সহকারী শিক্ষক
১৯ অক্টোবর, ২০২২ ০৬:২৮ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মদ (খামরুন) হল এমন এক অ্যালকোহলীক পদার্থ, যা (মন মস্তিষ্কে) নেশা ও মাদকতা উৎপন্ন করে।
আমাদের একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মাদক এমন একটি পদার্থ, যা একটি মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও দৈহিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি সাধন করে, ক্ষতি সাধন করে তার দ্বীন ও দুনিয়ার। একই ভাবে একথা বলারও অপেক্ষা রাখে না যে, মাদক পরিবার-পরিজন ও জ্ঞাতী-বংশকে এমন বিপদ-বিপর্যয়ের মাঝে ফেলে দেয়, যা থেকে উৎরে ওঠা, যা থেকে স্ত্রী- সন্তানদের জন্য মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানো সুকঠিন হয়ে পরে। মাদক সমাজ ও জাতি’র রুহানী, বৈষয়িক এবং চারিত্রিক অস্তিত্বের প্রশ্নে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
আরবরা জাহেলীয়াতের যুগে ছিল মদ পানের প্রতি গভীরভাবে আসক্ত । মদের সাথে ছিল তাদের গভীর বন্ধুত্ব ও অনুরক্ততা। তারা তাদের এ আসক্তি ও অনুরক্ততার কথা তাদের সাহিত্যের ভিতরেও প্রকাশ ঘটাতো। এমনকি মদের শ’খানেক নামও দিয়েছিলো তারা। এর বিভিন্ন গুণাগুণ তাদের কবিতাগুলোতে উচ্চারিত হত। বিভিন্ন আসরে আসরে বর্ণিত হত এর রকমারি চমক ও চানোক্য ।
যখন ইসলাম আবির্ভূত হল, সে তখন তাদেরকে একটি প্রজ্ঞাপূর্ন রাজপথে পরিচালিত করলো। ইসলাম তাদের ওপর মদকে হারাম করে দিল একটি ধারাবাহিকতা মেনে, একটি ক্রমধারা মেনে। তাদেরকে প্রথম ধাপে মদে-মত্তো অবস্থায় নামায পড়া থেকে নিষেধ করা হল। এরপর তাদেরকে বলে দেয়া হল যে, মদের মধ্যে যেসব উপকারিতা রয়েছে যেসব ফায়দা রয়েছে, তার তুলনায় এর গোনাহ ও অপরাধের দিকটিই অধিক মারাত্মক। এরপর আল্লাহ তাআলা সূরা মায়েদা’র নিম্নোক্ত ব্যাপক তাৎপর্যবহ ও অকাট্য আয়াতে কারিমাটি নাজিল করলেন –
“হে ইমানদারগণ! নিশ্চই খামরুন (মদ ও মাদক), মাইসীরুন (জুয়া), আনসাব্ (বলীদানের স্থান) এবং আযলাম (ভাগ্য গণনার শর)-শয়তানের অ-পবিত্রসব কাজ। বিধায় তোমরা তা পরিহার করে চলো। আশা করা যায়, তোমরা সফলতা লাভ করতে পারবে। নিশ্চই শয়তান চায় যে , মদ ও জুয়ার আবর্তে ফেলে সে তোমাদের পরষ্পরের মাঝে দুশমনি ও জিঘাংসা সৃষ্টি করে দিবে এবং তোমাদেরকে আল্লাহ’র স্মরণ ও নামায থেকে ফিরিয়ে রাখবে। সুতরাং, (এখন এসব থেকে) তোমরা বিরত হবে কি? [সূরা মায়েদাহ- ৯০, ৯১]
আল্লাহ তাআলা এ আয়াত দুটিতে মদ ও জুয়াকে একেবারে চূড়ান্ত ও কঠোর ভাষায় হারাম করে দিয়েছেন এবং এদেরকে বলিদানের স্থান এবং ভাগ্য গণনার শর – এর সাথে একই সঙ্গে উল্লেখ করে এ কাজ দুটিকে অপবিত্র/পঙ্কিলতা হিসেবে গণ্য করে নিয়েছেন। আর রিযসুন কথাটি যখন কুরআনে ব্যবহৃত, তখন সেটা শুধুমাত্র ফাহেশা, জঘন্য, বিভৎস ও পঙ্কীল জাতীয় কিছু বোঝাতেই মূলতঃ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তদুপরি এ কাজ দুটিকে আবার শয়তানের কাজ বলে অভিহিত