সহকারী শিক্ষক
১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ ১০:২৮ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ভূমিকম্প এমন একটি বিভীষিকার নাম, যার কয়েক সেকেন্ডের আঘাতে পুরো জনপদ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ভূমিকম্পে মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি বাড়িঘর, রেলপথ, পাইপলাইন ইত্যাদি ভেঙে যায় এবং যাতায়াত ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। টেলিফোন লাইন, ভূ-পৃষ্ঠের বড় বাঁধ, কালভার্ট, সেতু ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পুরো পৃথিবী সাতটি প্রধান টেকটনিক প্লেট-আফ্রিকান, এন্টারটিক, ইউরেশিয়ান, ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান, উত্তর আমেরিকান, প্যাসিফিক এবং দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের ওপর অবস্থিত। বিভিন্ন সময়ে এগুলোর স্থানচ্যুতির কারণে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। ভূ-অভ্যন্তরে শিলায় পীড়নের জন্য যে শক্তি সঞ্চয় হয়, সেই শক্তির হঠাৎ মুক্তি ঘটলে ভূ-পৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূ-ত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয়। এই আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প বলে। বেশির ভাগ ভূমিকম্পের কারণ হলো ভূ-গর্ভে ফাটল ও স্তরচ্যুতি। তবে তা অন্য কারণ যেমন-অগ্নুৎপাত, ভূমিধস, খনিতে বিস্ফোরণ বা ভূ-গর্ভস্থ নিউক্লিয়ার গবেষণায় ঘটানো আণবিক পরীক্ষা থেকেও হতে পারে। ভূমিকম্পের প্রাথমিক ফাটলকে বলে ফোকাস বা হাইপোসেন্টার। এপিসেন্টার হলো হাইপোসেন্টার বরাবর মাটির উপরিস্থ স্থান।
ভূ-পৃষ্ঠের এই প্লেটগুলো একটি আরেকটি থেকে আলাদা থাকে ফল্ট বা ফাটল দ্বারা। এ প্লেটগুলোর নিচেই থাকে ভূ-অভ্যন্তরের সব গলিত পদার্থ। কোনো প্রাকৃতিক কারণে এ গলিত পদার্থগুলোর স্থানচ্যুতি ঘটলে প্লেটগুলোর কিছুটা স্থানচ্যুতি ঘটে। এ কারণে একটি প্লেটের কোনো অংশ অপর প্লেটের তলায় ঢুকে যায়, যার ফলে ভূমিতে কম্পন সৃষ্টি হয়। আর এ কম্পনই ভূমিকম্পরূপে আমাদের কাছে আবির্ভূত হয়।
বাংলাদেশ মূলত ভারতীয় ইউরেশীয় এবং বার্মার (মিয়ানমার) টেকটনিক প্লেটের মধ্যে অবস্থান করছে। ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেট দুটি দীর্ঘদিন ধরে (১৯৩৪ সালের পর থেকে) হিমালয়ের পাদদেশে আটকা পড়ে আছে। অপেক্ষা করছে বড় ধরনের নড়াচড়া, অর্থাৎ বড় ধরনের কম্পনের। বাংলাদেশের আটটি ভূ-তাত্ত্বিক চ্যুতি এলাকা বা ফল্ট জোন সচল অবস্থায় রয়েছে। ফল্ট জোনগুলো হলো-বগুড়া চ্যুতি, ত্রিপুরা চ্যুতি, রাজশাহী চ্যুতি, সীতাকুণ্ড চ্যুতি, টেকনাফ চ্যুতি, ডাওকী চ্যুতি, ডুবরি চ্যুতি ইত্যাদি।
২০২১ সালের ২৬ নভেম্বর ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর আগে একই বছরের ৮ অক্টোবর একটি ৫.৬ মাত্রার ভূমিকম্প মিয়ানমার প্রান্তে অনুভূত হয়। এছাড়া ওই বছরের ২৯ মে পরপর চারটি ছোট ভূমিকম্প সিলেটে অনুভূত হয়। ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর বঙ্গোপসাগরে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬০ মাত্রার এবং ২০০৭ সালের নভেম্বরে ৬.০ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষণায় জানুয়ারি ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত চার বছরে রিখটার স্কেলে ৪ মাত্রার উপর ৮৬টি ভূকম্পন নথিভুক্ত হয়েছে। রেকর্ড থেকে দেখা যায়, ভূমিকম্পের মাত্রা না বাড়লেও ১৯৬০ সালের পর থেকে ভূমিকম্প সংঘটনের হার বেড়েছে। অর্থাৎ ঘনঘন স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে। মতপার্থক্য থাকলেও অনেক ভূতত্ত্ববিদ ছোট ছোট ভূমিকম্প সংঘটন বড় ধরনের ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বলে মনে করেন। অতীতের এসব রেকর্ডকে প্রাধান্য দিয়ে অনেক গবেষক জানিয়েছেন, কোনো সময় বাংলাদেশে রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে।
