সহকারী শিক্ষক
১২ জানুয়ারি, ২০২৩ ১০:১৯ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
রাজার একটা পাখি ছিল। পাখিটি গান গাইত। কিন্তু শাস্ত্র পড়ত না। উড়ত, লাফালাফি করত। কিন্তু কোনো কায়দা-কানুন জানত না। এসব কারণে রাজা মন্ত্রীকে আদেশ দিলেন যেন পাখিটাকে শিক্ষা দেওয়া হয়। রাজার ভাগিনারা পেল পাখিটাকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব। রাজপণ্ডিতরা বিচার করলেন পাখিটির অবিদ্যার কারণ তার যে সামান্য খড়কুটোর বাসা সেখানে বিদ্যা বেশি ধরে না।
বিচার-বিবেচনা করে বাসা বানানো হলো। স্যাকরা থলি বোঝাই বকশিশ পেল সোনার খাঁচা বানাতে। বিদ্যা শেখাতে লিপিকরকে তলব করা হলো। লিপিকর পুঁথি লিখে দিলেন, পারিতোষিক নিয়ে চলে গেলেন।
পাখিটাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য দিনের পর দিন চলছিল নানান আয়োজন। ওদিকে পাখিটা প্রায় আধমরা।
অবশেষে একদিন রাজার ভুল ভাঙে। রাজা পাখিটাকে দেখার ইচ্ছে পোষণ করলে তত দিনে পাখিটা মারা যায়। আর রাজার ভাগিনারা বলে—‘পাখিটার পুরো শিক্ষা হইয়াছে।’
কবিগুরুর তোতা কাহিনীর সারাংশ।
( গল্পটি সময়োপযোগী হওয়ায় গুগল ঘাটিয়া অতি কষ্টে জনস্বার্থে বাহির করিলাম।)
(১)
তোতাকাহিনী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১
এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।
রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’
মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’
২
(২)
পন্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।
সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে-বাসা বাঁধে সে-বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।
রাজপন্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।
৩
স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশ-বিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, ‘শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।’ কেহ বলে, ‘শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।’
স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।
পন্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ‘অল্প পুঁথির কর্ম নয়।’
ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বত প্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল, সেই বলিল, ‘সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।’
লিপিকরের দল পারিতোষিক লইয়া বলদ বোঝাই করিয়া তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।
অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ করার ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ‘উন্নতি হইতেছে।’
লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্দুক বোঝাই করিল।
তারা এবং তাদের মামাতো, খুড়তুতো, মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠা-বালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।
৪
সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, ‘খাঁচাটার উনতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।’
কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’
ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পন্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলি খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।’
জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনাদের গলায় সোনার হার চড়িল।
(৩)
৫
শিক্ষা যে কী ভয়ঙ্কর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।
দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া-নাকাড়া তুরী ভেরী দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসের খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প। পন্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া, টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো, পিসতুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।
ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ কান্ডটা দেখিতেছেন !’
মহারাজ বলিলেন, ‘আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।’
ভাগিনা বলিল, ‘শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।’
রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ‘মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কী?’
রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, ‘ঐ যা। মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’
ফিরিয়া আসিয়া পন্ডিতকে বলিলেন, ‘পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’
দেখা হইল। দেখিয়া বড় খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চিৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরের রোমাঞ্চ হয়।
এবারে রাজা হাতিতেই চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কানমলা দেওয়া হয়।
৬
পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্ত্তরমতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝটপট করে। এমন-কী, এক-একদিনে দেখা যায় সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।
কোতোয়াল বলিল, ‘এ কী বেয়াদবি।’
তখন শিক্ষামহলে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।
রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, ‘এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।’
(৪)
তখন পন্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কান্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।
কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিনির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।
৭
পাখিটা মরিল। কোনকালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্মীছাড়া রটাইল, ‘পাখি মরিয়াছে।’
ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, ‘ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।’
ভাগিনা বলিল, ‘মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’
রাজা শুধাইলেন, ‘ও কী আর লাফায়?’
ভাগিনা বলিল, ‘আরে রাম!’
‘আর কি ওড়ে?’
‘না।’
‘আর কি গান গায়?’
‘না।’
‘দানা না পাইলে আর কী চেঁচায়?’
‘না।’
রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’
পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্খস্ গজ্গজ্ করিতে লাগিল।
বাহিরে নব বসন্তের দক্ষিণ হাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।
৭১
১৪৫ মন্তব্য