Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৮:১০ অপরাহ্ণ

ইভা কাইলিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বহিষ্কার

ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনে কাতার সরকারের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ থেকে গ্রিক রাজনীতিক ইভা কাইলিকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ ডিসেম্বর) পার্লামেন্টে এক ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে পার্লামেন্টের ৬২৫ সদস্যের সবাই তাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে মোট ১৪টি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ রয়েছে। গত ৮ বছর ধরে তাদের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ৪৪ বছর বয়সী ইভা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজনে ঘুষ লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগে শুরু হওয়া তদন্তের অংশ হিসেবে গত শুক্রবার আরও তিনজনের সঙ্গে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও উপহার গ্রহণের জন্য অভিযোগও গঠন করা হয়েছে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের এবারের আসরের আয়োজক দেশ কাতার। গত ২০ নভেম্বর শুরু হওয়া আসর এখন প্রায় শেষের দিকে। তবে কাতার বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক বছর আগেই একে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগ একদিকে যেমন কাতারের বিরুদ্ধে, তেমনি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার বিরুদ্ধেও।

তবে সম্প্রতি এর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও সামনে আসে। নজিরবিহীন এ দুর্নীতির কারণে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোটটির গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।

ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ করে দিতে কাতার ইইউর কয়েক কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়েছে– এমন অভিযোগ উঠার পর এ নিয়ে তদন্ত শুরু করে বেলজিয়াম কর্তৃপক্ষ। তারই অংশ হিসেবে গত শুক্রবার (৯ ডিসেম্বর) অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়।

রোববার (১১ ডিসেম্বর) এ চারজনের বিরুদ্ধে ঘুষগ্রহণের অভিযোগ আনা হয়। পুলিশী অভিযানের সময় বিপুল পরিমাণ (৬ লাখ ৩১ হাজার ডলার) নগদ অর্থও উদ্ধার করা হয়। বেলজিয়ামের আইনজীবীরা বলছেন, অভিযানে প্রাথমিকভাবে ছয়জনকে আটক করা হয়।

এর মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। বাকি দুজনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তবে কাতারের কাছ থেকে কোনো ঘুষগ্রহণের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন ইভা।

আইনজীবীরা অবশ্য কাতারের নাম উল্লেখ করেননি। তারা বলেন, বেশ কয়েক মাস ধরেই তারা সন্দেহ করছিলেন, একটি উপসাগরীয় দেশ বিশ্বকাপ নিয়ে ইইউ সদস্যদের ‘প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিল’। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেই উপসাগরীয় দেশ হচ্ছে কাতার। বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক বছর আগে থেকেই দেশটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল।

তবে কাতার সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির কর্মকর্তারা বেশ জোরের সঙ্গেই বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে তাদেরকে কোনো অন্যায় বা দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা তারা প্রত্যাখ্যান করছেন।’

রোববারও আল-জাজিরাকে দেয়া এক বিবৃতিতে দেশটির কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘কাতার সরকারের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ করা হচ্ছে তা ভিত্তিহীন ও গুরুতর অজ্ঞতাপ্রসূত।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘কাতার সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিষ্ঠান যোগাযোগের মাধ্যমে কাজ করে এবং এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হয়।’

ইউরোপীয় ইউনিয়নে রীতিমতো তোলপাড়

বিষয়টি নিয়ে ইউরোপের ২৭টি দেশের সংস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়নে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিবিসি জানিয়েছে, অভিযোগের গুরুত্ব ও মাত্রা দেখে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনেক সদস্যই হতবাক হয়ে গেছেন। এ নিয়ে একে একে মুখ খুলছেন ইইউ নেতারা। তারা বলছেন, এটি হয়তো ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘুষ কেলেঙ্কারির একটি হতে যাচ্ছে।

সোমবার (১২ ডিসেম্বর) ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেল বলেন, খবরটি খুবই উদ্বেগের। ইইউ পার্লামেন্টের সদস্যদের ঘুষ গ্রহণের এ অভিযোগকে ‘খুবই মারাত্মক’ বলে অভিহিত করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের (ইসি) প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। তিনি বলেন, এসব অভিযোগ ‘অত্যন্ত গুরুতর।’ একই সঙ্গে ইইউর নীতি-সংশ্লিষ্ট নতুন একটি কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ইউরোপের গণতন্ত্র আক্রমণের শিকার

কথা বলেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট রবার্টা মেতসোলা। তিনি বলেন, ‘ঘুষ কেলেঙ্কারিতে ইউরোপের গণতন্ত্র আক্রমণের শিকার হয়েছে। উন্মুক্ত ও অবাধ গণতান্ত্রিক সমাজ আক্রান্ত হয়েছে।’

ইউরোপীয় ইকনোমিকস কমিশনার পাওলো জেন্টিলোনি ঘুষ লেনদেনের ঘটনাকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। ইতালির রায় ৩ টিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এটা যদি নিশ্চিত জানা যায় যে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অভ্যন্তরের মতামত বদলে দিতে কেউ একজন ঘুষ নিয়েছিল, তাহলে সেটা হবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতির সবচেয়ে নাটকীয় খবরগুলোর একটি।’

আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিমন কোভনি বলেন, ঘুষের লেনদেনের খবরটি নিশ্চিতভাবেই ইইউর ভাবমূর্তির জন্য ‘ক্ষতিকর’। তার কথায় ‘এটা এমন একটা কেলেঙ্কারি যার সত্যতা প্রকাশ করা প্রয়োজন।’

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক বলেন, এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশ্বাসযোগ্যতাই হুমকির মুখে পড়েছে। তার ভাষায়, এটা একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে এর উন্মোচন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা ইউরোপের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপার। এর পরিণতি বহুমুখী হতে পারে।’

হিমশৈলের চূড়ামাত্র

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একজন ঊর্ধ্বতন সদস্য বলেছেন, কাতারকে ঘিরে বর্তমান দুর্নীতির কেলেঙ্কারি ‘হিমশৈলের চূড়ামাত্র’। পার্লামেন্টের বামপন্থী গোষ্ঠীর সহ-সভাপতি মানন অব্রে এক টুইট বার্তায় বলেছেন, তিনি দেখেছেন যে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে তার সহকর্মীরা যারা কাতারে গেছেন তারা ফিরে আসার পর মত বদলে ফেলেছেন।

অব্রে আরও বলেন, সরকারগুলোর জোরালো তদ্বিরের প্রক্রিয়া নিষিদ্ধ করা উচিত এবং ইইউর প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মনীতি নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত।

চলতি সপ্তাহে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে। কুয়েত, কাতার, ওমান ও ইকুয়েডর- এই চার দেশকে ইইউ দেশগুলোতে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়া হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত নিতেই এ ভোটাভুটি। তবে ঘুষ কেলেঙ্কারির কারণে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক ও ভোটাভুটি স্থগিত করার পরামর্শ দিয়েছে কিছু আইনপ্রণেতা।

মন্তব্য করুন