করেছেন; আর শয়তানের কাজই হল ফাহেশা ও বদ্ কাজ করা। এখানে মদ্যপান ও জুয়াকে পরিহার করে চলার আহবান জানান হয়েছে; সাথে এই পরিহারকরণকে বানিয়ে দেওয়া হয়েছে সাফল্যের পানে ধাবিত হওয়ার পথ। আরও বলা হয়েছে, এ দু’কাজের বিভিন্ন সামাজিক ক্ষতির কথা। বলা হয়েছে, এসব কাজ নামাজ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে, সৃষ্টি করে একে-অপরের মাঝে দুশমনি ও জিঘাংসা। মাদক এবং জুয়ার আরও অন্যতম ক্ষতি এই যে, তা নামায এবং আল্লাহর স্বরণের ন্যায় দ্বীনের বিভিন্ন অপবিহার্য বিষয়-যা আত্মার রুহানী খোরাক- তা থেকে মানুষকে সরিয়ে রাখে। পরিশেষে মাদক ও জুয়া থেকে সম্পূর্ণ রূপে দূরে থাকার আহবান জানিয়ে সর্বশেষ বাক্যে বলা হয়েছে – ‘তাহলে এখন তোমরা বিরত হবে কি’? এর জবাবে তখন একটি চুড়ান্ত কথাই উচ্চারীত হয়েছিল মুমিনদের পক্ষ থেকে। আর সেটি ছিল- ‘হে আমাদের রব! আমরা পরিহার করলাম’– ‘হে আমাদের রব! আমরা পরিহার করলাম’।
এ আয়াতখানি নাজিল হবার পর মু’মিন সমাজ এক বিষ্কয়কর দৃশ্যের অবতারনা করেছিলেন। তখন যার হাতে মদের পানপাত্র ছিল, এমনকি তা থেকে কিছুটা তিনি পানও করেছিলেন, কিছুটা অবশিষ্টও ছিল, এমতাবস্থায় তাঁর কাছে যখন এ আয়াতের কথা গিয়ে পৌঁছলো , তখন তিনি মদের সেই পানপাত্রটিকে তাঁর মুখ থেকে সরিয়ে নিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন।
· বস্তুত: বহু রাষ্ট্র বহু সরকার আজ মাদকের ব্যক্তি, পারিবারিক এবং জাতিগত নানান ক্ষয়-ক্ষতি ও অবক্ষয়ের কথা স্বীকার করে নিয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ -যেমন: আমেরিকা- রাষ্ট্রীয় আইন বলে মাদকদ্রব্য নিষিদ্ধ করে দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু তাতে তারা ব্যর্থতারই মুখ দেখেছে। অপর দিকে শুধুমাত্র ইসলামই তার এ যুদ্ধে জয় লাভ করে মাদকের দফারফা করে দিয়েছিল। এর বিপরীতে মাদক সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান সুস্পষ্ট সুদৃঢ়। মাদক সেবন পর্যায়ে যত ধরনের সাহায্য সহযোগীতা হতে পারে, ইসলামে তার সবগুলিই নিষিদ্ধ।
প্রত্যেক নেশাকর জিনিসই (মাদক/মদ)
নবী করি (সা) যখন সর্বপ্রথম মদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘোষনা দেন, তখন তিনি এদিকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করেননি যে , কোন্ কোন্ জিনিস থেকে মদ তৈরী করা হয়, বরং তার মূল দৃষ্টি ছিল -মদ (মানুষের মধ্যে) যে আছোর ও প্রতিক্রিয়া ঘটায় -সে দিকে; আর সেটা হল মাতালতা , নেশা ও মাদকতা। কাজেই যে জিনিসের মধ্যেই এই মাদকতা, নেশা ও মাতালতার শক্তি বিদ্যমান থাকবে, সেটিই (খামরুন/মাদক/মদ) হিসেবে বিবেচিত হবে -চাই মানুষ সেটার যে নাম বা উপনামই দিক না কেনো -চাই তা যে জিনিস থেকেই প্রস্তুত করা হোক না কেনো। সুতরাং, ‘বিয়ার’ এবং এজাতীয় মাদকগুলোও হারাম।
