Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৩:১৭ পূর্বাহ্ণ

মধুর উপকারিতা ও অপকারিতা এবং খাওয়ার নিয়ম

ভূমিকা:মধু প্রকৃতির পক্ষ থেকে আসা এক অনন্য উপাদান।বিভিন্ন পুরাণ সহ ধর্ম গ্রন্থ গুলোতে মধুর গুণ ও স্বাদের অতুলনীয় বর্ণণা রয়েছে।পুষ্টিগুন ও উপাদেয়তার বিবেচনায় মধুর উপকারিতা অনস্বীকার্য।মধুকে প্রথম সারির খাদ্য হিসেবে খাদ্য তালিকায় রাখা যেতে পারে।মধু নিয়মিত সেবনে অসংখ্য রোগ বালাই থেকে পরিত্রান মেলে।


মধুর উপাদানঃ


মধু মহান আল্লাহ তা’য়ালা প্রদত্ত এক অশেষ নিয়ামত।প্রাচীন কাল হতে রোগ নিরাময় ও শক্তিবর্ধক হিসেবে মধুর ব্যবহার হয়ে আসছে।আসুন,জেনে নেয়া যায় মধুর এই জাদুকরী গুণের জন্য কি কি উপাদান ভূমিকা রাখছে।


মধুতে রয়েছে উচ্চমাত্রার পুষ্টিমান, যা মানবদেহের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। রাসায়নিক পরীক্ষায় জানা যায়, এতে রয়েছে বিভিন্ন খনিজ উপাদান ও ভিটামিন। মধুর প্রধান উপকরণ হলো সুগার, যার ভেতরে লেভিউলোজ ৩৯ শতাংশ, ডেক্সট্রোজ ৩১ শতাংশ, ম্যালটোজ ৯ শতাংশ, গ্লুকোজ ১ শতাংশ এবং সামান্য পরিমাণে থাকে সুক্রোজ। এতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এনজাইম ২ শতাংশ এবং মানবদেহের কোষকলা, অঙ্গ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপাদান থাকে। এ এনজাইমগুলো হচ্ছেÑ ডায়াস্টেজ, ইনভার্টেজ, সেকারোজ, ক্যাটালেক্স, পার-অক্সিডেজ, লাইপেজ। এনজাইমগুলো বিভিন্ন কালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, ক্লোরিন, সালফার, ফসফরাস, আয়োডিন লবণের সাথে যুক্ত থাকে। কিছু উপকরণে রেডিয়ামের মতো ধাতব উপাদানও থাকে।

মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে মধুর নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, এতে অ্যালুমিনিয়াম, বোরন, ক্রোমিয়াম, কপার, লেড, টিন, জিংক ও জৈব এসিড (যেমনÑ ম্যালিক এসিড, সাইট্রিক এসিড, টারটারিক এসিড, অ্যাক্সালিক এসিড), কয়েক প্রকার ভিটামিন, প্রোটিন, হরমোন, এসিটাইল কোলিন, অ্যান্টি-বায়োটিক্স, ফাইটোনসাইডস, সাইটোস্ট্যাটিক্স এবং পানি (১৭ দশমিক ৭ শতাংশ) ছাড়াও অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদান আছে। ভিটামিন যেমনÑ ভিটামিন বি-১, বি-২, বি-৩, বি-৫, বি-৬, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-কে এবং ক্যারোটিন বা ভিটামিন-এ মধুতে বিদ্যমান।মধুতে কোন চর্বি ও প্রোটিন নেই।এটি কার্বোহাইড্রেট বহুল খাদ্য।প্রতি ১০০ গ্রাম মধু হতে প্রাপ্ত শক্তির পরিমান ২৮৮ ক্যালোরি।


মধুর উপকারিতাঃ


শক্তিবর্ধক হিসেবেঃ


মধুর প্রধান উপাদান শর্করা যা পর্যাপ্ত তাপ ও শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে শরীরকে কর্মোক্ষম রাখে।দীর্ঘ কাজ করার শক্তি প্রদান করে।মধু সেবনে পরীশ্রমের ক্লান্তি বিলম্বিত হয়।


