১৬ ডিসেম্বর ২০২১।১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)নতমস্তকে আত্মসমপর্ণ করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।আর বিজয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের ৫০ বছর পেরিয়ে আসার পথে আমরা।বছর ঘুরে আবার এলো বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। এবারের মাসটি ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে এসেছে। স্বাধীনতাকামী বাঙালির হৃদয়ে মাসটি মহা আনন্দের, মহা গৌরবের। স্বজন হারানোর বেদনায় এই মাস একইসঙ্গে শোকের, আবার উদযাপনেরও।এবার থাকছে নানা আয়োজন। স্বাধীনতার ৫০ বছরে ৫০টি জাতীয় পতাকা সংবলিত সুবর্ণজয়ন্তীর র্যালি দেশের ৬৪টি জেলা প্রদক্ষিণ করবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সর্বশেষ জেলা প্রদক্ষিণ শেষে কেন্দ্রীয়ভাবে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে বীর মুক্তিযোদ্ধা মহাসমাবেশ।এর আগে দেশের ২১টি স্থানে হয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আঞ্চলিক সমাবেশ। যা শুরু হয় ২৬ নভেম্বর। ২৬ নভেম্বর দিনাজপুরে উপ আঞ্চলিক মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি তথা সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
আজ বাঙালি জাতির গৌরবের দিন।বিশ্ব মানচিত্রে লাল–সবুজের পতাকার স্থান পাওয়ার দিন। যেসব বীর সন্তানের প্রাণের বিনিময়ে এই পতাকা ও মানচিত্র এসেছে, তাঁদের শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমেই এই দিবসের মহিমা প্রকাশ পাবে আজ। আর এ অর্জন একদিনে সম্ভব হয়নি। এর জন্য বাঙালি জাতির ছিল সুদীর্ঘ তপস্যা ও সাধনা। এ সাধনার কাণ্ডারি ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিরা যখন স্বাধীনতা স্পৃহায় উদ্দীপ্ত হতে শুরু করে, পাকিস্তানি বর্বরতার মাত্রা বাংলার মানুষের ওপর আরও বাড়তে থাকে। ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের পর পাকিস্তানিরা আরও সোচ্চার হতে থাকে। ফল স্বরূপ ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ চালায়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে মুক্তিবাহিনী যখন আস্তে আস্তে সুগঠিত হতে থাকে তখন পাকবাহিনীর অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। গ্রামে-গঞ্জে ঘুমন্ত মানুষের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়, বেছে বেছে যুবকদের ধরে এনে গুলি করে হত্যা করে ও পৈশাচিক নির্যাতন চালায়।পাকসেনা ও রাজাকারদের এমন নিপীড়ন-নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাংলার সাধারণ মানুষ এক সময় সম্মিলিত প্রয়াসে জনযুদ্ধে নেমে পড়ে। এখানে ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক, কামার-কুমার, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শিশু-কিশোর, নারী সবাই অংশগ্রহণ করে এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করার আকাঙ্ক্ষায় তীব্র সংগ্রাম চালিয়ে যায়। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের পর বাংলার মানুষের এ আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় ১৬ ডিসেম্বরে। তাই ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় কোনো সাধারণ বিজয় নয়, এটি আমাদের রক্তে রঞ্জিত চেতনার বিজয়, আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের বিজয়। এ বিজয় আমাদের কাছে তাই একইসঙ্গে প্রেরণার ও গৌরবের।
বাঙালির প্রেরণার উৎস গৌরবময় এ বিজয় দিবস বর্তমানে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এবং বাঙালির জীবন চেতনায় গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ বিজয়ের অনুপ্রেরণা থেকে বাঙালির আজকের দীর্ঘ পথচলা, যাবতীয় অর্জন। একাত্তরের বিজয়গাথা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে তারই সুযোগ্যকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় বর্তমান বাংলাদেশের সমৃদ্ধি সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে শীর্ষে উঠেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দেশপ্রেমিক কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশে সমৃদ্ধির যে সুবাতাস বইছে, তা এই ক্ষুদ্র প্রয়াসে বলে শেষ করা যাবে না। তবু তার দু’চারটি প্রসঙ্গ তুলে ধরতে চাই।
