সহকারী অধ্যাপক
১৭ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৯:০৪ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ এক ধর্ম। এতে নেই বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি; নেই ঔদ্ধতা ও প্রান্তিকতা। এতে সুনিশ্চিত করা হয়েছে সম্মানিত প্রত্যেকের প্রাপ্য মর্যাদা। এরই অংশ হিসেবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর সর্বসম্মত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি আকীদা হচ্ছে:
১. আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন তামাম পৃথিবী ও মাখলুকের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, নবী ও রাসুল। মুসলিম হা. ২২৭৮; সুনানে দারেমী হা. ৪৭; মুসতাদরাক হাকেম হা. ৩৩৩৫, সহীহ; আকীদাতুত তাহাবী; শারহুল ফিকহিল আকবার, মুল্লা আলী কারী পৃ. ১৯৪-১৯৬।
২. তাঁর পর নবী-রাসুলগণ সকল মানব ও জিন জাতির উপর মর্যাদাবান। এমনকি অধিকাংশ ইমামের মতে ফেরেশতাদের উপরও নবীগণের মর্যাদা। দ্র. আল-হাবায়িক ফী আখবারিল মালায়িক, সুয়ূতী।
৩. নবী-রাসুলগণের পর সকল মানব জাতির উপর হযরত আবু বকর রা.-এর মর্যাদা, এরপর ওমর রা.। এমনকি তাঁরা আহলে বাইত, অন্য সাহাবা ও ওলীগণের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান। এটাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর সর্বসম্মত আকীদা।
প্রথম বিষয়ে এখনো কারো দ্বিমত দেখি নাই। তবে সম্প্রতি ওয়ায-মাহফিলে ‘আহলে বাইত’ ও হযরত আলী রা. বা হযরত হুসাইন রা.-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বয়ান করতে গিয়ে শেষ দুই বিষয়ে ভিন্ন মত ও আওয়ায শুনা যাচ্ছে। যেমন পরিচিত বক্তা মাওলানা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী সাহেব হাফি. বলেছেন, “পূর্বের আম্বিয়ায়ে কেরামের উপর মর্যাদা আহলে বাইত’-এর।” এভাবে বেরেলভী ঘরানার এক পাঞ্জাতনী বক্তা হযরত আলী রা.-এর মর্যাদা সকল সাহাবায়ে কেরামের উপর বলেছেন। তাই শেষ দুই বিষয়ে কিছু আলোচনা ও প্রমাণ তুলে ধরছি।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে হযরত নূহ, ইবরাহিম, ইসহাক, ইসমাঈল, য়াসা’আ, ইউনূস ও লূত (আলাইহিমুস সালাম) সহ ১৮ জন নবীর নাম উল্লেখ করার পর ইরশাদ করেন,
وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ
প্রত্যেককেই আমি বিশ্ব জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। দেখুন, সুরা আল-আনআম ৮৩-৮৬।
অনেক মুফাসসির বলেছেন, তাঁদের এ শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হল নুবুওয়াত ও রিসালাত। আর বিশ্ব জগতের মধ্যে সকল মানুষ অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং নবী-রাসুলগণ সকল মানুষের উপর শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান। দেখুন, ৮৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে মাতুরিদী, বায়যাভী, খাযেন ও আল-বাহরুল মুহীত
এছাড়া অনেক সহীহ হাদীসে এসেছে, কিয়ামত ও হাশরের মাঠে শাফাআতের জন্য সকল মানুষ ছুটে যাবে নবী-রাসুলগণের কাছে। যা এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, নবী-রাসুলগণের মর্যাদা সকল মানুষের চেয়ে বেশি। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে
আনাস রা. বলেন, আমাদেরকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন মানুষ সমুদ্রের ঢেউয়ের মত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। তখন তারা আদম (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করুন। তিনি বলবেন, এ কাজের জন্য আমি নই। বরং তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাও। কারণ, তিনি হলেন আল্লাহর খলীল। তখন তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন, আমি এ কাজের জন্য নই। তবে তোমরা মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও। কারণ, তিনি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন। তখন তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন, আমি তো এ কাজের জন্য নই। তবে তোমরা ঈসা (আঃ)-এর কাছে যাও। কারণ তিনিই আল্লাহর রূহ।
তারা তখন ঈসা (আঃ)-এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন, আমি তো এ কাজের জন্য নই। বরং তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে যাও। এরপর তারা আমার কাছে আসবে। আমি বলব, আমিই এ কাজের জন্য। আমি তখন আমার রবের নিকট অনুমতি চাইব। আমাকে অনুমতি দেয়া হবে। আমাকে প্রশংসাসূচক বাক্য ইলহাম করা হবে, যা দিয়ে আমি আল্লাহর প্রশংসা করব, যেগুলো এখন আমার জানা নেই। আমি সেসব প্রশংসা বাক্য দিয়ে প্রশংসা করব এবং সাজদাহয় পড়বো।
তখন আমাকে বলা হবে, ইয়া মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। তুমি বল, তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেয়া হবে। সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি বলবো, হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মত!, আমার উম্মত!!.......। সহীহ বুখারী হা. ৭৫১০ ও মুসলিম হা. ৩২৬।
অতএব ‘আহলে বাইত’ যদি নবী-রাসুলগণের চেয়ে শ্রেষ্ট হত, তাহলে সকল মানুষ এ কঠিন সময়ে শাফাআতের জন্য তাঁদের কাছেই যেতো।
দ্বিতীয়ত:
‘আহলে বাইত’-এর সদস্যগণ হয়তো সাহাবী হবেন যেমন হযরত ফাতেমা রা., হযরত আলী রা., হযরত হুসাইন রা., অথবা সাহাবী না হয়ে শুধু শ্রেষ্ঠওলী হবেন যেমন তাঁদের আওলাদ। আর দুটোর যেটাই হন না কেন, নবী-রাসুলগণের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হওয়া দূর কী বাত, তাঁদের সমমর্যাদারও হতে পারবেন না।
কেননা তিনি যদি সাহাবী হন, তাহলে হাদীসের ভাষ্য ও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর সর্বসম্মত আকীদা হচ্ছে, নবী-রাসুলগণের পর সকল মানব জাতির উপর হযরত আবু বকর রা.-এর মর্যাদা, এরপর হযরত ওমর রা.।
ইমাম আজম আবু হানিফা রহ. রহ. (মৃত্যু. ১৫০ হি.) বলেন,
وأفضل الناس بعد النبيّين عليهم الصلاة والسلام أبو بكر الصديق، ثم عمر بن الخطاب...
নবীগণের পর মানব জাতির মাঝে হযরত আবু বকর রা. শ্রেষ্ঠ, এরপর হযরত ওমর রা.। আল-ফিকহুল আকবার পৃ. ১০৬।
ইমাম শাফেয়ী রহ. (মৃ. ২০৪ হি.) রহ. বলেন,
أَفْضَلُ النَّاسِ بَعْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَبُو بَكْرٍ ثُمَّ عُمَرُ ثُمَّ عُثْمَانَ ثُمَّ عَلِيٍّ.
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর লোকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন আবু বকর রা., এরপর ওমর রা.। আল-ইতিকাদ, বায়হাকী পৃ. ৪৬১।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. রহ. (মৃ. ২৪১ হি.) বলেন,
وخير الأمة بعد النبي صلى الله عليه وسلم أبو بكر، وعمر بعد أبي بكر.
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর উম্মতের মধ্যে উত্তম হলেন আবু বকর রা., তাঁর পর ওমর রা.। তাবাকাতুল হানাবিলা ১/৩০।
হাফেজ ইবনে কাছীর রহ. (মৃ. ৭৭৪ হি.) বলেন,
وأفضل الصحابة، بل أفضل الخلق بعد الأنبياء عليهم السلام: أبو بكر. وقال في "تفسيره": كَانَا أَفْضَلَ الْمُؤْمِنِينَ بَعْدَ النَّبِيِّينَ وَالْمُرْسَلِينَ.
সাহাবাগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, বরং নবীগণের পর মাখলুকের মাঝে শ্রেষ্ঠ আবু বকর রা.। আল-বাইছুল হাছীছ পৃ. ১৮৩।
ইমাম তাহাবী রহ. (মৃ. ৩২১ হি.) লিখেন,
وَنُثْبِتُ الْخِلَافَةَ بَعْدَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوَّلًا لِأَبِيْ بَكْرٍ الصِّدِّيْقِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ تَفْضِيْلًا لَهُ وَتَقْدِيْمًا عَلَى جَمِيْعِ الْأُمَّةِ، ثُمَّ لِعُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ.
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর আবু বকর সিদ্দীক রা. সকল উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্যতা লাভ করার কারণে আমরা সর্বপ্রথম তাঁর খেলাফতের স্বীকৃতি প্রদান করি। দ্র. আকীদাতুত তাহাবী।
এর ব্যাখ্যায় সিরাজুদ্দীন গাযনভী রহ. (মৃ. ৭৭৩ হি.) বলেন,
لأنه أفضل الناس بعد الأنبياء لقوله عليه الصلاة والسلام: «مَا طَلَعَتْ شَمْسٌ وَلا غَرَبَتْ عَلَى أَحَدٍ بَعْدَ النَّبِيِّينَ وَالْمُرْسَلِينَ أَفْضَلَ مِنْ أَبِي بَكْرٍ».
[أخرجه أحمد في "فضائل الصحابة" 135، 508، 662، وعبد بن حميد في "مسنده" (212- المنتخب)، وابن بطة في "الإبانة"، واللالكائي في "أصول الاعتقاد"، وابن عساكر في "تاريخ دمشق"، من طرق عن ابن جريج، عن عطاء بن أبي رباح، عن أبي الدرداء مرفوعا، وأورده في "كنز العمال" 35644 وعزاه لابن عساكر وحسّن إسناده، ولفظه: «إن أبا بكر خير من طلعتْ عليه الشمس وغربتْ». وقال ابن حجر الهيتمي (ت: 974هـ) في "الصواعق المحرقة" 1/197: وله شواهد من وجوه أخر تقضي له بالصحة أو الحسن، وقد أشار ابن كثير إلى الحكم بصحته. اهـ. وقد احتج به ابن الجوزي وابن تيمية والحافظ ابن حجر والسخاوي.]
এর (সকল উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্যতা লাভ করার) কারণ হচ্ছে, নবীগনের পর লোকদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ। কেননা হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নবী ও রাসূলগনের পর আবু বকরের চেয়ে মর্যাদাবান কোন ব্যক্তির উপর কখনো সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত হয়নি।” অর্থাৎ নবী-রাসূল ছাড়া তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ এই পৃথিবীতে কখনো বসবাস করেনি।
ইমাম আবুল বারাকাত নাসাফী রহ. (মৃ. ৭১০ হি.) উক্ত হাদীস উল্লেখ করে বলেন,
فهذا يقتضي أن أبا بكر أفضل من كل مَن ليس بنبي، وأنه دون مَن هو نبي، وهو دليل على أن الأنبياء عليهم السلام أفضل من غيرهم.
এই হাদীসের দাবি হল, যারা নবী নন, তাদের সকল থেকে আবু বকর রা. শ্রেষ্ঠ এবং তাঁর মর্যাদা নবীগণের পরে। আর এতে প্রমাণিত হয় যে, নবীগণ অন্য সবার থেকে শ্রেষ্ঠ। আল-ই’তিমাদ ফীল ই’তিকাদ পৃ. ৩৩৬-৩৩৭।
আবু বকর কালাবাযী হানাফী রহ. (মৃ. ৩৮০ হি.) এ ব্যাপারে ঐকমত্য নকল করে বলেন,
وأجمعوا جميعا أن الأنبياء أفضل البشر، وليس في البشر من يوازي الأنبياء في الفضل، لا صديق، ولا ولي، ولا غيرهم، وإن جل قدره وعظم خطره.
