Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ জানুয়ারি, ২০২৩ ০২:১৫ অপরাহ্ণ

ত্রিফলার উপকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং ব্যবহারের পদ্ধতি।

ত্রিফলা কি?

ত্রিফলা হল একটি অতি প্রসিদ্ধ আয়ুর্বেদিক প্রণালি যেটি আমলা(এম্বলিকা অফিসিনালিস), বিভিতকি বা বহেড়া(তারমিনালিয়া বেলিরিকা)এবং হরিতকি বা হরদ(তারমিনালিয়া চেবুলা) এই তিনটি ফল থেকে তৈরি করা হয়। বস্তুত ত্রিফলা শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “তিনটি ফল”(ত্রি=তিন ও ফলা=ফল)। আয়ুর্বেদে ত্রিফলা উল্লেখযোগ্য তার রাসায়নিক গুণাবলীর জন্য যার অর্থ এটি আমাদের শরীরস্বাস্থ্য ও জীবনীশক্তি বজায় রাখতে এবং রোগ থেকে আমাদের দূরে রাখতে সাহায্য করে।

ত্রিফলা হল নিম্নোক্ত ভেষজ উদ্ভিদের সমাহার।

আমলা (এম্বলিকা অফিসিনালিস) :
দেশের সর্বত্র সবচেয়ে সহজপ্রাপ্য ফলগুলির একটি, এটিকে সাধারণত ভারতীয় গুজবেরিও বলা হয়ে থাকে। আমলা ফলটি ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ এবং এটি ভিটামিন সি-এর বিশ্বের উৎকৃষ্টতম উৎস। সাধারণত এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখতে, কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে এবং বার্ধক্যপ্রতিরোধী একটি ফল হিসেবে।


বহেড়া (তারমিনালিয়া বেলিরিকা):
ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র উপলব্ধ এই ফলটি আয়ুর্বেদ এবং অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবস্থায় জায়গা করে নিয়েছে জ্বর প্রতিরোধকারী, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও যক্কৃত সুরক্ষাকারী  হিসেবে, শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার চিকিৎসা সাধনকারী হিসেবে এবং ডায়বিটিস বিরোধী মহৌষধ হিসেবে। আয়ুর্বেদ অনুযায়ী গ্লুকোসাইড, ট্যানিন, গ্যালিক এসিড, ইথাইল গ্যালেটের মত একগুচ্ছ জৈব উপাদানে সমৃদ্ধ এই বহেড়া ফল। একত্রে এইসব উপাদানগুলিই হল বহেরার স্বাস্থ্যপোকারী বৈশিষ্ট্য।


হরদ (তারমিনালিয়া চেবুলা):
আয়ুর্বেদে বর্ণিত ভেষজ উদ্ভিদগুলির মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল হরদ। এটির স্বাস্থ্যপোকারীতা অপরিসীম। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহবিরোধী ও বার্ধক্যবিরোধী হওয়ার পাশাপাশি চমৎকার ক্ষয়প্রশমণকারী হিসেবেও এর সুখ্যাতি আছে। যক্কৃৎ, পাকস্থলী, হৃদয় এবং মুত্রাশয়ের স্বাভাবিকতা পুনরুদ্ধার ও বজায় রাখার ক্ষেত্রেও আয়ুর্বেদে এর সুখ্যাতি আছে। সেই কারণেই একে “ওষুধের রাজা” বলাটাও যথার্থ।


জানতেন কি?

