Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ ডিসেম্বর, ২০২২ ০২:১০ অপরাহ্ণ

ইমাম আল গাজ্জালী , মহানবী ﷺ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, প্রত্যেক শতাব্দীতে ইসলামের সংস্কারের জন্য একজন মুজাদ্দিদ (সংস্কারক) আসবেন।

ইমাম আল গাজ্জালী


মহানবী ﷺ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, প্রত্যেক শতাব্দীতে ইসলামের সংস্কারের জন্য একজন মুজাদ্দিদ (সংস্কারক) আসবেন। ইতিহাসের পথচলায় বহু মহান মুসলিম চিন্তাবিদ, শাসক, সেনাপতি, এবং শিল্পীর জন্ম হয়েছে যারা মুসলিম বিশ্বে ইসলামকে নতুন করে উপলব্ধিতে সহায়তা করেছেন এবং বিশ্বের সমসাময়িক নানা সমস্যা মোকাবেলায় মুসলিমদের সাহায্য করেছেন। এসকল মনীষীদের প্রতিটি অবদানই সেসময়কার প্রতিটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।


ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ (সংস্কারক) ছিলেন একাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত আলেম আবু হামিদ আল গাজ্জালী, যিনি আজ পরিচিত “حجة الإسلام‎” (হুজ্জাতুল ইসলাম – ইসলামের সাক্ষ্য)  নামে। সেসময়কার ইসলামের নামে প্রচলিত যেসব ভয়ংকর মতবাদ ও ভ্রান্ত দর্শন মুসলমানদেরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সেসবের বিরুদ্ধে কার্যকর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের কারণে তাঁকে এই উপাধি দেয়া হয়। সর্বব্যাপী গ্রীক দর্শন থেকে শুরু করে শিয়া মতবাদের উত্থান এবং জোয়ার; সবকিছুর বিরুদ্ধেই তিনি ছিলেন সোচ্চার। ইমাম গাজ্জালী ক্ষমতাসীনদের হুমকীর মুখেও প্রকৃত ইসলামী দর্শন ও জ্ঞানের পুনরুজ্জীবনের জন্য সম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা করেছেন।


ইরানের খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত তুস নগরীতে ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৪৫০ হিজরি সনে হুজ্জাতুল ইসলাম আবু হামেদ মোহাম্মাদ আল গাজ্জালী (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোহাম্মাদ আল-গাজ্জালী। ‘গাজ্জাল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সুতা কাটা । কারও মতে ইমাম গাজ্জালীর বংশের লোকেরা সম্ভবত সুতার ব্যবসা করতেন, তাই তাদের বংশ উপাধি গাজ্জালী নামে পরিচিত। 


ফার্সীভাষী পরিবারের উত্তরসূরী হয়েও আরবী ভাষাতে তিনি ছিলেন সাবলীল এবং অন্যান্য মুসলিম মনীষীদের মতো আরবী ভাষাতেই লেখালেখি করেছেন। ইসলামের মৌলিক জ্ঞান ও ইসলামী আইনে তিনি অল্প বয়সেই ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। শাফেয়ী মাজহাবের প্রখ্যাত আলেম আল জুয়াইনী ছিলেন তাঁর অন্যতম শিক্ষক।


প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি সেলজুক সাম্রাজ্যের অধীনে নিজামুল মুল্‌ক শাসিত ইস্পাহান প্রদেশের আদালতে যোগদান করেন। নিজামুল মুল্‌ক মুসলিম বিশ্বে আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত কর্মকান্ডের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। ১০৯১ খ্রিস্টাব্দে ইমাম গাজ্জালী বাগদাদের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র নিজামিয়া মাদ্রাসায় যোগদান করেন। বাগদাদে তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করেন যেখানে তাঁর নিয়মিত লেকচারগুলোতে ব্যাপক জনসমাগম ঘটতো।


সে যাহোক, ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দে ইমাম গাজ্জালী আধ্যাত্মিকতার সংকটের বিষয়টি উপলব্ধি করেন। এ সময় তিনি নিজের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। নিজের আত্মজীবনীতে এপ্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “এটা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ছিলনা বরং ব্যাপক মর্যাদা ও সুখ্যাতি লাভের প্ররোচনা ও প্রেষণাই (motivation) ছিল এর পেছনের উদ্দেশ্য”। নিজের মাঝে আধ্যাত্মিকতার এই সঙ্কটের কথা বুঝতে পেরে তিনি নিজামিয়া থেকে পদত্যাগ করেন এবং দামেস্ক, জেরুজালেম এবং হেজাজ সফরে বেরিয়ে পড়েন। এই দীর্ঘ ভ্রমণকালে তিনি আত্মশুদ্ধির প্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন এবং প্রচলিত ইসলামী ধ্যান-ধারণার নানান দিকগুলো বিশ্লেষণ করতে থাকেন।


