Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ নভেম্বর, ২০২২ ১১:৫৬ অপরাহ্ণ

বৈকাল হ্রদ পৃথিবীর প্রাচীনতম এবং গভীরতম হ্রদ।

পৃথিবীর মোট আয়তনের চার ভাগের তিন ভাগ জল দিয়ে পরিবেষ্টিত। আয়তনে মোট ১,৩৮৬ মিলিয়ন ঘন কি.মি. পরিমাণ জল আমাদের স্থলভাগকে ঘিরে রেখেছে। এদের মধ্যে রয়েছে বিশাল ৫ মহাসাগর, শত শত সাগর এবং লক্ষাধিক নদীনালা। এছাড়া রয়েছে প্রায় ১১৭ মিলিয়ন হ্রদ। চারদিকে স্থলবিশিষ্ট জলাশয় হিসেবে পরিচিত এই হ্রদগুলো পৃথিবীর জলভাগের অন্যতম প্রধান আধার হিসেবে বিদ্যমান।


পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলেই ছোট-বড় হ্রদ দেখা যায়। কিছু কিছু হ্রদ এতটাই বিশাল যে, এদের নামকরণে জুড়ে দেওয়া হয়েছে সাগর উপাধি। যেমনটি দেখা যায় কাস্পিয়ান সাগর নামক হ্রদের বেলায়। এ ধরনের বড় হ্রদগুলোকে অনেকে গ্রেট লেক বা মহাহ্রদ হিসেবেও আখ্যা দেন। এই মহাহ্রদগুলো যেন প্রাকৃতিক পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের এক চলমান জাদুঘর। নানাপ্রান্তের এই হ্রদগুলো ভূপ্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলো অপরূপভাবে মেলে ধরছে আমাদের কৌতূহলী চোখের সামনে। আজকের আলোচনায় আসবে সেরকম একটি হ্রদের গল্প। হ্রদটির নাম ‘বৈকাল’। রুশ মুলুকের সাইবেরিয়া অঞ্চলে অবস্থিত এই হ্রদটি যুগ যুগ ধরে মানুষের কৌতূহল এবং মুগ্ধতার কারণ হয়ে বিদ্যমান রয়েছে।


হ্রদের পরিচয়   

রুশ ফেডারেশনের সাইবেরিয়া অঞ্চলের দক্ষিণাংশে অবস্থিত পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন স্বাদুপানির হ্রদ বৈকাল। বিজ্ঞানীদের হিসাব মতে, এই হ্রদের বয়স প্রায় ২০-২৫ মিলিয়ন বছরের মতো হবে। রুশরা একে ওরেজো বেয়কাল বা বৈকাল নামে ডেকে থাকে। তিইউরিস্ক ভাষার আঞ্চলিক শব্দ ‘বাই-কুল’ থেকে এই হ্রদের নামকরণ করা হয়েছে। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় সম্পদশালী হ্রদ। এই হ্রদকে অনেকে সাইবেরিয়ার মুক্তা নামেও ডেকে থাকেন।


সাধারণ জ্ঞানের বইগুলোতে বৈকাল হ্রদের পরিচিতি হচ্ছে পৃথিবীর গভীরতম হ্রদ হিসেবে। প্রায় ১,৬২০ মিটার গভীর এই হ্রদের আয়তন ৩১,৫০০ বর্গ কিলোমিটার। তবে শুধু প্রাচীনতা এবং গভীরতার দিক দিয়েই এই হ্রদ অনন্য নয়; বরং আয়তনের দিক দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম স্বাদু পানির হ্রদ হিসেবেও এর সুখ্যাতি রয়েছে। পৃথিবীর মোট স্বাদু পানির এক-পঞ্চমাংশ (২৩,০০০ ঘন কি.মি.) এই হ্রদের বুকে প্রবাহিত হচ্ছে।রাশিয়ার অন্যতম এই জলধারাটি স্থানীয়দের নিকট অত্যন্ত পবিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক অঞ্চলে এই হ্রদকে ঘিরে অলৌকিক গল্পকথাও প্রচলিত রয়েছে। বিশেষ করে, শীতকালে হ্রদের পানি জমে বরফে পরিণত হলে সেখানে বিশালাকার ‘বলয়’ দেখা দেয়। এই বলয়কে ঘিরে একসময়ে বিভিন্ন উপকথা প্রচলিত ছিল। এমনকি হাল আমলে এসব বলয়কে ভিনগ্রহীদের কারসাজি হিসেবেও চালিয়ে দেওয়া হতো। তবে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান অবশ্য এসব তত্ত্ব বিশ্বাসীদের হতাশ করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৭ কিলোমিটার ব্যাসের এই বলয়গুলো আসলে হ্রদের উষ্ণ জলের সাথে পৃষ্ঠের বরফের সংস্পর্শে গঠিত হয়েছে। তবে এখনও বিভিন্ন জনপদের বিশ্বাসমতে এই হ্রদ পবিত্র এবং তারা নানা উপায়ে পবিত্র হ্রদকে ঘিরে বিভিন্ন রীতি পালন করে থাকে।