আয়ুর্বেদে বর্ণিত আছে যে ত্রিফলা দেহের তিনটি দোষের( বাত, পিত্ত, কফ) মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় বলা আছে যে ত্রিফলাতে পাঁচ ধরণের রস বা স্বাদ আছে। এতে মিষ্টি, তিক্ত, তীব্র, তিক্ত ও কষা স্বাদ বর্তমান। শুধুমাত্র নোনতা স্বাদটাই এখানে বিদ্যমান নয়।

ত্রিফলার স্বাস্থ্যপোকারিতা -


প্রাথমিকভাবে ত্রিফলা পুনর্জীবনদায়ী ভেষজ হিসেবে আয়ুর্বেদে বর্ণিত কিন্তু অন্যান্য কিছু রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বস্তুত আয়ুর্বেদে বলা হয় যে ত্রিফলা আমাদের মায়ের মতই যত্ন করে থাকে। কারোর মনে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে এর প্রণালীর মধ্যে কি এমন মহত্ত্ব আছে? আসুন আমরা অনুসন্ধান করে দেখি ত্রিফলার কিছু স্বাস্থপোকারী গুণ

ওজন কমানোঃ

বিভিন্ন ক্লিনিকাল গবেষণায় দেখা গেছে যে ত্রিফলা সেবন ওজন কমাতে সহায়তা করে। নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে যাদের ত্রিফলা দেওয়া হয়, দেখা যায় যে তাদের মধ্যে ওজন কমার পরিমাণ বেশি এবং তাদের কোমর এবং নিতম্বের পরিধিও হ্রাস পেয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।

চোখ :ছানি ও গ্লকো
মা নিয়ন্ত্রণে ত্রিফলা আয়ুর্বেদিক মিশ্রণ তৈরিতে কাজে লাগে। ক্লিনিকাল গবেষণা  প্রমাণ করে ছানিবিরোধী ও দৃষ্টিশক্তির উন্নতিসাধনে এই ভেষজের উপকারিত
চুলের সমস্যাঃত্রচুলের সুরক্ষাকারী গুণাবলীর জন্য পরিচিত ও সাধারণত অকালে চুল পাকা রোধ করতে সাহায্য করে। চুল পড়ার সমসস্যা কমায় এবং পরিমিত ব্যবহারে খুলিতে আকাঙ্ক্ষিত পুষ্টি প্রদান করে।

পেটের সমস্যাঃ

পেটে ফাঁপাভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফুলে যাওয়া এবং অনিয়মিত অন্ত্রের সমস্যাই পেটের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিন্হিত। গবেষণায় দেখা গেছে যে খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে ত্রিফলা অন্তর্ভুক্ত করলে পাচনতন্ত্রের সাধারণ সমস্যাগুলি সামাল দেওয়া যায় এবং এটি শরীর থেকে অতিরিক্ত টক্সিন বার করে দেয়।


পিরিওদন্তাইটীসঃ
জীবাণুবিরোধী কার্যকলাপের জন্য ত্রিফলা ব্যবহৃত হয়ে থাকে মাড়ির সমস্যা, পিরিওদন্তাইটিস ও অন্যান্য মৌখিক সমস্যার বিরুদ্ধে। ক্লোরহেক্সিডাইনের সাথে মুখ ধোওয়ার তরল হিসেবে ব্যবহার করলে তা প্লাক জমা রোধ করে এবং মুখের স্বাস্থ্য ভাল রাখে।


জীবাণুবিরোধীঃ
ত্রিফলা বিভিন্ন চিকিৎসায় সংক্রমণ আটকানোর প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং এই ব্যবহার গবেষণায় স্বীকৃত। শুধু তাই নয়, এসচেচিয়া কোলি, সালমেনেলা টাইফি, সুডোমোনাস এরেগিনোসা, স্টাফাইলোকোকাস অরেয়াস, ভিব্রিও কোলেরির বিরুদ্ধেও এর কার্যকারিতা প্রমাণিত।


অ্যান্টিঅক্সিডেন্টঃ
ভিটামিন-সি তে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে ত্রিফলাকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট খাওয়ার হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই কারণে এটি আমাদের শরীরকে ফ্রি র‌্যাডিকালের প্রভাব থেকে রক্ষা করে।


