Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১১:১৩ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে ফরেক্স ট্রেডিং হালাল না হারাম?

ইসলাম ধর্মে ব্যবসা কে হালাল করা হয়েছে, আর সুদকে করা হয়েছে হারাম। ইসলামিক চিন্তাধারায়, সুদ ভিত্তিক যেকোনো ব্যবসায়ীক কর্মকান্ডকে হারাম হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। কারণ, মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় গ্রন্থ আল কুরআনের পাশাপাশি হাদীসেও সুদের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মূলত সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই আমরা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে সুদ সম্পর্কিত কোনো কারবার বা ব্যবসায় জড়িত হতে পারিনা। কিন্তু দূঃখজনক হলেও সত্যি যে, বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ ব্যবসা সুদে জর্জরিত। যার কারনে ইসলামিক মূল্যবোধে যারা বিশ্বাস করেন, তাদের জন্যে সুদমুক্ত ব্যবসা খুঁজে বের করা খুবই কঠিন। 

ফরেক্স ট্রেডিং আন্তর্জাতিক বাজারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান ধরে রেখেছে। এটি বিশ্বের সবথেকে বড় অর্থনৈতিক বাজারগুলোর মধ্যে একটি। ফরেক্স ট্রেডিং আসলে সুদ মুক্ত কিনা, এই ব্যবসাটি হালাল নাকি হারাম, এই নিয়ে রয়েছে নানান মতবাদ৷ তবে সেই মতামতের আগে, যারা এখনো ফরেক্স ট্রেডিং সম্পর্কে জানেন না, তাদের উচিত এই বাজারটি সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা নেওয়া৷ আর তাই মূল আলোচনা শুরুর আগে আমরা জেনে নিবো ফরেক্স ট্রেডিং কি?

ফরেক্স ট্রেডিং কি?

ফরেক্স অথবা ফরেইন এক্সচেঞ্জকে ক্রেতা এবং বিক্রেতার একটি বৃহৎ নেটওয়ার্ক বলা যেতে পারে, যারা প্রতিদিন নির্ধারিত মূল্যে মুদ্রার আদানপ্রদান করে থাকে। একদম সহজ ভাষায় বলতে গেলে, মুদ্রার আদানপ্রদানকেই ফরেক্স বলে। ফরেক্স ট্রেডিংয়ে কোনো ব্যক্তি, কোম্পানী অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একটা মুদ্রাকে অন্য একটি মুদ্রায় রুপান্তরিত করে থাকে।

২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন ফরেক্স মার্কেটে প্রায় ৬.৬ ট্রিলিয়ন ফরেন এক্সচেঞ্জ সেটেলমেন্ট করা হয়। ফরেক্স ট্রেডিংয়ের অনেক  বৈদেশিক লেনদেন যদিও ব্যবহারিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়, তবে এর বেশিরভাগ ব্যবহারটা এখন মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যেই। বৈদেশিক মুদ্রার প্রতিনিয়ত এই লেনদেন যেকোনো মুদ্রার দামের ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এবং এটা ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয়ক্ষেত্রেই। আর বৈদেশিক মুদ্রার এই অস্থিরতাই ব্যবসায়ীদের নিকট ফরেক্স ট্রেডিংকে আরো আকর্ষনীয় করে তোলে। ফরেক্স ট্রেডিংয়ে অল্প সময়ে অতিরিক্ত মুনাফাও অর্জন করা সম্ভব, পাশাপাশি এটি মূলধনের ঝুঁকিও বাড়ায়। ফরেক্স ট্রেডারদের নমুনাঃ https://www.binaryoptions.com/bn/দালাল/

মুদ্রার এই বাজার কিভাবে কাজ করে?

অন্যান্য পণ্যের মতো ফরেক্স মার্কেটের লেনদেন শারীরিক ভাবে হয়না। ফরেক্স মার্কেটে মুদ্রার লেনদেন হয় দুটো পক্ষের মধ্যে, ওভার দি কাউন্টার বা ওটিসির মাধ্যমে। ফরেক্স মার্কেট মূলত বিভিন্ন টাইমজোনের অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে থাকা ব্যাংক সমূহের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আর একারণে ফরেক্স মার্কেটে কেন্দ্রীয় কোনো রাজত্ব থাকেনা। ফলে আপনি চাইলে সপ্তাহে ৫ দিন ২৪ ঘন্টাই ফরেক্স ট্রেডিং করতে পারবেন। 

ফরেক্স মার্কেট মূলত তিন ধরণের। 

১. স্পট ফরেক্স মার্কেট

২. ফরওয়ার্ড ফরেক্স মার্কেট

৩. ফিউচার ফরেক্স মার্কেট

ফরেক্স ট্রেডিং কি হালাল না হারাম?

