সহকারী অধ্যাপক
২৭ ডিসেম্বর, ২০২২ ০৮:১১ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
ইতিহাসের যে অধ্যায় আমাদের নিজেদের স্বার্থেই বারবার পাঠ করা উচিত, তা হলো হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও আসমা বিনতে আবুবকর রা. এর শেষ কথোপকথন...
আবু নাওফিল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। আমি মক্কায় ‘উকবাতুল মাদীনাহ্ নামক স্থানে আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ) এর লাশকে খুঁটির ওপর ঝুলিয়ে রাখতে দেখেছিলাম। হাজ্জাজ এবং তার লোকেরা তাকে হত্যা করে সেভাবেই ঝুলিয়ে রেখেছিল, যাতে মানুষ এ ঘটনা দেখে শিক্ষা পায় এবং খলিফাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস না পায়।
তখন অন্যান্য লোকজন তাঁর কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। একদিন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) তাঁর কাছ দিয়ে যাওয়াকালে বললেন, আস্সালামু ‘আলাইকা ইয়া আবূ খুবাইব! (আবু খুবাইব ছিল হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবায়েরের রা. কুনিয়া নাম) আস্সালামু ‘আলাইকা ইয়া আবূ খুবায়ব! আস্সালামু ‘আলাইকা ইয়া আবূ খুবায়ব! আল্লাহ্র কসম! আমি অবশ্য আপনাকে এ থেকে বিরত থাকতে বলেছিলাম। আল্লাহ্র কসম! আমি যতদূর জানি, আপনি ছিলেন সর্বাধিক সিয়াম পালনকারী, সর্বাধিক সালাত আদায়কারী এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী ব্যক্তিত্ব। আল্লাহর কসম, এরপরও আপনার মতো মহৎ একজন ব্যক্তিকেও এরা নিকৃষ্ট মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এটুকু বলেই আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) সেখান হতে চলে গেলেন।
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর যাত্রাবিরতি ও তার দেয়া বক্তব্য হাজ্জাজের কানে পৌঁছল। তখন সে ‘আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়রের রা. বিকৃত করা লাশের কাছে সেনাদেরকে প্রেরণ করলো। এরপর আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. এর লাশকে শূলের ওপর থেকে নামানো হলো। আর তারও পরে ইহুদিদের কবরস্থানে তাঁকে নিক্ষিপ্ত করা হলো।
তারপর হাজ্জাজ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের রা. মা আসমা বিনতে আববকর (রাঃ)-কে ডেকে নেয়ার জন্য দূত পাঠায়। কিন্তু আসমা রা. হাজ্জাজের নিকট যেতে অস্বীকৃতি জানালেন। হাজ্জাজ আবার তাঁর নিকট লোক পাঠাল তাঁকে তাঁর নিকট আসার জন্য এই বলে যে, তোমাকে অবশ্যই আসতে হবে। অন্যথায় তোমার নিকট এমন লোক পাঠাব যে, তোমাকে চুল ধরে টেনে নিয়ে আসবে।
এরপরও হযরত আসমা রা. অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তার কাছে যাবো না। পারলে সে আমার কাছে তার লোক পাঠাক, আর তারা আমাকে চুল ধরে টেনে নিয়ে যাক। উল্লেখ্য, আসমা বিনতে আবুবকর (রা.) ততদিনে প্রায় শত বছর বয়স। চোখেও তিনি কিছু দেখতে পান না।
রাবী বলেন, তারপর হাজ্জাজ বলেন, আমার জুতা নাও। তারপর সে জুতা পরল এবং সদর্পে আসমা বিনতে আবূ বকর (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছল এবং সে বলল, তুমি তো দেখলে আল্লাহর শত্রু আব্দুল্লাহ বিন যুবায়েরের সাথে আমি কী ব্যবহার করেছি।
আসমা রা. বললেন, “হ্যাঁ আমি তোকে দেখছি, তুই তাঁর দুনিয়া বরবাদ করে দিয়েছিস। আর সে তোর আখিরাত নষ্ট করে দিয়েছে। আমি জানতে পেরেছি যে, তুই তাকে (তিরস্কার স্বরূপ) দু’টি কোমরবন্ধনীর ছেলে বলে সম্বোধন করে থাকিস। আল্লাহর কসম! আমিই সেই দু’ কোমরবন্ধ (বেল্ট) ব্যবহার কারিণী। এ দুই বেল্টের একটির মাঝে আমি রাসুলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং আবুবকর (রাঃ)-এর খাদ্যদ্রব্য বেঁধে তুলে রাখতাম যাতে তারা হিজরতের সময় খেতে পারেন, বাহনের পশু যেন না খেয়ে ফেলে। আর বেল্টের দ্বিতীয় অংশটি আমি আমার পোশাককে আঁটকে রাখার জন্য ব্যবহার করেছিলাম।
জেনে রাখো, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, সাকীফ সম্প্রদায়ে এক মিথ্যুকের এবং নরহত্যাকারীর অভ্যুদয় হবে। মিথ্যুককে তো আমরা সকলেই দেখেছি, আমি নরহত্যাকারী হিসেবে তোমাকে ছাড়া আর কাউকে মনে করছি না।”
এ কথা শুনে হাজ্জাজ উঠে দাঁড়াল এবং আসমা (রাঃ)-এর কথার কোন প্রত্যুত্তর করল না। সে আর কখনো আসমার রা. সামনে এসে দাঁড়ায়নি। অবশ্য আব্দুল্লাহ বিন যুবায়েরের রা. শাহাদাতের আনুমানিক ১শ দিন পর আসমা বিনতে আবুবকরও রা. ইন্তেকাল করেন। (সহিহ মুসলিম: ই.ফা. ৬২৬৫)
৩
৩ মন্তব্য