★আর্থ-সামাজিক অবস্থাঃ- বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা গত কয়েক দশকের চেয়ে যে শীর্ষে অবস্থান করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার যেভাবে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিয়েছে, তার তুলনা হয় না। যদিও সীমিত সম্পদের বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার শতভাগ পূরণ করা সম্ভব নয়, তবু আমরা বলতেই পারি যে, বর্তমান সরকারই দেশ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণে সফলতা অর্জন করেছে। এর ফলে আমাদের দেশে এখন ভিক্ষাবৃত্তিসহ সামাজিক নীচুতা বহুলাংশে কমে এসেছে। মানুষ আত্মমর্যাদার প্রশ্নে এখন অনেকটাই সচেতন হয়ে উঠেছে।
★যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ-বাংলাদেশ মূলত গ্রামভিত্তিক দেশ। এ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাও তাই উন্নত দেশের মতো হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অবিশ্বাস্য সাফল্যের সঙ্গে বর্তমান সরকার আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। কী গ্রাম, কী শহর, দেশের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকে তাকালে আমরা দেখি, আমাদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। বিশেষ করে, যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ স্থাপনে যে কী কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে, তা সবারই জানা। সারা দেশে এমন অনেক সুযোগ তৈরি করা হয়েছে যাতে মানুষ সহজে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প বর্তমান সরকারের আরেকটি সাফল্য। এ সেতু চালু হলে দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ সহজতর হবে। ঢাকা শহরে যানজট নিরসনের জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। ঢাকায় প্রথমবারের মতো মেট্রোরেল স্থাপন করার যুগান্তকারী পদক্ষেপও নিয়েছে বর্তমান সরকার। আর এসব সম্ভব হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে।
★তথ্যপ্রযুক্তিঃ-তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখন আর পিছিয়ে নেই। শেখ হাসিনার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দেশে তথ্যপ্রযুক্তিগত নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে মানুষের নানা বিষয়ে দুর্ভোগ অনেকটাই কমে এসেছে। ঘরে বসেই এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক কাজই মানুষ করতে পারছে। একটা চিঠি পাঠানো, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা পাঠানো ইত্যাদির জন্য গ্রামের মানুষকে আর কারও দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় না।ব্যাংকিং থেকে শুরু করে সবকিছুতেই এখন প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ খুব সহজে এবং দ্রুত নিজেদের কাজকর্ম সেরে নিতে পারছে। স্যাটেলাইট, সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিযোগাযোগ সব ক্ষেএেই প্রযুক্তির কল্যাণে এখন সুবাতাস বইছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে এমন সাফল্য আমাদের মহান বিজয়কে আর ও গৌরবান্বিত করেছে।
★বিজয় দিবসের তাৎপর্যঃ-বিজয় দিবস আমাদের কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা, এ দিনটিতে আমরা পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হয়েছি। ত্রিশ লক্ষ জীবনের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। অশ্রু আর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এ স্বাধীনতা আমাদের কাছে অত্যন্ত গৌরবের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে নিয়ে চলেছে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পতাকা, গাইছে বিজয়ের গৌরবগাথা। তাই বিজয় দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম।প্রতিবছর এই দিনটি পালনের মধ্য দিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম এবং বিশ্বকে বারবার মনে করিয়ে দেয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযযাদ্ধাদের কথা, বীর শহীদদের কথা। আমরা অনুপ্রাণিত হই আমাদের দেশের গৌরবােজ্জ্বল ইতিহাসের কথা স্মরণ করে। উদ্বুদ্ধ হই অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে।পরিশেষে বিজয় দিবসের ঐতিহাসিক তাৎপর্য সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশকে আমরা সঠিক পন্থায় গড়ে তুলতে পারিনি। সুতরাং বাংলাদেশকে একটি আদর্শ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে গঠন করে তুলতে হলে বিজয় দিবসের তাৎপর্য আমাদের অবশ্যই যথার্থভাবে অনুধাবন করতে হবে।আর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের ঠাঁই হবে না। এবারের মহান বিজয় দিবসে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
