Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ নভেম্বর, ২০২২ ০৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ

কোরআন তেলাওয়াতের আদব @ কোরআন তেলাওয়াতের আদব @ কোরআন তেলাওয়াতের আদব

কোরআন তেলাওয়াতের আদব

 

# إِنَّ ٱلَّذِينَ عِندَ رَبِّكَ لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِۦ وَيُسَبِّحُونَهُۥ وَلَهُۥ يَسْجُدُونَ ۞

নিশ্চয় যারা আপনার রবের সান্নিধ্যে রয়েছে তারা তাঁর ইবাদাতের ব্যাপারে অহঙ্কার [১] করে না। আর তারা তাঁরই তাসবীহ পাঠ করে [২] এবং তাঁরই জন্য সিজদা [৩] করে। (আরাফ 7:206)

 

[১]  যারা আল্লাহর কাছে রয়েছেন তারা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাগণ। সে হিসেবে আয়াতের অর্থ হচ্ছে, শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার করা ও রবের বন্দেগী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া শয়তানের কাজ। এর ফল হয় অধঃপতন ও অবনতি। পক্ষান্তরে আল্লাহর সামনে ঝুঁকে পড়া এবং তাঁর বন্দেগীতে অবিচল থাকা একটি ফেরেশতাসুলভ কাজ। এর ফল হয় উন্নতি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ। যদি তোমরা এ উন্নতি চাও তাহলে নিজেদের কর্মনীতিকে শয়তানের পরিবর্তে ফেরেশতাদের কর্মনীতির অনুরূপ করে গড়ে তোল।

 

[২]  আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করে অর্থাৎ আল্লাহ যে ক্রটিমুক্ত, দোষমুক্ত, ভুলমুক্ত সব ধরনের দুর্বলতা থেকে তিনি যে একেবারেই পাক-পবিত্র এবং তিনি যে লা-শরীক, তুলনাহীন ও অপ্রতিদ্বন্দ্ব, এ বিষয়টি সর্বান্তকরণে মেনে নেয়। মুখে তার স্বীকৃতি দেয় ও অংগীকার করে এবং স্থায়ীভাবে সবসময় এর প্রচার ও ঘোষণায় সোচ্চার থাকে।

 

[৩] এখানে সালাত সংক্রান্ত ইবাদাতের মধ্য থেকে শুধু সিজদার কথা উল্লেখ করার কারণ এই যে, সালাতের সমগ্র আরকানের মধ্যে সিজদার একটি বিশেষ ফযীলত রয়েছে। হাদীসে রয়েছে যে, ‘কোন এক লোক সওবান রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট নিবেদন করলেন যে, আমাকে এমন একটা আমল বাতলে দিন যাতে আমি জান্নাতে যেতে পারি। সওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু নীরব রইলেন; কিছু বললেন না। লোকটি আবার নিবেদন করলেন, তখনও তিনি চুপ করে রইলেন। এভাবে তৃতীয়বার যখন বললেন, তখন তিনি বললেনঃ আমি এ প্রশ্নটিই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে করেছিলাম। তিনি আমাকে ওসীয়ত করেছিলেন যে, অধিক পরিমাণে সিজদা করতে থাক। কারণ, তোমরা যখন একটি সিজদা কর তখন তার ফলে আল্লাহ তা'আলা তোমাদের মর্যাদা এক ডিগ্রি বাড়িয়ে দেন এবং একটি গোনাহ ক্ষমা করে দেন। লোকটি বললেনঃ সওবান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে আলাপ করার পর আমি আবুদদারদা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাৎ করে তার কাছেও একই নিবেদন করলাম এবং তিনিও একই উত্তর দিলেন। [মুসলিমঃ ৪৮৮]

 

অন্য এক হাদীসে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বান্দা স্বীয় রবের সর্বাধিক নিকটবর্তী তখনই হয়, যখন সে বান্দা সিজদায় অবনত থাকে। কাজেই তোমরা সিজদারত অবস্থায় খুব বেশী করে দোআ-প্রার্থনা করবে। তাতে তা কবুল হওয়ার যথেষ্ট আশা রয়েছে। [মুসলিমঃ ৪৭৯, ৪৮২]

 

সুরা আল-আ’রাফের শেষ আয়াতটি হল আয়াতে সিজদা। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘কোন আদম সন্তান যখন কোন সিজদার আয়াত পাঠ করে অতঃপর সিজদায়ে তেলাওয়াতে সম্পন্ন করে, তখন শয়তান কাঁদতে কাদতে পালিয়ে যায় এবং বলে যে, আফসোস, মানুষের প্রতি সিজদার হুকুম হল আর সে তা আদায়ও করল, ফলে তার ঠিকানা হল জান্নাত, আর আমার প্রতিও সিজদার হুকুম হয়েছিল, কিন্তু আমি তার না-ফরমানী করেছি বলে আমার ঠিকানা হল জাহান্নাম।’ [মুসলিমঃ ১৩৩]