অবশেষে ১১০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাগদাদে ফিরে যান এবং পুনরায় শিক্ষকতা শুরু করেন। আত্মশুদ্ধি ও নিয়তের পরিশুদ্ধির উপায় অনুসন্ধানে তাঁর কর্মকাণ্ড ও চিন্তাধারা জনগণের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। বাগদাদে অবস্থানকালে শাসকদের সাথে তাঁর কিছু বিরোধ দেখা দেয়।


শেষ পর্যন্ত তিনি নিজ শহর তুসে ফিরে যান এবং এই মহামনীষী খ্রিস্টাব্দ ১১১১ সনের ডিসেম্বর মাস মোতাবেক ৫০৫ হিজরি সনে নিজ জন্মভূমি তুস নগরীতে সুস্থ অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। 


ইতিহাস থেকে জানা যায়, মৃত্যুর দিন ভোর বেলায় তিনি ফজরের নামাজ আদায় করেন এবং নিজ হাতে কাফনের কাপড় পরিধান করেন এবং শুয়ে পড়েন। এভাবেই এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই মহান দার্শনিক। ইরানের অমর কবি ফেরদৌসীর সমাধির পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।


ইসলামী চিন্তার জগতে আল গাজ্জালী হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ ও মৌলিক চিন্তাবিদ। তিনি ছিলেন ইসলামী মতবাদের একজন বড় সংস্কারক ও দার্শনিক মতবাদের একজন সমালোচক। ধর্ম, দর্শন ও সুফীবাদে তার মৌলিক অবদানের জন্য তিনি একজন শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিধর্মী চিন্তাবিদ বলে মুসলিম দর্শনে স্বীকৃত ও প্রসংশিত। তার চিন্তাধারা মুসলিম ধর্মতত্ত্বের উচ্চতম বিবর্তন বলে বিবেচিত। ধর্ম, দর্শন ও সুফীবাদে তার মৌলিক অবদানের জন্য অনেক পন্ডিত হজরত মুহম্মদ (সঃ) এর পরে তাকে সর্বশ্রেষ্ট চিন্তাবিদ ও ধর্মীয় সংস্কারক বলে মনে করে থাকেন।


আল গাজ্জালী অধিবিদ্য, যুক্তিবিদ্যা, নীতিবিদ্য, ধর্মতত্ত্ব, সুফীবাদ প্রভৃতি বিষয়ে চারশোর অধিক মুল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো- তাহাফাতুল ফালাসিফা, এহইয়াউল উলুমুদ্দিন, মাকসিদ উল ফালাসিফা। তবে তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে এহইয়াউল উলুমুদ্দিন সর্বশ্রেষ্ট। অনেক পন্ডিতের মতে যদি সকল মুসলিম চিন্তাধারা বিলুপ্ত হয় এবং উক্ত গ্রন্থ সংরক্ষিত থাকে তবে ইসলামের পক্ষে সে ক্ষতি সামান্য মাত্র। সুফীরা এ গ্রন্থকে কোরআনের পরে অন্যতম দ্বিতীয় গ্রন্থের মর্যদা দান করেন।


আল গাজ্জালী জ্ঞান বিষয়ক আলোচনায় মুল্যবান অবদান রেখে গেছেন। তিনি সন্দেহাতীত ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে পরম সত্যের জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। কারণ ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও প্রজ্ঞার জ্ঞান প্রতারণামূলক হতে পারে। এগুলো ছাড়াও মানুষের একটা শক্তি আছে যাকে বলা হয় স্বজ্ঞা। তার মতে মানুষের হৃদয়ে এমন একটি শক্তি আছে যার মাধ্যমে সে সত্যের জ্ঞান লাভে সমর্থ হয়। তিনি দ্বার্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করেন যে, এমাত্র স্বজ্ঞা মাধ্যমেই পরম সত্ত্বার জ্ঞান লাভ সম্ভব। কাজেই স্বজ্ঞাই হলো জ্ঞান লাভের প্রকৃত উৎস ও পথ।