قال النبي صلى الله عليه وسلم لعلي رضى الله عنه: «هَذَانِ سَيِّدَا كُهُولِ أَهْلِ الجَنَّةِ مِنَ الأَوَّلِينَ وَالآخِرِينَ؛ إِلَّا النَّبِيِّينَ وَالمُرْسَلِينَ». [أخرجه الترمذي 3664 وقال: حَدِيث حَسَن.] يعني أبا بكر وعمر، فأخبر صلى الله عليه وسلم أنهما خير الناس بعد النبيين.
قال أبو يزيد البسطامي: آخر نهايات الصديقين أول أحوال الأنبياء، وليس لنهاية الأنبياء غاية تدرك. انتهى.
এ বিষয়ে সবাই একমত যে, নবীগণ হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। মানুষ জাতির মধ্যে এমন কেউ নেই, যে শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে নবীদের বরাবর হবে। এমনকি ছিদ্দীকও নয়, কোনো ওলিও নয়। এছাড়া অন্য কারো যতই মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব থাকুক না কেন, তিনিও হতে পারবেন না।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “এরা দু’জন হলেন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল গুণী-জ্ঞানী জান্নাতীদের সর্দার নবী-রাসুলগণ ব্যতীত।” অর্থাৎ নবীজি সংবাদ দিলেন যে, আবু বকর ও উমর রাযি. নবীদের পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।
(প্রসিদ্ধ ওলী) আবু ইয়াযীদ বুসতামী রহ. (মৃ. ২৬১ হি.) বলেছেন, ছিদ্দীকগণের সর্বশেষ যেখানে, নবীগণের অবস্থার শুরু সেখানে। আর নবীগণের শেষ প্রান্ত জানা যায় না। আত-তাআররুফ লি-মাযহাবিত তাসাওউফ পৃ. ৬৯।
বরং আল্লামা ইবনে হাযম যাহিরী রহ. (মৃ. ৪৫৬ হি.) বলেন,
...أن يكون في الناس من هو أفضل من الأنبياء عليهم السلام، وهذا كفر.
মানুষের মধ্যে কাউকে নবীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা কুফরী। আল-ফিছাল ৪/২১।
নবীগণের পর আবু বকর রা. ও উমর রা.-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্যতার ব্যাপারে অনেকেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর ঐকমত্য নকল করেছেন।
ইমাম শাফেয়ী রহ. (মৃ. ২০৪ হি.) রহ. বলেন,
مَا اخْتَلَفَ أَحَدٌ مِنَ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ فِي تفْضِيلِ أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ وَتَقْدِيمِهِمَا عَلَى جَمِيعِ الصَّحَابَةِ.
সাহাবা ও তাবিঈগণের কেউ সকল সাহাবার উপর আবু বকর রা. ও উমর রা.-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্যতার ব্যাপারে মতভেদ করেনি। আল-ইতিকাদ, বায়হাকী পৃ. ৪৬১।
ইমাম আকমালুদ্দীন বাবিরতী রহ. (মৃ. ৭৮৬ হি.) বলেন,
أجمَعَ أهلُ السُّنَّة والجماعة على أن أفضلَ هذه الأمَّة بعد النبيِّ صلى الله عليه وسلم أبو بكر رضي الله تعالى عنه، وأكثرُ المعتزلة وجميعُ الروافض يزعمون أن أفضلَ الأمَّة عليٌّ كرَّم الله وجهه، والإماميَّةُ يزعمون أن مَن سوى عليٍّ وابنَيهِ وفاطمةَ ونفرٍ يسيرٍ من الصحابة ارتدُّوا بعد وفاة النبي صلى الله عليه وسلم.
لنا أن ابن عمر رضي الله تعالى عنهما قال: «كُنَّا فِي زَمَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لاَ نَعْدِلُ بِأَبِي بَكْرٍ أَحَدًا، ثُمَّ عُمَرَ، ثُمَّ عُثْمَانَ، ثُمَّ نَتْرُكُ أَصْحَابَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، لاَ نُفَاضِلُ بَيْنَهُمْ».