ডায়াবেটিসঃ
ইনসুলিন হরমোনের ওপর ক্রিয়ার ফলে ত্রিফলা যে ডায়াবেটিসবিরোধী তা আজ প্রমাণিত সত্য। এটি রক্তস্রোতে গ্লুকোজ জমা হওয়া বা বিমুক্ত হওয়া নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।


ওজন কমাতে ত্রিফলা - Triphala for Weight Loss in Bengali

বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়মিত ত্রিফলা সেবন করলে তা ওজন কমাতে ভীষণ ভাবে সাহায্য করে, বিশেষত: স্থুলকায় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক কিছু মানবভিত্তিক গবেষণায়, 16-60 বছর বয়সী স্থুলকায় কিছু বাছাই করা লোকজনদের 2টি  শ্রেণীতে ভাগ করে তাদের ওপর পরীক্ষা করা হয়েছিল ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ত্রিফলার উপকারিতা। এর মধ্যে একটি শ্রেণীকে 12 সপ্তাহ ধরে দিনে 2 বার করে 5 গ্রাম  ত্রিফলা দেওয়া হয় মৌখিক সেবনের জন্য এবং অন্য শ্রেণীটিকে দেওয়া হয় প্ল্যাসিবো। এরপর ত্রিফলা সেবনকারী শ্রেণীটির শারীরিক ওজন ও কোমর এবং নিতম্বের পরিধির উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ করা যায়। উপরন্তু, অন্ত্রের ওপর ত্রিফলা পাউডার সেবনের প্রভাব লক্ষ্য করলে খুব সহজেই বলে দেওয়া যায় ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ত্রিফলার উপকারিতা। তাহলে এটা বলাই যায় যে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ত্রিফলা হল একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রতিকার।

চোখের জন্য ত্রিফলা পাউডার - Triphala Powder for Eyes in Bengali

চোখের ছানি ও গ্লুকমা সহ চোখের পক্ষে ত্রিফলার প্রচুর উপকারী প্রভাব আয়ুর্বেদ বর্ণনা করে। ক্লিনিকাল গবেষণা দাবি করে ত্রিফলার ছানি-বিরোধী প্রভাব। দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধির জন্য আয়ুর্বেদিক ডাক্তারদের প্রস্তাবিত চিকিৎসায় ত্রিফলা অন্যতম উপাদান। কমায় বলেও জানা যায়। ত্রিফলা ঘৄত নামক একটি আয়ুর্বেদিক প্রতিকার আছে যা চোখের অন্যতম ভাল ওষুধ হিসেবে চিহ্নিত। তবে চোখ হল মানুষের শরীরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গাগুলির একটি। সুতরাং চোখের বিষয়ে ত্রিফলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে একজন আয়ুর্বেদিক ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

চুলের জন্য ত্রিফলা - Triphala for hair in Bengali

ত্রিফলা হল অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের একটি সমৃদ্ধ উৎস যা দূষণের কারণে হওয়া চুলের ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে। ত্রিফলায় থাকা আমলা অকালে চুল পাকা থামাতে বিশেষভাবে উপকারী এবং বহেড়া চুল পড়া কমাতে ও চুলের গোড়া শক্ত করতে খুবই সাহায্য করে। ত্রিফলা সম্বন্ধে আরও বলা হয় যে এটি মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় ও তার ফলে পুষ্টিকর উপাদান ও খনিজ বস্তু আমাদের ত্বক আরও তাড়াতাড়ি শুষে নিতে সক্ষম হয়। ত্রিফলা তেল বা ত্রিফলা পেস্ট মাথায় সরাসরি প্রয়োগ করা যায়, যাতে চুলের ওপর এর পুষ্টিদায়ী এবং রক্ষাকারী সুবিধাগুলি পাওয়া যায়।