কার্যকারণ তত্ত্বে বর্ণনা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গাজ্জালী ছিলেন তার সময়ের তুলনায় অনেক বেশী অগ্রগামী। অভিজ্ঞতাবাদী ডেভিড হিউম-এর ন্যায় অনুরূপ মত পোষণ করেন প্রায় সাত শত বছর পূর্বে। এ ব্যাপারে গাজ্জালী বলেন যে, কার্যকারণের মধ্যে কোন অনিবার্য সম্পর্ক নেই। কার্যকারণ সম্পর্ক হলো ঘটনার পূর্বাপর সম্পর্ক মাত্র। গাজ্জালী এ বিষয়ে বলেন যে, কোন প্রাকৃতিক বস্তু বা ঘটনা অন্য কোন বস্তু বা ঘটনার কারণ হতে পারে না। তিনি যে কোন একটি কার্যের কারণ হিসাবে একটি আদি কারণকে বিশ্বাস করতেন। এই আদি কারণ হল খোদা স্বয়ং।


আত্মা সম্পর্কে আল গাজ্জালীর আলোচনা লক্ষণীয়। আত্মা সম্পর্কে অনেক দার্শনিক কেবল আত্মাকে অমর বলেছেন। কিন্তু গাজ্জালী আত্মা ও দেহ-উভয়কে অমর বলেছেন। জন্মের সময় খোদা আদি আত্মার সাথে দেহের পূনঃ মিলন ঘটিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করতে পারেন। তার মতে আত্মা হলো আধ্যাতিক দ্রব্য। আত্মার ব্যাস বা বিস্তৃতি নেই।


ধর্মতত্ত্বে আল গাজ্জালীর অবদান সুদূরপ্রসারী। তিনি চরমপন্থী মুতাজিলা ও দার্শনিকদের তথা গ্রীক দর্শনের অশুভ প্রভাব থেকে ইসলামকে রক্ষা করেন। তিনি ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য দেখান এবং ধর্মকে দর্শনের উপর প্রাধান্য দেন। তিনি আশারিয়া মতবাদের সংস্কার সাধন করেন এবং মুসলমানদের কোরআন ও হাদীছের দিকে ফিরিয়ে আনেন এবং কোরআন ও হাদীছের মাহাত্ম পূনঃ প্রতিষ্ঠা করেন।


আল গাজ্জালীর প্রচেষ্টায় সুফীতত্ত্ব মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে তা অর্জন করা সম্ভব। তিনি শরীয়তের সাথে মারেফতের সংযোগ সাধন করেন এবং যথার্থ জীবন ধারার রূপায়ন করেছেন। ডি বোয়ার-এর মতে আল গাজ্জালীর প্রভাবে সুফীবাদ ইসলামের জ্ঞানভান্ডারে মূল্যবান অবদান রাখতে সমর্থ হন।


ইমাম আল গাজ্জালী তদানিন্তন শাসক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার উদ্দেশ্যে সরাসরি নৈতিক ও রাজনৈতিক চিন্তাপ্রসূত পত্রাবলী বিনা দ্বিধায় প্রেরণ করতেন। কারণ তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, আধ্যাতিক পরিবর্তনের সাথে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিশেষ প্রয়োজন। তিনি তার রাষ্ট্রদর্শনে রাষ্ট্রের প্রকৃতি, আইন, শাসনতন্ত্র ও ধর্ম, রাজস্ব আদায়, প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা, জ্ঞানীদের পরামর্শ গ্রহণ, শাসক ও প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের কর্তব্য প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছেন।


মুসলিম দর্শনের ইতিহাসে গাজ্জালী এত ব্যাপক বিষয়ে প্রাঞ্জল ও যুক্তিযুক্ত আলোচনা করেছেন, তা অন্যকোন মুসলিম দার্শনিকের বেলায় তা অনুপস্থিত। অধ্যাপক ম্যাকডোনান্ড এর মতে “আল গাজ্জালী ইসলামের শ্রেষ্ট ও সর্বাপেক্ষা সহনশীল চিন্তাবিদ। তার মতবাদ সমূহ তার ব্যক্তিত্বেরই অভিব্যাক্তি।” আরেক চিন্তাবিদ ইকবাল গাজ্জালী সম্পর্কে বলেন, “অষ্টাদশ শতাব্দীর জার্মানীর ইমানুয়েল কান্টের (দার্শনিক) এর মত গাজ্জালীর মহান উদ্দেশ্য ছিল প্রেরিত পুরুষের মতই।” গাজ্জালীর খ্যাতি শুধু মুসলিম জগতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল বিশ্বব্যাপি। তার মূল্যবান গ্রন্থ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে।


দর্শনের যুক্তি খণ্ডন

আত্মজীবনী “المنقذ من الضلال” (আল মুনকিজ মিন আল-দালাল – Deliverance from the error) গ্রন্থে তিনি মানুষের সত্যজ্ঞান নির্ণয়ের প্রক্রিয়া বর্ণনা করেছেন। সে সময় জনপ্রিয় নানা আদর্শের মধ্যে অন্যতম ছিল গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটলের ভাবাদর্শভিত্তিক ন্যায়শাস্ত্র। এমনকি বিখ্যাত মুসলিম মনীষী ইবনে সীনা ও আল ফারাবীও এমন দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন।


