল-প্রিয়া প্রিয়তমা!
তরু, লতা, পশু, পাখী, সকলের কামনার সাথে
আমার কামনা জাগে,-আমি রমি বিশ্ব-কামনাতে!
বঞ্চিত যাহারা প্রেমে, ভুঞ্জে যারা রতি-
সকলের মাঝে আমি-সকলের প্রেমে মোর গতি!
যে-দিন স্রষ্টার বুকে জেগেছিল আদি সৃষ্টি-কাম,
সেই দিন স্রষ্টা সাথে তুমি এলে, আমি আসিলাম।
আমি কাম, তুমি হ’লে রতি,
তরুণ-তরুণী বুকে নিত্য তাই আমাদের অপরূপ গতি!
কী যে তুমি, কী যে নহ, কত ভাবি-কত দিকে চাই!
নামে নামে, অ-নামিকা, তোমারে কি খুঁজিনু বৃথাই?
বৃথাই বাসিনু ভালো? বৃথা সবে ভালোবাসে মোরে?
তুমি ভেবে যারে বুকে চেপে ধরি সে-ই যায় স’রে।
কেন হেন হয়, হায়, কেন লয় মনে-
যারে ভালো বাসিলাম, তারো চেয়ে ভালো কেহ
বাসিছে গোপনে।
সে বুঝি সুন্দরতর-আরো আরো মধু!
আমারি বধূর বুকে হাসো তুমি হ’য়ে নববধূ।
বুকে যারে পাই, হায়,
তারি বুকে তাহারি শয্যায়
নাহি-পাওয়া হ’য়ে তুমি কাঁদ একাকিনী,
ওগো মোর প্রিয়ার সতিনী।….
বারে বারে পাইলাম-বারে বারে মন যেন কহে-
নহে, এ সে নহে!
কুহেলিকা! কোথা তুমি? দেখা পাব কবে?
জন্মেছিলে জন্মিয়াছ কিম্বা জন্ম লবে?
কথা কও, কও কথা প্রিয়া,
হে আমার যুগে-যুগে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া!
কহিবে না কথা তুমি! আজ মনে হয়,
প্রেম সত্য চিরন্তন, প্রেমের পাত্র সে বুঝি চিরন্তন নয়।
জন্ম যার কামনার বীজে
কামনারই মাঝে সে যে বেড়ে যায় কল্পতরু নিজে।
দিকে দিকে শাখা তার করে অভিযান,
ও যেন শুষিয়া নেবে আকাশের যত বায়ু প্রাণ।
আকাশ ঢেকেছে তার পাখা
কামনার সবুজ বলাকা!
প্রেম সত্য, প্রেম-পাত্র বহু-আগণন,
তাই-চাই, বুকে পাই, তবু কেন কেঁদে ওঠে মন।
মদ সত্য, পাত্র সত্য নয়!
যে-পাত্রে ঢালিয়া খাও সেই নেশা হয়!
চির-সহচরী!
এতদিনে পরিচয় পেনু, মরি মরি!
আমারি প্রেমের মাঝে রয়েছ গোপন,
বৃথা আমি খুঁজে মরি’ জন্মে জন্মে করিনু রোদন।
প্রতি রূপে, অপরূপা, ডাক তুমি,
চিনেছি তোমায়,
যাহারে বাসিব ভালো-সে-ই তুমি,
ধরা দেবে তায়!
প্রেম এক, প্রেমিকা সে বহু,
বহু পাত্রে ঢেলে পি’ব সেই প্রেম-
সে শরাব লোহু।
তোমারে করিব পান, অ-নামিকা, শত কামনায়,
ভৃঙ্গারে, গোলাসে কভু, কভু পেয়ালায়!
(কাব্যগ্রন্থ – সিন্ধু হিন্দোল)
(২)
গোপন প্রিয়া
পাইনি ব’লে আজো তোমায় বাসছি ভালো, রাণি,
মধ্যে সাগর, এ-পার ও-পার করছি কানাকানি!