কোষ্ঠকাঠিণ্যে ত্রিফলা - Triphala for Constipation in Bengali

সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন অন্ত্র আমাদের শরীর সার্বিকভাবে ভাল রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাচনতন্ত্রের বর্জ্য পদার্থ অন্ত্রের পথ শুধুমাত্র বদ্ধই করে রাখে তা নয়, দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিণ্য শরীরে বিষাক্ত উপাদানের পরিমান বাড়িয়ে তোলে। অতিরিক্ত পরিমাণে অধিবিষ জমা হওয়ার ফলে শরীরে উদ্বেগ ও চাপের মত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। আয়ুর্বেদিক ডাক্তারদের মতে ত্রিফলা একটি প্রাকৃতিক জোলাপ, এবং এটি কোষ্ঠশুদ্ধি নিয়মিত করার পাশাপাশি অন্ত্রের পেশিগুলিকেও শক্তিশালী করে তোলে। এটি পেটের ওপর কোনরকম চাপ সৃষ্টি করে না এবং দীর্ঘকাল কোনরকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা না ভেবেই এটি সেবন করা যায়। ভারতে হওয়া একটি ক্লিনিকাল গবেষণা দাবি করে যে নিয়মিত ত্রিফলা সেবন কোস্ট কাঠিন্য দূর করতে পারে, অনিয়মিত কোষ্ঠশুদ্ধির ক্ষেত্রে, পেট ফুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে এবং পেট ব্যথার বিষয়ে বিশেষভাবে সহায়তা করে।

দাঁতের জন্য ত্রিফলা - Triphala for Teeth in Bengali

অ্যান্টিঅক্সিডান্ট, প্রদাহবিরোধী ও অ্যান্টিমাইক্রবিয়াল  প্রভাবের কারণে দাঁতের সাধারণ সমস্যা দূরীকরণে ও দাঁতের স্বাস্থ্য ভাল রাখতে ত্রিফলা একটি দুর্দান্ত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। ভারতে হওয়া একটি ক্লিনিকাল গবেষণায় দেখা গেছে ত্রিফলা ও ক্লোরহেক্সিডাইন মাউথওয়াশ প্লাক জমার গতিরোধ করতে সক্ষম। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় ত্রিফলা ও  0.2% ক্লোরহেক্সিডাইন দিয়ে তৈরি মাউথওয়াশও মারী জ্বলে যাওয়া ও প্লাক জমার সমস্যা সমাধানে  ক্ষেত্রেও কার্যকর।

অ্যান্টিমাইক্রবিয়াল হিসেবে ত্রিফলা - Triphala as an antimicrobial in Bengali

প্রথাগতভাবে আয়ুর্বেদে ত্রিফলা একটি অ্যান্টিমাইক্রবিয়াল  প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করে এসেছে। ল্যাব গবেষণায়ও দেখা গেছে ত্রিফলার জীবাণুবিরোধী ও অ্যান্টিমাইক্রবিয়াল হওয়ার সম্ভাব্যতা। ভারতে হওয়া একটি গবেষণায় দেখা গেছে HIV রুগীদের মধ্যে হওয়া আনুসঙ্গিক রোগের উৎস যে সাধারণ জীবাণু তাদের বিরুদ্ধে লড়ে ত্রিফলার ইথানোলিক নির্যাস। এই গবেষণায় এও দেখা গেছে যে ত্রিফলা এসেরেশিয়া কোলি, সালমেনেলা টাইফি, স্যুডোমোনাস এরেগিনোসা, স্টাফিলোকোকাস অরেয়াস, ভিব্রিও কোলেরির বিরুদ্ধেও সমান কার্যকর। যদিও মানুষের ওপর এর প্রভাব এখনও পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।

