সহকারী শিক্ষক
২৯ জানুয়ারি, ২০২৩ ১২:১১ পূর্বাহ্ণ
বাজ পাখীর জীবন আমাদের অনেক কিছু শেখায়।
প্রকৃতির থেকে বড়ো শিক্ষক আর কেও নেই। বাজ পাখীর জীবন আমাদের অনেক কিছু শেখায়।
বাজ পাখি কে বলা হয় পাখিদের রাজা। কিন্তু জানেন কি, এই বাজ পাখির জীবনের প্রতিটা মুহূর্তই কতটা কঠিন? বাজ পাখির জীবনটাই শুরু হয় একটি কঠিন ট্রেনিং-এর মধ্য দিয়ে, এমন ট্রেনিং যে ট্রেনিং তাকে অন্যান্য পাখিদের উপর রাজ করতে শক্তি জোগায়, এমন ট্রেনিং যে ট্রেনিং তাকে মেঘ ভেদ করে, মেঘের উপড়ে গিয়ে উড়ার প্রেরনা জোগায়। আর তার জীবনের শুরুতেই এই কঠিন ট্রেনিং, তাকে জীবনের পরবর্তী চড়াই-উতরাই গুলি পাড় হতে সাহায্য করে।
সাধারণত পাখিরা তাদের বাচ্চাদের ততদিন পর্যন্ত পরিচর্যা করতে থাকে যতদিন পর্যন্ত সেই বাচ্চা পাখিটি ঠিকমত উড়তে না শিখে, কিন্তু বাজ পাখির বেলায় ব্যাপারটা একেবারেই উল্টো। যখন ডিম থেকে বাজ পাখির জন্ম হয়, তার কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয়ে যায়, তার প্রশিক্ষণ।
অন্য পাখীরা যেমন, বাইরে থেকে খাবার সংগ্রহ করে সরাসরি, বাচ্চার মুখে ঢেলে দেয়। কিন্তু বাজ পাখির বেলায় ব্যাপারটা অনেকটা আলাদা, বাজ পাখির বাবা-মা খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু খাবার গুলি সরাসরি বাচ্চাদের মুখে ঢেলে দেয় না, প্রথমে বাচ্চাকে মুখে খাবার দিয়ে জানিয়ে দেয় যে, এগুলি খাবার। এরপর খাবারগুলি সেগুলি বাচ্চাটির থেকে কিছুটা দূরে রেখে দেয়। বাচ্চাটি যখন খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়ে, তখন সে খাবারের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়, কারণ তার পা এখনও ঠিক হয়নি, কিন্তু খিদের জ্বালা বড় জ্বালা, যেভাবেই হোক তাকে খাবার খেতেই হবে।
তাই অনেক কষ্টে, বারংবার চেষ্টা করে, বাচ্চাটিকে খাবারটির কাছে যেতে হয়। কিন্তু ভোগান্তি এখানেই শেষ নয়, খাবারের কাছে গেলেও, খাবার কিভাবে উঠিয়ে খেতে হয় সেটাও যে তার জানা নেই, ঠোঁট খাবারে ঠোকর দিতে দিতে একসময় সে সফল হয়। এভাবেই সে হাঁটতে শেখে।
এরপর শুরু হয় তার জীবনের আরেকটি কঠিন পর্যায়। কারণ এবার তার প্রশিক্ষণ হবে উড়তে শেখার প্রশিক্ষণ। মা-বাজ পাখি বাচ্চাটিকে ঠোঁটের মধ্যে বা পায়ে ধরে আকাশের অনেকটা উপড়ে নিয়ে যায়, এরপর হঠাৎ করেই অত উপর থেকে ছেড়ে দেয়। বাঁচার তাগিদে ছোট্ট বাজ পাখীটি ডানা ঝাঁপটাতে থাকে, কিন্তু সে উড়তে সফল হয়না। মা-বাজ মাটিতে পড়ার আগেই তার বাচ্চাটিকে আবার ধরে ফেলে।
এতে সেই ছোট্ট বাচ্চাটির, উঁচু দেখে ভয় এবং উড়ার শিক্ষা একসাথে চলতে থাকে। অনেক সময় বাসার বাইরে মা-বাজ খাবার ধরে উড়তে থাকে, অভুক্ত বাজের বাচ্চাটি খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্যে যখনই বাইরে পা বাড়ায় সে নীচের দিকে পড়তে থাকে আর নিজেকে বাঁচানোর জন্য সে ডানা ঝাঁপটাতে থাকে, এই প্রশিক্ষণের সময় সে অনেক চোট পায়। কিন্তু মা-বাজ যে তাকে কিছুতেই ছাড়বে না!