ইমাম গাজ্জালীর মতে, এরিস্টটলের দর্শন ও যুক্তির ফলে মানুষ যেসব সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, সেগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ। অনেক দার্শনিকই সৃষ্টির অবিনশ্বরতা, খোদার অস্তিত্বহীনতা, কিংবা তাঁর সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞানী হওয়া অসম্ভব এমন বিষয়গুলো বিশ্বাস করতে শুরু করল। ইমাম গাজ্জালী ও প্রকৃত ইসলামে বিশ্বাসী মুসলমানদের কাছে এসব ধ্যন ধারণা ছিল স্পষ্টতই কুফরী।


ইমাম গাজ্জালী দেখলেন যে, কোন আলেমই কার্যকরভাবে দার্শনিকদের যুক্তি খণ্ডন করতে পারছিলেন না। কেননা এসব দার্শনিকেরা ছিলেন যুক্তি ও বিতর্কে (কালাম শাস্ত্র) বিশেষজ্ঞ। তারা তাদের অবস্থানকেই স্পষ্টভাবে ও বোধগম্য যুক্তির সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে এমন উপায় অবলম্বন করছিলেন, যা ছিল সরাসরি ইসলামী আক্বিদার সাথে সাংঘর্ষিক।


ইমাম গাজ্জালী দার্শনিকদের যুক্তি ও পরিভাষা দিয়েই তাদের অবস্থানের অসারতা তুলে ধরলেন “تهافت الفلاسفة” (Tahāfut al-Falāsifa – The Incoherence of the Philosophers) গ্রন্থে। দার্শনিকদের যুক্তিকে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে তিনি সেসব দর্শনের ফাঁকফোকরগুলো দেখিয়ে দেন যা জনসাধারণকে কুফরী চিন্তা চেতনার দিকে ধাবিত করতো। এই কাজ করতে গিয়ে তাঁকে দর্শনশাস্ত্র গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হয়েছিল। বিভ্রান্তিতে পড়ার আশংকা থাকে বিধায় সর্বসাধারণের জন্য দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়নকে তিনি অনাবশ্যক মনে করতেন। তিনি সবসময় তাঁর লেখাগুলোতে প্রচলিত ভ্রান্ত মতবাদের গবেষণার পূর্বে ইসলামের সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জনে গুরুত্ব প্রদান করেছেন।


আরেকটি বিরাট সমস্যা যা ইমাম গাজ্জালীকে মোকাবেলা করতে হয়েছিল, সেটি হলো ইসমাঈলী শিয়া মতবাদের উপদ্রব। এরা বিশ্বাস করত যে, একজন অকাট্য ইমামই ইসলামী আক্বীদা ও আইন-কানুনের বৈধ উৎস হতে পারে। ইমাম গাজ্জালীর সময়ে মিশরের ইসমাঈলী শিয়ারা বিশ্বাস করত যে, ধর্মীয় ব্যাপারে হযরত মুহাম্মাদ ﷺ এর কথাই শেষ কথা নয়। বরঞ্চ একজন বিশিষ্ট পবিত্র ব্যক্তিত্ব যাকে বলা হবে ইমাম, তিনিই সব ধরনের নির্দেশনা দিতে পারেন।


ইসমাঈলী শিয়ারা ধর্মগ্রন্থের দোহাই দিয়ে ইমাম গ্রহণের যে যৌক্তিকতা দাবী করতো ইমাম গাজ্জালী আল মুনকিজ মিন আল-দালাল (المنقذ من الضلال – Deliverance from Error) গ্রন্থে তা খণ্ডন করেছেন। তিনি প্রমাণ করে দিলেন যে, মুহাম্মদ ﷺ এর পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুর পর কোন ইমামত গ্রহনের সুস্পষ্ট প্রামাণিক বর্ননা/হাদীস নেই। তিনি ইমামের প্রয়োজনীয়তা দাবীর যুক্তিসম্মত পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে ইসলামী আইনের ভূমিকা ও মূলনীতিও বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর প্রমাণাদির (যা তাঁর মূল বই থেকে ভালোভাবে বোঝা যাবে) বেশি গভীরে না গিয়ে ইসমঈলী শিয়াদের ব্যাপারে তিনি যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন আমরা শুধু তা উল্লেখ করছিঃ