আমি এ-পার, তুমি ও-পার,
মধ্যে কাঁদে বাধার পাথার
ও-পার হ’তে ছায়া-তরু দাও তুমি হাত্ছানি,
আমি মরু, পাইনে তোমার ছায়ার ছোঁওয়াখানি।
নাম-শোনা দুই বন্ধু মোরা, হয়নি পরিচয়!
আমার বুকে কাঁদছে আশা, তোমার বুকে ভয়!
এই-পারী ঢেউ বাদল-বায়ে
আছড়ে পড়ে তোমার পায়ে,
আমার ঢেউ-এর দোলায় তোমার ক’রলো না কূল ক্ষয়,
কূল ভেঙেছে আমার ধারে-তোমার ধারে নয়!
চেনার বন্ধু, পেলাম না ক’ জানার অবসর।
গানের পাখী ব’সেছিলাম দু’দিন শাখার’ পর।
গান ফুরালো যাব যবে,
গানের কথাই মনে রবে,
পাখী তখন থাকবো না ক’-থাকবে পাখীর স্বর!
উড়ব আমি,-কাঁদবে তুমি ব্যথার বালুচর!
তোমার পারে বাজ্ল কখন আমার পারের ঢেউ,
অজানিতা! কেউ জানে না, জানবে না ক’ কেউ।
উড়তে গিয়ে পাখা হ’তে
একটি পালক প’ড়লে পথে
ভুলে’ প্রিয় তুলে যেন খোঁপায় গুঁজে নেও!
ভয় কি সখি? আপনি তুমি ফেলবে খুলে এ-ও!
বর্ষা-ঝরা এমনি প্রাতে আমার মত কি
ঝুরবে তুমি এক্লা মনে, বনের কেতকী?
মনের মনে নিশীথ্-রাতে
চুম্ দেবে কি কল্পনাতে?
স্বপ্ন দেখে উঠবে জেগে, ভাববে কত কি!
মেঘের সাথে কাঁদবে তুমি, আমার চাতকী!
দূরের প্রিয়া! পাইনি তোমায় তাই এ কাঁদন-রোল!
কূল মেলে না,-তাই দরিয়ায় উঠতেছে ঢেউ-দোল!
তোমায় পেলে থাম্ত বাঁশী,
আস্ত মরণ সর্বনাশী।
পাইনি ক’ তাই ভ’রে আছে আমার বুকের কোল।
বেণুর হিয়া শূন্য ব’লে উঠবে বাঁশীর বোল।
বন্ধু, তুমি হাতের-কাছের সাথের-সাথী নও,
দূরে যত রও এ হিয়ার তত নিকট হও।
থাকবে তুমি ছায়ার সাথে
মায়ার মত চাঁদনী রাতে!
যত গোপন তত মধুর-নাই বা কথা কও!
শয়ন-সাথে রও না তুমি নয়ন-পাতে রও!
ওগো আমার আড়াল-থাকা ওগো স্বপন-চোর!
তুমি আছ আমি আছি এই তো খুশি মোর।
কোথায় আছ কেম্নে রাণি
কাজ কি খোঁজে, নাই বা জানি!
ভালোবাসি এই আনন্দে আপনি আছি ভোর!
চাই না জাগা, থাকুক চোখে এমনি ঘুমের ঘোর!
রাত্রে যখন এক্লা শোব-চাইবে তোমার বুক,
নিবিড়-ঘন হবে যখন একলা থাকার দুখ,
দুখের সুরায় মস্ত্ হ’য়ে
থাকবে এ-প্রাণ তোমায় ল’য়ে,
কল্পনাতে আঁক্ব তোমার চাঁদ-চুয়ানো মুখ!
ঘুমে জাগায় জড়িয়ে র’বে, সেই তো চরম সুখ!
গাইব আমি, দূরের থেকে শুনবে তুমি গান।
থাম্বে আমি-গান গাওয়াবে তোমার অভিমান!
শিল্পী আমি, আমি কবি,
তুমি আমার আঁকা ছবি,
আমার লেখা কাব্য তুমি, আমার রচা গান।
চাইব না ক’, পরান ভ’রে ক’রে যাব দান।
তোমার বুকে স্থান কোথা গো এ দূর-বিরহীর,
কাজ কি জেনে?- তল কেবা পায় অতল জলধির।
গোপন তুমি আস্লে নেমে
কাব্যে আমার, আমার প্রেমে,
এই-সে সুখে থাক্বে বেঁচে, কাজ কি দেখে তীর?
