Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ

গ্রামীণ শিক্ষা অবকাঠামোর সাম্প্রতিক বাস্তবতা, শিক্ষা ব্যবস্থায় এগিয়ে নিতে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ-----

শিক্ষা সম্পর্কে একটি ধ্রুপদি ধারণা হচ্ছেতা মানুষের চিন্তার উত্কর্ষ সাধন  অন্তর্নিহিত শক্তিগুলোকে বিকশিত করে। আধুনিককালে শিক্ষার ব্যবহারিক মূল্যকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। অর্থাৎ মানুষের জ্ঞানগত পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার দক্ষতা তৈরিতে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে সমাজ  জাতির উন্নতির জন্য প্রয়োজন। পৃথিবীর উন্নত  অনুকরণীয় দেশগুলো সবার আগে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত  আধুনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাম্প্রতিক সময় বাংলাদেশেও আমরা গুণগত  মানসম্মত শিক্ষার কথা শুনছি। আমরা জানি উন্নত শিক্ষা পদ্ধতি নিশ্চিত করার প্রাথমিক শর্ত শিক্ষা অবকাঠামোর মজবুতি।  দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা অবকাঠামো গুণগত  মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার উপযোগী বলার সুযোগ নেই। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরে এসে একটি দেশ তার শিক্ষার মৌলিক দর্শনসর্বজন গ্রহণযোগ্য শিক্ষা পদ্ধতি  শিক্ষা কাঠামো তৈরি করতে পারেনি  ব্যর্থতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। আজকের  লেখায় শিক্ষা পদ্ধতি বা শিক্ষা দর্শন নিয়ে আলোচনা না করে বরং গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা এবং বাংলাদেশের প্রাথমিক  মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা অবকাঠামোর স্বরূপ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।

একজন শিশু কীভাবে কথা বলবেকীভাবে অন্যজনের সঙ্গে মতবিনিময় করবেভাববে  চিন্তা করবে তা শেখার প্রক্রিয়াকে আমরা সামাজিকীকরণ বলি। অর্থাৎ যে প্রক্রিয়ায় একজন ব্যক্তির চিন্তাকাঠামোজীবনবোধ  দক্ষতা তৈরি হয় তার নাম সামাজিকীকরণ। সামাজিকীকরণের চারটি উল্লেখযোগ্য বাহন রয়েছেপরিবারশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসঙ্গী  গণমাধ্যম। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আনুষ্ঠানিক মাধ্যমটি হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু একজন ব্যক্তির চিন্তাকাঠামো তৈরি করে দেয় নাবরং তার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। শুধু পাঠ্যপুস্তকশিক্ষকপরীক্ষা পদ্ধতি কিংবা শিক্ষার নিয়মকানুন দিয়ে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব হয় না। শিক্ষার জন্য প্রয়োজন হয় আলাদা পরিবেশঅবকাঠামো  পারিপার্শ্বিকতা। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীকে তার জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত হওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লক্ষ্য অর্জনে তো বেশি সফল হয়। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করার জন্য শিক্ষার্থীকে যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়। বাংলাদেশে শিক্ষক  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার উপযোগী অবকাঠামোগত প্রস্তুতি আছে বলে মাঝেমধ্যে অনেককেই বলতে শুনি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর চাহিদা পূরণ  বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপযোগী মানবসম্পদ তৈরির জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা  শিক্ষা অবকাঠামো নিয়ে এখনো অনেক কাজ করার বাকি আছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রদত্ত তথ্যমতেবাংলাদেশে বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায়  লাখ ৩৩ হাজার। যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭৩ সালে প্রথম যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সরকারীকরণ করা হয়তখন গ্রাম এলাকার জন্য ন্যূনতম ৩০ শতাংশ জমির শর্ত ছিল। এখনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য মেট্রোপলিটন এলাকায়  শতাংশপৌরসভা এলাকায় ১২ শতাংশ  অন্যান্য এলাকার জন্য ৩০ শতাংশ জমির শর্ত রয়েছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য শর্ত হচ্ছেপ্রতিটি বিদ্যালয় ছয়টি কক্ষবিশিষ্ট ন্যূনতম তিন হাজার বর্গফুটের একটি ভবন থাকতে হবে।  ধরনের অবকাঠামোর মধ্যে একজন শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক  বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথা। বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় বাজারনিচু জমি  অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অবস্থিত। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেইখেলাধুলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেইএমনকি আলাদা করে খেলাধুলা করার রুটিনও নেই। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। ভবন  ক্লাসরুমগুলো স্যাঁতসেঁতে  অস্বাস্থ্যকর। হাওর  নিচু এলাকায় অনেক বিদ্যালয় বর্ষা মৌসুমে পানিতে তলিয়ে যায়। বিদ্যালয়ে যাতায়াত করার রাস্তা কাঁচা হওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার্থীদের যাওয়া-আসা করতে অনেক কষ্ট হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় ন্যূনতম ৫০০ বই সংবলিত একটি লাইব্রেরি থাকার কথা বলা হলেও অনেক বিদ্যালয়ে তার অস্তিত্ব নেই। বিভিন্ন সময়ে কিছু বই কেনা হলেও তার ওপর পড়ে থাকা ধুলার আস্তরণ দেখলেই মনে হবে এগুলো খুলে দেখার সময়  ইচ্ছা কারো হয়নি। শিক্ষাশিক্ষকের মানপ্রশিক্ষণকারিকুলাম প্রভৃতি বিষয় নিয়ে  লেখায় আলোকপাত করব না।  লেখার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে যে গুণগত শিক্ষার প্রাথমিক শর্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যদি দুর্বল  ভঙ্গুর হয় তাহলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাহলে প্রাথমিক শিক্ষাযেখান থেকে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়সেখানকার অবকাঠামো এত অবহেলিত  অপরিকল্পিত হলে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আশাবাদী হওয়া কঠিন। আজকের দুনিয়ায় শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তি অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। শিক্ষার্থীদের যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করানো না যায় তাহলে বর্তমান সময়ের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তারা পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। ক্লাসরুমে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহারডিজিটাল হাজিরা  ডকুমেন্টেশনবিদ্যালয়ের নিজস্ব কম্পিউটার  প্রিন্টার ব্যবহার প্রভৃতি বিষয়ে কথা বলা হলেও কার্যত এগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