দেহের বাড়তি মেদ ঝড়াতেঃ


বর্তমানে ওবেসিটি বা অতিরিক্ত মেদ সমস্যায় ভোগা বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে অত্যন্ত উপকারী ও জনপ্রিয় ফলাফল প্রদান করছে মধুর ব্যবহার।গরম পানিতে দু চামচ মধু ও পরিমান মতো লেবুর রসের মিশ্রণ প্রতিদিন সকালে সেবন করার মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমে যায়।বর্তমানে নারী এবং তরুনীদের মধ্যে এই পদ্ধতি অত্যন্ত জনপ্রিয়।


হৃদরোগের ঝুঁকি এড়াতেঃ


হৃদ্‌রোগে: এক চামচ মৌরি গুঁড়োর সঙ্গে এক বা দুই চামচ মধুর মিশ্রণ হৃদ্‌রোগের টনিক হিসেবে কাজ করে। এটা হৃৎপেশিকে সবল করে এবং এর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে।


রক্ত উৎপাদনে সহায়তাঃ


আমরা জানি রক্তের মূল উপাদান লোহিত রক্তকণিকা।শরীরে রক্ত কণিকার উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য আয়রনের প্রয়োজনীয়তা অতুলনীয়।রক্ত উৎপাদনকারী উপকরণ আয়রন রয়েছে মধুতে। আয়রন রক্তের উপাদানকে (আরবিসি, ডব্লিউবিসি, প্লাটিলেট) অধিক কার্যকর ও শক্তিশালী করে।


রুপচর্চায়ঃ


রুপচর্চার ক্ষেত্রে মধুর ব্যবহার প্রাচীন।পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন হওয়ায় বেশ জনপ্রিয় ও।মধু ত্বকের মৃত কোষ পরিষ্কার ও পূনর্গঠনে অত্যন্ত উপকারী।তাই প্রাকৃতিক ক্লিনজার হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর।যেকোন স্কিন টাইপের জন্য লেবু মধুর মিশ্রন একটি ভালো ক্লিনজিং এজেন্ট যা নিয়মিত ব্যবহারে ত্বককে উজ্জ্বল ও মসৃণ করে তোলে।এছাড়াও শ্যাম্পুর পর,রেগুলার যেকোন কন্ডিসনারের সাথে এক চামচ মধু মিশিয়ে চুলের নিচের অংশে লাগিয়ে কিছুক্ষণ পর ধুয়ে ফেলার মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে উজ্জ্বল ও সিল্কি চুল।


মধু ময়েশ্চারাইজার হিসেবেও অতুলনীয়।শুষ্ক ঠোঁটে মধুর ব্যবহারের মাধ্যমে ঠোঁট গোলাপী আভা ফিরে পায় ও সতেজ থাকে।মুখের দাগ দূর করতে মধু, আমন্ড অয়েল, গুঁড়া দুধ এবং লেবুর রস পরিমাণমতো মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে মুখে লাগান। ১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। ব্রণ বা রোদে পোড়া দাগ দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।


দৃষ্টি শক্তি বাড়াতেঃ


মধু অত্যন্ত কার্যকর উপাদান চোখের জ্যোতি বাড়ানোর জন্য।নিয়মিত গাজরের সাথে মধু খেলে দৃষ্টিশক্তি উন্নত হয়।


গলার স্বর সুন্দরেঃ


যারা নিয়মিত গান বা কন্ঠচর্চা করেন তাদের কাছে মধু ও গরম পানির মিশ্রন পান করা অত্যন্ত জনপ্রিয়।কেননা,মধু কন্ঠকে সুন্দর রাখে।


হজমে সহায়তাঃ


মধুর মূল উপাদান চিনি বা শর্করা যা রাসায়নিক ভাবে সরল গঠনের খাদ্য উপাদান।তাই মধু সহজ পাচ্য।