দূরের পাখী-গান গেয়ে যাই, না-ই বাঁধিলাম নীড়!
বিদায় যেদিন নেবো সেদিন নাই-বা পেলাম দান,
মনে আমায় ক’রবে না ক’-সেই তো মনে স্থান!
যে-দিন আমায় ভুলতে গিয়ে
কর্বে মনে, সে-দিন প্রিয়ে
ভোলার মাঝে উঠবে বেঁচে, সেই তো আমার প্রাণ!
নাই বা পেলাম, চেয়ে গেলাম, গেয়ে গেলাম গান!
(কাব্যগ্রন্থ – সিন্ধু হিন্দোল)
(৩)
তোমারে পড়িছে মনে
তোমারে পড়িছে মনে
আজি নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরণে,
যুথিকার অশ্রুসিক্ত ছলছল মুখে
কেতকী-বধূর অবগুন্ঠিত ও বুকে-
তোমারে পড়িছে মনে।
হয়তো তেমনি আজি দূর বাতায়নে
ঝিলিমিলি-তলে
ম্লান লুলিত অঞ্ছলে
চাহিয়া বসিয়া আছ একা,
বারে বারে মুছে যায় আঁখি-জল-লেখা।
বারে বারে নিভে যায় শিয়রেরে বাতি,
তুমি জাগ, জাগে সাথে বরষার রাতি।
সিক্ত-পক্ষ পাখী
তোমার চাঁপার ডালে বসিয়া একাকী
হয়ত তেমনি করি, ডাকিছ সাথীরে,
তুমি চাহি’ আছ শুধু দূর শৈল-শিরে ।।
তোমার আঁখির ঘন নীলাঞ্জন ছায়া
গগনে গগনে আজ ধরিয়াছে কায়া । …
আজি হেথা রচি’ নব নীপ-মালা–
স্মরণ পারের প্রিয়া, একান্তে নিরালা
অকারণে !-জানি আমি জানি
তোমারে পাব না আমি। এই গান এই মালাখানি
রহিবে তাদেরি কন্ঠে- যাহাদেরে কভু
চাহি নাই, কুসুমে কাঁটার মত জড়ায়ে রহিল যারা তবু।
বহে আজি দিশাহারা শ্রাবণের অশান্ত পবন,
তারি মত ছুটে ফেরে দিকে দিকে উচাটন মন,
খুঁজে যায় মোর গীত-সুর
কোথা কোন্ বাতায়নে বসি’ তুমি বিরহ-বিধুর।
তোমার গগনে নেভে বারে বারে বিজলীর দীপ,
আমার অঙ্গনে হেথা বিকশিয়া ঝরে যায় নীপ।
তোমার গগনে ঝরে ধারা অবিরল,
আমার নয়নে হেথা জল নাই, বুকে ব্যথা করে টলমল।
আমার বেদনা আজি রূপ ধরি’ শত গীত-সুরে
নিখিল বিরহী-কন্ঠে–বিরহিণী–তব তরে ঝুরে!
এ-পারে ও-পারে মোরা, নাই নাই কূল!
তুমি দাও আঁখি-জল, আমি দেই ফুল!
(কাব্যগ্রন্থ – চক্রবাক)
(৪)
অভিশাপ
যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে –
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
ছবি আমার বুকে বেঁধে
পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে
ফিরবে মরু কানন গিরি,
সাগর আকাশ বাতাস চিরি’
যেদিন আমায় খুঁজবে –
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
স্বপন ভেঙে নিশুত্ রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে,
কাহার যেন চেনা-ছোওয়ায় উঠবে ও-বুক ছমকে, –
জাগবে হঠাৎ চমকে!
ভাববে বুঝি আমিই এসে
ব’সনু বুকের কোলটি ঘেঁষে,
ধরতে গিয়ে দেখবে যখন
শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!
বেদনাতে চোখ বুজবে –
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিড়ে আসবে যখন কান্না,
ব’লবে সবাই – “সেই যে পথিক, তার শেখানো গান না?”