নবী করি (সা) এর কাছে ‘মধু’ থেকে প্রস্তুতকৃত, কিংবা ‘ভুট্ট’’ ও ‘যব’ ভিজিয়ে পরে তা ঘন করে যে মদ প্রস্তুত করা হয় -সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন – “প্রত্যেক নেশাকর জিনিসই খামরুন (মাদক/মদ)। আর প্রত্যেক খমরুন’ই হারাম”। [সহিহ মুসলীম- ৩/১৫৮৮ হাদিস ২০০৩;
(রাসুলুল্লাহ (সা) আরো বলেছেন) – “যে জিনিসের এক ফরক্ব পরিমান মাতালতা/নেশা/মাদকতা সৃষ্টি করে, তার অঞ্জলী ভরা পরিমানও হারাম”। [মুসনাদে আহমদ- ২/৭১, ১৩১; (ফারাক্ব) বলতে বোঝায় এমন পাত্রকে, যার মধ্যে ষাট রতল পরিমান জায়গা সংকুলান হয়।
মদ/মাদক ব্যবসা
মদ/মাদক -চাই কম হোক বা বেশি- নবী করিম (সা) সেটাকে শুধু হারাম করে দিয়েই ক্ষ্যান্ত হন নি, বরং মাদক ব্যবসাকেও তিনি হারাম করে দিয়েছেন -চাই সেই ব্যবসাটি অমুসলীমদের সাথেই করা হোক না কেনো। সুতরাং কোনো মুসলমানের জন্যই এ কাজ জায়েয নয় যে, সে মাদক আমদানী-রপ্তানীর কাজ করবে, অথবা মাদক বিক্রির দোকান দিয়ে বসবে, কিংবা কোনো মদের দোকানে চাকুরী করবে।
এ পর্যায়ে নবী করিম (স) মাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট দশ শ্রেণির ব্যক্তির উপরে লা’নত দিয়েছেন। তারা হল- “যে (দ্রব্য নিংরিয়ে/প্রক্রিয়াজাত করে) তা উৎপাদন করে, যে তা উৎপাদন করিয়ে নেয়, (অর্থাৎ যে মাদক উৎপাদন করতে বলে), যে তা সেবন করে, যে তা বহন করে, যার কাছে তা বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়, যে তা পরিবেশন করে, যে তা বিক্রি করে, যে তার মূল্য খায়, যে তা ক্রয় করে, এবং যার জন্য তা ক্রয় করা হয়”। [সুনানে তিরমিযী- ১/২৪৩ হাদিস ১২৯৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৩৮১]
সূরা মায়েদার পূর্বোল্লখীত আয়াতে কারিমাটি যখন নাজিল হয়, তখন নবী করিম (স) বললেন- “আল্লাহ (তাআলা কুরআনে) খামরুন (মদ/মাদক) হারাম করে দিয়েছেন। সুতরাং, যে ব্যক্তিই এই আয়াতের কথা জানতে পারবে, তার কাছে এর কোনো কিছু থেকে থাকলে সে আর (তা) সেবনও করতে পারবে না, (সেটা) বিক্রিও করতে পারবে না”। রাবী (হাদীসের বর্ণনাকারী) বলেন: লোকজন এ নির্দেশকে (ততক্ষনাৎ সাদরে) গ্রহন করে নিলেন। মদীনার রাস্তায় রাস্তায় তাদের যার কাছে এর যা কিছু ছিল, তারা তা বহিয়ে দিলেন”। [সহিহ মুসলীম, হাদিস ১৫৭৮
কোনো মুসলীম মদ/মাদক উপহার দিতে পারে না
একজন মুসলীমের জন্য যেমন মদ/মাদক বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষন ও ভোগ করা হারাম , তেমনি তা কাউকে বিনামূল্যে উপহার দেয়া –চাই তা কোনো ইহুদী বা খৃষ্টান অথবা অন্য কোনো অমুসলীমকেই দেয়া হোক না কেনো-তাও হারাম। কাজই কোনো মুসলমানের জন্যেই এটা উচিৎ হতে পারে না যে, সে কাউকে মদ/মাদক উপহার দিবে কিংবা সেটা উপহার স্বরূপ গ্রহন করবে। মুসলমান-তো একজন পবিত্র মানুষ; ভাল ও পবিত্র জিনিস ছাড়া সে যেমন উপহার দিতে পারে না , তেমনি সে তা গ্রহনও পারে না।