ফরেক্স ট্রেডিং আসলে হারাম নাকি হালাল, তা নিয়ে ইসলামিক স্কলারদের মতবেদ রয়েছে। মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে আমাদের দেশে এই চিন্তাটা আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আপনি যদি মুসলিম ধর্মাবলম্বী হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার মনেও উঁকি মার‍তে পারে এই বিষয়টি। 

ফরেক্স ট্রেডিং হারাম এবং হালাল, উভয়টিই হতে পারে। তবে তা ব্যক্তির বিনিয়োগের উদ্দেশ্য এবং আচরণের উপর নির্ভর করে। ইসলামিক স্কলারদের মতে, সঠিক উপায়ে এবং একটি ইসলামিক একাউন্টের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হালাল, তবে এমন কোনো একাউন্টের মাধ্যমে যদি ফরেক্স মার্কেটে ট্রেড করা হয়, যা হতে নিয়মিত সুদ আসতে থাকে, তাহলে সেটি হারাম হিসেবে গণ্য হবে। 

যদিও ট্রেডিংয়ের অনেক কিছুকেই ইসলামে হারাম বলা হয়েছে, তবুও ইসলামে বিশ্বাস রেখে কিছু সঠিক পন্থা অবলম্বন করে হালাল ভাবেও ফরেক্স ট্রেডিং থেকে আয় করা সম্ভব।

ইসলামিক ফরেক্স ট্রেডিং একাউন্ট কি?

ইসলাম ধর্মাবলম্বী যারা রয়েছেন, যারা ইসলামি নীতি অনুসারে ব্যবসা করতে চান, তাদের জন্যে ফরেক্স ট্রেডিংয়ে হালাল একাউন্টের সুযোগ রয়েছে। এই একাউন্টটিকে সাধারণত সোয়াফ-ফ্রি একাউন্ট অথবা হালাল ফরেক্স ট্রেডিং একাউন্ট হিসেবেও ডাকা হয়ে থাকে। ইসলামিক ট্রেডিং একাউন্টে কোনো রকম সুদ প্রদান করা হয়না। কারণ, ইসলামী শরিয়ায় কোনো মুসলিম ব্যক্তিকে সুদ গ্রহণের বিষয়টিকে পূর্ণাঙ্গ রুপে এড়িয়ে যেতে বলা হয়েছে। শুধুমাত্র ইসলাম নয়, বিশ্বের বেশিরভাগ ধর্মেই সুদ গ্রহণের বিষয়টিকে একটি নিন্দনীয় অপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়। সুদ দেওয়া এবং নেওয়া, উভয়ই ইসলামে নিষিদ্ধ। তবে ইসলামে ব্যবসাকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। 

ফরেক্স ট্রেডিং হালালের পূর্বশর্তঃ

প্রচলিত ট্রেডিং একাউন্টের সাথে হালাল ইসলামিক একাউন্টেরও অনেক মিল রয়েছে। তবে এসব ট্রেডিং একাউন্টের স্পেশাল যে ফিচারগুলোকে সংযোজন করা হয়েছে সেগুলো অবশ্যই ইসলামী ফাইন্যান্সের নীতি মেনে চলতে হবে।

ইসলামী ফাইন্যান্সের চারটা মূল বিষয়বস্তু হলো,

১. জুয়া খেলা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

২. সুবিধা এবং ঝুঁকি বিতরণ 

৩. কোনো সুদ নেওয়া এবং দেওয়ার কঠোর নিষেধাজ্ঞা। যাকে রিবা বলা হয়ে থাকে।

৪. বিলম্ব ছাড়া ট্রেডিং অপারেশন এক্সচেঞ্জ

মূলত ইসলামিক একাউন্টগুলোর উৎপত্তি শুরু হয়েছিলো ইসলামী ফাইন্যান্সের প্রতি সম্মান জানিয়ে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলিমদের কাছে ফরেক্স ট্রেডিংয়ের দ্বোর উন্মুক্ত করে দেওয়াই ছিলো এর উদ্দেশ্য। কারণ পশ্চিমা বিশ্বের ব্যবসায়িক লেনদেন কখনো ইসলামী ফাইনান্সের এই চারটি মৌলিক বিষয়কে অনুসরণ করেনা। তাই কোনো ইসলাম ধর্মাবলম্বী যদি চান, ইসলামী আইন অনুযায়ী তিনি ফরেক্স ট্রেডিংয়ে ব্যবসা করবেন, তাহলে ইসলামিক ট্রেডিং একাউন্টটি তার জন্যে উপযুক্ত একটি সমাধান৷

বাংলাদেশে ফরেক্স ট্রেডিং হালাল না হারাম?

