Loading..

ব্লগ

রিসেট

২০ নভেম্বর, ২০২২ ০৭:২৯ অপরাহ্ণ

ক্যানভা দিয়ে সহজেই আমন্ত্রণপত্র, বিজনেস কার্ড, প্রচারপত্র, পাঠ পরিকল্পনা কিংবা জুম ব্যাকগ্রাউন্ড এর মতো অনেক কিছু পেশাদারদের মতো করে তৈরি করা যায়।
যেভাবে ‘ক্যানভা’ গড়ে তুললেন মেলানি পারকিন্স
একটা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা এক জিনিস। আর মাইক্রোসফট বা অ্যাডোবি'র মতো বিরাট প্রতিষ্ঠানের প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা একেবারেই অন্য জিনিস।
অস্ট্রেলিয়ান উদ্যোক্তা মেলানি পারকিন্স টেক জায়ান্টদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ডিজাইন ভিত্তিক একটা প্রডাক্ট নিয়ে এসে কঠিন এই কাজটাই করেছিলেন।
৩২ বছর বয়সী মেলানি পারকিন্স 'ক্যানভা' (Canva) নামের কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও। ক্যানভা হলো বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য একটি অনলাইন ডিজাইন প্ল্যাটফর্ম।
ক্যানভা দিয়ে সহজেই আমন্ত্রণপত্র, বিজনেস কার্ড, প্রচারপত্র, পাঠ পরিকল্পনা কিংবা জুম ব্যাকগ্রাউন্ড এর মতো অনেক কিছু পেশাদারদের মতো করে তৈরি করা যায়। এজন্য এই প্ল্যাটফর্মে আগে থেকেই ডিজাইন করা টেমপ্লেট ব্যবহার করে।
এখানে যে কেউ চাইলে তার নিজের ছবি আপলোড করতে পারে। এবং ক্যানভায় থাকা টেমপ্লেটে খুব সহজেই সেই ছবি টেনে নিয়ে এসে বসাতে পারে।
মোটকথা ফটোশপের ছোটখাটো কাজগুলি ক্যানভা দিয়ে খুব সহজে করা যায়। আর বিনামূল্যের এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার জন্য ফটো এডিটিং এর কাজে খুব বেশি দক্ষতারও প্রয়োজন হয় না। ক্যানভায় ছবি কাটা বা ক্রপ করা, সোজা বা স্ট্রেট করা থেকে শুরু করে টেক্সচার যোগ করা এবং রঙ সংশোধন করার মতো এমন অনেক ফিচার আছে, যেগুলি দিয়ে অপেশাদার যে কেউই সহজে ফটো এডিট করতে পারে।
লোগো, বিজনেস কার্ড বা প্রেজেন্টেশন ডিজাইনের কাজ যাতে সবাই সহজে করতে পারে, সেজন্য মেলানি ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।
এর ৫ বছরের মধ্যেই মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি প্রযুক্তি বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী সিইওদের একজন হিসেবে আলোচনায় উঠে আসেন।
তরুণ এবং নারী সিইও হিসেবে ১ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনাময় একটি টেক স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠা করেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ধনী নারীদের একজন মেলানি, যিনি বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আছেন।
.
# শৈশব এবং শিক্ষাজীবন
অস্ট্রেলিয়ান মা এবং মালয়েশিয়ান বাবার ঘরে জন্ম নেয়া মেলানির পরিবার ছিল বহু সংস্কৃতির মিলনস্থল। পেশায় তার বাবা-মা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার এবং শিক্ষক। শৈশব থেকেই মেলানির মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মনোভাব ছিল। ১৪ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের কিছু বাজারের আশেপাশে নিজের হাতে তৈরি স্কার্ফ বিক্রি করে প্রথম ব্যবসা শুরু করেন তিনি।
স্যাক্রেড হার্ট কলেজে মেলানির শিক্ষাজীবনের বেশিরভাগটা কেটেছে। পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া থেকে যোগাযোগ, মনোবিজ্ঞান এবং বাণিজ্যে পড়াশোনা করেন। অধ্যয়নের অংশ হিসেবে তাকে প্রাথমিক কম্পিউটার ডিজাইনও শেখাতে হয়েছিল। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, ফটোশপ এবং ইলাস্ট্রেটরের মতো টেকনিক্যাল এবং জটিল প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে বেগ পেতে হয় শিক্ষার্থীদের।
১৯ বছর বয়সে উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি।
.
# ক্যারিয়ারের শুরু
স্বামী ক্লিফ ওব্রেখটের সাথে মিলে মেলানি 'ফিউশন বুকস' নামে তার প্রথম স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম ছিল, যা দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের স্কুলের বার্ষিক ইয়ারবুক বানাতে পারত। সেই প্ল্যাটফর্মে ড্র্যাগ অ্যান্ড ড্রপ, ইলাস্ট্রেশন বা ফন্ট এর মতো সহজ আর দরকারি টুল ব্যবহার করে ডিজাইন করা যেত। এটি ভালই কাজ করছিল, কিন্তু ক্লিফ এবং মেলানি নিজেদের ব্যবসার বৃদ্ধি এবং সম্প্রসারণের জন্যে পর্যাপ্ত তহবিল জোগাড় করতে পারছিলেন না।
'ফিউশন বুকস'ই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে 'ক্যানভা ইনকর্পোরেটেড'। তবে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করার পরও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল জোগাড় করাটা পার্কিন্স এবং ওব্রেখটের জন্য খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল।
.
