সিনিয়র শিক্ষক
০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১২:১১ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
ভালোবাসার বন্ধনগুলোর মধ্যে অন্যতম বরকতময় বন্ধন হলো স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন যা হজরত আদম ও হাওয়া (আ.) থেকে শুরু হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা চলমান থাকবে। তাই, এমন মধুর সম্পর্কের দাম্পত্য জীবন যেন সুখের হয় সে জন্য ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলা এবং হেকমত অবলম্বন করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দাম্পত্য জীবন যেহেতু একটি দীর্ঘ পথচলা তাই, এতে ভালো-মন্দ, হাসি-খুশি, রাগ-অভিমান ইত্যাদির উপস্থিতি একটি স্বাভাবিক বিষয়।
অতএব, ইসলামের হুকুম মেনে চলার পাশাপাশি দাম্পত্য জীবন সুখের করতে কিছু টিপস অনুসরণ করা যেতে পারে যাতে সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। মনে রাখতে হবে, শয়তানকে কখনোই সুযোগ দেওয়া যাবে না।
স্বামীর জন্য করণীয় : সুখী দাম্পত্যের জন্য স্বামী যে কাজগুলো করতে পারেন তাহলো-প্রতিদিন বাইরে থেকে এসে ঘরে প্রবেশ করেই স্ত্রীর সঙ্গে সালাম বিনিময় করবেন। এতে করে স্ত্রী স্বামীর প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল হবেন। বের হওয়ার সময় হাত কিংবা কপালে একটি চুমো দিয়ে ভালোবাসা নেবেন। এরূপ করাতে ভালোবাসার গভীরতা আরও বৃদ্ধি পায়।
স্ত্রীকে বেশি বেশি সময় দিন। এতে করে দূরত্বের ফাটল সৃষ্টি হবে না। স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে ইমান জাগানিয়া ও ভালোবাসার গল্প করলে উভয়ের মাঝ থেকে নিঃসঙ্গতা দূর হবে। যদি পারেন কুরআন পাঠ করে শুনান। মধ্য রাতে তাহাজ্জুদে উঠলে স্ত্রীকেও ডেকে তুলুন। এতে করে আরও স্ত্রীর ধার্মিকতা বাড়বে এবং পরস্পরের প্রতি সুধারণা জন্মাবে। কাজের ফাঁকেও স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসি দেওয়া ভালো। এমনকি স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করা সুন্নাত। স্ত্রীর অসুস্থতায় পাশে থেকে সেবা শুশ্রুষার পাশাপাশি তাকে সাহস দেওয়া ও তার নিঃসঙ্গতা দূর করা একান্ত অপরিহার্য। দূরে কোথাও বের হলে একাকিত্ব দূর করতে ঘন ঘন ফোনে আলাপ করা উত্তম।
বাইর থেকে ফেরার সময় স্ত্রীর জন্য ছোট্ট কিছু পকেটে করে নিয়ে আসতে পারেন। খেতে বসলে স্ত্রীর পান করা অবশিষ্ট পানি পান করলে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। স্ত্রীর করা রান্নার প্রশংসা করুন। একসঙ্গে খেতে বসলে স্ত্রীর মুখে খাবারের লোকমা তুলে দিন। রাসূল (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-এর খাওয়া অবশিষ্ট মাংসের অংশ চুষে খেতেন। আয়েশা (রা.) যে পাশ থেকে পান করতেন রাসূল (সা.)ও একই পাশ থেকে পান করতেন। এটাই স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার শিক্ষা। সকাল-সন্ধ্যায় একবার হলেও বলুন ‘আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি’। এমন কোনো আচরণ প্রকাশ করবেন না যাতে স্ত্রীর মাঝে স্বামীর প্রতি অনিহা চলে আসে। আর হ্যাঁ, সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্য কোনো বেগানা নারীর সঙ্গে সম্পর্কে না জড়ানো।
স্ত্রীরা সবচেয়ে স্বামীর এ কাজ থেকে অতিরিক্ত দুঃখ পেয়ে থাকেন। তা ছাড়া এমন চরিত্রের কারণে কখনো সংসার সুখের হয় না; বরং ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিপতিত হয়। স্ত্রীর বৈধ চাহিদাগুলো সাধ্যের মধ্যে পূরণ করা প্রয়োজন। তা ছাড়া উত্তম কথার মাধ্যমে স্ত্রীকে পর্দার গুরুত্ব এবং আচরণে শালীনতার শিক্ষা দেওয়াও জরুরি। বেশি বেশি আল্লাহমুখী করে তোলা এবং পাপ কাজ থেকে স্ত্রীকে বিরত রাখা স্বামীর একান্ত অপরিহার্য দায়িত্ব। জীবন যেহেতু একাকিত্ব হয়ে বাস করে না। তাই এর মাঝে রাগ-অভিমান ও হাসি-খুশি বিদ্যমান। অতএব, স্ত্রীর অভিমানের সময় নিজেকে হৃদয়বান করুন এবং রাগ, অভিমান দূর করার চেষ্টা করুন। কোনো একটা স্মৃতিবিজড়িত হাসির গল্প কিংবা খুশির কোনো মুহূর্তের কথা স্মরণ করিয়ে দিন। এতে অভিমান কমে যেতে পারে।
অথবা, কোথাও বেড়াতে নিয়ে যান। এতে করে মনটা আরও বেশি রিফ্রেশ হবে। যদি পারেন কিছু গিফট করেন। মনে রাখবেন, স্ত্রী হলো কাচের মতো। একটু এদিক-ওদিক হলে ভেঙে যেতে পারে। তাই, অতি যত্ন করে ভালোবাসায় আগলে রাখুন এবং বেশি বেশি তার পজিটিভ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করুন, তার আচরণে ভালো লাগার বিষয়গুলো তুলে ধরুন। স্ত্রীর ভুলগুলোকে আন্তরিকতার সঙ্গে শুধরে দিন। কখনো স্ত্রীর গায়ে হাত তুলবেন না এবং স্ত্রীকে বেশি বেশি ভালোবাসুন।
ইনশাআল্লাহ! এতে অবশ্যই সম্পর্কের দৃঢ়তা বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে পরকালে জান্নাতে একসঙ্গে প্রবেশ করার জন্য আমলের পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন। সফল হবে ইনশাআল্লাহ!