তারুণ্য বজায় রাখতেঃ


 তারুণ্য বজায় রাখতে মধুর ভূমিকা অপরিহার্য। এটি অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট, যা ত্বকের রং ও ত্বক সুন্দর করে। ত্বকের ভাঁজ পড়া ও বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে। শরীরের সামগ্রিক শক্তি ও তারুণ্য বাড়ায়।


উচ্চ রক্তচাপ কমায়ঃ


দুই চামচ মধুর সঙ্গে এক চামচ রসুনের রস মেশান। সকাল-সন্ধ্যা দুইবার এই মিশ্রণ খান। প্রতিনিয়ত এটার ব্যবহার উচ্চ রক্তচাপ কমায়। প্রতিদিন সকালে খাওয়ার এক ঘণ্টা আগে খাওয়া উচিত।


পানিশূন্যতায়ঃ


পানিশূন্যতা হলে এক লিটার পানিতে ৫০ মিলিলিটার মধু মিশিয়ে খেলে দেহে পানিশূন্যতা রোধ করা যায়।


হাঁপানিরোগ রোধেঃ


 আধা গ্রাম গুঁড়ো করা গোলমরিচের সঙ্গে সমপরিমাণ মধু এবং আদা মেশান। দিনে অন্তত তিনবার এই মিশ্রণ খান। এটা হাঁপানি রোধে সহায়তা করে।


রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়ঃ


 মধু শরীরের রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়ায় এবং শরীরের ভেতরে এবং বাইরে যেকোনো ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতাও জোগান দেয়। মধুতে আছে একধরনের ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধকারী উপাদান, যা অনাকাঙ্ক্ষিত সংক্রমণ থেকে দেহকে রক্ষা করে।


মধু যাদের খাওয়া উচিত এবং উচিত নাঃ


ছোট শিশু যারা বাড়ন্ত,লেখাপড়া করছে তাদেরকে দুধের সাথে দু চামচ মধু মিশিয়ে খাওয়ানো উচিত।এতে একদিকে তাদের হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত করে,অন্যদিকে এনার্জিটিক রাখে যার ফলে পড়াশোনায় মনোযোগ বৃদ্ধি পায়।


যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁরা যদি প্রতিদিন সকালে এক গ্লাস কুসুম গরম পানির সাথে এক চামচ মধু ও লেবু মিশিয়ে খান, তাহলে সহসাই কিন্তু আপনার মেটাবলিজম বা বিপাককে বাড়িয়ে ওজন কমাতে সক্ষম হবে। চিনির বিকল্প হিসেবে এই মধুর জুড়ি এ জন্যই নেই, মধুর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স চিনির চেয়ে অনেক কম, যা শরীরে চিনির তুলনায় একটু ধীরে সুগার লেভেলকে বাড়ায়। সুতরাং যাঁরা চান ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে চান, তাঁদের কিন্তু এখন থেকেই চিনির পরিবর্তে মধু খাওয়া অবশ্যই উচিত।


তবে নবজাতক বা এক বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনভাবেই মধু খাওয়ানো উচিত না যদিও এরকম একটি প্রাচীন চর্চা আমরা এখনো করে থাকি।আমাদের অবশ্যই এ থেকে বিরত থাকা উচিত।ডায়াবেটিক রোগীকে এ জন্য মানা করা হয়, যেহেতু তাঁদের ব্লাডের ইনসুলিনের অ্যাকটিভিটিস কম এবং মধু খাওয়ার পর সেই সুগারকে কন্ট্রোল করতে পারবে না। এ ছাড়া ক্যানসারের রোগীকে অনেক সময় দেখা যায় যে বিভিন্ন ফলের জুসের সাথে, তাঁদের জন্য অ্যানার্জির দরকার হয়, তখন মধু ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া যেসব রোগীর অনেক বেশি ক্যালোরির দরকার; যেমন—গর্ভবতী মায়েদের অনেক বেশি ক্যালোরি দরকার, বাচ্চাদের অনেক ইনস্ট্যান্ট অ্যানার্জি দরকার হয়, তাঁদের জন্য মধুর জুড়ি নেই

মন্তব্য করুন