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর এ ব্যাপারে ইজমা’ বা একমত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হলেন আবু বকর রা.। আর অধিকাংশ মুতাযিলা ও রাফেযী ধারণা করে যে, উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হলেন আলী রা.। আর ইমামিয়ারা মনে করে, আলী রা., তাঁর দুই সন্তান ও ফাতেমা রা. এবং কিছু সাহাবা ছাড়া বাকী সাহাবায়ে কেরাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর মুরতাদ হয়ে গেছেন।
আমাদের দলিল হল, ইবনে উমর রা. বলেন, আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যমানায় আবু বকর রা.-এর মর্যাদার সমান কাউকে মনে করতাম না, এরপর উমর রা...। সহীহ বুখারী হা. ৩৬৯৭। শারহু ওসিয়াতিল ইমাম আবি হানিফা পৃ. ৯৮।
এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর ইজমা’র বিবরণ দেখুন, রিসালা ইলা আহলিছ ছাগর, আবুল হাসান আশআরী পৃ. ২৯৯; আল-ইসতিযকার, ইবনে আব্দিল বার ৫/১১০; তাবছিরাতুল আদিল্লা, আবুল মুইন নাসাফী ২/৮৯৬; আল-মুফহিম, কুরতুবী ৬/২৩৮; আল-ই’তিমাদ ফীল ই’তিকাদ, নাসাফী পৃ. ৩৭৬; ফাতহুল মুগীছ, সাখাবী ৪/৫৫; তাদরীবুর রাবী, সুয়ূতী ৫/১৯৯; শারহুল ফিকহিল আকবার, মুল্লা আলী কারী, পৃ. ১১৪।
আর যারা দাবি করে, “আহলে বাইত নবীগণ থেকে শ্রেষ্ঠ বা উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হলেন আলী রা.” এটা তো স্বয়ং আলী রা.-এর মতেরই বিপরীত। কারণ তিনি নিজেকে এবং আবু বকর এবং উমর রা.-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন না। কেননা তার থেকে মুতাওয়াতির সুত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,
أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرِ هَذِهِ الْأُمَّةِ بَعْدَ نَبِيِّهَا؟ أَبُو بَكْرٍ ثُمَّ عُمَرُ.
‘আমি কি তোমাদের কে সংবাদ দিব না যে, নবীর পর এ উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের ব্যাপারে? এরপর বলেন. আবু বকর রা., এরপর উমর রা.। মুসনাদে আহমদ হা. ৯৩৩, সনদ সহীহ; মিনহাজুস সুন্নাহ, ইবনে তাইমিয়া ১/৩০৮।
অতএব যারা দাবি করে, “আহলে বাইত নবীগণ থেকে শ্রেষ্ঠ বা উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হলেন আলী রা.” এটা অপবাদ ছাড়া কিছুই নয়।
উল্লেখ্য, কেউ কেউ নবীগণের পর শ্রেষ্ঠ বলেছেন খুলাফায়ে রাশেদাহকে। কিন্তু পরে ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, তাঁদের মধ্যে প্রথম আবু বকর রা., এরপর উমর রা.। যেমন নিচে ইমাম বাগাভীর বক্তব্য দেখুন।
قال البغوي بعد ما روى هذا الحديث: "فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ" في شرح السنة 1/208: وَالْحَدِيثُ يَدُلُّ عَلَى تَفْضِيلِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ عَلَى مَنْ سِوَاهُمْ مِنَ الصَّحَابَةِ، وَهُمْ: أَبُو بَكْرٍ، وَعُمَرُ، وَعُثْمَانُ، وَعَلِيٌّ، فَهَؤُلاءِ أَفْضَلُ النَّاسِ بَعْدَ النَّبِيِّينَ وَالْمُرْسَلِينَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِمْ، وَتَرْتِيبُهُمْ فِي الْفَضْلِ، كَتَرْتِيبِهِمْ فِي الْخِلافَةِ، فَأَفْضَلُهُمْ أَبُو بَكْرٍ، ثُمَّ عُمَرُ، ثُمَّ عُثْمَانُ، ثُمَّ عَلِيٌّ.