এভাবেই একদিন সে উড়তে শিখে যায়, উঁচু দেখে ভয় পায় না সে। নিজের লক্ষ্য বস্তুতে অটুট থাকে। আর ছোট থেকেই এই কঠিন প্রশিক্ষণের জন্যই বাজ পাখী তার থেকেও বড় বড় প্রাণীদের আক্রমণ করার সাহস অর্জন করে।
জীবনের চাকা যত ঘুরতে থাকে, শরীরের পাখা যখন আর ঠিকমত বাতাসের প্রবাহকে বাগে আনতে পাড়ে না, ঠোঁট যখন আর আগের মত ধারালো থাকে না, পায়ের নখ যখন বড় হয়ে যায়, খাবার যখন আর সহজে সেগুলির দ্বারা ধরা যায় না, তখন বার শুরু হয় এক নতুন সংগ্রাম। কিন্তু তখন বাজ পাখির বয়স মাত্র ৪০ বছর, অপরদিকে তার আয়ু ৭০ বছর। এই সময় তাকে চরম সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে, সে কিছুদিন কষ্ট করবে নাকি এভাবে থেকেই অকালে মারা যাবে! এই সময় তার কাছে তিনটি পথ খুলে যায়-
সে আত্মহত্যা করবে, নাকি শকুনের মত মরা- পচা জন্তু খাবে, নাকি নিজেকে আবার এক নতুন জীবন দান করবে! সে বিজ্ঞের মত বেঁছে নেয় শেষের পথটি।
এবার সে একটি উঁচু পাহাড়ে গিয়ে বা উঁহু জায়গায় গিয়ে আস্তানা জমায়। ঠোঁট দিয়ে ধীরে ধীরে উপড়ে ফেলে দেয় শরীরের সব পালক, কি ভাবছেন বেদনা? যার জীবনটাই শুরু হয়েছে সংঘর্ষ দিয়ে তার কাছে এগুলি কিছুই নয়। এরপর সে তার ভোঁতা ঠোঁটকে পাথরে আঘাত করে ভেঙ্গে ফেলে, রক্তাক্ত হয়ে যায় সে, কিন্তু সে জানে টিকে থাকতে গেলে এই কষ্ট গুলি তাকে পেতেই হবে।
এরপর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পড় ধীরে ধীরে তার শরীরে নতুন পালক আসে, নতুন ধারালো ঠোটের উদয় হয়, শুরু হয় আরেক নতুন জীবন। প্রায় ১৫০ দিনের প্রতীক্ষার অবসানের পর শুরু হয় তার নতুন জীবন। বাকি ৩০ টি বছর আবার নিজের মত করে বেঁচে থাকার জন্য সে প্রস্তুত হয়ে যায়।
তাই আপনার জীবনে যদি অনেক সংঘর্ষ আসে, এটা ভেবে বসে থাকবেন না যে, আপনার ভাগ্য খারাপ। বরং পরিস্থিতি এবং সংঘর্ষ আপনাকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যাতে আপনি আরও সহনশীল হতে পাড়েন, যাতে একটুতেই ভেঙ্গে না পড়েন, যাতে নিজের সংকল্প মজবুত রাখতে পাড়েন, যাতে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পাড়েন। বাজ পাখী কক্ষনোই দলবেঁধে থাকে না। তাই জীবনে কিছু করতে হলে দল-বলের মায়া ছেড়ে, নিজের আস্তানা নিজেকেই গড়তে হবে। কারণ আপনি যেদিন সফল হবেন সেদিন আপনাকে দেখে হাসাহাসি করা আপনার বন্ধুটিও আপনার সাথে সেলফি তোলার জন্য প্রতীক্ষায় থাকবে।
সংগ্রহ
১৩
১৯ মন্তব্য