★ইসলামের দৃষ্টিতে বিজয় দিবসের গুরুত্বঃ-বিজয়’ শব্দটি যদিও খুব ছোট, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকে বিস্তর ইতিহাস।ত্যাগ-তিতিক্ষার, হাসি-কান্নার, আনন্দ-বেদনার এবং অর্জন-বর্জনের ইতিহাস।বিজয় দিবস’ শুধুই উদযাপনের নয়; তা হৃদয় দিয়ে আত্মোপলব্ধি করার।বিজয় দিবস উদযাপনে ইসলামেও বিরোধিতা নেই। বরং দেশের স্বাধীনতা অর্জন ও বিজয় উদযাপন উপলক্ষে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করা এবং তারই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাই ইসলামের নির্দেশ।প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো ঘোষণাই দিয়েছেন-‘হুব্বুল ওয়াত্বানে মিনাল ঈমান অর্থাৎ দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।’ আর দেশকে ভালোবাসার সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও পরাধীনতা থেকে মুক্তি লাভ করে বিজয় অর্জন করা একই সুতোয় গাঁথা।আর মুক্তিযুদ্ধে যারা জানমাল বাজি রেখে স্বদেশের জন্য, মানুষের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে লিপ্ত ছিল- তাদের এ নৈতিক অধিকারকে ইসলাম সমর্থন করে সর্বতোভাবে।হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্ব।তিনি মদিনাকে স্বাধীন করেছিলেন মুনাফিক চক্র এবং সুদখোর, চক্রান্তবাজ, ইহুদিদের কবল থেকে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) যে কতটা স্বাধীনচেতা রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন তার পরিচয় মেলে পঞ্চম হিজরির শাওয়াল মাসে সংঘটিত খন্দকের যুদ্ধে। মদিনার ইহুদিদের প্ররোচনায় মক্কার কুরাইশরা যখন মদিনা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়, তখন হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইসলামি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে সাহাবি হজরত সালমান ফারসির (রা.) পরামর্শক্রমে মদিনার চারপাশে পরিখা খনন করেন। কুরাইশ বাহিনী পরিখা পার হয়ে মদিনায় আসতে না পেরে কিছুদিন অবরুদ্ধ থাকার পর ব্যর্থ মনে মক্কায় ফিরে যায়। সে সময় এটা ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী বিজয় ধরে রাখতে হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) একটি বিস্ময়কর পদক্ষেপ।
মানবতার ধর্ম ইসলামে দেশকে ভালোবাসার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ ও স্বভাব-চরিত্রে দেশপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তিনি নিজের মাতৃভূমি পবিত্র মক্কা নগরীকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাই স্বজাতি কর্তৃক নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বিতাড়িত হয়ে জন্মভূমি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকালে বারবার মক্কার দিকে ফিরে তাকিয়ে কাতর কণ্ঠে আফসোস করে বলেছিলেন, ‘হে আমার স্বদেশ! আমাকে বাধ্য করা না হলে- আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।
সত্যিকারে দেশপ্রেম স্বদেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে, স্বদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কর্মকৌশল উদ্ভাবনে আত্মনিয়োগ করার শিক্ষা দেয়। অতএব, আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি স্বাধীনতা ও এই বিজয়কে অর্থবহ করতে দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করা, দেশকে কিছু দেওয়ার মনমানসিকতা তৈরি করা। সেই সঙ্গে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন, সেসব শহীদের স্মরণ ও দোয়া করা।তাদের স্মরণ ও দোয়া করতে হবে ইসলাম নির্দেশিত পন্থায়। যেমন কোরআনে কারিমের একটি সূরা হচ্ছে ‘আল ফাতহ’ অর্থ বিজয়। আরেকটি সূরার নাম ‘আন নাসর’ অর্থ মুক্তি ও সাহায্য। সূরা নাসরের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের বিজয় উৎসব করার নিয়ম বাতলে দিয়েছেন।এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যখন আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্য ও বিজয় আসবে, তখন মানুষদের তুমি দেখবে, তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে। অতঃপর তুমি তোমার মালিকের প্রশংসা কর এবং তার কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা কর; অবশ্যই তিনি তওবা কবুলকারী। ’ -সূরা নাসর: ১-৩এই সূরায় আল্লাহতায়ালা বিজয় অর্জনের পর দু’টি কাজ করতে বলেছেন।এক. বিজয় অর্জিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহান আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে তার দরবারে শোকরিয়া জ্ঞাপন করা।