আর আহলে বাইতের সদস্য যদি শ্রেষ্ঠওলী হন, তাহলে অনেক ইমাম এ ব্যাপারে ঐকমত্য নকল করে বলেছেন, নবীগণ ওলীদের থেকে শ্রেষ্ঠ; বরং কোনো ওলী কখনো নবীর স্তরে পৌঁছাতে পারবে না। আর এমন মনে করা কুফরী বলা হয়েছে।
ইমাম তাহাবী রহ. বলেন,
وَلَا نُفَضِّلُ أَحَدًا مِنَ الْأَوْلِيَاءِ عَلَى أحَدٍ مِنَ الْأَنْبِيَاءِ، وَنَقُوْلُ: نَبِيٌّ وَاحِدٌ أَفْضَلُ مِنْ جَمِيْعِ الْأَوْلِيَاءِ.
আমরা কোনো ওলীকে কোনো নবীর উপর প্রাধান্য দিব না। আমরা বলি, একজন নবী সকল ওলী থেকে উত্তম। আকীদাতুত তাহাবী পৃ. ১৪৭, আল-মাওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ ৪০/৫০।
এর ব্যাখ্যায় সিরাজুদ্দীন গাযনভী রহ. (মৃ. ৭৭৩ হি.) বলেন, কোনো ওলী কখনো নবীর স্তরে পৌছতে পারবে না। কেননা ওলীগণ হচ্ছে নবীগণের অনুসারী। আর অনুসারীর স্তর অনুসৃতের স্তর থেকে নিম্নে হয়ে থাকে। তাছাড়া প্রত্যেক নবীই ওলী হয়ে থাকে, কিন্তু প্রত্যেক ওলী নবী নন। সুতারং নবীর মধ্যে ‘নবুওয়ত ও বেলায়েত’ উভয় গুণই সন্নিহিত রয়েছে। তাই নবীগণ ওলীদের চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ট। আর এতে সেই সব অজ্ঞ সুফিদের মতবাদ খণ্ডন করা হয়েছে, যারা বেলায়েতের স্তরকে নবুওয়তের স্তরের উপর প্রাধান্য দেয়।
হাদীসে এসেছে, “নবী-রাসূলগনের পর আবু বকরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন মানুষের উপরে কখনো সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয়নি।”
এ হাদিসও প্রমাণ বহণ করে যে, হযরত আবু বকর ছিদ্দিক রা. এমন সকল ওলি থেকে শ্রেষ্ট, যারা নবী নন। আর যেহেতু ছিদ্দিকে আকবর রা. সকল ওলিদের থেকে শ্রেষ্ঠ, তাহলে নবীগণ তো অতি উত্তমরূপে শ্রেষ্ঠ।
ইমাম কুশাইরী রহ. (মৃ. ৪৬৫ হি.) -এর কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, ওলিকে নবীদের উপর প্রাধান্য দেওয়া কি জায়েয?
তিনি বলেন,
رتبة الأولياء لا تبلغ رتبة الأنبياء عليهم السلام للإجماع المنعقد على ذلك.
আওলিয়াদের মর্যাদা নবীগণের মর্যাদার স্তরে পৌছতে পারবে না। এ ব্যাপারে উম্মতের ইজমা রয়েছে। আর-রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ ২/৫২২-২৩।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. (মৃ. ৭২৮ হি.) বলেন,
وقد اتفق سلف الأمة وأئمتها وسائر أولياء الله تعالى على أن الأنبياء أفضل من الأولياء الذين ليسوا بأنبياء.
