চাতক (বৈজ্ঞানিক নাম: Clamator jacobinus), পাকড়া পাপিয়া বা পাপিয়া Cuculidae (কুকুলিডি) গোত্র বা পরিবারের অন্তর্গত Clamator (ক্ল্যামেটর) গণের অন্তর্গত এক প্রজাতির বড় আকারের বাসা পরজীবী পাখি।[২][৩] বাংলাদেশে করুণ পাপিয়া (Cacomantis merulinus) নাম আরেকটি পাখি পাপিয়া নামে পরিচিত। চাতকের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ জ্যাকোবিনের চেঁচানো পাখি (লাতিন: clamator = আর্তনাদকারী পাখি, jacobinus = জ্যাকোবিনের, মধ্যযুগীয় ধর্মপ্রচারক গোষ্ঠী)।[৩]
চাতক পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো; এরা বৃষ্টির জল ছাড়া অন্যকোনো জল পান করে না। এমনকি তৃষ্ণায় মরে গেলেও এরা অন্য জল পান করে না।এই পাখিকে খাঁচায় পুষে পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যে এরা আসলেই বৃষ্টির জল ছাড়া অন্য জল পান করে না।
পাকড়া পাপিয়া দেশের দুর্লভ পাখিগুলোর একটি। এরা পরিযায়ী। বছরের বেশিরভাগ সময় এদেশেই থাকে। শীতকালে চলে যায় আফ্রিকায়। ফিরে আসে শীত শেষে। আগে যেখানে থাকত আবার সেখানে ফিরে যায়। এরা গাছের উঁচু ডালে একা একা বসে থাকে। বৈদ্যুতিক তারেও বসতে দেখা যায়। মাঝে মাঝে একজোড়া পাখি এক সঙ্গে দেখা যায়। এরা ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে খাবার খায়। শুঁয়োপোকা, উই, পিঁপড়া, ছারপোকা এদের প্রধান খাদ্য।
পাকড়া পাপিয়ার চেহারায় রাজকীয় একটা ছাপ আছে। মাথায় শিংয়ের মতো ঝুঁটি। পিঠ, পাখা ও লেজ কালো। দুই পাখায় একটা করে ছোট সাদা পট্টি। লেজের আগার দিকের কিনার সাদা। গলা, বুক ও পেট সাদা। মাথা, ঘাড়, লেজ, ঝুঁটি ও ঠোঁট কালো, পা কালো। তবে সাদা লোমে ঢাকা।
‘পিউ...পিউ...’ স্বরে ডাকে। কোকিল গোত্রের পাখি। বাসা বাঁধে না। ডিমে তা দেয় না। ছানাও লালন-পালন করে না। বসন্তকালে ডিম পাড়ে ছাতারে পাখির বাসায়। ছাতারে নিজের ডিম মনে করে তা দেয়। ছানা বড় করে। একসময় ছাতারে বুঝতে পারে ছানা তার নয়। তখন ঠুকরে পাপিয়ার ছানাগুলো তাড়িয়ে দেয়। ততদিনে উড়তে শিখে যায় ছানা।
পাকড়া পাপিয়া দেশের একেবারেই দুর্লভ পাখি। এদের সংরক্ষণে সবার এগিয়ে আসা দরকার।চাতকের বিস্তৃতি :
চাতক পাখি বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দেখতে পাওয়া যায়। ভারতের উত্তরাখণ্ডে চাতক পাখির দেখা মেলে। উত্তরাখণ্ডের গাড়ওয়ালে একে ‘চোলী’ বলা হয়। গাড়ওয়ালের লোকেদের মতে, চাতক বেশির ভাগ সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। চাতককে মাগওয়া ও মাড়োয়ারি ভাষায় পাপিয়াও বলা হয়ে থাকে। চাতকের বিচরণ ক্ষেত্র : আফ্রিকার দক্ষিণ থেকে তাঞ্জানিয়া ও জাম্বিয়া পর্যন্ত এবং উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে নেপাল, বাংলাদেশ, মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত।
অর্থাৎ বলা যায়, সারা পৃথিবীর বিশাল এলাকা জুড়ে এদের বসবাস। আর আয়তনে প্রায় ৩৬ লাখ ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এদের আবাস।
চাতক নিয়ে লোকবিশ্বাস :
অনেক সময় দেখা যায় বৃষ্টির মৌসুম ছাড়াই শীতকালে বা অসময়ে আকাশে কোনোরকম মেঘ ছাড়াই হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি নামে। এরকম হঠাৎ বৃষ্টি হলে গ্রামের মুরুব্বীরা বলেন, চাতক পাখির আর্তনাদ আর প্রার্থনায় মেঘদেবতা বা মিকাইল ফেরেশতা বৃষ্টি দিতে বাধ্য হয়েছে। সেই বিশ্বাস থেকেই আগের দিনে গ্রামবাংলায় চৈত্র-বৈশাখে অনাবৃষ্টি আর খরা দেখা দিলে, খড়কুটো দিয়ে প্রতীকী চাতক পাখি বা চাতকমূর্তি বানিয়ে; সেটিকে খোলা মাঠে আকাশের দিকে অনেক উঁচু করে রাখা হতো।
৫৩
৯২ মন্তব্য