Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ ডিসেম্বর, ২০২২ ১০:২৬ অপরাহ্ণ

হযরত ইউসুফ আ. এর ঘটনা ও জীবন কাহিনী থেকে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ @@ হযরত ইউসুফ আ. এর ঘটনা ও জীবন কাহিনী থেকে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ

হযরত ইউসুফ আ. এর ঘটনা ও জীবন কাহিনী থেকে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ হচ্ছে-


- মুফতী মনসূরুল হক দা.বা.

প্রধান মুফতী ও শাইখুল হাদীস,

জামিয়া রহমানিয়া,মুহাম্মাদপুর,ঢাকা।


(এক) ইউসুফ আ. এর ভ্রাতারা যখন অক্ষত অবস্থায় তাঁর জামা পিতার কাছে নিয়ে এসেছিল, তখন হযরত ইয়াকূব আ. ইউসুফ আ.-এর জামা অক্ষত থাকার দ্বারা নিজ ছেলেদের দাবী মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলেন। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, বিচারকের জন্য উচিত উভয় পক্ষের দাবী-দাওয়া ও যুক্তি-প্রমাণের সাথে সাথে পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও আলামতের প্রতিও লক্ষ্য রেখে বিচার করা।


(দুই) যুলাইখা যখন একটি নির্জন কক্ষে ইউসুফ আ. কে স্বীয় কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য ফুঁসলাতে শুরু করেছিল, তখন ইউসুফ আ. সঙ্গে সঙ্গে যেখান থেকে দৌড়ে বের হয়ে পড়েছিলেন। এর দ্বারা বোঝা গেল যে, যে স্থানে গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সে স্থানকেই পরিত্যাগ করা উচিত। আর এক্ষেত্রে নিজের সম্ভাব্য সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে- যেমনটি হযরত ইউসুফ আ. করেছিলেন।


(তিন) আল্লাহ তা‘আলার হুকুম-আহকাম পালনে সাধ্যানুযায়ী চেষ্টার ত্রুটি না করা মানুষের অবশ্যই কর্তব্য-যদিও বাহ্যত এর ফলাফল দেখা না যায়। ফলাফল তো আল্লাহর হাতে। বান্দার কাজ হল-স্বীয় চেষ্টা-সাধনাকে আল্লাহর পথে ব্যয় করে দাসত্বের পরিচয় দেয়া। যেমন, ইউসুফ আ. সব দরজা বন্ধ থাকা সত্বেও এবং ঐতিহাসিক রিওয়ায়াত অনুযায়ী তালাবদ্ধ থাকা সত্বেও দরজার দিকে দৌড় প্রদানে নিজের সমস্ত শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করেছেন।


এহেন অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে গায়েবী সাহায্যের আগমনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করা হয়।


বস্তুত বান্দা যখন নিজের চেষ্টা পূর্ণ করে ফেলে, তখন আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য সাফল্যের পথ উন্মুক্ত করে দেন। যেমন দিয়েছেন হযরত ইউসুফ আ. এর ক্ষেত্রে। সমস্ত দরজা কুদরতীভাবে খুলে দিয়ে তাকে বের হওয়ার পথ তৈরী করে দিয়েছেন।


(চার) কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, ইউসুফ আ. যখন জেলে প্রেরিত হন, তখন আল্লাহর তরফ থেকে ওহী আসে-আপনি নিজেকে জেলে নিক্ষেপ করেছেন। কারণ, আপনি বলেছিলেন- “হে আমার পালনকর্তা এই মহিলারা আমাকে যে কাজের দিকে আহবান করছে এর চাইতে জেলখানা আমার নিকট অধিক পছন্দ।” তখন আপনি জেলখানা পছন্দ করা ছাড়া অন্যকোন নিরাপত্তা চাইলে, আপনাকে পুরোপুরি নিরাপত্তা দান করা হতো।


এ থেকে বুঝা গেল যে, বড় বিপদ থেকে বাঁচার জন্যে দু‘আয় সেই বিপদের তুলনায় অমুক ছোট বিপদকে আমি ভাল মনে করি এরূপ বলা সমীচিন নয়। বরং ছোট বড় প্রত্যেক বিপদাপদ ও মুসীবত থেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে পরিপূর্ণ মুক্তি ও নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করা উচিত।


(পাঁচ) আলোচিত কাহিনীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জেলখানায় দু‘জন কয়েদী যখন হযরত ইউসুফ আ. এর কাছে স্বপ্নের তা‘বীর জিজ্ঞেস করেছিল, তখন তিনি তাদের স্বপ্নের তা‘বীর বর্ণনা করার পূর্বে ঈমান আমল ও তাওহীদের উপর বিস্তারিত আলোচনা করে তাদের কাছে দ্বীনী দাওয়াত পেশ করেছিলেন। এ থেকে বুঝা গেল যে, কোন মুসলমানের কাছে কেউ কোন বিষয় নিয়ে উপস্থিত হলে এবং সে দ্বীন থেকে গাফিল থাকলে, প্রথমে তার নিকট ঈমান আমল সংক্রান্ত বিষয় আলোচনা করে তাকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়া কর্তব্য। অতঃপর তার উক্ত বিষয় সমাধা করে দেয়া উচিত।