উম্মতের সকল আইম্মায়ে সালাফ ও খালাফ এবং সকল ওলি এ ব্যাপারে একমত যে, নবীগণ সেই সকল ওলীদের থেকে শ্রেষ্ঠ, যারা নবী নন। মাজমুউল ফাতাওয়া ১১/২২১।
শায়খ মোজাদ্দিদে আলফেসানী রহ. (মৃ. ১০৩৪ হি.) বলেন,
لا يبلغ وليّ قطّ درجة نبيّ من الأنبياء عليهم السّلام بل يكون رأس الوليّ تحت قدم نبيّ على الدّوام.
أنّ أفضل الأولياء لا يبلغ مرتبة أدنى الصّحابة.
কোন ওলি কখনো কোন নবীর স্তরে পৌঁছাতে পারবে না। বরং ওলির মাথা সর্বদা একজন নবীর পায়ের নিচে।
অন্যত্র বলেন, শ্রেষ্ঠ বা ওলিকুল শিরোমণিও একজন কম মর্যাদার সাহাবীর স্তরে পৌঁছাতে পারবে না। মাকতুবাত আরবী ১/৩৫৩ ও ১/১৫৫।
তাফসীরে নাসাফীতে ২/২৫২ রয়েছে,
وقد زل أقدام أقوام من الضلال في تفضيل الولي على النبي وهو كفر جلي.
পথভ্রষ্ট কিছু লোক ওলিকে নবীর উপর প্রাধান্য দিয়েছে। আর তা স্পষ্ট কুফরী।
আল্লামা তাফতাযানী রহ. (মৃ. ৭৯২ হি.) বলেন,
فما نقل عن بعض الكرامية من جواز كون الولي أفضل من النبي كفر وضلال.
কতক কাররামিয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ওলি নবী থেকে শ্রেষ্ঠ হতে পারে। এটা কুফরী ও ভ্রষ্টতা। শারহুল আকায়েদ পৃ. ৩৭৯।
‘তাফসীরে রুহুল মাআনী’তে ৬/১৬৭ এসেছে,
সারাংশ: (বড় পির) আব্দুল কাদের জিলানী রহ. (মৃ. ৫৬১ হি.) বলেছেন, নিশ্চয় কোনো ওলিকে কোনো নবীর উপর শ্রেষ্ঠ মনে করার আকীদা কুফরী ও সুস্পষ্ট গোমরাহি। যদি কোনো ওলিকে কোনো নবীর উপর প্রাধান্য দেওয়ার সুযোগ থাকত, তাহলে অবশ্যই আবু বকর রা.কে একজন নবীর উপর হলেও প্রাধান্য দেওয়া হত।
কেননা তিনি ছিলেন মর্যাদাগত দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ বা ওলিকুল শিরোমণি, যা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ মনে করেন। অথচ তাঁকে এভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। বরং নবীগণের পর শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, যেমনটা হাদিসে এসেছে যে, নবীগণের পর আবু বকরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন মানুষের উপরে কখনো সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয়নি।
আর যেহুতু আবু বকর রা.-এর মতো ব্যক্তিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়নি, যার মর্যাদা ও পূর্ণতা স্বীকৃত, তাহলে অন্য কাউকে কিভাবে প্রাধান্য দেওয়া যাবে?
অনেক শিআ আলী রা.কে প্রাধান্য দেয়, এভাবে তাঁর সন্তানদেরকে অনেক সম্মানিত নবী-রাসুলগণের উপর প্রাধান্য দেয়। অথচ এ ব্যাপারে তাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই, কেবল মিথ্যা হাদীস ও ভ্রান্ত চেতনা ছাড়া।
উল্লেখ্য, আহলে বাইতের ব্যাপারে সম্মিলিতভাবে এবং ব্যক্তি বিশেষ হিসেবে অনেক সহীহ হাদিসে বিভিন্ন ফযিলত এসেছে এবং তাঁদেরকে মুহাব্বত ও সম্মান করতে বলা হয়েছে। তাই আহলে বাইতকে মুহাব্বত করা ও সম্মান করা ঈমানের অংশ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি থেকে হেফাজত করুন এবং সঠিক ঈমান ও আকীদা পোষণ করার তাওফীক দান করুন।
৫৩
৯১ মন্তব্য