Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ ডিসেম্বর, ২০২২ ১০:৪৪ অপরাহ্ণ

*উযুর পদ্ধতি, ফজিলত এবং উযুর শেষে দো’য়া ও যিকির @@ *উযুর পদ্ধতি, ফজিলত এবং উযুর শেষে দো’য়া ও যিকির

*উযুর পদ্ধতি, ফজিলত এবং উযুর শেষে দো’য়া ও যিকির (দৈনিক ইবাদাত)*


আল্লাহর বাণী: হে তোমরা যারা ঈমান এনেছো (মু'মিনগণ), যখন তোমরা সালাতের জন্য প্রস্তুত হবে তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও হস্তদ্বয় কনুই পর্যন্ত ধৌত করবে এবং তোমাদের মাথা মাসেহ করবে এবং পা-দুটি গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত করবে (৫:৬) ৷


*১. উযুর ধারাবাহিক পদ্ধতি:*


*উযুর জন্য নিয়ত করা:* উযুর জন্য নিয়ত করা বা উযু করার জন্য ইচ্ছা পোষণ করা; নিয়তের স্থান হচ্ছে নাফস-অন্তরে তাই নিয়ত মনে-মনে করতে হবে; উচ্চারণ বা শব্দ করে নিয়ত করার প্রয়োজন নেই। 


*বিসমিল্লাহ বলা:* ‘বিসমিল্লাহ’ বলে উযু শুরু করা। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘ঐ ব্যক্তির সালাত আদায় হয় না যে সঠিকভাবে উযু করে না এবং ঐ ব্যক্তির উযু হয় না যে উযুর শুরুতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে না, অর্থাৎ বিসমিল্লাহ বলে না (সুনানে আবূ দাউদ-ইফাবা-হা/১০১; কিতাবুত তাহারাত)। এখানে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা একটি সতন্ত্র ইবাদাত।    


*হাত ধৌত করা:* প্রথমে হাতের কব্জিদ্বয় ধৌত করবে; আঙ্গুল এবং নখের মধ্যে ভালমত পানি প্রবেশ করাবে (তিনবার)। হাতের ত্বক ভালভাবে ঘষে ধৌত করবে যেন সমস্ত ত্বক পানি দ্বারা ভিজে যায়, যেন ত্বক্বের কোন একটি বিন্দুও শুকনা না থাকে।


*মুখের ভিতর পরিস্কার করা:* মুখে পানি দিয়ে কুলি করবে এবং হাতের আঙ্গুল দিয়ে দাঁত ও জিহ্‌বা পরিস্কার করবে (তিনবার)। উযুর পূর্বে মিসওয়াক করে দাঁত ও জিহ্‌বা পরিস্কার করবে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল।  


*নাকের ভিতর পরিস্কার করা:* নাকের ভিতরে পানি দিয়ে ভালমত নাক ঝেড়ে পরিস্কার করবে (তিনবার)। 


*মুখমণ্ডল ধৌত করা:* মুখমণ্ডল পানি দিয়ে ধৌত করবে (তিনবার); মুখমণ্ডলের ত্বক ভালভাবে ঘষে ধৌত করবে যেন মুখমণ্ডলের সমস্ত ত্বক পানি দ্বারা ভিজে যায়, যেন ত্বক্বের কোন একটি বিন্দুও শুকনা না থাকে। যাদের দাঁড়ি আছে তারা দাঁড়ির ওপর ও অভ্যন্তর উভয়টা ধৌত করবে; আর দাঁড়ি খিলাল করে ত্বকে পানি প্রবেশ করাবে (তিনবার)। মুখমণ্ডল: দৈর্ঘে মাথার স্বাভাবিক চুল গজাবার স্থান থেকে দুই চোয়ালসহ থুতনির নিচ এবং গলার উপর পর্যন্ত; প্রস্থে ডান কান থেকে বাম কান পর্যন্ত। 


*দুই হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করা:* এরপর দুই হাত আঙ্গুলসহ কনুইয়ের কিছু উপর পর্যন্ত ধৌত করবে (তিনবার)। দুই হাতের ত্বক ভালভাবে ঘষে ধৌত করবে যেন সমস্ত ত্বক পানি দ্বারা ভিজে যায়, যেন ত্বক্বের কোন একটি বিন্দুও শুকনা না থাকে।