দুই. আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আসলে স্বাধীন হওয়ার চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু নেই। এ কারণেই আল্লাহ নির্দেশ দিলেন, ‘তোমরা বিজয় লাভ করেছ, এখন তোমাদের কাজ হচ্ছে এ বিজয়ের জন্য আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে কিংবা তাসবিহ পাঠ করে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।বিজয়ের দিনে যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন, সেসব শহীদের জন্য দোয়া করা। সেই সঙ্গে তাদের শাহাদাত থেকে নতুন করে শপথ নেওয়া, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকার, বাতিলের কাছে মাথা নত না করার এবং অন্যের কাছে নিজের স্বাধীনতা বিকিয়ে না দেওয়ার।আমরা মুসলমান। তাই বিজয় উৎসব করতে গিয়ে আল্লাহকে ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে আল্লাহ আমাদের বিজয় দান করেছেন, এটা আল্লাহর অপার অনুগ্রহ।অষ্টম হিজরিতে নবী মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয় করেন এবং মক্কার কুরাইশদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। নবী করিম (সা.) বিজয়ের দিন শোকরিয়াস্বরূপ আট রাকাত নামাজ আদায় করেছিলেন।আর বিজয় দিবস উদযাপনে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি যুযোপযোগী হাদিস তুলে ধরা হলো-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে একদিন ও এক রাত (দেশের) সীমানা পাহারা দেয়া এক মাসব্যাপী রোজা পালন ও মাসব্যাপী রাত জাগরণ করে নামাজ আদায়ের চেয়ে বেশি কল্যাণকর। এ অবস্থায় যদি ওই ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে; তবে যে কাজ সে করে যাচ্ছিল, মৃত্যুর পরও তা তার জন্য অব্যাহত থাকবে; তার রিজিক অব্যাহত থাকবে; কবর ও হাশরে ওই ব্যক্তি ফেতনা থেকে মুক্ত থাকবে।’ (মুসলিম)
দেশপ্রেম, দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রহরা ও বিজয় দিবসে তাসবিহ, ক্ষমা প্রার্থনা এবং আনন্দ উৎসবও দেশের প্রতিটি নাগরিকের আবশ্যকীয় কাজ। এ বিজয় দিবসে দেশের জন্য আত্মদানকারী সব শহীদের জন্য দোয়া ও প্রার্থনা করা ঈমানের একান্ত দাবি। যেমনটি আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-
‘(হে নবি!) যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে; আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন। তখন আপনি আপনার পালনকর্তার তাসবিহ তথা পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমা ও তাওবা কবুলকারী।’ (সুরা নসর)তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিরপরাধ বাংলা ভাষাভাষী মানুষ অত্যাচারী পশ্চিম পাকিস্তানিদের অত্যাচার নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করব। দেশের উন্নয়নে তার কাছে সাহায্য চাইব। নিজেদের পরিশুদ্ধ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতেও তার সাহায্য চাইব। নিজেদের দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলে প্রকৃত ঈমানদার হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করব। নিজেদের দেশের সেবায় উৎসর্গ করব। এমনটিই ইসলামের দিকনির্দেশনা।সুতরাং বিজয় দিবসে মহান আল্লাহ তাআলা প্রশংসা ও দেশের জন্য আত্মদানকারী সব শহীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা দেশের সব নাগরিকের ঈমানের অকাট্য দাবি।বিজয় দিবসে এদেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব হলো- বিজয় দিবস উদযাপনের পাশাপাশি স্বাধীনতার জন্য আত্ম ও অঙ্গদানকারী বীর সন্তানদের যথাযথ স্মরণ করা। পরিশেষে. ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনে আমরা নফল নামাজ পড়ে আল্লাহতায়ালার দরবারে শোকরিয়া জ্ঞাপন করতে পারি। সেই সঙ্গে কোরআনে কারিম তেলাওয়াত ও দান-খয়রাত ইত্যাদির মতো ভালো কিছু কাজ করতে পারি। যা যুদ্ধকালীন শহীদসহ অন্যদের উপকারে আসে, তাদের নাজাতের উসিলা হয়।
৫৩
৯২ মন্তব্য