 

২০৪-২০৬ নং আয়াতের তাফসীরঃ

 

পূর্বের আয়াতে কুরআনকে মানুষের পথপ্রদর্শক, রহমত ও দলীল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ আয়াতে কুরআনের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে তেলাওয়াতকালে চুপ থাকা ও মনোযোগসহকারে শ্রবণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কাফিরদের মত হট্টগোল করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের সম্পর্কে বলেন: 

 

# وَقَالَ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا لَا تَسْمَعُوْا لِهٰذَا الْقُرْاٰنِ وَالْغَوْا فِيْهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُوْنَ ‏۞

 

কাফিররা বলেঃ তোমরা এই কুরআন শ্রবণ কর না এবং তা তেলাওয়াতকালে শোরগোল সৃষ্টি কর যাতে তোমরা জয়ী হতে পার।” (সূরা হা-মীম সিজদাহ ৪১:২৬)

 

নাবী (সাঃ) যখন কুরআন তেলাওয়াত করতেন মক্কার কাফিররা তখন হট্টগোল সৃষ্টি করতো যাতে কেউ না শুনতে পায়।

 

মনোযোগসহকারে শ্রবণ করা আর চুপ থাকার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে- চুপ থাকা হল: বাহ্যিক কথাবার্তা ও অন্যান্য ব্যস্ততা বর্জন করা, যা কুরআন শ্রবণে বাধা সৃষ্টি করে। আর মনোযোগসহকারে শ্রবণ করা হল: অন্তরের উপস্থিতিসহ একাগ্রচিত্তে শ্রবণ করা ও শ্র“ত বিষয়কে অনুধাবন করা। কুরআন তেলাওয়াত বা শ্রবণকালে এ দু’টি আবশ্যিক বিষয়। তাহলেই আল্লাহ তা‘আলার রহমত পাওয়ার আশা করা যায়। যে ব্যক্তিই কুরআন তেলাওয়াত শুনবে সে সকল ব্যক্তি এ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। সালাতের ভিতর হোক আর বাইরে হোক।

 

সুতরাং সালাতেও ইমাম যখন কুরআন তেলাওয়াত করবে তখন মুক্তাদির চুপ থাকা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন:

 

 # إِنَّمَا جُعِلَ الْإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ، فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا، وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا

 

ইমামকে নিযুক্ত করা হয়েছে তার অনুসরণ করার জন্য। অতএব তিনি তাকবীর দিলে তারপর তোমরা তাকবীর দাও তিনি কিরাত পড়লে তোমরা চুপ থাক। (নাসায়ী হা: ৯২১, সহীহ)

 

তবে অবশ্যই সকলকে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে। কেননা সূরা ফাতিহা ছাড়া কারো সালাত হবে না। এ সম্পর্কে সূরা ফাতিহায় আলোচনা করা হয়েছে। অসংখ্য সহীহ হাদীস দ্বারা তা প্রমাণিত।

 

তারপর আল্লাহ তা‘আলা নাবী (সাঃ)-সহ সকলকে নির্দেশ দিচ্ছেন যেন আল্লাহ তা‘আলাকে স্বরণ করে। আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ অন্তর, জিহবা ও অন্তর-জিহবা উভয়টা দ্বারা হয়। তবে আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ করতে হবে বিনয়-নম্র ও ভয়-ভীতির সাথে। আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ করতে গিয়ে আওয়াজ করে হট্টগোল সৃষ্টি করা যাবে না আবার একেবারে নিঝুম থাকলেও হবে না বরং মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে হবে। অতএব জামাতের সাথে গোলাকার হয়ে বসে সশব্দে মাথা দুলিয়ে যিকির করা শরীয়তসম্মত নয়।

 

(بِالْغُدُوِّ وَالْاٰصَالِ)

 

সকাল-সন্ধ্যায়’ অর্থাৎ দিনের প্রথম প্রহরে এবং দিনের শেষ প্রহরে তথা সকাল-সন্ধ্যায়। অন্যান্য সময়ের চেয়ে এ দু’ সময়ের বিশেষ ফযীলত রয়েছে। এ সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

 

(وَلَهُ يَسْجُدُوْنَ)

 