*মাথা ও কান মাসেহ করা:* অতঃপর পুনরায় হাতের তালুদ্বয়ে পানি নিয়ে ভেজা তালু দিয়ে মাথা ও কান মাসেহ করবে (একবার); মাসেহ করার পদ্ধতি হচ্ছে- পানিতে ভেজা হাতের তালুদ্বয় মাথার সামনের চুল থেকে মাথার পেছনের চুল পর্যন্ত নিবে; এরপর পুনরায় যেখান থেকে শুরু করেছে সেখানে ফিরিয়ে আনবে। এরপর দুই হাতের শাহাদাত (তর্জনী) আঙ্গুল কানের ছিদ্রতে প্রবেশ করাবে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে কানের পিঠদ্বয় মাসেহ করবে (একবার)। 


*দুই পা টাকনু পর্যন্ত ধৌত করা:* এরপর দুই পায়ের টাকনু পর্যন্ত ভালভাবে ত্বক ঘষে ধৌত করবে যেন সমস্ত ত্বক পানি দ্বারা ভিজে যায়, যেন ত্বক্বের কোন একটি বিন্দুও শুকনা না থাকে; প্রথমে ডান পা এবং পরে বাম পা টাকনু পর্যন্ত ধৌত করবে; উভয় ক্ষেত্রে আঙ্গুল খিলাল করে আঙ্গুলের ফাঁকে-ফাঁকে এবং নখের মধ্যে পানি প্রবেশ করাবে (একবার)। আঙ্গুল খিলাল করার সময় ডান দিক থেকে শুরু করতে হবে। এই হল পরিপূর্ণভাবে ধারাবাহিক উযুর বর্ণনা। 


*২. উযুর শেষে দো’য়া-যিকির পাঠ; দো’য়া-যিকির পাঠ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত:*


*দো’য়া-যিকির:১* (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ) 

উচ্চারণ: ‘আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু; ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ’। অর্থ- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নাই কোন ইলাহ আল্লাহ ছাড়া; তিনি এক, তাঁর কোন শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল (মুসলিম)। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অযু করে কালেমায়ে শাহাদাত পড়বে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হবে; ঐ ব্যক্তি যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা সে প্রবেশ করবে। (সুনানু আবূ দাউদ-ইফাবা-হা/১৬৯; মুসলিম, মিশকাত)।


*দো’য়া-যিকির:২* (اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنْ التَّوَّابِينَ ، وَاجْعَلْنِي مِنْ الْمُتَطَهِّرِينَ)


উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মাজ আলনি মিনাত তাউয়যাবিনা, ওয়াজ আলনি মিনাল মুত্বাতাহ্হিরীন’। (অর্থ- হে আল্লাহ, আমাকে আপনি তওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন, আমাকে পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। [সহিহুত তিরমিযি গ্রন্থে (৪৮) আলবানী হাদিসটিকে ‘সহিহ’ আখ্যায়িত করেছেন]।


*দো’য়া-যিকির:৩* (سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ)

সুব্‌হানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বি-হামদিকা আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লা আন্‌তা, আসতাগফিরুকা ওয়া-আতুবু ইলাইক। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, মাজলিসে যা কিছু ভুলত্রুটি হয়ে থাকে উপরোক্ত বাক্য দ্বারা তার কাফফারাহ হিসেবে গণ্য হবে। (সুনানু আবূ দাউদ-ইফাবা-হা/৪৭৮১, কিতাব-আল-আদাব; (তাহকিককৃত – হাসান সহিহ; hadith.com)।


*৩. উযুর ফজিলত:*


*উযুর ফজিলত – (এক):* আবূ হুরায়রাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: যখন কোন মুসলিম অথবা মু’মিন বান্দা উযূ করে এবং তার চেহারা ধুয়ে নেয়, তখন তার চেহারা হতে পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে তার চোখের দ্বারা কৃত সকল গুনাহ বের হয়ে যায় যা সে চোখ দিয়ে দেখেছে। যখন সে তার দুই হাত ধোয় তখন তার দুই হাত দিয়ে করা গুনাহ পানির সাথে বা পানির শেষ বিন্দুর সাথে বের হয়ে যায় যা তার দু’ হাত দিয়ে ধরার কারণে সংঘটিত হয়েছে। অনুরূপভাবে সে যখন তার দুই পা ধোয়, তার পা দ্বারা কৃত গুনাহ পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে বের হয়ে যায় যে পাপের জন্যে তার দু’ পা হাঁটছে। ফলে সে উযূর জায়গা হতে উঠার সময় সকল গুনাহ হতে পাক-পবিত্র হয়ে যায়। (মুসলিম-ইফাবা-হা/৪৬৮)। 