বিল্ডিং কোড ২০২০-এ বাংলাদেশের ভূমিকম্পপ্রধান এলাকাগুলোকে চারটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। বেশি ভূমিকম্পপ্রধান এলাকা জোন ১-এর মধ্যে রয়েছে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও ভারতের শিলং। ডাওকী ও ডাওকী নদী ডাওকী চ্যুতি বরাবর অবস্থান করছে আর ভূ-তাত্ত্বিক চ্যুতিগুলোই বড় ধরনের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল।
দেশের ভূমিকম্পের ইতিহাস ও আশঙ্কা বিশ্লেষণ করে বলা যায়, ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ব্যাপকতা বিবেচনায় আমাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। ভূমিকম্পের আশঙ্কা মাথায় রেখে বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড ২০২০-এ যথাযথ নিয়মে বাড়িঘর নির্মাণের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, বাঁধ নির্মাণে ভূমিকম্পের বিষয়টি তেমন বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অথচ আমরা জানি, বাঁধ ভেঙে ব্যাপক কৃষিজমির ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি মানুষের জানমালের ক্ষতি হয়। এক্ষেত্রে মোড়ানো বাঁধ তথা র্যাপ ফেইজ এমব্যাকমেন্ট নির্মাণকৌশল উদ্ভাবন ভূমিকম্পের ক্ষতি মোকাবিলায় একটি যুগান্তকারী সম্ভাবনার জš§ দিয়েছে। র্যাপ ফেইজ এমব্যাকমেন্ট হলো জিওটেক্সটাইল বা জিওগ্রিড দ্বারা মোড়ানো বালুর বাঁধ, যা কয়েকটি স্তরে খাড়াভাবে নির্মাণ করা হয়। এ পদ্ধতি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, জার্মানিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাঁধ-রাস্তার ঢাল সুরক্ষায় ব্যবহƒত হয়। এসব দেশে র্যাপ ফেইজ এমব্যাকমেন্টের ব্যাপক কার্যকারিতা দেখা গেছে। বাংলাদেশের মতো নদীবিস্তৃত ব-দ্বীপ অঞ্চলের (যেখানে ব্যাপক পলি দ্বারা মাটির স্তর গঠিত হয়েছে) নরম মাটিতে র্যাপ ফেইজ এমব্যাকমেন্টের কার্যকারিতা বুয়েটের গবেষণায় উঠে এসেছে, যা পৃথিবীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ পেয়েছে। গবেষণার ফলাফলগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষকরা একমত হয়েছেন যে, বাংলাদেশের নরম মাটিতে র্যাপ ফেইজ এমব্যাকমেন্ট ভূমিকম্প ও পানির ওয়েব সহিষ্ণু ও কার্যকর এবং এটি পাইলটিং করার পর দেশে ব্যাপক আকারে এ ধরনের এমব্যাকমেন্ট উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করা যায়। র্যাপ ফেইজ এমব্যাকমেন্টের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে ব্যাপকভাবে কার্যকর। দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে বন্যার পরিমাণ বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে উপযুক্ত পাইলটিংয়ের মাধ্যমে দক্ষ প্রকৌশলী দ্বারা এমব্যাকমেন্ট নির্মাণ করে ব্যাপক আকারে তা তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই এমব্যাকমেন্ট পুরোপুরি খাড়া হওয়ার কারণে বাঁধের দুপাশের ব্যাপক কৃষিজমির অপচয় রোধ হবে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়বে। এছাড়া বাঁধটি খাড়া হওয়ার কারণে সরকারের জমি অধিগ্রহণ করার ব্যয় ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেবে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক মোড়ানো বাঁধের ২০০ মিটার পাইলটিং করার জন্য নেত্রকোনায় (জোন-১ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা) অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এর নির্মাণকাজ শুরু হবে। এটাই হবে দেশের নরম মাটিতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী প্রথম বাঁধ।
এখনই সময় দেশে ভূমিকম্প সহিষ্ণু বাঁধ নির্মাণে মোড়ানো বাঁধের প্রযুক্তি ব্যবহার করার। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন-সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে র্যাপ ফেইজ এমব্যাকমেন্ট ভূমিকম্প সহিষ্ণু প্রযুক্তি ব্যাপক আকারে ব্যবহার করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ভূমিকম্প সহিষ্ণু মোড়ানো বাঁধের প্রযুক্তি দেশের সড়ক অবকাঠামো খাতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
৫৩
৯১ মন্তব্য