প্রাচীনকাল থেকে মানুষ বৈকাল হ্রদ অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে মানুষ সর্বপ্রথম বৈকাল হ্রদ আবিষ্কার করে। তাছাড়া হান-শিয়ংগু যুদ্ধের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে এই অঞ্চলের নাম ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করা রয়েছে। সেই যুদ্ধ সঙ্ঘটিত হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৩ সাল থেকে ৮৯ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে। এই হ্রদের ইতিহাস এতটাই প্রাচীন যে, স্থানীয়রা বিশ্বাস করে, স্বয়ং যিশুখ্রিষ্ট এই হ্রদ অঞ্চলে ভ্রমণে এসেছিলেন। যদিও এর কোনো ঐতিহাসিক দলিল নেই।


ইউরোপ মহাদেশ থেকে প্রথম এই হ্রদ অঞ্চলে পদার্পণ করেছিলেন ‘কুরবাত ইভানোভ’ নামক একজন রুশ নাগরিক। তিনি ১৬৪৩ সালে এই কীর্তি গড়েন। তখন সাইবেরিয়া রুশ সাম্রাজ্যের অধীনস্ত ছিল না। ১৭শ শতকে রাশিয়া কর্তৃক সাইবেরিয়া দখল হয়ে গেলে বৈকাল হ্রদ রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই হ্রদ ঠিক কতটা প্রাচীন? এর উত্তর বিজ্ঞান বলছে, এই হ্রদের বয়স কমপক্ষে ২৫ মিলিয়ন বছর। প্রাগৈতিহাসিক যুগে ভূপৃষ্ঠের আন্দোলনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এই হ্রদকে ঘিরে থাকা পর্বতমালা।


ধারণা করা হয়, প্রাথমিকভাবে বৈকাল হ্রদ অঞ্চল ছিল একটি নদীর খাত। কিন্তু ভূমিকম্প এবং ভূপৃষ্ঠের ফাটলের কারণে নদীর দুই তীরের মধ্যে প্রশস্ততা বাড়তে থাকে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে নদীর গভীরতা। টারশিয়ারি যুগের (৬৬ থেকে ২.৬ মিলিয়ন বছর আগে) বিভিন্ন সময়ে এই পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে বৈকাল অববাহিকা গঠিত হয়েছে। পর্বতের চূড়ায় জমে থাকা বরফ গলে নদীর পানি বৃদ্ধি করতে থাকে। এরপর প্লাইয়োসিন যুগে (৫.৩ থেকে ২.৫৮ মিলিয়ন বছর আগে) নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাধিক স্বতন্ত্র হ্রদের জন্ম হয়। এরপর সেগুলো ধীরে ধীরে একত্রিত হয়ে সৃষ্টি হয় বৈকাল হ্রদ। হ্রদগুলো এক হওয়ার পেছনে ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, শিলাপতনসহ বেশকিছু সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। আবার এমনও হতে পারে, একাধিক কারণ এই হ্রদ সৃষ্টির পেছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছে।


প্রাগৈতিহাসিক যুগের ন্যায় আজও বৈকাল অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ। হ্রদের অভ্যন্তরীণ উপত্যকায় প্রতি বছর ২ হাজারের মতো হালকা এবং মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প নির্ণিত হয়। এর ফলে হ্রদের গভীরতাও কম-বেশি বাড়তে থাকে বলে ধারণা করা হয়।

সংগৃহীত 

মন্তব্য করুন