আসবে ভেঙে কান্না!
প’ড়বে মনে আমার সোহাগ,
কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ!
প’ড়বে মনে অনেক ফাঁকি
অশ্রু-হারা কঠিন আঁখি
ঘন ঘন মুছবে –
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভ’রবে তোমার অঙ্গন,
তুলতে সে-ফুল গাঁথতে মালা কাঁপবে তোমার কঙ্কণ –
কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন!
শিউলি ঢাকা মোর সমাধি
প’ড়বে মনে, উঠবে কাঁদি’!
বুকের মালা ক’রবে জ্বালা
চোখের জলে সেদিন বালা
মুখের হাসি ঘুচবে –
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
(কাব্যগ্রন্থ – বিষের বাঁশি)
(৫)
আমার কবিতা তুমি
প্রিয়া-রূপ ধরে এতদিনে এলে আমার কবিতা তুমি,
আঁখির পলকে মরুভূমি যেন হয়ে গেল বনভূমি!
জুড়াল গো তার শত জনমের রৌদ্রদগ্ধ-কায়া–
এতদিনে পেল তার স্বপনের স্নিগ্ধ মেঘের ছায়া!
চেয়ে দেখো প্রিয়া, তোমার পরশ পেয়ে
গোলাপ দ্রাক্ষাকুঞ্জে মরুর বক্ষ গিয়াছে ছেয়ে!
গভীর নিশীথে, হে মোর মানসী, আমার কল্পলোকে
কবিতার রূপে চুপে চুপে তুমি বিরহ-করুণ চোখে
চাহিয়া থাকিতে মোর মুখ পানে ; আসিয়া হিয়ার মাঝে
বলিতে যেন গো – ‘হে মোর বিরহী, কোথায় বেদনা বাজে?’
আমি ভাবিতাম, আকাশের চাঁদ বুকে বুঝি এল নেমে
মোর বেদনায় বুকে বুক রাখি কাঁদিতে গভীর প্রেমে!
তব চাঁদ-মুখপানে চেয়ে আজ চমকিয়া উঠি আমি,
আমি চিনিয়াছি, সে চাঁদ এসেছে প্রিয়া-রূপ ধরে নামি!
যত রস-ধারা নেমেছে আমার কবিতার সুরে গানে
তাহার উৎস কোথায়, হে প্রিয়া, তব শ্রীঅঙ্গ জানে।
তাই আজ তব যে অঙ্গে যবে আমার নয়ন পড়ে,
থির হয়ে যায় দৃষ্টি সেথাই, আঁখি-পাতা নাহি নড়ে!
তোমার তনুর অণু-পরমাণু চির-চেনা মোর, রানি!
তুমি চেন নাকো ওরা চেনে বলে, ‘বন্ধু তোমারে জানি।’
অনন্ত শ্রীকান্তি লাবণি রূপ পড়ে ঝরে ঝরে
তোমার অঙ্গ বাহি, প্রিয়তমা, বিশ্ব ভুবন-পরে!
মন্ত্র-মুগ্ধ সাপের মতন তোমার অঙ্গ পানে
তাই চেয়ে থাকি অপলক-আঁখি, লজ্জারে নাহি মানে!
তুমি যবে চল, যবে কথা বল, মুখ পানে চাও হেসে
মূর্তি ধরিয়া ওঠে যেন সেথা আমার ছন্দ ভেসে।
মনে মনে বলি, তুমি যে আমার ছন্দ-সরস্বতী,
ওগো চঞ্চলা, আমার জীবনে তুমি দুরন্ত গতি!
আমার রুদ্র নৃত্যে জেগেছে কঙ্কালে নব প্রাণ,
ছন্দিতা ওগো, আমি জানি, তাহা তব অঙ্গের দান!