“তাদের মতবাদের সারাংশ এসেছে কর্তৃত্বপরায়ণ একজন শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে সাধারণ জনগণ ও স্বল্পবুদ্ধির মানুষগুলোকে প্রতারিত করার মাধ্যমে।”

এরিস্টটলের দর্শন, শিয়া মতবাদ ও অন্যান্য মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের নানা দিক বিশ্লেষণ করার পর ইমাম গাজালি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বিশ্বপ্রকৃতিকে বুঝার একমাত্র কার্যকর পন্থা হলো ইসলামের অনুশীলন যা মহানবী ﷺ ও তাঁর অনুসারীরা শিক্ষা দিয়ে গেছেন। ইমাম গাজ্জালীর সময়ে প্রকৃত ইসলাম অনুশীলন করতেন সূফীরা, যারা ছিলেন পার্থিব ভোগবিলাসের মোহমুক্ত এবং আল্লাহ্‌র দ্বীনের জন্য একনিষ্ঠভাবে আত্মশুদ্ধি অর্জনে প্রচেষ্টারত।


ইমাম গাজ্জালী ও বিজ্ঞান

প্রাচ্যবিদরা (Orientalist) ঢালাওভাবে অভিযোগ করেন যে ইমাম গাজ্জালীর দর্শন ও যুক্তি ইসলামের বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করেছে । তাদের এহেন অভিযোগের ভিত্তি হলো তিনি ইবনে সিনা ও আল ফারাবীর মতো বিজ্ঞানীদের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করেছিলেন, যারা ছিলেন তৎকালীন বিশ্বে বিজ্ঞানচর্চার অগ্রদূত। মূলত বাস্তবতা ছিল অবশ্যই ভিন্ন।


ইমাম গাজ্জালী তৎকালীন বিজ্ঞানীদের দর্শনগত ধারণার সাথে মতানৈক্য পোষণ করেন, যারা ছিলেন গণিত ও বিজ্ঞানের বিখ্যাত সব গ্রন্থের রচয়িতা। তাদের যুক্তি খণ্ডন করতে গিয়ে তিনি বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরেন। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন-


“গণিতশাস্ত্র নিয়ে যিনি এগিয়ে গেছেন তিনি নির্ভুলভাবে সবিস্তারে তার গাণিতিক প্রমাণাদির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেন। একারণে তিনি দার্শনিকদের সম্পর্কেও উচ্চধারণা পোষণ করেন এবং মনে করেন এই গণিতশাস্ত্রের মতো দর্শনশাস্ত্রেও একইরকম সহজবোধ্য, যুক্তিগ্রাহ্য ও প্রতিপাদনযোগ্য বিবৃতি দেয়া যাবে।”

তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, গণিত এবং অন্যান্য বিজ্ঞানশাস্ত্র অধ্যয়নের ভয়াবহ দিক এটি নয় যে এই বিষয়গুলোই ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কিংবা ক্ষতিকর ও পরিত্যাজ্য। বরঞ্চ, শিক্ষার্থীদের উচিৎ সতর্কতার সাথে জ্ঞান অর্জন করা এবং দর্শন ও অন্যান্য স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা যেসব বৈজ্ঞানিক ধারণার অবতারণা করেছেন সেসব অন্ধভাবে বিশ্বাস না করা ।


তিনি আরো বলেন, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের আরো একটি বিপজ্জনক পর্যায় হতে পারে যে, তারা বিজ্ঞানীদের সমস্ত আবিস্কার ও উদ্ভাবনকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে যেহেতু এসব বিজ্ঞানী প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বিরোধী দর্শনও প্রবর্তন করেছেন। তাঁর ভাষ্য হলোঃ


“কেউ যদি ধারণা করে বসে যে গণিত ও বিজ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করেই ইসলাম বিজয়ী হয়েছে, এটা হবে মস্ত বড় অপরাধ। কেননা ইসলামী আইন এসব বিষয়কে প্রত্যাখ্যান কিংবা সত্যায়ন করেনি এবং ধর্মীয় বিষয়ের অন্তর্ভুক্তও করেনি।”

কেউ যদি ইমাম গাজ্জালীর কর্মধারা অগভীরভাবে পড়ে তবে সহজেই তার কথাগুলোকে অবৈজ্ঞানিক ভেবে ভুল করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইমাম গাজ্জালীর সতর্কবাণী ছিল শিক্ষার্থীদের প্রতি- যেন তারা গণিত ও বিজ্ঞানে অবদানের কারণেই বিজ্ঞানীদের দার্শনিক ধ্যান-ধারণাগুলোকেও পুরোপুরি গ্রহণ না করে। এমন সতর্কতা জারীর উদ্দেশ্য ছিল তাত্ত্বিক দর্শন থেকে পৃথক করে বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডকে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সুরক্ষা করে যাওয়া। এটি না হলে বিজ্ঞান নিজেই দর্শনের মতো অনুমান ও যুক্তিনির্ভর কিন্তু কোথাও প্রয়োগ হয়নি এমন একটি ক্ষেত্রের সাথে মিশ্রিত হয়ে যেতো।