বিভিন্ন সরকারি  বেসরকারি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়শিক্ষা অবকাঠামোর দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। বর্তমানে ২০ হাজার ৮৪৯টি মাধ্যমিক স্কুলে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি ক্লাসে শতাধিক শিক্ষার্থী ক্লাস করছে। ক্লাসরুমের দুরবস্থাফ্যানের শব্দঅল্প জায়গায় অনেক শিক্ষার্থী প্রভৃতি দিক বিবেচনায় এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান সহজেই অনুমেয়। পাঠাগার করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনেক স্কুলে বরাদ্দ রয়েছে। বরাদ্দের টাকা দিয়ে বই কেনা হয়। কিন্তু এক বা দুই বছর পর ক্রয়কৃত বইগুলোর অধিকাংশই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়। কারণ পাঠাগার ব্যবস্থাপনার জন্য যথাযথ অবকাঠামো  জনবল সংকট। সরকার অনেকগুলো কম্পিউটার ল্যাব করে দিয়েছে। এসব ল্যাবে ১৫-২০টি কম্পিউটার  আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়। ব্যবহার করতে না পারাকম্পিউটার শিক্ষকের অদক্ষতাযথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে একটা নির্দিষ্ট সময় পর অধিকাংশ কম্পিউটার নষ্ট হয়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক স্কুল তুলনামূলক সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হলেও বিভিন্ন কারণে সেসব স্কুলে সরকারি অনুদানে কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এছাড়া বিজ্ঞান বিষয়ে ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদানের জন্য আলাদা ল্যাব  যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে  ধরনের বিজ্ঞান ল্যাব নেইযেখানে ল্যাবরেটরি আছে সেখানে আবার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি  উপকরণ নেইযেখানে প্রয়োজনীয় উপকরণ আছে তার অনেক জায়গায় তা ব্যবহার উপযোগী নেইআবার ব্যবহার উপযোগী থাকলে তা ব্যবহার করার মতো দক্ষ জনবল নেই।  রকম অদ্ভুত এক দুষ্টচক্রে ঘুরছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা।

মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত দুর্বলতা আরো প্রকট। ক্লাসরুমের শিক্ষার বাইরে অন্য আনুষঙ্গিক অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মাদ্রাসাগুলোর চিন্তা প্রক্রিয়ায় উদারতার অভাব রয়েছে। মাদ্রাসার শিক্ষকদের অনেকেই মনে করেন সরকারি অনুদান  সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে তারা তুলনামূলকভাবে স্কুলের চেয়ে পিছিয়ে থাকেন। বিপরীত দিকে স্কুলের শিক্ষক  পরিচালনা পর্ষদের অনেকে মনে করেনমাদ্রাসাগুলো ধর্মীয় কারণে সারা বছর বিভিন্ন ধরনের দান  অনুদান পেতে থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে অনুদান সংগ্রহের জন্য মাদ্রাসাগুলো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সংস্কারকে ফেলে রাখে।  ধরনের জটিলতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয়। গ্রামীণ পর্যায়ে কওমি মাদ্রাসাগুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতা আরো বেশি দৃশ্যমান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসাগুলো আবাসিকভাবে পরিচালিত হয়। সংগত কারণেই একজন শিক্ষার্থী সারাক্ষণ মাদ্রাসার সীমানাপ্রাচীরের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের শারীরিক  মানসিক বিকাশের জন্য যে ধরনের পরিবেশ  পারিপার্শ্বিক সুযোগ-সুবিধা দরকারঅধিকাংশ মাদ্রাসায় তা অনুপস্থিত। একটা নির্দিষ্ট কক্ষে তাদের ক্লাস হয়। বসার মতো প্রয়োজনীয় বেঞ্চ  অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল থাকার কারণে ফ্লোরে বসে অনেককে লেখাপড়া করতে হয়। পাঠদান পদ্ধতিতে প্রযুক্তির ব্যবহারের দিক দিয়ে স্কুলের তুলনায় মাদ্রাসাগুলো অনেক পিছিয়ে। খেলাধুলা  অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই অধিকাংশ মাদ্রাসায়।

