এবারের মহান বিজয় দিবস বিগত বছরগুলোর চেয়ে একেবারেই ভিন্ন, অনন্য। আমরা উদযাপন করছি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, মুজিববর্ষ। একই সঙ্গে উদযাপন করছি বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। বাঙালি জাতির জন্য অনন্য সাধারণ দুটি বিরল মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য হওয়ায় নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করছি। ৫০ বছর আগে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারা এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে পেরে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে ধন্য মনে করছি।
এ মাহেন্দ্রক্ষণে আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি যার জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানসহ মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ নির্যাতিত মা-বোন এবং সকল ভাষাসংগ্রামীর প্রতি।
আমাদের এই মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল বিশ্বের রোল মডেল। কারণ, আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, একজন বিশ্বনেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।আমরা প্রায় দুইশ বছর ব্রিটিশদের অধীনে ছিলাম। এরপর ২৩ বছর পাকিস্তানিদের কলোনি ছিলাম। এর আগেও বাঙালি জাতি পরাধীন ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি প্রথমবারের মতো স্বাধীনতা অর্জন করে, পেয়েছি সার্বভৌম রাষ্ট্র।
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের পর থেকেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালির স্বাধীনতার ব্যাপারে আত্মপ্রত্যয়ী। পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আওয়ামী মুসলিম লীগকে তৃণমূলে প্রতিষ্ঠিত করেন। বাঙালির অদম্য মুক্তির স্পৃহার ধারাবাহিক বিস্ম্ফোরণ দেখা যায় ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২-এর উত্তাল ভাষা আন্দোলনে, '৫৪-এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয়লাভ, বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা আন্দোলনে, উনসত্তরে গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর অবিস্মরণীয় নির্বাচনী জনরায়ে। এর মহাকাব্যিক বিস্ম্ফোরণ আমরা পাই ১৯৭১-এর ৭ মার্চে মুক্তি সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের ঘোষণায়- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'।১৯৭১-এর ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী কাপুরুষের মতো রাতের অন্ধকারে পাশবিক হিংস্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। কালবিলম্ব না করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিকামী বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ৩০ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ মা-বোনের সল্ফ্ভ্রমহানির বিনিময়ে পেয়েছি আমরা স্বাধীনতা। রক্তের অক্ষরে লেখা লাল-সবুজ পতাকা।গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্জনের অধিকাংশের সূচনাই বঙ্গবন্ধু করে গেছেন। বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধুর সূচিত কাজগুলোই বাস্তবায়ন করছে। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য মিত্র বাহিনীর সদস্যদের দেশে ফেরত পাঠানো। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ তিনি স্বল্প সময়ের মধ্যে পুনর্গঠন করেন।বঙ্গবন্ধু কেবল ক্যারিশম্যাটিক নেতাই ছিলেন না, কূটনীতিক হিসেবেও অনন্য ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার দশ মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর অন্যতম সেরা সংবিধান প্রণয়ন করেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের পাশাপাশি গবেষণা, এমনকি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের জন্যওউদ্যোগ নিয়েছিলেন।যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশকে বঙ্গবন্ধু যখন তার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন তখন স্বাধীনতাবিরোধী দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিবসহ সপরিবারে হত্যা করে বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানি ভাবধারার রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত হলো সামরিক-বেসামরিক একনায়ক ও তাদের দ্বারা পুনর্বাসিত স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর হাতে। উল্টো পথে চলতে থাকে প্রগতির চাকা। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলে ইতিহাস বিকৃতির ধারা। যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে পত পত করে ওড়ে জাতীয় পতাকা। দেশ হয়ে ওঠে জঙ্গিবাদের বিচরণ ক্ষেত্র। রাষ্ট্র পরিচালনার জাতীয় চার মূলনীতি ছিল উপেক্ষিত। এ জন্য বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি।আশার কথা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর রক্তের ও আদর্শের উত্তরাধিকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত হয়েছি। নির্বাসিত '৭২-এর সংবিধানে ফেরত এসেছি এবং '৭১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল নির্মাণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, মাতারবাড়ি প্রকল্প, সমুদ্রবিজয়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারির স্বীকৃতি, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে মানবতার নবদিগন্ত উন্মোচন, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, সর্বোপরি করোনা অতিমারি পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করে দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের সময় মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ তা নেমে এসেছে ২০ শতাংশের নিচে। ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। আর জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। শূন্য থেকে শুরু করা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আজ প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মানব উন্নয়ন রিপোর্টেও অধিকাংশ সূচকে আমরা বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছি।আজ বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। তবে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো কারণ নেই। এখনও অনেক পথ বাকি। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত করতে হবে, বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাতীয় এবং ব্যক্তিজীবনে ছড়িয়ে দিতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। তবেই স্বাধীনতার স্বপ্ন পূর্ণতা পাবে।আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক এমপি :মন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়
৫
৫ মন্তব্য