সহকারী অধ্যাপক
০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ০৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
মাদক সেবনে রয়েছে আত্মিক, দৈহিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, জাতীয় ইত্যাদি ক্ষতি
১. আত্মিক ক্ষতি : মাদকের আত্মিক ক্ষতির মধ্যে রয়েছে- উত্তাপ সৃষ্টি : মাদক সেবন করার ফলে মানবাত্মায় উত্তাপের সৃষ্টি হয়। এর ফলে বিবেক বুদ্ধি হারিয়ে যায়, ভালো-মন্দ পার্থক্য করতে পারে না। মাদক আত্মার ধ্বংস সাধন করে। আত্মায় গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে এবং এর বিষক্রিয়া ও অনিষ্টতা সর্বাঙ্গে ছড়িয়েপড়ে।
বিবেকশূন্য : মাদক সেবন ব্যক্তিকে বিবেকশূন্য ও মাতালে পরিণত করে। ফলে সে এমন কাজ করে যা একজন সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন লোক করতে পারে না। মাদক সেবনের ফলে সে অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করে এবং গর্হিত কাজ করে। ব্যভিচার, ধর্ষণ, নিষিদ্ধ আত্মীয়ের সাথে জোরপূর্বক যৌনতা-ি এসব কিছু মদ্যপায়ীদের মধ্যে অধিক পাওয়া যায়। আমেরিকার ন্যাশনাল ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের ন্যাশনাল ভিকটিমাইজেশন সার্ভে ব্যুরো অব জাস্টিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে প্রতিদিন গড়ে ২৭১৩ ধর্ষণের ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল। রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে ধর্ষকদের বেশির ভাগই ঘটনার সময় মাতাল ছিল। একই পরিসংখ্যানে দেখা যায় ৮ শতাংশ আমেরিকান মা-বোন, অথবা মেয়ের সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত। প্রতি ১২ বা ১৩ জনের একজন আমেরিকান এই কর্মে অভ্যস্ত এবং দু’জনের একজন অথবা উভয়ে এ সময় মাতাল থাকে। এইড্স বিস্তারের ক্ষেত্রে মাদকের ভূমিকা অন্যতম।
দুর্বল হয়ে পড়ে : মাদকসেবী মাদকের প্রভাবে নিজেকে বড় শক্তিশালী মনে করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সে দুর্বল, অক্ষম ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
গোপন বিষয় প্রকাশ : মাদকসেবন করে অনেকে গোপন বিষয় প্রকাশ করে ফেলে। যা তার নিজের ও পরিবারের ক্ষতির কারণ হয়।
২. দৈহিক ক্ষতি : মাদক দৈহিকভাবে অনেক ক্ষতিসাধন করে। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ ক্ষতিগুলো হলো- অসুস্থ করা : মাদক সেবন সুস্থ ব্যক্তিকে চরমভাবে অসুস্থ করে ফেলে, যুবককে বৃদ্ধ করে দেয়। ফলে অল্প বয়সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। মস্তিষ্কের লাখ লাখ সেল ধ্বংস করে, লিভারে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়।
জটিল রোগের সৃষ্টি : কলিজা শুকিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া, অম্লনালীর ক্যান্সার এবং মাথা, গলা, কলিজা ও মলনালীর ক্যান্সার, অগ্ন্যাশয় ও যকৃতের প্রদাহ, হৃদয় স্পন্দনসংক্রান্ত সব রোগ, হাইপার-টেনশন, হৃৎপিণ্ডে রক্তসঞ্চালন নালীগুলোর যাবতীয় রোগ, গলনালী প্রদাহ এবং হৃদযন্ত্র ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, পক্ষাঘাত, সন্যাস রোগ এরূপ অন্যান্য প্যারালাইসিস, স্নায়ু ও মস্তিষ্কের যাবতীয় রোগ, কিডনি বিকল হওয়া। এ ছাড়াও মাদকের কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এতে নতুন নতুন রোগ বাসাবাধে মাদকসেবীর শরীরে।
হজম শক্তি হ্রাস : মাদক সেবনে হজম শক্তি হ্রাস পায়। আর এর ফলে আমাশয়, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটের পীড়া ইত্যাদি রোগের উৎপত্তি হয়।