তাঁরই নিকট সিজ্দাবনত হয়।’ এটি কুরআনুল কারীমের প্রথম তিলাওয়াতে সিজদার আয়াত। কুরআনুল কারীমের সিজদার আয়াত তেলাওয়াত করলে বা শুনলে তাকবীর দিয়ে একটি সিজদাহ করা এবং তাকবীর দিয়ে মাথা তোলা মুস্তাহাব। এ সিজদার পর কোন তাশাহহুদ বা সালাম নেই।

 

তাকবীরের ব্যাপারে মুসলিম বিন ইয়াসার, আবূ কিলাবা ও ইবনু সীরীন কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। (তামামুল মিন্নাহ, পৃঃ ২৬৯)

 

এ সিজদার অনেক ফযীলত সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন: আদম সন্তান যখন সিজদার আয়াত পাঠ করে সিজদাহ করে তখন শয়তান দূরে সরে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বলে: হায় ধ্বংস আমার! সে সিজদাহ করতে আদেশ পেয়ে সিজদাহ করল, ফলে ওর জন্য জান্নাত। আর আমি সিজদার আদেশ পেয়ে তা অমান্য করেছি ফলে আমার জন্য জাহান্নাম। (সহীহ মুসলিম হা: ১৯৫)

 

তেলাওয়াতের সিজদার জন্য ওযূ শর্ত নয়। সতর ঢাকা থাকলে কেবলামুখী হয়ে এ সিজদাহ করা যায়। যেহেতু ওযূ শর্ত হবার ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না। (নাইনুল আওতার: ৪র্থ খণ্ড পৃঃ ১২৬, ফিকহুস সুন্নাহ ১/১৯৬) তিলাওয়াতে সিজদায় পঠনীয় একাধিক সুন্নতী দু‘আ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হল: 

 

# اللّٰهُمَّ لَكَ سَجَدْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَلَكَ أَسْلَمْتُ، سَجَدَ وَجْهِي لِلَّذِي خَلَقَهُ، وَصَوَّرَهُ، وَشَقَّ سَمْعَهُ وَبَصَرَهُ، تَبَارَكَ اللّٰهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِيْنَ

 

হে আল্লাহ! তোমার জন্যই সিজদা করলাম, তোমার প্রতিই ঈমান এনেছি, তোমার কাছেই আত্মসমর্পন করেছি, আমার মুখমণ্ডল তার জন্য সিজদাবনত হল যিনি তা সৃষ্টি করেছেন এবং স্বীয় শক্তি ও ক্ষমতায় ওর চক্ষু ও কর্ণকে উদ্গত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বরকতময়, সর্বত্তোম সৃষ্টিকারী। (সহীহ মুসলিম হা: ৭৭১)

 

# আয়াত হতে শিক্ষণীয় বিষয়ঃ

 

১. কুরআন তেলাওয়াতকালে চুপ থাকা ও মনোযোগসহকারে শ্রবণ করা আবশ্যক।

২. কুরআন তেলাওয়াতকালে হট্টগোল করা হারাম।

৩. প্রত্যেক সালাতে সকলের জন্য ফাতিহা পাঠ করা আবশ্যক।

৪. আল্লাহ তা‘আলাকে ডাকার পদ্ধতি জানতে পারলাম।

৫. তিলাওয়াতের সিজদার বিধান ও নিয়ম জানলাম।

(সংগৃহীত)

প্রকৌঃ মোঃ শফি উদ্দীন (বিএসসি এগ্রিল. ইঞ্জিনিয়ারিং, এমএস ইন ইরিগেশন, বা কৃ বি)

ইন্সট্রাক্টর (ফার্ম মেশিনারী), সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, মেহেরপুর।

CBT&A সার্টিফাইড ট্রেইনার in TVET, (BTEB),বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা।

CBT&A সার্টিফাইড অ্যাসেসর in TVET, (BTEB),বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা।

গ্রাফিক্স ডিজাইনার,

ব্লগা‌র,

ইউটিউব কন্টেন্ট ক্রিয়েটর,

ICT4E জেলা অ্যাম্বাসেডর এটুআই, মেহেরপুর

সেরা কনটেন্ট নির্মাতা, শিক্ষক বাতায়ন, ফেব্রুয়ারী, ২০২২

MIE Expert : 2021-2022

বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষক: ফার্ম মেশিনারী, এগ্রো মেশিনারী, কৃষি শিক্ষা ও কম্পিউটার এপ্লিকেশন

সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, মেহেরপুর।

E-mail: [email protected]

বাতায়ন প্রোফাইল:

ইউটিউব চ্যানেল:

মন্তব্য করুন

ব্লগ