এক বর্ণনায় এসেছে, এক ব্যক্তি নবী করিম (স) কে মদ উপহার স্বরূপ দেয়ার ইচ্ছে করেছিল । তখন নবী করিম (স) তাকে জানালেন যে, আল্লাহ তাআলা মদ হারাম করে দিয়েছেন। তখন সে জিজ্ঞেস করলো: – ‘(তাহলে) আমি কি সেটা বিক্রি করে দিতে পারবো না’? নবী করিম (স) বললেন: ‘যিনি তা সেবন করাকে হারাম করেছেন, তিনি সেটা বিক্রি করাকেও হারাম করে দিয়েছেন’। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলো: – ‘আমি কি এটা কোনো ইহূদীকেও উপহার দিতে পারবো না’? নবী করিম (স) বললেন: – ‘যিনি একে হারাম করেছেন, তিনি তা কোনো ইহূদীকে উপহার হিসেবে দেয়াকেও হারাম করে দিয়েছেন’। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলো: – ‘তাহলে আমি সেটা দিয়ে কি করবো’? নবী করিম (স) বললেন: – ‘এটা কোন উপত্যকায় ঢেলে দাও’। [মুসনাদে হুমাইদী- ২/৪৪৭ হাদিস ১০৩৪]
মাদকের আসর বা মজলিস থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা
শুধু তাই নয়, মুসলমানকে মদের আসর, সভা বা মজলিস এবং যারা এসব আসরে মাদক সেবন করে -তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হযরত ওমর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং আখেরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন -যে টেবিল/দস্তরখানায় মদ পরিবেশন করা হয়, সেখানে না বসে। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস ১২৬;
মুসলমান মাত্রই এ ব্যপারে আদিষ্ট যে, সে কোনো অন্যয়-অপরাধ ও পাপ কাজ দেখতে পেলে তাতে পরিবর্তন আনার
পদক্ষেপ নিবে। সুতরাং, যদি তার পক্ষে (অন্যদেরকে) তা পরিহার
করানো সম্ভবপর না হয়, তাহলে তার অবশ্য কর্তব্য হল, সে নিজেই তা থেকে দূরে থাকবে, তদুপরি ভদ্রতা বজায় রেখে ওই স্থান এবং সেখানে যারা রয়েছে, তাদেরকে পরিত্যাগ করবে।
খলীফায়ে রাশেদ হয়রত ওমর বিন আব্দুল আযীয রহ. থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি মদ্যপকে চাবুক মারতেন; এমনকি ওই ব্যক্তিকেও মারতেন, যে মদ্যপদের আসর বা মজলিসে উপস্থিত থাকতো -এমনকি সে তাদের সাথে মদ পান না করলেও। এও বর্ণিত আছে যে, একবার তার সামনে এমন কিছু লোককে ধরে নিয়ে আসা হল, যারা মদ পান করেছিল। তিনি তাদেরকে চাবুক মারার নির্দেশ দিলেন। তখন তাঁকে বলা হল : ‘ওদের সাথে ওমুক ব্যক্তিও আছে, যে রোযা রেখেছিল’। তখন তিনি বললেন : ‘ওকে দিয়েই শুরু করো। তোমরা কি শোনো নি, আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন- “আর আল-কিতাবে তোমাদের উপর এই বিধান নাজিল করা হয়েছে যে, তোমরা যখন শুনতে পারবে যে, আল্লাহর আয়াতসমূহের সাথে কুফরী করা হচ্ছে, ঠাট্টা-মশকরা করা হচ্ছে, তখন তোমরা আর তাদের সাথে বসে থাকবে না -যাবৎ না তারা তা বাদ দিয়ে অন্য কথাবার্তায় লিপ্ত হয়ে যায়। অন্যথায় তোমরাও তাদের অনুরূপ গণ্য হবে”। [সূরা নিসা ১৪০]
মাদক খোদ্ রোগ; এটা কোনো ঔষধ নয়
