প্রভাষক
০১ অক্টোবর, ২০২২ ১০:৪৬ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
তথ্য প্রযুক্তি : তথ্য প্রযুক্তি হল তথ্য পরিচালনা ও বিতরনের জন্য কম্পিউটার সিস্টেম, সফ্টওয়্যার এবং নেটওয়ার্কের বিকাশরক্ষাণাবেক্ষণ এবং ব্যবহার সম্পর্কিত প্রযুক্তি। বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্যে সংগ্রহ করে, তথ্যের সত্যতা জেনে ঔ সকল তথ্যের প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষন প্রণালী প্রস্তুত, আধুনিকীকরণ, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিকে বলা হয় তথ্য প্রযুক্তি বা ইনফরমেশন টেকনোলজি।
২০২০ সালে DSP সিটি-সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের এক পরিসংখ্যান তথ্য হতে জানা যায়, ১৮ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ৭ %, ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ৩৪ %, ২৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ৩৬%, ৩৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারী-পুরুষের মধ্যে ২০% এবং ৫৫ থেকে বেশি বয়সী নারী ও পুরুষের মধ্যে ৩% তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নানান রকম আপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে।
পৃথিবীর আয়ু বৃদ্ধির সাথে সথে বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাচ্ছে আমাদের সামনে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি আমাদের শেষ পর্যন্ত কোন দিগন্তে নিয়ে যাবে সেটা ধারণার বাহিরে ।এক পা দু পা করে আমরা সভ্যতার একেকটি স্তর পার হয়ে যাচ্ছি। প্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। আবার আমাদের কাছ থেকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধে কেড়ে নিয়েছে। এ কথা আমি বলতে চাই না যে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের সমাজের জন্য প্রয়োজন নাই । সভ্যতার উন্নয়নে তথ্য প্রযুক্তির অবদান অপূরণীয়। কিন্তু আমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছি যে প্রযুক্তির অকল্যাণকর দিকগুলো আমাদের অবস্থান কোথায় নামিয়ে দিচ্ছে ?
আমাদের তথ্য প্রযুক্তি কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক ও নৈতিক জ্ঞানহীন মানুষের হাতে আক্রান্ত। অপরাধের একটা বড় অংশ এই সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়।মানুষের আবেগ ও অনুভূতিতে আঘাত হানার মাধ্যম হিসেবে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন অসামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোকে। আর এ মূল্যবোধহীন মানুষগুলো তথ্য প্রযুক্তিকে তাদের ভোগ ও আয়েশের ক্ষেত্র বানিয়ে ফেলেছে ।
দেশে ব্যবহৃত ইন্টারনেটের অর্ধেকের বেশি ব্যয় হচ্ছে পর্নোগ্রাফিক ও বিভিন্ন অনলাইন গেমস , সহ টিকটক ও লাইকি এর মত অ্যাপস এ। শহর বা স্কুলের ৬০ শতাংশ ছেলেমেয়েই আজ যে পর্নোগ্রাফি আসক্ত হয়েছে। আর এই পর্নোগ্রাফিতে মাত্রাতিক্ত আসক্তি তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার এর ফল। তাই সন্তানের হাতে বড় বড় উন্নত মোবাইল বা ট্যাব দেওয়ার আগে একটু ভাবুন, সে এর নিরাপদ ব্যবহার করতে পারবে কি না। তা না হলে নতুন প্রজন্মের মেধার অপচয় ঠেকানো যাবে না, অপরাধও আরো বেড়ে যাবে। ফলে তরুণ প্রজন্ম শারীরিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি মানসিক অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে।বিশ্বে প্রতিদিন ৭০০ মানুষ আত্মহত্যা করছে শুধু তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহারের শিকার হয়ে। পাশাপাশি এটি বর্তমান প্রজন্মকে অনেকটা নেশাগ্রস্ত করেছে। ফলে প্রজন্ম বইমুখী না হয়ে সময় দিচ্ছে ফেসবুকে, মোবাইলে ও ইন্টারনেটে। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই সর্বনাশা আন্তর্জাতিক চক্রান্ত থেকে বাঁচানোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এবং ক্ষতিকর সাইটগুলো বন্ধ অথবা প্রবেশাধিকার রোধ করতে হবে। অন্যথায় আমরা অচিরেই অসভ্যতার আঁধারে ডুবে যাব।
বিভিন্ন অনলাইন গেমস যেমন ফ্রী ফায়ার, পাবজি, অনলাইন গেমসগুলো যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে ফলে নানা রকম মানুষ তাদের অভিযোগ প্রদান করে যার ফলে পরবর্তীতে দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া হয় এসমস্ত অনলাইন গেমস।এছাড়াও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে 20 হাজারের বেশি পর্ণোগ্রাফি সাইট।বর্তমান সময়ে দেশে ব্যবহার করা ২৬০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথের ৫০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে টিক টক, লাইকি, ফ্রী ফ্রায়ার, পাবজি অনলাইন গেমস ও পর্নোগ্রাফি দেখবার জন্য যা খুবই দুঃখজনক।