স্ত্রীর জন্য করণীয় : সংসারের সুখের জন্য স্ত্রী যে কাজগুলো করতে পারেন তাহলো-প্রধান যে বিষয়টি মনে রাখবেন তা হলো ‘স্বামী হলো স্ত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত’। স্বামীর অবস্থান পাশে না থাকলে দেখতে পাবেন পুরো দুনিয়াটাই পাশে থাকছে না। কোনো ভরসা, স্থায়ী কোনো আশ্রয় কিংবা প্রশান্তির কোনো জায়গা বলতে খুঁজে পাবেন না। তাই, স্বামীর বৈধ সব ক্ষেত্রে স্ত্রীর আনুগত্য একান্ত কর্তব্য। অতএব, স্বামী পরিশ্রম শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরলে পাশে গিয়ে তাকে বাতাস করুন। পাখাটা ছেড়ে দিন। পানি চাইলে এনে দিন। কাপড়গুলো নিজে ধৌত করুন।
অনেক সময় স্বামীর মন-মানসিকতা প্রফুল থাকে না। সে সময় স্বামীর অবস্থা বুঝার চেষ্টা করুন। স্বামীর আর্থিক অবস্থানের দিকে লক্ষ রেখে নিজেদের আবদারগুলো প্রকাশ করুন। অহেতুক কোনো চাওয়া-পাওয়া নিয়ে স্বামীকে বেহুদা কথা শুনাবেন না। স্বামীর কোনো অযোগ্যতা নিয়ে কথা নয়; বরং তাকে উৎসাহিত করুন ভালো কোনো কাজে। স্ত্রীর সঙ্গটা স্বামীর জন্য অনেক বড় মানের হয়। তার দুঃখের সময় তাকে জড়িয়ে ধরুন এবং খুশি করার চেষ্টা করুন। খাদিজা (রা.) রাসূল (সা.)-এর দুঃখের সময়টায় সবচেয়ে বেশি পাশে ছিলেন। তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। বাইর থেকে স্বামী বাড়ি ফিরলে আগে সালাম বিনিময় করুন। পারিবারিক বিষয় নিয়ে উভয়ই আলোচনা করুন এবং মতামত দিন। স্বামীর বৈধ সব হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করুন। কারণ কখনো স্বামী রেগে থাকলে মনে রাখবেন নিজের ওপর আল্লাহ নারাজ রয়েছেন।
রাসূল (সা.) বলেছেন, জাহান্নামে নারীদের অবস্থান বেশি। কেননা তারা বেশি বেশি অভিশাপ দেয় এবং স্বামীর অকৃতজ্ঞ ও অবাধ্য হয়। স্বামীকে ইম্প্রেস করার চেষ্টা করুন যেন নিজের প্রতি অনীহা চলে না আসে। এমন কোনো আচরণ প্রকাশ করবেন না যাতে স্বামীর মনে কষ্ট লাগে।
বিশেষ করে স্বামী তখনই কষ্ট বেশি পায় যখন জানতে পারে যে, স্ত্রী পরকিয়ায় লিপ্ত। সুতরাং, এমন কাজে কখনো পা বাড়াবেন না। মনে রাখবেন, স্বামীর যত অর্জন, যত চেষ্টা রয়েছে সবকিছু স্ত্রীকে ঘিরে। কখনো স্বামীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজের কণ্ঠস্বরকে উঁচু করবেন না। স্বামীকে বেশি বেশি ভালোবাসা দিন এবং স্বামীর ভুলগুলোকে ভুলে যান আর পরকালের পথে সৎকর্ম নিয়ে এগিয়ে চলুন। আশা করা যায়, এমন মধুর সম্পর্কে কখনো ফাটল ধরবে না। আল্লাহতায়ালা প্রতিটি দাম্পত্য জীবনকে সুখময় করুন। আমিন!
৩
৩ মন্তব্য