অ্যান্টিঅক্সিডান্ট হিসেবে ত্রিফলা - Triphala as an antioxidant in Bengali

ত্রিফলা ভিটামিন সি, পলিফেনল এবং অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডান্টে সমৃদ্ধ যা এটিকে একটি দুর্দান্ত প্রতিনিধি বানায় ফ্রী রাডিক্যাল থেকে শরীরে হওয়া ক্ষতি আটকাতে। ফ্রী রাডিক্যাল হল এক ধরণের প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেনে সমৃদ্ধ প্রজাতি যা শরীরের স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপের ফলে সৃষ্টি হয় এবং বয়সের সাথে সাথে শরীরে জমতে থাকে। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু জীবনধারা ও খাদ্যাভ্যাসের কারণে যেমন অতিরিক্ত জাঙ্কফুড খাওয়ার ফলে, বা ধূমপান অথবা দূষণের কারণে আমাদের শরীরে দ্রুতবেগে ফ্রী রাডিক্যাল জমতে থাকে। বৈজ্ঞানিকদের মতে, অতিরিক্ত পরিমাণে ফ্রী রাডিক্যাল শরীরে জমা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বেশ কিছু সমস্যা এবং অসুখের প্রধান কারণ। অতিরিক্ত ফ্রী রাডিক্যালের হার্ট, লিভার, ও কিডনি সহ অন্যান্য দেহের মূল অঙ্গগুলির সুস্থ ও স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপ রোধ করে এবং এই কারণে মানুষের শরীরে বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার প্রাথমিক সুত্রপাথ হয়। তাহলে কিভাবে অ্যান্টিঅক্সিডান্ট এই বহুচর্চিত ফ্রী রাডিক্যালের বিরুদ্ধে লড়ে? একটি ভাল অ্যান্টিঅক্সিডান্ট সম্পূরক ফ্রী রাডিক্যাল খুজে বের করে প্রতিরোধ করে (শরীরের ক্ষতি করা থেকে আটকায়) এবং শরীরকে প্রাথমিক ক্ষতি হওয়া থেকে আটকায়।

ডায়াবিটিসের জন্য ত্রিফলা - Triphala for diabetes in Bengali

ত্রিফলাতে আছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাইপোগ্লাইসেমিক (শর্করাভাব কমায়) । গবেষণায় পাওয়া গেছে ত্রিফলা বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য ডায়বিটিসবিরোধী ওষুধগুলির মতই ইনসুলিন থেকে দুটি প্রধান এনজাইমের, যেমন আলফা-অ্যামিলেস এবং আলফা-গ্লুকোসিডেসের ক্ষরণ আটকায়।এই এনজাইমগুলি চিনি থেকে উৎপন্ন হওয়া বৃহত্তর যৌগগুলিকে ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত করে। এই এনজাইমগুলির ক্ষরণ থামলে গ্লুকোজ তৈরি হওয়া থামে, ফলত পরবর্তী ক্ষেত্রে তা রক্তে মেশা বন্ধ হয়। এইভাবে রক্তে শর্করার পরিমান নিয়ন্ত্রণে থাকে। ভারতে হওয়া একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে 45জন রুগী যাদের ডায়বেটিস ইনসুলিনের ওপর নির্ভরশীল নয়, নিয়মিত ত্রিফলা সেবনের ফলে তাদের রক্তে শর্করাভাব কমানোর ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব ফেলে।

বাত-বিরধী হিসেবে ত্রিফলা - Triphala as an anti-arthritic in Bengali

ত্রিফলা একটি দুর্দান্ত প্রদাহবিরোধী এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই দুটি গুণের কারণের জন্যে এটি বাত এবং বাত সংক্রান্ত লক্ষণগুলির বিরুদ্ধে নিখুঁত একটি সম্পূরক। জীবজন্তুদের ওপর হওয়া কিছু গবেষণা দাবি করে যে ত্রিফলা তরুণাস্থি ও হাড় ফুলে যাওয়ার কারণে হওয়া আর্থ্রাইটিস থেকেও রেহাই দেয়। যদিও মানুষের ওপর কোন গবেষণা এখনও হয়নি যাতে করে মানুষের মধ্যে হওয়া আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে ত্রিফলার কার্যকারিতা বোঝা যায়।