নাচ যবে তুমি আমার বক্ষে, রুধির নাচিয়া ওঠে
সেই নাচ মোর কবিতায় গানে ছন্দ হইয়া ফোটে।
মনে পড়ে যবে তোমার ডাগর সজল-কাজল আঁখি,
সে চোখের চাওয়া আমার গানের সুর দিয়ে বেঁধে রাখি।
প্রেম-ঢলঢল তোমার বিরহ-ছলছল মুখ হেরি
ভাবের ইন্দ্রধনু ওঠে মোর সপ্ত আকাশ ঘেরি।
আমার লেখার রেখায় রেখায় ইন্দ্রধনুর মায়া,
উহারা জানে না, এই রং তব তনুর প্রতিচ্ছায়া!
আমার লেখায় কী যেন গভীর রহস্য খোঁজে সবে
ভাবে, এ কবির প্রিয়তমা বুঝি আকাশ-কুসুম হবে!
উহারা জানে না, তুমি অসহায় কাঁদ পৃথিবীর পথে,
উহারা জানে না রহস্যময়ী তুমি মোর লেখা হতে।
আমিই ধরিতে পারি না তোমারে, উহারা ধরিতে চায়,
সাগরের স্মৃতি খুঁজে ওরা মরুভূর বালুকায়!
তোমার অধরে আঁখি পড়ে যবে, অধীর তৃষ্ণা জাগে,
মোর কবিতায় রস হয়ে সেই তৃষ্ণার রং লাগে।
জাগে মদালস-অনুরাগ-ঘন নব যৌবন-নেশা
এই পৃথিবীরে মনে হয় যেন শিরাজি আঙুর-পেশা!
সুর হয়ে ওঠে সুরা যেন, আমি মদিরা-মত্ত হয়ে
যৌবন-বেগে তরুণেরে ডাকি খর তরবারি লয়ে।
জরাগ্রস্ত জাতিরে শুনাই নব জীবনের গান,
সেই যৌবন-উন্মদ বেগ, হে প্রিয়া তোমার দান।
হে চির-কিশোরী, চির-যৌবনা! তোমার রূপের ধ্যানে
জাগে সুন্দর রূপের তৃষ্ণা নিত্য আমার প্রাণে।
আপনার রূপে আপনি মুগ্ধা দেখিতে পাও না তুমি
কত ফুল ফুটে ওঠে গো তোমার চরণ-মাধুরী চুমি!
কুড়ায়ে সে ফুল গাঁথি আমি মালা কাব্যে-ছন্দে-গানে,
মালা দেখে সবে, জানে না মালার ফুল ফোটে কোনখানে!
হে প্রিয়া, তোমার চির-সুন্দর রূপ বারে বারে মোরে
অসুন্দরের পথ হতে টানি আনিয়াছে হাত ধরে।
ভিড় করে যবে ঘিরিত আমারে অসুন্দরের দল,
সহসা ঊর্ধ্বে ফুটিয়া উঠিত তব মুখ-শতদল।
মনে হত, যেন তুমি অনন্ত শ্বেত শতদল-মাঝে,
মোর প্রতীক্ষা করিতেছ প্রিয়া চির-বিরহিণী সাজে।
সেই মুখখানি খুঁজিয়া ফিরেছি পৃথিবীর দেশে দেশে,
শ্রান্ত স্বপনে হৃদয়ে-গগনে ও মুখ উঠিত ভেসে!
যেই ধরিয়াছি মনে হত হায়, অমনই ভাঙিত ঘুম,
স্মৃতি রেখে যেত আমার আকাশে তব রূপ-কুঙ্কুম!
দেখি নাই, তবু কহিতাম গানে ‘সাড়া দাও, সাড়া দাও,
যারা আসে পথে, তারা তুমি নহ, ওদের সরায়ে নাও!’
ভেবেছিনু, বুঝি পৃথিবীতে আর তব দেখা মিলিল না,
তুমি থাক বুঝি সুদূর গগনে হয়ে কবি-কল্পনা।
সহসা একদা প্রভাতে যখন পাখিরা ছেড়েছে নীড়,
হারানো প্রিয়ারে খুঁজেছি আকাশে অরুণ-চন্দ্রাপীড়,
আমি পৃথিবীতে খুঁজিতেছিনু গো আমার প্রিয়ারে গানে,
থমকি দাঁড়ানু, চমকি উঠিনু কাহার বীণার তানে!