*উযুর ফজিলত – (দুই):* রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যখন ওযু করে এবং পরিপূর্ণভাবে পানির দ্বারা পূর্ণভাবে ওযু করে, এরপর বলে: ‘আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু; ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ’ (অর্থ- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নাই কোন ইলাহ আল্লাহ ছাড়া; তিনি এক, তাঁর কোন শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল), তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজায় খুলে দেয়া হয়। সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে (মুসলিম-ইফাবা-হা/৪৪৪, ত্বহারাত অধ্যায়)। 


সুনানে তিরমিযিতে আরেকটু অতিরিক্ত এসেছে যে, ‘আল্লাহুম্মাজ আলনি মিনাত্তাওয়্যাবীন ওয়াজ আলনি মিনাল মুত্বাতাহ্হিরীন’ (অর্থ- হে আল্লাহ, আমাকে আপনি তওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন, আমাকে পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন) [সহিহুত তিরমিযি গ্রন্থে (৪৮) আলবানী হাদিসটিকে ‘সহিহ’ আখ্যায়িত করেছেন]।   


*উযুর ফজিলত – (তিন):* উসমান ইবনে আফ্‌ফান (রা.) একবার উত্তমরূপে উযু করলেন এবং বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-কে আমার এ উযুর ন্যায় উযু করতে দেখেছি এবং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার এ উযুর ন্যায় উযু করে দু’রাকাত (তাইহ্যাতুল উযুর) সালাত আদায় করবে এবং তার মধ্যে কোন বাজে খেয়াল মনে আনবে না, আল্লাহ তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন’ (বুখারী-ইফাবা-হা/১৬১-১৬৫)। 


*উযুর ফজিলত – (চার):* আবূ হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলতে শুনেছি, ক্বিয়ামতের দিন আমার উম্মাতকে এমন অবাস্থায় ডাকা হবে যে, উযুর প্রভাবে তাদের হাত-পা ও মুখমণ্ডল থাকবে উজ্জ্বল। তাই তোমাদের মধ্যে যে এ উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নিতে পারে, সে যেন তা করে (বুখারী-ইফাবা-হা/১৩৮)। উযু একটি দৈনিক ইবাদাত এবং পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পূর্বে উযু করা ফরজ। সুতরাং যে বান্দা পাঁচবার উযু করে, পাঁচ বারই তাহিয়যাতুল উযুর সালাত আদায় করবে তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। এছাড়া তার হাত-পা ও মুখমণ্ডল ক্বিয়ামতের দিন থাকবে উজ্জ্বল।

 

অযুর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উল্লেখিত দো’য়াগুলো অনেক ফজিলত পূর্ণ। যা অযুকারীকে পবিত্র ও নেককার বান্দায় পরিণত করে দেয়। যার জন্য জান্নাতের সব দরজা উন্মুক্ত থাকে। সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত, একান্ত মনোযোগের সঙ্গে সুন্নাতের অনুসরণে সব সময় অযু অবস্থায় থাকা। অযুর ফজিলত লাভে যথাযথভাবে অযু করা। হাদিসে ঘোষিত অযুর ফজিলত ও উপকারিতাগুলো অর্জন করা।

 

হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে সব সময় অযু অবস্থায় থাকার তাওফিক দান কর। আমাদেরকে পবিত্রতা অবলম্বনকারী ও তাওবাকারী হিসেবে কবুল কর। আমাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম রিজিক দান কর, মৃত্যুর পূর্বেই সকল গোনাহ মাফ কর এবং পরকালে চিরস্থায়ী জান্নাতের অধিবাসী হিসেবে কবুল কর।


*আল্লাহুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন।* (মূসা: ২৫-১২-২২)

মন্তব্য করুন

ব্লগ