ত্রিফলার ক্যানসাররোধী বৈশিষ্ট - Triphala anticancer properties in Bengali

ত্রিফলার ক্যানসাররোধী কার্যকারিতার বিষয়ে জানতে অসংখ্য গবেষণা করা হয়েছে এবং এই সকল গবেষণাই দাবি করে যে ত্রিফলা সম্ভাবনাসূচক একটি ক্যানসার রোধী ওষুধ। ভারতে হওয়া একটি সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে আমরা জানতে পারি ত্রিফলার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্তারবিরোধী (বেড়ে যাওয়া আটকায়) ও অ্যাপোপটোটিক (ক্যানসার কোষগুলিকে মেরে ফেলে) বিশেষত্ব রয়েছে। প্রস্টেট ক্যানসারের ওপর হওয়া আরেকটি গবেষণা দাবি করে যে ত্রিফলার মধ্যে থাকা গ্যলিক অ্যসিড (একটি রাসায়নিক যৌগ) এর ক্যানসারবিরোধী কার্যকলাপের জন্য দায়ি। শুধু তাই নয়, অ্যাপোপটোটিক (কোষ মেরে ফেলা) বিশেষত্বের কারণে সাধারণ কোষ ও ক্যানসার-কবলিত কোষগুলির ওপর ভিন্ন প্রভাব দেখা যায়। এটি ক্যানসার-কবলিত কোষগুলিকে মেরে ফেলে সাধারণ কোষগুলির ওপর কোন প্রভাব না ফেলেই। যদিও মানুষের ওপর ত্রিফলার ক্যানসাররোধী প্রভাবের বিষয়ে জানার কোনওরকম গবেষণা এখনও পর্যন্ত হয়নি। সেই কারণে ত্রিফলার ক্যানসাররোধী প্রভাবের বিষয়ে জানতে আয়ুর্বেদিক ডাক্তারের সাথে পরামর্শ একান্তই বাঞ্ছনীয়।

ত্রিফলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া - Side effects of triphala in Bengali

ত্রিফলা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী সেবনের জন্য খুবই নিরাপদ হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে একজন সুস্থ ব্যাক্তিও ত্রিফলার পুষ্টিকর উপকারিতার জন্য এটি সেবন করতে পারেন। কিন্তু ত্রিফলার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকার ফলে খাদ্যাভাসে এটিকে যোগ করার আগে বিবেচনা করে দেখা উচিৎ।

 ত্রিফলা হল একটি প্রাকৃতিক জোলাপ। এটি স্বল্প পরিমাণে সেবন করা যেমন উপকারী, অপরিমিত পরিমাণে সেবন করলে তা ডাইরিয়া ও ডিসেন্ট্রির আকার ধারণ করে।


 যদি আপনি নির্ধারিত ওষুধ সেবন করে থাকেন, তাহলে ত্রিফলা খাদ্যাভাসে যোগ করার আগে আপনার আয়ুর্বেদের ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া বাঞ্ছনীয় কারণ ত্রিফলা অন্যান্য ওষুধের কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারে।


 ত্রিফলা সেবন যে গর্ভবতী ও শিশু প্রতিপালনকারী মায়েদের জন্য নিরাপদ তার কোন বৈজ্ঞানিক প্রমান নেই। সেহেতু গর্ভবতী মহিলাদের বলা হয় কোন প্রকারের ত্রিফলা সেবন না করতে অথবা ব্যবহারের আগে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিতে।


বাচ্চাদের ত্রিফলা দেওয়া উচিৎ নয়।


কিছু লোক ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার অভিযোগ জানান ত্রিফলা সেবনের ফলে কিন্তু সেটা নির্ভর করে পাউডার  মাত্রার ওপর।