প্রাথমিক বিদ্যালয়মাধ্যমিক স্কুল কিংবা মাদ্রাসাসবখানেই সরকারিআধাসরকারি  প্রাইভেট এই তিনটি ধারা রয়েছে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যে ধারারই হোক না কেনসেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো  সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। প্রতি বছর শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। ২০০০ সালের আগে চ্যালেঞ্জগুলো ছিল শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া রোধ করামেয়ে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া নিশ্চিত করা  সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ তৈরি করে দেয়া। ২০০০ সালের পর থেকে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের দিকে মনোনিবেশ করা হয়েছে। গত এক দশকে ফোকাস পরিবর্তন করে গুণগত  মানসম্মত শিক্ষার কথা বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী মহল থেকে বলা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকার  শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অন্য স্টেকহোল্ডারদের অনেকেই মনে করেন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ  অবকাঠামো ব্যবহার করে যুগোপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত করা। এখানেই সম্ভবত শিক্ষাসংক্রান্ত নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে বড় ভুলটি হচ্ছে।

মেট্রোপলিটন বা পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিফলন নয়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী গ্রামাঞ্চল থেকে উঠে আসে। বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো ধরনের নীতি  অগ্রাধিকার ঠিক করা উচিত। অধিকাংশ গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো বসার জায়গা অপ্রতুল। ছোট ছোট ভাঙাচোরাঅস্বাস্থ্যকর  স্যাঁতসেঁতে শ্রেণীকক্ষে অনেক শিক্ষার্থী একসঙ্গে গাদাগাদি করে বসে ক্লাস করে। যেখানে শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব হয় না গ্রুপ ওয়ার্ক বা উদ্ভাবনীমূলক কোনো পাঠদান পদ্ধতির প্রয়োগ করা। চাইলেই একজন শিক্ষক ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানসম্মত উপায় বসাতে পারেন না। ক্লাসরুমে স্থান সংকুলান না হওয়ার কারণে শিক্ষক কোনো ধরনের পরীক্ষণে যেতে পারেন না। চার-পাঁচ ফুট লম্বা একটি বেঞ্চে চার থেকে ছয়জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসে ক্লাস করে। একটি ক্লাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন শিক্ষক ক্লাসে আসেন। বিরতির সময় ভালোভাবে অতিবাহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় কক্ষ  অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নেই। আলাদা লাইব্রেরি বা পড়ার স্থান নেই যেখানে বসে শিক্ষার্থীরা পরের দিনের ক্লাসের প্রস্তুতি নিতে পারে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কম্পিউটার থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ব্যবহার অনুপযোগী। ল্যাবরেটরির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম  উপকরণ শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করবে অনেকে তা কল্পনাও করেন না। 

গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঢেলে সাজাতে হবে। অবকাঠামোগত সংস্কারের কথা বললেই অনেকে অধিক জনসংখ্যা বা শিক্ষার্থী সংখ্যার আধিক্যের কথা বলেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দে সরকারি তহবিলের সীমাবদ্ধতার কথা বলেন। কিন্তু ক্রয়কৃত কম্পিউটার কেন নষ্ট হয়ে যায়লাইব্রেরির জন্য সংগৃহীত বইগুলো কেন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়নির্মিত ভবনগুলো কেন অপরিকল্পিতশিক্ষায় সহশিক্ষা কার্যক্রম কেন অবহেলিত বিষয়গুলো আড়ালেই থেকে যায়। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হয়তো প্রয়োজনের তুলনায় কমঅধিক জনসংখ্যার সমস্যাকে বাস্তবিক কারণেই অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আসল সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ  তার যথাযথ বাস্তবায়নে। অপরিকল্পিত উদ্যোগঅবকাঠামোগত উন্নয়নে বিভিন্ন সুবিধাভোগীর অবৈধ অনুপ্রবেশদীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবরক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা  প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ জনবলের অভাবের কারণে বরাদ্দকৃত অর্থ প্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারছে না। সে কারণেই স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছর পরে এসেও আমাদের বাংলাদেশ মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত করতে পারেনি।


মন্তব্য করুন