খাদ্য স্বাদ হ্রাস : মাদক সেবন খাদ্যের স্বাদকে বিনষ্ট করে। ফলে খাদ্যের কোনো স্বাদই সে পায় না। সর্ব প্রকার খাদ্য মাদকসেবীর কাছে সমান মনে হয়।
৩. অর্থনৈতিক ক্ষতি : মাদক অর্থনৈতিকভাবে বিরাট ক্ষতিসাধন করে।
সম্পদহীন করে : মাদক সেবনে ব্যক্তি অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। একসময় সব কিছু বিক্রি করে দিয়ে পথে বসতে বাধ্য হয়। যে পরিবারে মদখোর থাকে সে পরিবার ধীরে ধীরে দরিদ্রতার দিকে ধাবিত হয়। একসময় পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে যায়। মাদকসেবী মাদকদ্রব্য ক্রয়ের অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঋণ করতে বাধ্য হয়। ঋণের বোঝা একসময় তাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তোলে।
অবৈধ পথে উপার্জনে বাধ্য করে : মদ ও নেশাদ্রব্য সেবন করতে গিয়ে মাদকসেবী চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ইত্যাদি অবৈধ কাজ করতে বাধ্য হয়।
৪. ধর্মীয়ক্ষতি : মাদক সেবন ধর্মীয় ক্ষেত্রে বর্ণনাতীত ক্ষতিসাধন করে।
আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে : মাদকসেবী যখন মাদক সেবনে ব্যস্ত থাকে। তখন সে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল থাকে এবং তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। সে সর্বপ্রকার ইবাদত থেকে গাফেল হয়ে যায়। এমনকি ইবাদতের ধারেকাছেও যেতে চায় না। মাদক সেবনের ফলে তার হৃদয় কঠিন হয়ে যায়।
ঈমানহারা করে : মাদক একসময় মাদকসেবীকে ঈমানহারা করে দেয়। মহানবী সা: বলেছেন- জিনাকারী যখন জিনা করে তখন সে মুমিন থাকে না এবং মদখোর যখন মদ পান করে তখন সে মুমিন থাকে না (বুখারি-২৪৭৫, মুসলিম-৫৭, তিরমিজি-২৬২৫, নাসায়ি-৪৮৭০, তাফসিরে কুরতুবি, ৫ম খণ্ড, পৃ: ২২৮৫)। মহানবী সা: বলেছেন- মাদক সকল অনিষ্টতার প্রসূতি (তিবরানি)। রাসূল সা: আরো বলেছেন- মদ্যপানকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না (ইবন মাযাহ-৩৩৭৬)।
৫. জাতীয় ক্ষতি : মাদক সেবন জাতীয় নানাবিধ ক্ষতিসাধন করে।
শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করে : মাদক সেবন যে জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সে জাতির মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। মাদক সেবন পারস্পরিক শত্রুতা ও ক্রোধের জন্ম দেয়। ফলে সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট হয় এবং পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ লেগে থাকে।
উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে অন্তরায়: মদ ইত্যাদি নেশাদ্রব্য সেবন জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। সাইয়িদ সাবিক বলেন, মাদকাসক্তি সুঠামদেহী, স্বাস্থ্যবান, শক্তিশালী ও জ্ঞানী হতে বাধা সৃষ্টি করে।
দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত : মাদকসেবী কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি হলে মাদক সেবন তাকে দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত করে। কারণ দেহের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তার কর্মক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
শত্রুকে সুযোগ করে দেয় : মাদক সেবন করার দ্বারা রাষ্ট্রের শত্রুদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ করে দেয়। মাদকসেবী মাদক সেবনের ফলে ভালো-মন্দ পবিত্র-অপবিত্র, লাভ-ক্ষতি ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
(সংগৃহিত)
৫৩
৯২ মন্তব্য