ইসলাম এ সমস্ত সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে মাদক বিরোধী যুদ্ধে সর্বদিক দিয়ে তার জোড়ালো ভূমিকা পালন করেছে এবং মুসলমান মাত্রকেই এ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছে; চেয়েছে তার এবং মাদকের মাঝে দূর্ভেদ্য প্রাচীর দাড়ঁ করিয়ে দিতে, যাতে সামান্যতম ছিদ্রপথও উন্মুক্ত থাকতে না পারে, যাতে মাদকের সাথে কোনো রকম যোগাযোগ বা সম্পর্ক থাকতে না পারে। কোনো মুসলমানের জন্যে সামান্যতম মাদক সেবনকেও বৈধ রাখা হয়নি। এমনিভাবে তার জন্য এও জায়েয নয় যে, সে মাদক ক্রয়-বিক্রয় করা, তা উপহার স্বরূপ দেয়া কিংবা উৎপাদনের সাথে কোনো রকম যোগ-সম্পর্ক বজায় রাখবে। তার জন্য এও জায়েজ নয় যে, সে মাদক এনে তার দোকানে অথবা বাড়িতে রেখে দিবে। তার জন্য এও জায়েয নয় যে, সে আনন্দঘন কোনো পার্টিতে অথবা নিরান্দমূলক কোনো সমাবেশে মাদক এনে হাজির করবে। তার জন্য এও জায়েয নয় যে, সে কোনো অমুসলীমের মেহমাদারী করার উদ্দেশ্যে মদ এগিয়ে দিবে। এমনিভাবে খাদ্য হোক, পানীয় হোক -কোন কিছুতেই মদ/মাদক মেশানো জায়েয নয় তার জন্য।
এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, যা কেউ কেউ জিজ্ঞেসও করে থাকে । আর সেটি হল, মাদকদ্রব্যকে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কিনা? বস্তুতঃ এর জবাব তা-ই, যা খোদ্ রাসুলুল্লাহ (স) দিয়েছিলেন। এক ব্যাক্তি রাসুলুল্লাহ (স)-এর কাছে মদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো যে, তা রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কি-না ? রাসুলুল্লাহ (স) তাকে তা করতে নিষেধ করলেন। তখন লোকটি বললো:– ‘আমি তো সেটা রোগ নিরাময়ের জন্য বানিয়েছি’। রাসুলুল্লাহ (স) বললেন – ‘ওটা কোনো ঔষধ নয়। বরং ওটাই একটা অসুখ’। [সহিহ মুসলীম- ৩/১৫৭৩ হাদিস ১৯৮৪; মুসনাদে আহমদ- ৪/৩৩১; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২০৪৬; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৮৭৩; সুনানে দারেমী- ২/১৫৩ হাদিস ২০৯৫]
রাসুলুল্লাহ (স) আরও বলেছেন: – “নিশ্চই আল্লাহ রোগ-ব্যাধী ও ঔষধ (দুটোই) অবতীর্ণ করেছেন এবং তোমাদের সকল রোগ-ব্যাধীর জন্য প্রতিষেধকও বানিয়ে দিয়েছেন। কাজেই তোমরা চিকিৎসা করো। তবে হারাম কিছু দিয়ে চিকিৎসা করতে যেও না”। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৮৭০; সুনানে তিরমিযী, হাদিস ১৯৬১; সুনানুল কুবরা, বাইহাকী- ৫/১০]
এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই যে, ইসলাম মদ/মাদক সহ অপরাপর হারাম জিনিসসমূহ দ্বারা চিকিৎসা করাকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রহ. যেমন বলেছেন:- ‘কোনো কিছু হারাম হওয়াটা মূলত: তার পর থেকে সেটাকে সর্বোতভাবে পরিহার করে চলারই দাবী জানায়। মাদককে ঔষধ হিসেবে অবলম্বন করা হলে এতে ওই মাদকের মধ্যেই আষ্টেপিষ্টে থাকার প্রতি উস্কানীমূলক আগ্রহই জন্ম লাভ করবে। এতে-তো শরীয়তদাতার উদ্দেশ্যই ব্যহত হয়ে যাবে’।
তিনি আরও বলেছেন: ‘হারাম জিনিস দিয়ে চিকিৎসা করার অনুমতি দেয়া হলে তখন বিশেষভাবে ওই জিনিসের দিকেই নফ্সানী আগ্রহ ও চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, যেটা পরিগ্রহ করে নিবে কুপ্রবৃত্তি ও নফ্সানীস্বাদ গ্রহনের পথে একটি মাধ্যম হিসেবে -বিশেষত: নফস যখন দেখতে পাবে যে, জিনিসটি (বাহ্যত:) তার জন্য ফায়দাকর, রোগ দূরিভূতকারী এবং আরোগ্য আকর্ষক একটি জিনিস! এতে করে তার মধ্যে যে ধারনাটি বৃদ্ধি পাবে, সেটা হল, বিভিন্ন ঔষধের মধ্যে সংশ্লিষ্ট হারাম ওষুধটিই তার জন্য প্রতিষেধক-নিরাময়ক’।