কিভাবে ব্যবহার করবেন ত্রিফলা - How to use triphala in Bengali

ত্রিফলা সাধারণত ত্রিফলা “চূর্ণ” হিসেবেই সেবন করা হয়ে থাকে। কিন্তু বাণিজ্যিক ভাবে এটি ট্যাবলেট, ক্যাপসুল ও ত্রিফলা রসের আকারে উপলব্ধ। সাময়িক ব্যাবহারের জন্য ত্রিফলা তেলের আকারেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ত্রিফলার তিনটি ভেষজের অনুপাত পৃথক শরীরের ধরণের ওপর নির্ভর করে, তবে সাধারণত যে অনুপাতে ব্যাবহার করা হয় টা হল 1 (হরদ) , 2 (বহেড়া) ও 4 (আমলা) । ½ চা চামচ পাউডার জলের সাথে মিশিয়ে (চা হিসেবে) হয় সকালে বা রাতে খাওয়ার পরে খাওয়া যেতে পারে। আয়ুর্বেদিক ডাক্তারেরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন ত্রিফলা আলাদা করে তিনটি চূর্ণ 1:2:4 অনুপাতে খেতে। বহেড়া চূর্ণটি খাওয়ার আগে, আমলা চূর্ণটি খাওয়ার পরে ও হরদ চূর্ণটি খাওয়ার 2-3 ঘণ্টা পর খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আয়ুর্বেদ অনুযায়ী সেরা ফলাফলের জন্য এই সকল পাউডার ঘি এবং মধুর সাথে সেবন করা উচিৎ। ত্রিফলার নিয়মিত সেবন পাচনতন্ত্র উন্নত করে এবং শরীরে বিভিন্ন খনিজ পুষ্টিকর পদার্থের সমপূরক হিসেবে কাজ করে। তবুও যদি আপনি বাড়িতে এই স্বাস্থ্যবর্ধক প্রণালি তৈরি করতে চান, তাহলে আয়ুর্বেদের ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়।

ত্রিফলাকে প্রায়শই ত্রিফলা গুজ্ঞুলুর সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। এটি একটি ভিন্ন প্রণালী যাতে লম্বা পাইপার ও গুজ্ঞুলু (গন্ধরসসহ রজন) ত্রিফলা ফলের সাথে যোগ করা হয় যা আয়ুর্বেদে প্রদাহবিরোধী একটি প্রণালী হিসেবে ব্যাবহার করা হয়।

ত্রিফলার মাত্রা - Triphala dosage in Bengali

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ত্রিফলা খালি পেটে বা খাওয়ার পরে খাওয়া যায়। সাধারণত ½ চা চামচ ত্রিফলা পাউডার চায়ের মত করে দিনে দুবার খাওয়া যায়। ত্রিফলা পাউডার ঘি বা মধুর সাথেও দিনে দুবার খাওয়া যায় কিন্তু সে ক্ষেত্রে জলের সাথে খাওয়ার পরিমাণের সাথে তার তারতম্য ঘটে। চেহারার ধরণ, বয়স, লিঙ্গ এবং অন্যান্য কারনের ভিত্তিতে ত্রিফলা সেবনের মাত্রার তারতম্য ঘটে তবে আয়ুর্বেদিক ডাক্তারেরা বলে থাকেন প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ত্রিফলা সেবনের দৈনিক মাত্রা যেন 2 চা চামচের বেশি না হয়।

ত্রিফলা ক্যাপসুল, সিরাপ এবং ট্যাবলেটের সেবনের মাত্রা ত্রিফলা পণ্যটির কার্যকারিতা অনুযায়ী এবং চেহারার ধরণ ও দেহতত্ত্ব অনুযায়ী পাল্টায়। সেই কারণে যদি আপনি এই আয়ুর্বেদিক চূর্ণটির বিশেষ আরোগ্যকারী কোনও সুবিধা পেতে চান, সেই ক্ষেত্রে একজন আয়ুর্বেদিক ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে জানুন আপনার ক্ষেত্রে ত্রিফলার সঠিক পরিমাণ।  

মন্তব্য করুন