বেণু আর বীণা এক সাথে বাজে কাহার কন্ঠ-তটে,
কার ছবি যেন কাঁদিয়া উঠিল লুকানো হৃদয়-পটে।
হেরিনু আকাশে তরুণ সূর্য থির হয়ে যেন আছে,
কে যেন কী কথা কয়ে গেল হেসে আমার কানের কাছে।
আমার বুকের জমাট তুষার-সাগর সহসা গলে
আছাড়িয়া যেন পড়িতে চাহিল তোমার চরণ-তলে।
ওগো মেঘ-মায়া, বুঝিয়াছিলে কি তুমি?
দারুণ তৃষায় তব পানে ছিল চেয়ে কোনো মরুভূমি?
তুমি চলে গেলে ছায়ার মতন, আমি ভাবিলাম মায়া,
কল্প-লোকের প্রিয়া আসে না গো ধরণিতে ধরি কায়া!
ভেবেছিনু, আর জীবনে হবে না দেখা –
সহসা শ্রাবণ-মেঘ এল যেন হইয়া ব্রজের কেকা!
যমুনার তীরে বাজিয়া উঠিল আবার বিরহী বেণু,
আঁধার কদম-কুঞ্জে হেরিনু রাধার চরণ-রেণু।
যোগ-সমাধিতে মগ্ন আছিনু, ভগ্ন হইল ধ্যান,
আমার শূন্য আকাশে আসিল স্বর্ণ-জ্যোতির বান।
চির-চেনা তব মুখখানি সেই জ্যোতিতে উঠিল ভাসি
ইঙ্গিতে যেন কহিলে, ‘বিরহী প্রিয়তম, ভালোবাসি!’
আমি ডাকিলাম, ‘এসো এসো তবে কাছে।’
কাঁদিয়া কহিলে, ‘হেরো গ্রহ তারা এখনও জাগিয়া আছে,
উহারা নিভুক, ঘুমাক পৃথিবী, ঘুমাক রবি ও শশী,
সেদিন আমারে পাবে গো, লাজের গুন্ঠন যাবে খসি।
কেবল দুজন করিব কূজন, রহিবে না কোনো ভয়,
মোদের ভুবনে রহিবে কেবল প্রেম আর প্রেমময়।’
‘আমি কী করিব?’ কহিলাম আঁখি-নীরে
কহিলে ‘কাঁদিবে মোর নাম লয়ে বিরহ-যমুনাতীরে!
যমুনা শুকায়ে গিয়াছে প্রেমের গোকুলে এ ধরাতলে,
আবার সৃজন করো সে যমুনা তোমার অশ্রুজলে।
তোমার আমার কাঁদন গলিয়া হইবে যমুনা জল
সেই যমুনায় সিনান করিতে আসিবে গোপিনীদল,
ওরা প্রেম পাবে, পাইবে শান্তি, পাবে তৃষ্ণার মধু,
তোমারে দিলাম চির-উপবাস, পরম বিরহ, বঁধু!’
‘এ কী অভিশাপ দিলে তুমি’ বলে যেমনই উঠি গো কাঁদি,
হেরি কাঁদিতেছ পাগলিনি মোর হাত দুটি বুকে বাঁধি!
আজ মোর গানে কবিতায়, সুরে তুমি ছাড়া নাই কেউ,
সেই অভিশাপ যমুনায় বুঝি তুলেছে বিপুল ঢেউ!
সবার তৃষ্ণা মিটাইতে আমি যমুনা হইয়া ঝরি,
জানে না পৃথিবী, কোন নিদারুণ তৃষ্ণা লইয়া মরি!
বড়ো জ্বালা বুকে, বলো বলো প্রিয়া – না-ই পাইলাম কাছে,
এই বিরহের পারে তব প্রেম আছে আজও জেগে আছে!
যদি অভিমান জাগে মোর বুকে না বুঝে তোমার খেলা,
দূরে থাক বলে ভাবি যদি তারে অনাদর অবহেলা –
কেঁদে কেঁদে রাতে যদি মোর হাতে লেখনী যায় গো থামি,
বিরহ হইয়া বুকে এসে মোর কহিয়ো – ‘এই তো আমি।’
৩
৩ মন্তব্য