মাদক দ্রব্য
(খামরুন বা মদ/মাদক হল সেই পদার্থ, যা মস্তিষ্কে মাতালতা বা নেশা আনায়ন করে)। এই সুস্পষ্ট কথাটি
বলেছিলেন হযরত ওমর বিন খাত্তাব রা. নবী করিম (স) এর মিম্বরে উপর আরোহনরত অবস্থায়। তিনি এ কথার দ্বারা খামরুন
(মদ/মাদক)-এর অর্থ ও তাৎপর্যের একটি সীমানা এঁটে দিয়েছেন, যাতে করে প্রশ্নকারীদেরকে অধিক প্রশ্ন করতে না হয় এবং সংশয়
পোষনকারীদের সংশয়ের কোনো অবকাশ না থাকে। সুতরাং, যে জিনিস মস্তিষ্কে নেশাচ্ছন্নতা ও মাতালভাব সৃষ্টি করে এবং
বিচার-বিবেক ও পঞ্চন্দ্রীয় স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে হরণ করে নেয়, সেটাই হচ্ছে খামরুন (মদ/মাদক); আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স) সেটাকেই কেয়ামত পর্যন্ত হারাম করে
দিয়েছেন।
হাশীশ, কোকেন, আফিম এবং এ জাতীয় যে সমস্ত দ্রব্য ‘মাদক’ নামে পরিচিত -সেগুলোও এ পর্যায়েরই জিনিস। যারা এসব খেয়ে থাকে, তারা এগুলোর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি জানে। এ সব জিনিস মস্তিষ্কের বিবেকবোধ ও বিচারশক্তির উপর অপরাপর সাধারণ জিনিসমূহ থেকে ভিন্নতর এমন সব নতুন নতুন প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে যে, সে দূরের জিনিস কে কাছে এবং কাছের জিনিসকে দূরে দেখতে পায়। সে বাস্তবতাকে ভুলে যায় এবং অবাস্তব বিষয়ের কল্পনায় বিভোর থাকে। সে সাতরে বেড়ায় স্বপ্ন আর জল্পনার সাগরে। যে ব্যক্তি মাদক ব্যবহার করে, তার সাথে এসবই ঘটতে থাকে। এসব ছাড়াও মাদক শারীরিক অবক্ষয়ের জন্ম দেয়, স্নায়ুবিক অস্থিরতা ও বিপর্যয় নিয়ে আসে, স্বাস্থ্যহানী ঘটায়। এর চেয়েও বড় কথা হল, মাদকদ্রব্য মনস্তাত্বিক দূর্বলতা, গাঠনিক শক্তিহীনতা, ইচ্ছাশক্তির অথর্বতা এবং অনুভূতিজ্ঞানের অবিশ্যম্ভাবী দূর্বলতার জন্ম দেয়। এর ফলে মাদকে অভ্যস্থ এসমস্ত মানুষ কল্যাণের পরিবর্তে সমাজদেহে ব্যাপক ভাবে দংশনের ঝড় বইয়ে দিতে থাকে। এসব বির্পযয় ছাড়াও মাদকের পিছনে ব্যয় করতে গিয়ে তারা ধনসম্পদকে সর্বোতভাবে ধংস করে দেয়, পরিবারে ভাংগন ধরায়। এসবে প্রচুর ধ্বনসম্পদ খরচ হয়ে যায়। এতে করে মাদকে অভ্যস্থ ব্যক্তি তার সন্তান-সন্ততির (নির্ভর) শক্তিটুকুরও সর্বনাশ করে দেয়। কখনো কখনো অসৎ ও অসামাজিক পথে বিপথগামী হতেও সে কুন্ঠিত হয় না।