বাংলাদেশে আমরা যে প্রচলিত শেয়ার মার্কেটকে চিনি, সেটি এবং ফরেক্স মার্কেট প্রায় একই। দুটোকেই বলা হয় ট্রেডিং মার্কেট। বরং বলা যেতে পারে শেয়ার মার্কেট তূলনায় ফরেক্স মার্কেট আরো বেশি সহজ এবং ইসলামিক। শেয়ার মার্কেট কে বৈধতা দেওয়ার জন্যে যেসব রুলস ধার্য করা হয়েছে, তা আবার ফরেক্স মার্কেটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এই দুই ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেটে ট্রেডিং একই রকম হলেও, তাদের মধ্যে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। 

বাংলাদেশে শেয়ার মার্কেটকে ইসলামিক স্কলারগণ বৈধতা দেওয়ার পেছনে যে সমস্ত কারণ বিদ্যামান, সেগুলো হলো-

১. কোম্পানীর মূল যে লেনদেন বা কারবার সেটি হালাল হওয়া।

২. কোম্পানীর নিজস্ব সম্পত্তি থাকা। যদি তা লিকুয়িড এসেট হয়, তবে তা হারাম।

৩. কোম্পানী যদি কোনো কারণে সুদের লেনদেন করে থাকে, তাহলে বাৎসরিক মিটিংয়ে আওয়াজ তুলতে হবে।

৪. কোম্পানীর ইনকাম স্টেটমেন্টে যদি ডিপোজিট হওয়া অর্থ থেকে দেখা যায় সেখানে সুদ এসেছে, তা সদকা করে দেওয়া। কারন সুদ ভিত্তিক ডিবেঞ্চার কেনা বৈধ নয়। 

উপরোক্ত এই চারটি শর্ত সাপেক্ষে বাংলাদেশে শেয়ার মার্কেটকে বৈধ ঘোষণা করেছেন ইসলামিক স্কলারগণ। এখন এই বিষয়গুলোকে যদি আমরা ফরেক্স মার্কেটের ক্ষেত্রে তূলনা করি, তাহলে দেখবো,

১. মুদ্রা জোড়ে ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে প্রথম শর্তটি প্রযোজ্য নয়।

২. দ্বিতীয় শর্তে যে সম্পদের কথা বলা হয়েছে, সে হিসেবে মুদ্রা মানেই সম্পদ। কারণ সম্পদের হিসাব মুদ্রাতেই হয়। 

৩. মুদ্রা নিজে কখনো সুদী পণ্য হয়না।

৪. ফরেক্স ট্রেডিং ব্রোকারগণ আপনাকে সুদমুক্ত ইসলামিক একাউন্ট প্রদান করছে। 

শেষ কথা

বাংলাদেশে ফরেক্স ট্রেডিং হালাল নাকি হারাম, তা নিয়ে মতবেদের অন্ত নেই। তার কারন, ইসলামী স্কলারদের নানান জনের নানান চিন্তা এবং গবেষণা। কেউ কেউ ফরেক্স ট্রেডিং কে হারাম মনে করেন, আবার অনেকেই সঠিক উপায়ে ফরেক্স ট্রেডিং করাটাকে সমর্থন করেন। কিছু কিছু মানুষ আবার ফরেক্স ট্রেডিংয়ের পুরো প্রসেসটাকে না জেনে হারাম বা হালাল বলে আখ্যায়িত করেন। ধর্মীয় অনুভূতি বা ব্যক্তিগত মতবেদ সবারই থাকতে পারে। তাই ফরেক্স ট্রেডিং হারাম নাকি হালাল, তা নির্ভর করবে আপনার উদ্দেশ্যের উপর, এবং আপনি ফরেক্স ট্রেডিংয়ে সঠিক উপায় অবলম্বন করছেন কিনা, তার উপর।


মন্তব্য করুন

ব্লগ