Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ অক্টোবর, ২০২২ ০৮:২৬ অপরাহ্ণ

এডিস মশা কোথা থেকে কীভাবে এলো?

এডিস মশা কোথা থেকে কীভাবে এলো?

এডিস মশা প্রথমে ছিল আফ্রিকায়, সেখানে মশা বাস করত গাছের কোটরে, পাতার বোটা ও বাঁশের গোড়ার গর্তে। বৃষ্টি হলেই এসব জায়গায় জমে থাকা পানিতে মশা ডিম পাড়ে। প্রতিটি ডিম থেকে শত শত মশার জন্ম হতো এবং এভাবেই বংশ বৃদ্ধি ঘটত। বর্ষাকাল এবং অতিরিক্ত আর্দ্র পরিবেশ এডিস মশার বংশ বৃদ্ধির জন্য খুবই উপযোগী। বৃষ্টির পানি শুকিয়ে যাওয়ার পরও ডিমগুলো অনেক দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে। আবার বৃষ্টির পানি পেলেই ডিম থেকে এডিস মশার জন্ম হয়। ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকারীরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ভ্রমণ করলে এ মশাগুলো একসময় আফ্রিকা থেকে জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রপথে আমেরিকা ও এশিয়াসহ সারা বিশ্বে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন রকমের যানবাহনের মাধ্যমে এক অঞ্চল বা এক দেশ থেকে মশা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এ এডিস মশা বহুদিন ধরেই ‘পীত জ্বরের’ বাহক হিসেবে পরিচিত। মশাগুলো প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম পাত্রে যেমন- ড্রাম, পড়ে থাকা টায়ার, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল, মাটির পাত্র বা ভাঙা বোতল, ডাবের খোসা বা যে কোনো পরিত্যক্ত পাত্রে স্থির জমা পানিতে ডিম পাড়ে এবং শত শত ডেঙ্গুবাহিত মশা জন্মলাভ করে। এ মশাগুলো আবার সুন্দর সুন্দর বসতবাড়িতে প্রবেশ করে এবং ঘরে জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে যেমন ফুলদানি, ফুলের টব, এয়ারকুলার, ফ্রিজ, অব্যবহৃত কমোড, ছাদে এবং নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি মশার বংশ বৃদ্ধির সহায়ক। জলবায়ু পরিবর্তন, ভাইরাসের বিবর্তন, অপরিকল্পিত ও অত্যধিক নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ও অস্বাস্থ্যকর বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনার কারণে মশার বিস্তার ঘটছে এবং ডেঙ্গুজ্বর বেড়েই চলেছে।

ডেঙ্গু বা ডেঙ্গি নামটি কোথা থেকে এলো?

ডেঙ্গু নামটি কোথা থেকে এসেছে তা পরিষ্কার নয়। ৪২০ খ্রিস্টাব্দে চীনাদের বর্ণনায় জানা যায়, এ ভাইরাস ‘উড়ন্ত কীট’-এর মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। কিন্তু ধারণা করা হয়- আফ্রিকার সোয়াহিলি ভাষার প্রবাদ ‘কান্ডডিঙ্গা পেপো’ থেকে ‘ডেঙ্গু’ নামটি এসেছে। ওই শব্দের অর্থ- শয়তানের শক্তির কাছে আটকে যাওয়ার মতো ব্যথা। অনেকেই এর অর্থ করেন- দুষ্ট আত্মা দ্বারা বন্দী বানানো। কারও কারও ধারণা স্প্যানিশ ডেঙ্গু শব্দ থেকে এ রোগের নামকরণ করা হয়, যার অর্থ ‘হাড়ভাঙা জ্বর’। তাদের বিশ্বাস ছিল- ‘খারাপ আত্মার সংস্পর্শে হাড়গোড় ভাঙার ব্যথাঅলা’ এ জ্বর হয়। আবার কোনো কোনো স্প্যানিশ এটিকে বলে ‘ডিঙ্গা’, যার অর্থ ‘যত্নশীল বা সতর্ক থাকা’। নেদারল্যান্ডসে ডেঙ্গু নিয়ে এক গবেষকের মতে, সোয়াহিলি ভাষার ডিঙ্গা শব্দটি স্প্যানিশ শব্দ ডেঙ্গু থেকে আসতে পারে, যার মানে হলো ‘সতর্ক থাকা’। একজন ব্যক্তির হাড়ে ব্যথা থেকে সতর্ক থাকা ব্যাখ্যা করতে বুঝানো হয়, যা ডেঙ্গুজ্বরের সময় হয়ে থাকে। অনেকের ধারণা ওয়েস্ট ইন্ডিজের গোলাম বা দাসরা এ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অনেকটা ত্যাড়াব্যাঁকা হয়ে হাঁটতো, তখন তাদের হাঁটার ভঙ্গিমা ডান্ডি নৌকার মতো বলে ডাকা হতো ‘ডান্ডি ফিভার’, সেখান থেকে ডেঙ্গু নামটি এসেছে।

এ জ্বরকে শনাক্ত করা হয় ১৭৭৯ সালে। ১৭৭৯ সালের পরের বছর প্রায় একই সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকায় ব্যাপকভাবে দেখা যায়। শরীরে ব্যথার কারণে তখন একে হাড়ভাঙা জ্বর বলেও ডাকা হতো। ১৮২৮ সালের পর ডেঙ্গুজ্বর শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ

ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধে দুটি মূল বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া উচিত। ১) এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা এবং মশাকে মেরে ফেলা, ২) মশার কামড় থেকে নিজেকে বাঁচানো। ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কোনো একক ব্যক্তি, সংগঠন বা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। সবার সময়োপযোগী, কার্যকর পদক্ষেপ, সমন্বিত সচেতনতা, মশা নিধনে বিদ্যমান প্রকল্পগুলোকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সরকার এবং জনগণের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এ মহামারি থেকে আমাদের সুরক্ষিত রাখতে। পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা, মশার জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, মশক নিধন কীটনাশক প্রয়োগ এবং গণসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ডেঙ্গু মহামারি থেকে সুরক্ষিত থাকতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। নিজে সচেতন না থেকে শুধু সরকারের সমালোচনা ডেঙ্গু থেকে মুক্তি দিতে পারবে না। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন সচেতনতা। এ বিষয়ে সামাজিকভাবে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

সরকার-জনগণ উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ এবং পরিকল্পিত উদ্যোগই পারে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমিয়ে এ সংকট থেকে আমাদের সুরক্ষিত রাখতে। তাই ডেঙ্গু নিয়ে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। মনে রাখতে হবে এসবক্ষেত্রে প্রতিকার নয় প্রতিরোধ সর্বদা উত্তম।

মন্তব্য করুন