তথ্য প্রযুক্তিগত অপব্যাবহার কিশোর- কিশোরীদের মানুষিকতার ব্যাপক পরিবর্তন ও নৈতিক বিপর্যয় হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশে বিভিন্ন জেলায় কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে যার মধ্য ঢাকায় ৫০ থেকে ৬০ টি,খুলনাতে ৩ টি, যশোরে ১৫-২০ টি, ফেনীতে ১০ টি,রাজশাহীতে ৮১ টি, চট্রগ্রামে ১৬ টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে যারা তথ্য প্রযুক্তির অপব্যাবহার করে, ২০% খুন, ২৪% নারী ও শিশু নির্যাতন, এবং ছিনতাই, চাঁদাবাজি সহ জটিল অপরাধ করে আসছে।এই কিশোর গ্যাং গুলো মূলত ফেসবুক, টুইটার,হোয়াটস এপ, এ গ্রুপভিত্তিক অপরাধ কাজ গুলো করে থাকে।
তথ্য চুরি
এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৫৯ শতাংশ চাকরিজীবী তাদের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরও পুরাতন প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেস থেকে তথ্য চুরি করতে তৎপর হন। যেহেতু তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ ব্যক্তিরাই এই অপরাধমূলক কাজ বেশি করে থাকেন সে ক্ষেত্রে তারা নিজেদের গোপনীয়তার ব্যাপারে বেশ সচেতন এবং পরিণামে তাদের অনেকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। তাই তথ্য-প্রযুক্তি শুধু কল্যাণের জন্য এই মনোভাবটা মানুষের ভেতর জাগিয়ে ব্যক্তি পর্যায়েও নৈতিকতা রেখে তৃণমূলের সব শ্রেণির মানুষের কাছে এই সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু তথ্য-প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সবার জানা না থাকায় সম্ভব হচ্ছে না।
তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার ফলে আমাদের তথ্য প্রযুক্তি আজকাল কিছু অল্প বয়সী ও নৈতিক শিক্ষাহীন মানুষের হাতে ধ্বংস হচ্ছে। অপরাধীরা তাদের অপরাধ কাজের একটা বেশির ভাগ এই সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে কেন্দ্র করে সংগঠিত করে । মানুষের আবেগ ও অনুভূতিতে আঘাত হানার মাধ্যম হিসেবে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোকে। মূল্যবোধ বিবর্জিত মানুষেরা প্রযুক্তিকে তাদের ভোগ ও আয়েশের ক্ষেত্র তৈরি করে ফেলেছে। তথ্য বিকৃতি, ব্যক্তিগতভাবে সমাজের কোনো মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা, প্রতিকৃতির ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন ইত্যাদি বিষয় সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া একটি নিত্যনৈমিত্তিক কাজে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের তথ্য ও ছবি চুরি করে ব্ল্যাকমেল করার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। বিভিন্ন অপরাধী মহল তাদের অপরাধী কর্যকলাপ ঘটানোর জন্য ইন্টারনেটকে গোপনীয় মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নিজের সকল পরিচয় গোপন রাখতে পারে বলে কাউকে হুমকি দেওয়া, মিথ্যা সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেওয়া, অথবা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য ধারণ করে বিভিন্ন অনলাইন সাইটে ছড়িয়ে দেওয়া এসব কাজ অনায়াসে সম্ভব হয়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে কম্পিউটারের তথ্য হ্যাকিং সম্পর্কিত ঘটনা বেশি ঘটছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সী তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতাটি বেশি লক্ষ্য করা যায়। তরুণদের পাশাপাশি বিভিন্ন মেইন স্ট্রিম মিডিয়াগুলোও নানাভাবে ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় গত ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের তথাকথিত হ্যাকার গ্রুপ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার দ্বারা ভারতের প্রায় পঁচিশ হাজারেরও বেশি ওয়েবসাইট আক্রান্ত হয় | এগুলোর মধ্যে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইটসহ বিএসএফের (Border Security Force) ওয়েবসাইটও ছিল। তা ছাড়া একই বছর কক্সবাজারের রামুতে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার পেছনে ফেসবুকের অপব্যবহারই দায়ী | বৌদ্ধ ধর্মের এক ব্যক্তির নাম দিয়ে খোলা ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পবিত্র কোরআন শরিফের একটি অবমাননাকর ছবি প্রকাশ করা হয় | এই ঘটনার জের ধরে ওই এলাকায় সাধারণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন | অথচ পরবর্তীতে ছবিটির সত্যতা যাচাই সম্ভব হয়নি। অনুসন্ধান করে দেখা যায় ছবি প্রকাশকারী ব্যক্তির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা ছিল নিছক বানোয়াট এক ব্যাপার। সমাজে ঘটে যাওয়া এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা বস্তুত সামাজিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ।
মূলত শুধু ইন্টারনেট নয় বরং প্রযুক্তির অন্যান্য খাতকে ব্যবহার করেও যেকোনো অপকর্ম খুব দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। আর তাই আমরা তথ্য প্রযুক্তির সঠিক ব্যাবহার নিশ্চিত করি এবং এর অপব্যাবহার রোধে যথেষ্ট সচেতনতা অবলম্বন করে সুস্থ দেশ সমাজ ব্যাবস্থা গড়ে তুলি।
৫৩
৯২ মন্তব্য