সাফল্যধারা (Legacy)

এই নিবন্ধটি ইমাম গাজ্জালীর চিন্তাধারা ও অবদানগুলোর সামগ্রিক পর্যালোচনার কোন প্রচেষ্টা নয়। তাঁর রচনাবলী বিশ্লেষণের কাজটি করতে গেলে একটি সম্পূর্ণ বইয়েরই প্রয়োজন পড়বে। আল-গাজ্জালী সমকালীন মুসলিম বিশ্বে ও পরবর্তী ইতিহাসে যে প্রভাব রেখে যান তা আলোকপাত করাই এর উদ্দেশ্য ছিল।


আজ ইমাম গাজ্জালী “حجة الإسلام‎” (হুজ্জাতুল ইসলাম)  হিসেবে সুপরিচিত, যার অর্থ হলো ‘দ্বীনের প্রমাণ বা স্বাক্ষ্য’। তাঁর সময়ে মুসলিম বিশ্ব যে ভয়ংকর বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যলেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল, সেটির মোকাবেলায় তাঁর অবদানের কারণেই তাঁকে এই উপাধি দেয়া হয় । কালের পরিক্রমায় চলে আসা বিশুদ্ধ ইসলামী বিশ্বাস ও রীতিনীতির বিপরীত দর্শন ও কট্টর শিয়া মতবাদ তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল, যা ছিল ইসলামী ভাবধারায় উজ্জীবিত জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি ভয়ংকর হুমকিস্বরুপ। ইমাম গাজ্জালীর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ও সেই চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত আলেমদের সহযোগিতা সকল প্রকার ফিতনা ও দূষণ থেকে রক্ষা করে ইসলামী মূল্যবোধ ও বিশ্বাসকে রাসুল ﷺ এর প্রবর্তিত মূলধারায় আনার পথ খুলে দিয়েছিল। তিনি যেন ৫০০ বছর পূর্বেই মহানবী ﷺ এর প্রতিশ্রুত শতাব্দীর একজন সংস্কারকের মূর্ত প্রতীক।


ইমাম গাজ্জালী পরবর্তী ইসলামী চিন্তা ও দর্শন


১৮৭০ সাল থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত ইমাম গাজ্জালী ও ইসলামী জ্ঞান সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে ওরিয়েন্টালিস্টরা এক নির্জলা মিথ্যাচার করে আসছে। আর এতে যোগ দিয়েছে চরম জাতীয়তাবাদী কিছু মুসলমান লেখক ও বুদ্ধিজীবী। তাদের ভাষ্য মতে, ইমাম গাজ্জালীর পরে মুসলিম উম্মাহ চিন্তা, গবেষণা ও দর্শনে আস্তে আস্তে পিছিয়ে পড়ে। এর কারণ হিসেবে তারা বলে থাকেন যে, ইমাম গাজ্জালী দার্শনিকদের সমালোচনা করে ‘তাহাফাতুল ফালাসিফা’ নামক বই রচনা করেছেন এবং তাদেরকে ২০ টি বিষয়ে কঠিন ভাবে সমালোচনা করেছেন ও তিনটি পয়েণ্টে তাদেরকে তাকফীর করেছে।

যে তিনটি বিষয়ে তিনি দার্শনিকদেরকে তাকফীর করেছেন সে তিনটি বিষয় হল,

ক) বিশ্বজগতের চিরস্থায়িত্ব নিয়ে।

খ) আল্লাহ কুল্লি ( সামগ্রিক) সমূহ জানেন, কিন্তু জুযয়ী (আংশিক, অপ্রয়োজনীয়) সমূহ জানেন না।