ইসলামের যেসকল ফুকাহায়ে কেরামের যুগে এ সমস্ত ‘খবীস’ জিনিসের প্রাদূর্ভাব ঘটেছিল, এসব নিষিদ্ধ ও নাজায়েয হবার ব্যপারে তাঁরা একমত। এ সকল ওলামায়ে কেরামের মধ্যে সর্বপ্রথম যার নাম আসে, তিনি হলেন শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ.। তিনি বলেছেন- “এই হাশীশ (এক প্রকার মাদক এবং তা) শক্ত হারাম একটি জিনিস -তাতে মাতালতা সৃষ্টি হোক, চাই না হোক।………মূলত: ফাজের (পাপী ও খারাপ লোক)-রাই এসব জিনিস সেবন করে থাকে। এতে রয়েছে বিহবল ও উত্তেজক পদার্থ। এর মধ্যে নেশা উৎপাদক মদের সদৃশ জিনিসই রয়েছে। মদ মানুষকে কলহ-বিবাদের দিকে চালিত করে। আর হাশীশের অবধারিত ক্রিয়া হল অবসাদবোধ এবং হীনমন্নতা। এর মধ্যে আরও এমন পদার্থও রয়েছে, যা জ্ঞানবোধ এবং মেজাজ-মর্জিকে বিশৃঙ্খল করে দেয়, উন্মুক্ত করে দেয় বদ প্রবৃত্তির দ্বার। তদুপরি এটি একজন মুসলীমের আত্বমর্যাদাবোধ এবং আত্বসম্ভ্রমবোধকে খুইয়ে ফেলে। এটা (কোনো কোনো দিক দিয়ে) ‘মাতালতা আনায়নকারী’ মদের চাইতেও ক্ষতিকর। বস্তুত: তাতার সম্প্রদায়ের উত্থানের মধ্য দিয়েই মানুষের মাঝে এর ব্যপক প্রচলন ঘটেছে। যে এটা সেবন করবে -পরিমান কম হোক, চাই বেশি হোক -তাকে মদ পানের শাস্তিই দেয়া বাঞ্চনীয়।…….. যার থেকে আত্বপ্রকাশ করবে যে, সে হাশীশ সেবন করেছে, মনে করতে হবে, তার থেকে মদ পান করার বিষয়টি আত্বপ্রকাশ করেছে। বস্তুত: কোনো কোনো দিক থেকে হাশীশ দ্রব্যটি মদ থেকেও খারাপ-নিকৃষ্ট। মদের ক্ষেত্রে যে শাস্তি দেওয়া হয়, সেই শাস্তি এ ক্ষেত্রেও দিতে হবে।…… (তিনি আরো) বলেছেন: ‘শরীয়তের নিয়ম এই যে, মদ এবং জেনা ব্যভিচারের মত যে সমস্ত হারাম কাজের প্রতি নফসের কামনা-বাসনা জাগ্রত হয়, সেগুলোর জন্য حد (হদ্দ)-এর ব্যবস্থা রয়েছে। অপর দিকে যেসব ব্যপারে কামনা-বাসনা জন্মায়না যেমন: মৃত ভক্ষণ করা, সে সমস্ত ক্ষেত্রে ব্যবস্থা রয়েছে তা’জিবের। বস্তুতঃ হাশীশ সেবনের পতি এতই আগ্রহ ও ললুপতা বিদ্যমান থাকে যে, তা থেকে বিরত থাকতে চাইলেও বিরত থাকা সম্ভব হয় না। বস্তুতঃ অন্যান্য মাদক সেবন হারাম হওয়া পর্যায়ে কুরআন-সুন্নাহ্’য় যেসমস্ত অকট্য দলিল-প্রমাণ রয়েছে, সেগুলো হাশীশ সেবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য”। [ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইয়িব্যাহ– ৪/১৬২]
খাদ্য হোক বা পানীয় -ক্ষতিকর জিনিসমাত্রই হারাম
এক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়তে একটি সাধারণ মূলনীতি নির্ধারিত বয়েছে। মূলনীতিটি হল , ’কোনো মুসলমানের জন্যে এমন কোনো জিনিস খাওয়া বা পান করা হালাল নয়, যা তাকে দ্রুত কিংবা ধীরে ধীরে মৃত্যু মুখে পতিত করবে, (যেমন: বিষ বা এজাতীয় দ্রব্য সামগ্রী); অথবা তাকে (কোনো ভাবে) ক্ষতিগ্রস্থ করবে ও কষ্টে ফেলে দিবে’। এমনকি কোনো মুসলমানের জন্য এত অধিক পরিমান (হালাল খাদ্য) খাওয়া বা পান করাও জায়েয নয়, যা তাকে রোগী বানিয়ে দিবে। আসলে কোনো মুসলীম তার নিজের উপরও মালিকানাধীকার রাখে না। (মূলতঃ সব কিছুর মালিক হলেন একমাত্র আল্লাহ তাআলা । তাঁর নির্দেশ মতই এসব ব্যবহার করার গুরু দায়ীত্ব দেয়া হয়েছে মানুষকে; এগুলোতে কারও নিজের স্বেচ্ছাচারীতা জায়েয নয়) । একজন মুসলীম মূলত: তার দ্বীন, তার মিল্লাত, তার জীবন, তার স্বাস্থ্য এবং তার ধন সম্পদের উপর দায়ীত্বশীল। আল্লাহ তাআলা এর সব কিছুই তার কাছে আমানত স্বরূপ রেখেছেন; তাতে খেয়ানত করা তার জন্য হালাল নয়।। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন-