# ক্যানভা'র সূচনা
বেশ কয়েক বছর চেষ্টা করার পরে একজন প্রাক্তন গুগল এক্সিকিউটিভকে এই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে রাজি করান তারা। ক্যামেরন অ্যাডামস নামের এই বিনিয়োগকারী তাদের সাথে যোগ দিয়ে ব্র্যান্ডের প্রবৃদ্ধির জন্য অন্যান্য উৎস থেকে বিনিয়োগ জোগাড় করতেও সাহায্য করেন।
২০১৩ সালে দুই দফা প্রাথমিক বিনিয়োগ বা সিড ফান্ডিং সংগ্রহ করার পরে অবশেষে ক্যানভা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। আর মেলানি পারকিন্সকে ক্যানভা'র সিইও ঘোষণা করা হয়।
এরপর থেকে দ্রুতগতিতে ক্যানভা'র ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পরিসর বাড়তে থাকে, একইসাথে তাতে বৈচিত্র্যও আসতে শুরু করে। প্রথম বছরেই তাদের প্ল্যাটফর্ম এর ইউজারের সংখ্যা ৬০০,০০০ ছাড়িয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানটি বেইজিং এবং ম্যানিলার মতো ব্যবসার জন্য প্রতিকূল শহরেও ব্যবসা করছে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি বছরেই ক্যানভা প্ল্যাটফর্মে নতুন সব ফিচার যোগ হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার বাইরে যখন তাদের খুব বেশি ব্যবসা ছিল না, তখনই মেলানি'র প্রতিষ্ঠান ‘সিলিকন ভ্যালি’ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি নির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০১৬ সালে ফোর্বসের এশিয়া লিস্টে 'থার্টি আন্ডার থার্টি' তালিকায় উঠে আসে তার নাম।
২০২০ সালে ক্যানভা'র প্রবৃদ্ধি হয় ৬০ মিলিয়ন ডলার আর কোম্পানির মূল্য দাঁড়ায় ৬ বিলিয়ন ডলারে। এতে ১.৩ বিলিয়ন ডলার সম্পদের সাথে অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় ধনী নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন মেলানি পারকিন্স।
.
# ক্যানভা'র বিকাশ
ডিজাইনের কাজে যাদের দক্ষতা সীমিত, তাদের জন্যে সহজে ব্যবহার করার মতো একটি গ্রাফিক ডিজাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার স্বপ্ন ছিল পারকিন্সের। আর ক্যানভা'র মাধ্যমেই সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল। প্ল্যাটফর্মটি অ্যাডোবি ফটোশপ এবং ইলাস্ট্রেটরের মতো প্রোগ্রামের একটি চমৎকার বিকল্প, যেখানে অসাধারণ সব গ্রাফিক্স ডিজাইন করার জন্যে ইউজারদের হাতে প্রচুর অপশন থাকে।
বিশ্ব বাজারে অ্যাডোবি'র মতো প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকার পরও বর্তমানে ১৯০টি দেশে ক্যানভা'র সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭৫ মিলিয়নেরও বেশি।
২০১৭ সালে ক্যানভা স্টার্টআপ শিল্পে বিরল এক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে। সেই বছরের প্রথমার্ধেই ২৫.১ মিলিয়ন ডলার বিক্রয়লব্ধ আয় থেকে ১.৮৬ মিলিয়ন ডলার লাভ তোলে প্রতিষ্ঠানটি। কারণ প্রতিষ্ঠানটির প্রিমিয়াম ইউজারের সংখ্যা অনেক। বর্তমানে ক্যানভার প্রিমিয়াম ইউজাররা ৪ লাখেরও বেশি টেমপ্লেটে অ্যাক্সেস পেতে পারে। প্ল্যাটফর্মটির ব্যবসার এই পদ্ধতিকে ‘ফ্রিমিয়াম বিজনেস মডেল’ বলা হয়।
.
# মেলানি পারকিন্স এর ব্যক্তিগত জীবন
ক্লিফ ওব্রেখটের সাথে মেলানি পারকিন্স এর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। তারা একসাথে তাদের প্রথম স্টার্টআপ ‘ফিউশন বুক’ এবং তারপর ‘ক্যানভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৯ সালে তুরস্কের ক্যাপাডোশিয়ায় ভ্রমণের সময় ওব্রেখট মেলানিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।
দুজনই নিজেদের ফিলানথ্রপি’র জন্য সুপরিচিত, এবং তাদের উপার্জনের একটা বড় অংশ দাতব্য কাজের পেছনে খরচ হয়।
পারকিন্স তার নিজের কাজের জন্য খুবই গর্বিত। নিজেকে এবং নিজের এই ডিজাইনিং প্ল্যাটফর্ম ক্যানভাকে আরো সমৃদ্ধ করাই তার লক্ষ্য। ইতোমধ্যে ‘ফরচুন ৫০০’ তালিকাভুক্ত ৮৫% এরও বেশি কোম্পানি মেলানির এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।
.
# পরিশেষে
ক্যানভা যখন শুরু হয়, তখন ডিজাইন এর কাজ একচেটিয়াভাবে পেশাদারদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেসব পেশাদাররা ‘ফটোশপ’ এবং ‘ইনডিজাইন’ এর মতো অ্যাডোবি’র বিভিন্ন সফটওয়্যারের কাজে দক্ষ ছিলেন। কিন্তু এই চিত্রে পরিবর্তন এনেছে ক্যানভা, যার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যে কেউই ডিজাইন এর কাজ করার জন্যে টেমপ্লেট ব্যবহার করতে পারেন।
পেশাদার কাজে কিংবা ব্যক্তিগত প্রকল্পের মতো নানান কাজের ডিজাইনের জন্যে আগে যেভাবে চিন্তা করতে হতো, তাতে আমূল পরিবর্তন এনেছে ক্যানভা। প্রতি মাসে এর সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭৫ মিলিয়নেরও বেশি। এবং ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয়ের আশা করছে।
মন্তব্য করুন