(ছয়) হযরত ইউসুফ আ. বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার পর তাকে রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন। এ সময় যখন এ জরুরতের তাকাজা এসেছিল যে, এ বিরাট পরিকল্পনার ব্যবস্থাপনা কিভাবে হবে এবং কে করবে? তখন ইউসুফ আ. উত্তর দিয়েছিলেন “জমির উৎপন্ন ফসলসহ দেশীয় সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আপনি আমাকে নিযুক্ত করুন।


আয়াতের এ অংশ থেকে বুঝা যায় যে, যদিও নিজের জন্য কোন পদ প্রার্থনা করা সাধারণভাবে নিষেধ, কিন্তু যদি কখনো এমন পর্যায়ে আসে যে, তার জানা থাকে যে, সুষ্ঠুভাবে অপর কেউ সেই কাজ আনজাম দিতে পারবে না, সেই অবস্থায় সেই কাজ আনজাম দানের জন্য বা দেশ ও জাতির নিরঙ্কুশ সেবার জন্য নিজেকে পেশ করতে পারে।


তেমনিভাবে কোন বিশেষ পদ সম্বন্ধে যদি জানা যায় যে, অন্য কোন ব্যক্তি এর সুষ্ঠু ব্যবস্থা করতে সক্ষম হবে না এবং নিজে ভালরূপে তা সম্পাদন করতে পারবে বলে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস থাকে এবং তার মধ্যে কোন গুণাহে লিপ্ত হওয়ারও আশংকা না থাকে, তাহলে দেশ ও জনগণের বৃহৎ কল্যাণের জন্য তার পক্ষে উক্ত পদের প্রার্থী হওয়া জায়িয।


তবে শর্ত এই যে, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অর্থ-কড়ির মোহে নয়, বরং উক্ত পদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের খিদমত ও ইনসাফের সাথে তাদের অধিকার সংরক্ষণ করাই উদ্দেশ্য থাকতে হবে এবং তা সেভাবেই আনজাম দিতে হবে, যেমন হযরত ইউসুফ আ. এর দ্বারা হয়েছিল। আর যেখানে এরূপ অবস্থা না হয়, সেক্ষেত্রে রাসূলে কারীম ﷺ কোন পদ প্রার্থনা করতে বা প্রার্থী হতে নিষেধ করেছেন। বরং যদি কেউ কোন পদের জন্য আবেদন করেছে, তিনি তাকে সেই পদ দেননি। 


(সাত) হযরত ইউসুফ আ.-এর ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা যদি এমন চরমে পৌছে যে, সরকার কোন ব্যবস্থা না নিলে অনেক লোক জীবন ধারণের অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যসামগ্রী থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়বে, তখন সরকার এ ধরনের দ্রব্যসামগ্রীকে নিজ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারে এবং খাদ্যশস্যের উপযুক্ত মূল্যও নির্ধারণ করে দিতে পারে। কিন্তু সাধারণ অবস্থায় মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া সরকারের জন্য ঠিক নয়।


অবশ্য যদি কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সিন্ডিকেট করে দ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে অধিক মুনাফা লুটতে থাকে, সরকার তাকে বা তাদেরকে কঠোর হস্তে দমন করবে এবং বাজারে দ্রব্যের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।


(আট) ইউসুফ আ. এর ভাইয়েরা যখন দ্বিতীয়বার মিসরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন, তখন ইয়াকূব আ. তাদেরকে মিসর শহরে প্রবেশ করার ব্যাপারে একটি বিশেষ উপদেশ দিয়েছিলেন যে, তোমরা এগারো ভাই শহরের একই প্রবেশ দ্বার দিয়ে প্রবেশ করো না, বরং নগর প্রাচীরের কাছে গিয়ে আলাদা হয়ে যেয়ো এবং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করো। কারণ এতে করে  কারো কুদৃষ্টি পড়ার সম্ভাবনা আছে। এ দ্বারা জানা গেল যে, বদ নজর লাগা সত্য ও বাস্তব বিষয়। সুতরাং ক্ষতিকর খাদ্য ও ক্ষতিকর ক্রিয়াকর্ম থেকে আত্মরক্ষার ন্যায় এবং এর প্রভাব থেকে মুক্ত হতে তদবীর করার ন্যায় এ বদনজর থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করা এবং এর কুপ্রভাব থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করা এবং এর কুপ্রভাব থেকে মুক্তির জন্য তদবীর করাও সমভাবে শরীয়তসিদ্ধ।

 

(নয়) এ থেকে আরও বুঝা গেল যে, যদি কেউ অন্য কারো সম্পর্কে দুঃখ-কষ্টে পতিত হওয়ার আশঙ্কা পোষণ করে, তবে তাকে সে ব্যাপারে অবহিত করা এবং দুঃখ-কষ্টের হাত থেকে আত্মরক্ষার সম্ভাব্য উপায় বলে দেয়া উচিত, যেমন ইয়াকূব আ. ইউসুফ ভ্রাতাদের ব্যাপারে করেছিলেন।