গ) হাশর কি শারীরিক (জিসমানী) হবে নাকি রূহানী হবে।

কিন্তু ওরিয়েন্টালিস্টরা এই বিষয়টিকে ভুল ভাবে তুলে এনে তাকে চিন্তাশীলদের সামনে ব্যাপকভাবে খাটো করার চেষ্টা করেছে। অথচ তিনি এখানে ঐ সময়ে এরিস্টটলের মেটাফিজিক্সকে অনুসরণকারীদেরকে তাকফির করেছেন। ইমাম গাজ্জালীর তাহাফাতুল ফালাসিফা দার্শনিকদের বিরুদ্ধে লেখা কোন গ্রন্থ নয়। নির্দিষ্ট একটি দার্শনিক গোষ্ঠীর জবাব দেওয়ার জন্য তিনি এই বই লিখেছেন। যারা এরিস্টটলের মেটাফিজিক্সকে ধর্মীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিলেন মূলত তাদের বিরুদ্ধে জবাব হিসেবে ‘তাহাফাতুল ফালাসিফা’ রচনা করেন। তিনি নিজেও রাজনীতি, মানতিক, গণিত, ফিজিক্স ও আরও অন্যান্য বিষয়ে দার্শনিকদের কথার তিনি বিরোধিতা করেননি এবং এই সকল বিষয়ে এরিস্টোটল বা অন্যান্য দার্শনিকদের চিন্তার মধ্যে কোন সমস্যা নেই বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এমনকি তাদের চিন্তা থেকে তিনি নিজেও উপকৃত হয়েছেন।

অথচ যারা সত্যিকারের সত্যপন্থী দার্শনিক তারা ‘মাকাসিদুল ফালাসিফা’ ও ‘তাহাফাতুল ফালাসিফা’ র লেখক ইমাম গাজ্জালী ‘ইন্টেল্লেকচুয়াল জায়ান্ট’ বলে অভিহিত করেছেন।

ওরিয়েন্টালিস্ট ও জাতীয়তাবাদী কিছু মুসলমান চিন্তাবীদদের এই প্রোপ্যাগান্ডা এখনোও সারা দুনিয়ায় বিশেষ করে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক গ্রহণ যোগ্য। তাদের ভাষ্য মতে, আব্বাসী খিলাফতের পতনের পরে এবং ইমাম গাজ্জালী সহ আরও অন্যান্য অনারব চিন্তাবিদদের কারণে আমরা পেছনে পড়ে গিয়েছি!

আমরা সকলেই জানি যে, ইমাম গাজ্জালী ১১১০ (হিজরী ৫০৫) সালে মৃত্যুবরণ করেন। ওরিয়েন্টালিস্ট কিংবা মুসলিম ঐতিহাসিকদের লেখা ‘ইসলামী দর্শনের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থ সমূহের দিকে যখন তাকাই তখন দেখতে পাই যে, প্রায় সকলেই বলে থাকেন যে, ইমাম গাজ্জালী পরবর্তীতে সময়ে মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী দর্শন ও চিন্তা বিলীন হয়ে যায়। তবে তার পরে দুইটি ধারা জারী ছিল এর মধ্যে একটি হল, উত্তর আফ্রিকায়। ইবনে রুশদ, ইবনে খালদুন, ইবনে বাজা সহ আরও অন্যান্যরা ইসলামী দর্শন ও চিন্তাকে উত্তর আফ্রিকায় জারী রাখেন। আর অপর ধারাটি হল ইরানের ইশরাকী ধারার দার্শনিকগণ।

বর্তমান সময়ে ইসলামী দর্শনের ইতিহাস সম্পর্কিত এনসাইক্লোপেডিয়া সমূহ কিংবা ইসলামী দর্শনের ইতিহাস সম্পর্কিত বই সমূহের বেশীর ভাগ রচনা করেছেন ইরানী বংশোদ্ভূত চিন্তাবিদগণ। তাদের কথা হল, না। ইমাম গাজ্জালীর পরে ইসলামী চিন্তা ও দর্শন মুলত উসমানী শাসনাধিন অঞ্চল সমূহে নিঃশেষ হয়ে যায় কিন্তু মোল্লা সাদরার মাধ্যমে ইরানে তা জারী থাকে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হল এই দুই অঞ্চলের বাহিরে সেলজুক সালাতানাত শাসিত অঞ্চল সমূহ, সহ আরও অনেক অঞ্চলের কথা কেউ উচ্চারন করেনা! ইরান ও উত্তর আফ্রিকা ছাড়া কি সেই সময়ে অবশিষ্ট মুসলিম শাসিত কিংবা মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল সমূহে কি কোন চিন্তাবিদ বা দার্শনিক ছিলেন না? তারা আরও যে কাজটি করে থাকেন তা হল, ইবনে রুশদের পরে সরাসরি উনবিংশ শতাব্দীতে চলে আসেন। আমার কাছে মনে হয়, এটা সম্পূর্ণভাবে ওরিয়েণ্টালিস্ট ও জাতীয়তাবাদী মুসলিম লেখকদের একটি যৌথ প্রপাজ্ঞান্ডা।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, ইমাম গাজ্জলী একজন ছিলেন সেলজুকীয় চিন্তাবিদ। সেলজুক সুলতান মালিক শাহ ও তার ওজীরে আযম নিজামূল মূলকের সাথে মিলেই তিনি মূলত তাকলিদের বিরুদ্ধে ইজতিহাদের এক নতুন ধারা শুরু করেছিলেন। ইমাম গাজ্জালীর পরে ইসলামী চিন্তা ও দর্শন শেষ হওয়ার অর্থ হল সেলজুল শাসিত অঞ্চল ও উসমানী অঞ্চলে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও দর্শন শেষ হয়ে যাওয়া। আরব সহ বলতে সমগ্র ইসলামী বিশ্বে এই বিষয়টি শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে।