“আর তোমারা তোমাদের (নিজেদের)কে হত্যা করো না। নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের ব্যপারে (একজন) করুনাকারী(র পরিচয় দিয়েছেন)”। [সূরা নিসা ২৯]
“আর তোমরা তোমাদের (নিজদের) হাতে (নিজেদেরকে) ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না”। [সূরা বাকারাহ ১৯৫]
রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন- -‘নিজের ক্ষতি সাধন করা এবং অন্যের ক্ষতি সাধন করা কোনটিই জায়েয নয়’। [মুসনাদে আহমদ- ৫/৩২৬ হাদিস ২২৮৩০; সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস ২৩৪০; সুনানে বাইহাকী- ৬/১৫৬ হাদিস ১২২২৪]
“তবে যে ব্যক্তি অনন্যোপায় হয়ে পড়ে (এমতাবস্থায় যে, সে আসলে এসব হারাম জিনিস ভক্ষনের ব্যপারে মোটেই আগ্রহী নয়। তদুপরি বাধ্যহয়ে ভক্ষন করতে গিয়ে ভক্ষনে জরুরতের তুলনায়) বাড়াবাড়িও করে না, সীমালঙ্ঘনও করে না, তাহলে তার উপর কোনো গোনাহ বর্তাবে না। নিশ্চই আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু”। [সূরা বাকারাহ ১৭৩]
তবে এখানে যে বিষয়টি প্রনিধানযোগ্য, তা এই যে, আয়াতগুলোতে ‘ঠেঁকে যাওয়া বা নিরুপায় হওয়া’ পর্যায়ের যেসকল লোকদের কথা বলা হয়েছে, তাদেরকে এই শর্ত দেয়া হয়েছে যে, তারা (হারাম জিনিসটির প্রতি মনের দিক থেকে) আকাঙ্খিতও হতে পারবে না, (তা গ্রহনে) স্বীমালঙ্ঘনও করতে পারবে ন। এ কথাটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট জিনিসটির স্বাদ গ্রহন করা এবং তা পাওয়ার আকাঙ্খা -তার লক্ষ্য হতে পারবে না; দ্বিতীয়ত: পরিতৃপ্ত হতে গিয়ে সীমালঙ্খন করতে পারবে না, বরং ঠিক জরুরতের সীমা পর্যন্তই সেটাকে সীমাভুক্ত রাখতে হবে।
একথা ঠিক যে, মানুষকে (তার) জরুরতের দাবীর কাছে (অনেক সময়) আত্বসমর্পণও করতে হয়। কিন্তু তাই বলে তার কাছে সম্পূর্ণরূপে সপে দেয়া এবং নিজের নফসের রশি’কে নফসের কাছে নিক্ষেপ করে দেয়া কাম্য হতে পারে না। বরং তার অপরিহার্য কর্তব্য হল, সে জোর করে মূল হালালের অনুসন্ধিৎসু হয়ে তা দিয়েই কাজ চালাবে; হারামের মধ্যেই অবিচল হয়ে থাকবে না কিংবা জরুরত পূরণ করতে গিয়ে হারামকে একটি সুযোগ হিসেবে নেবে না।
‘‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপরে জটিলতার কিছু চাপিয়ে দিতে চান না, বরং তিনি চান তোমাদেরকে পাক-পবিত্র করতে এবং তোমাদের উপর তাঁর নেয়ামতকে সুসম্পন্ন করতে। যাতে করে তোমরা শোকরগুজার হতে পারো”। [সূরা মায়েদা ৬]
আমাদের সবাইকে মাদকের মতো ভয়াবহ কুফল থেকে বিরত থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন
সংকলনে:
· মুহা: মোহায়মেনুল ইসলাম (মোহন)
· সহকারী শিক্ষক
· দিনাজপুর জিলা স্কুল, দিনাজপুর
(সাবেক স্টাফ: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, অপারেশনস্ ও গোয়েন্দা বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়)
৭১
১৪৫ মন্তব্য