(দশ) হযরত ইয়াকূব আ. নিজ ছেলেদেরকে কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষার তদবীর বাতলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে একথাও বলেছিলেন যে, আমি জানি-এ তাদবীর বাতলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে একথাও বলেছিলেন যে, আমি জানি-এ তদবীর আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছাকে এড়াতে পারবে না। হুকুম একমাত্র তাঁরই চলে। তবে মানুষের উপর বাহ্যিক চেষ্টা-তাদবীর করার নির্দেশ আছে। তাই এ উপদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমি এ তদবীরের উপর ভরসা করি না, বরং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার উপরই ভরসা করি। অর্থাৎ এ তদবীরের দ্বারা কিছুই হবে না, তবে আল্লাহ যদি স্বীয় অনুগ্রহে তোমাদের হেফাযত করেন, তবেই তোমরা হিফাযতে থাকতে পারবে।


হযরত ইয়াকুব আ. এর এ বক্তব্যে এ কথা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, মুসলমানদের কর্তব্য হচ্ছে-প্রত্যেক কাজে আসল ভরসা আল্লাহ পাকের উপর রাখা। কিন্তু বাহ্যিক ও বস্তুভিত্তিক উপায়াদিকেও উপেক্ষা করবে না এবং সাধ্যানুযায়ী বৈধ উপায়াদি অবলম্বন করবে। ইয়াকূব আ. তা-ই করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এ শিক্ষাই দিয়েছিলেন।


(এগার) আলোচিত ঘটনায় হযরত ইয়াকুব আ. এর অবস্থা থেকে প্রমাণিত হয় যে, জান-মাল ও সন্তান-সন্ততির ব্যাপারে কোন মুসীবত ও দুঃখ কষ্ট দেখা দিলে, প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে-সবর ইখতিয়ার করে আল্লাহ তা‘আলার ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং ইয়াকূব আ. ও অন্যান্য পয়গাম্বরের আ. অনুসরণ করা।


(বার) আলোচ্য কাহিনীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ইউসুফ আ.- কে যখন তাঁর ভাইয়েরা চিনে ফেলল, তখন তারা অতিরিক্ত কিছু তথ্য জানার জন্য তাকে প্রশ্ন করল- “সত্যি সত্যিই কি তুমি ইউসুফ?” উত্তরে ইউসুফ আ. বললেন “হ্যাঁ, আমিই ইউসুফ আর এ হচ্ছে আমার সহোদর ভাই।” অতঃপর তিনি আরও বললেন- “আল্লাহ তা‘আলা আমাদের প্রতি অনুগ্রহ ও কৃপা করেছেন। নিশ্চয় যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে এবং বিপদাপদে সবর করে, আল্লাহ পাক এহেন সৎকর্মীদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।” এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল যে, হযরত ইউসুফ আ. হাজারো দুঃখ কষ্টের প্রান্তর অতিক্রম করে যখন ভাইদের সাথে পরিচিত হলেন, তখন পূর্ববর্তী কোন বিপদাপদের কথাই তিনি উল্লেখ করলেন না বরং আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নিয়ামতসমূহের কথাই শুধু স্মরণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন।


এ থেকে বুঝা যায় যে, মানুষ যখন কোন বিপদ ও কষ্টে পতিত হয়, এরপর আল্লাহ পাক যখন তাকে বিপদ থেকে মুক্তি দিয়ে নিয়ামত দ্বারা ভূষিত করেন, তখন তার উচিত-অতীত বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্টের কথা উল্লেখ না করে উপস্থিত নিয়ামত ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করা। কেননা, বিপদ থেকে মুক্তি ও খোদায়ী নিয়ামত লাভ করার পরও অতীত দুঃখ-কষ্টের কথা মনে করে হা-হুতাশ করা অকৃতজ্ঞতারই পরিচায়ক। কুরআন মাজীদের সূরাহ ‘আদিয়াত-এ এ ধরনের অকৃতজ্ঞতাকে কানূদ كنود বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কানূদ ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যে নিয়ামত ও অনুগ্রহ স্মরণ না করে শুধু কষ্ট ও বিপদাপদের কথাই স্মরণ করে।


পরিশেষে আমাদের কর্তব্য-পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলগণের কাহিনী ও ঘটনা আমাদের জীবনের সাথে মিলিয়ে আমাদের জীবনের ভুল-ত্রুটিগুলো শুধরে নেয়া এবং নবীগণের আদর্শ গ্রহণ করে জীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করা। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে নবী-রাসূলগণের ঘটনা আমাদের নিকট এজন্যই উল্লেখ করেছেন।


মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে আলোচিত ঘটনা থেকে শিক্ষা হাসিল করে সর্বপ্রকার চক্রান্ত ও প্রতারণামূলক কার্যকলাপ থেকে দূরে থেকে নবীওয়ালা আদর্শিক চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার তাওফীক দান করুন। (আমীন)

মন্তব্য করুন