আমরা যদি জ্ঞানের ইতিহাস সম্পর্কিত একাডেমিক গবেষনা কর্ম সমূহের দিকে তাকাই তখন দেখতে পাই যে, গাজ্জালী পরবর্তী অর্থাৎ, সেলজুক ও উসমানীদের সময় কালে ইসলামী দর্শন, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, গণিত, মানতিক, চিকিৎসা বিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যায় বলতে গেলে কোন কাজি হয়নি! কেউ কেউ উল্লেখ করলেও খুব যৎসামান্যই উল্লেখ করেছেন। শুধু দর্শন কিংবা বিজ্ঞান নয়, তাফসীরের ইতিহাসের দিকে যদি তাকাই তাহলেও একই দৃশ্য আমরা সেখানেও দেখতে পাই। তাফসীরের ইতিহাসের লেখকগণও পঞ্চম হিজরী পর্যন্ত আসেন এর পরে আরব তাফসীর কারকদের কিছু কাজকে উল্লেখ করে মাঝখানে ৫ শত বছর বাদ দিয়ে সরাসরি আধুনিক তাফসীর লেখকদের কাছে চলে আসেন। তাহলে মাঝখানের এই ৬০০ বছরে উসমানী খিলাফতের এত বড় বড় মুফাসসির, মুহাদ্দিস, জ্যোতির্বিদ, পদার্থবিদ, স্থাপত্যবিদরা কি করেছেন? ঐ সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লাইব্রেরী ‘সুলেইমানিইয়া কুতুবখানা’ তাহলে কে লিখে ভর্তি করল? মিমার সিনানের মত, চেলেবীর মত হাজার হাজার চিন্তাবিদ কোথায় গেলো? ঊলূবেয়, ফাতিহ সুলতান মেহমেদ, জাওদাদ পাশা, তার মেয়ে আলিয়া বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক, আল্লামা জাহিদ আল কাওসারী, মুস্তাফা সাবরী, ইসমাইল হাক্কি ইজমিরলি বলতে গেলে এই সময়ে এত বেশী দার্শনিক, বিজ্ঞানী, আলেম উলামা জন্ম গ্রহণ করে যে যাদের নাম লিখতেই শুধু কয়েকটি বইয়ের দরকার পড়বে।

প্রখ্যাত জাপানী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক Toshihiko Izutsu বলেন, ইসলামী দর্শন ও চিন্তা মূলত ইমাম গাজ্জালীর পরে পূর্ণতা পেয়েছে।


তুরস্কের প্রখ্যাত গবেষক ও দার্শনিক দুজানে জুন্দিওলু বলেন, আমাকে কেউ যদি বলেন, ইসলামী জ্ঞানের ইতিহাসে ‘আল-মুকাদ্দিমা’ র সমপর্যায়ের আর কোন বই লেখা হয়েছে কিনা? তাহলে আমি উত্তরে বলব, হ্যাঁ অবশ্যই হয়েছে আর সেটা হল, উসমানী খিলাফতের প্রখ্যাত ফকিহবিদ আলী চেলেবি কিনালিযাদের লেখা ‘ আখলাকে আ’লা’। এমনকি মুকাদ্দিমার পাশে যদি কোন বই আমার টেবিলে রাখি তাহলে এই বইকেই রাখব।

এখানে যদি তাকাই তাহলে আরো মজার কিছু বিষয় আমরা দেখতে পাই, এই সকল বই পড়ে মনে যখন প্রশ্ন জাগে, আচ্ছা চিন্তা ও দর্শনের ক্ষেত্রে এই মৃতাবস্থা কতদিন জারী ছিল? সবচেয়ে মজার বিষয় হল এটা। ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ইসলামী চিন্তা ও দর্শন মৃতাবস্থায় ছিল! আর এই সময়েই আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সমগ্র আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে!

মন্তব্য করুন

ব্লগ